Thursday, June 28, 2018

সুজাতা ম্যাম


   সুজাতা_ম্যাম



রোল নং -1,2,3,4………. না বিশেষত্ব কিছু নেই এইভাবে রোল কল করতে। বিশেষত্ব বলতে এতদিন গ্রামের ঐ নিস্পাপ ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে শুনত ‘উপস্থিত দিদিমুনি’। আজ বাড়ি থেকে ২০ কিমি দুরের আধা শহরের স্কুলে এসে শুনল ‘ইয়েস ম্যাম’। 
....................................................................................
নতুন স্কুলে আজ দ্বিতীয় দিন সুজাতার; নাম ভগবতী বিদ্যা নিকেতন। এতদিন ছটপট করত তাঁর আগের রামলাল সরেন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আসার জন্য। না অন্য কোনও কারন নয় শুধু বাড়ি থেকে প্রতিদিন ১৭০ কিমি যাতায়তের জন্য। নাহলে ঐ স্কুলের সবাই সুজাতা মেডাম বলতে পাগল। কি করত না সুজাতা আগের স্কুলে মিড-ডে-মিলের হিসেব থেকে কন্যাশ্রী , স্কুলের মান্থলি স্যালারি রিকুইজিশন সব। অবশ্য কম্পিউটারের নলেজ তাকে ঐ জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এত কাজের মাঝেও ছাত্রছাত্রীদের সাথে আলাদা করে বসা, কিভাবে গুলতি দিয়ে পাখি মারে বা তাঁদের বাবা মায়ের নিত্যদিনের কলহ সব প্রাণ খুলে বলত মেডামের কাছে বলত তারা। কিন্তু স্কুল বাড়ি ফেরার সময় থেকে মনে হত আর কতদিন এভাবে যাওয়া যাবে এইভাবে? বাড়িতে সরকারি চাকুরি করা স্বামীর যে আয় সেরকম নয়। এদিকে বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা মা ও তাঁর নিজের সুগারের ঔষধ কিনতেই তিনি জেরবার; তাই ইচ্ছে থাকেলেও উপায় ছিল না সুজাতার। সর্বোপরি বাড়িতে চার বছরের সন্তান। না সে যেমন ছেলেটিকে স্কুলে পাঠাতে পারে না আবার বিকেলে অভুক্ত ছেলেটিকে নিজের হাতে খেতেও দিতে পারে না। অবশেষে মিউচুয়াল ট্রান্সফারে । আজ ১০ টায় বেরিয়েও প্রেয়ার লাইনে দাঁড়িয়েছে। 
গতকাল জয়েন করার পর থেকেই কেমন যেন লাগছে তাঁর। এই স্কুলের ছেলে গুলো মনে হচ্ছে ডেপো। গতকাল নাইনের ক্লাসে স্টপগ্যাপে পাঠানো হয়েছিল। প্রথম দিন বলে একটিই ক্লাস! দেওয়ালের গায়ে লেখাগুলি দেখেই মন কেমন হয়ে গিয়েছিল সুজাতার। এই লেখা গুলি অন্য স্যারেরা দেখতে পান না?
গঙ্গাজল যে পাত্রে রাখা হোক না কেন আকার কিন্তু সেই পাত্রেরই হয়। আগের স্কুলের সব কলিগ কলিগ নয়, যেন ভাই-বোন আবার একই পেশার এখানে পরিবেশটা কেমন যেন। হতে পারে নতুন বলে নিজের এরকম ঠেকছে কিন্তু তবুও মনে হচ্ছে কেমন। বিশেষ করে নকুল বাবু কাল থেকে কপাল আর চশমার ফাঁক দিয়ে তাকে যেন এক্সরে করছেন। যতদুর আন্দাজ বছর তিন চারের মধ্যে স্কুলের মায়া ত্যাগ করবেন। 
তবে একটি জিনিস এখানে আলাদা, এবং টা হল মানে এখানকার ছাত্র / ছাত্রী ওখান থেকে এগিয়ে। গতকাল ক্লাসে গিয়ে টের পেয়েছে। আর বাকি সব যেন আলাদা।
..............................................................................
রোল কল করতে করতেই একটি ছেলের দিকে নজর চলে গেল তাঁর। স্টাফরুমে নকুল বাবু শুধু নয় ভবিষ্যতের নকুল বাবু সেভেনেই তৈরি যেন। 
“অ্যাই দাড়াও বলছি তোমার নাম কি?” 
“ম্যাডাম পটলা” বলে পাশের ছেলেটি উত্তর দিল। 
“একি আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি ?” 
“অ্যাই দাড়াও বলছি” 
ছেলেটি উঠে পড়ল; উষ্কখুষ্ক চুল জামাও কিছুটা অপরিষ্কার শুধু উজ্জ্বল তার চোখ দুটি।
“কি নাম?”
“মদন”
“নাম প্রেজেন্ট করলে না কেন?”
“এমনি”।
“এমনি বলার মধ্যেও এমন ডেপোমি লুকিয়ে আছে বলার না”।
“কত রোল?”
“বাহান্ন”
“ঠিক আছে বস, কাল নাম প্রেজেন্ট করবে তোমাকে চিনে রাখলাম”।
মদন মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল।
‘শোনো আমি তোমাদের নতুন ক্লাস টিচার, কাল থেকে আমি তোমাদের বাংলা ক্লাস নেব। একটা কথা বলে দিই আমি কিন্তু খুব রাগী। তাই আমার কাছে দুষ্টুমির অনেক শাস্তি আছে যখন যা দরকার তা দেব”। না সুজাতা কোনদিনও মারধর করে নি। ঐ যে কর্পোরাল পানিশমেন্ট আইন। ওগুলো বলতে হয় তাই বলা । 
পরবর্তী ক্লাস পর্যন্ত মদন এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকল। একটা বিরক্তি নিয়েই যেন ক্লাসটা শেষ করল।
সারাদিনে আরও তিনখানা ক্লাস করল। নিচু ক্লাসের ছেলেরা চুপ থাকেলও উঁচু ক্লাসের ছেলেদের কথা বলার স্টাইল যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল নিত্যদিনের জার্নি ছাড়া ও ওদের মিস করছে।
এইভাবেই সাতদিন কেটে গেল। ক্রমশ এখানেও কলিগদের সাথে বেশি করে পরিচিত হল । এখানেও আগের স্কুলের মত একজন কে জানতে পেল দিব্য দা যিনি সেই গ্রামেরই অথচ স্কুল অন্তপ্রান আর কেউ বিপদে পরলে সবচেয়ে আগে এগিয়ে আসেন। 
কিন্তু সাতদিনে মদনের আচরণে কোনও চেঞ্জ হল না। এক দৃষ্টিতে তাকানো তার বন্ধ হল না।
না কোনও দিন নেয়নি CCL এবার যেন খুলতেই হবে। গত বছর চালু হওয়া এই ছুটি আগের স্কুলের রিনিদি একা নিয়েছেন। আজ রাতেই তাঁর সাথে কথা বলবে আরও ভাল করে বুঝে নেওয়ার জন্য।
একদিন টিফিনের সময় প্রধান শিক্ষক সুমিত রায় এর ঘরে। সুজাতা জয়েন করার পর পাঁচদিন ছিলেন না।
সুমিত বাবু- “আরে সুজাতা এসো এসো, তোমার সাথে তো আমার দেখাই হল না আর বল কেমন লাগছে তোমার নতুন স্কুল”। 
সুজাতা- “স্যার বলছি একটা কথা”।
সুমিত বাবু- “জানি বলতে হবে না তোমার স্যালারি তো? ও ঠিক হয়ে যাবে আমি দিব্যকে বলে দিচ্ছি তুমি ওর সাথে একটু বস”।
সুজাতা- “না স্যার আমি ছুটি নেব CCL”।
সুমিত বাবুর এক্সপ্রেশন দেখে মনে হল সুজাতা CCL নয় ওনার কিডনি চাইলেন।
সুমিত বাবু- “আরে সবে তো জয়েন করলে এখন তো বাড়ির কাছে তাহলে ছুটি কি দরকার। কিছুদিন যাক তারপর ভাবা যাবে”। 
সুজাতা- “ঠিক আছে । স্যার একটা কথা বলব”।
সুমিত বাবু-“অবশ্যই বল”।
সুজাতা-“একটি ক্লাস সেভেনের ছেলে?..................”।।
সুমিত বাবু- “দিনেশ ছেলেটিকে ডাক তো” ।
দিনেশ ছেলেটিকে ডেকে নিয়ে এল। ওকে দেখতেই সুমিত বাবু ওর কান দুটি ধরে বললেন- “শোন আর যদি ম্যাডামের সাথে ওইরকম করিস পিঠের চামড়া তুলে নিব বুঝলি”।
পরদিন ক্লাসে আবার এর কোনও ব্যতিক্রম হল না। কিন্তু আজ মদন একটা অদ্ভুদ কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলল। ক্লাস শেষ হতেই ও সুজাতার কাছে চলে গেল আর তার শাড়ি সরিয়ে পেটে হাত দিতে গেল ।
সুজাতা তার মেজাজ হারিয়ে মদনের চুলের মুঠি ধরে গালে অন্তত ছয়-সাত ঘা বসিয়ে দিল। ক্লাসের সবাই হো হো করে উঠল।
স্টাফরুমে ফিরেই হাতের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু বেশিক্ষণ পারল না উঠে গিয়ে টয়লেটে দরজা বন্ধ করে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। চোখে জল দিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। সহকর্মী রেনু দি বারবার জিজ্ঞেস করলেন সুজাতা কি হয়েছে বল কিন্তু সুজাতা চুপচাপ। বাড়ি ফিরে সব ঘটনা বলল স্বামীকে। 
ও বলল- “ঠিক আছে আমি কথা বলছি ওখানকার ম্যানেজমেন্টের লোক দের সাথে”। 
সুজাতা- “না থাক এর পর কিছু হলে বলব”। 
তিনদিন স্কুলে গেল না। তিনদিন পর স্কুলে গিয়ে দেখল মদন নেই। উফ বাঁচা গেল একদিন শান্তিতে ক্লাস করতে পারব। রোল কল শুরু করল কিন্তু বাহান্ন টতে এসে আটকে গেল। আজ তিনদিন মদনের অ্যাবসেন্ট। ওর কথা জিজ্ঞেস করতেই একজন বলল –“ম্যাম আপনার আপনার চড় খেয়ে জ্বরে পরে আছে তিনদিন”।
পাশ থেকে একটা ছেলে বলে উঠল-“ পটলা তুই গেলি রে”।
ক্লাসের বাকিরা হো হো করে হেসে উঠল। 
ক্লাস থেকে ফিরে এসে উদাস হয়ে বসে রইল। সেদিন কাউকে বলা হয়নি ঘটনাটা । আজ দিব্য স্যারকে সব বলল। ওর কাছে জানতে পারল ও দাদুর বাড়িতে থাকে। একবছর হল অএখানে এসেছে। কিছুটা অন্যমনস্ক থাকে। কোনও অজানা কারনে কথাটি শুনে যেন তাঁর হৃদয় মোচড় দিয়ে উঠল। ও মদনের বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করল। 
যথারীতি বিকেল বেলা দুজন মিলে মদনের বাড়ি। 
গিয়ে দেখল বাড়িতে মদনের দিদা।,দাদু তখনও বাড়ি নেই। বাড়ির বড় ছেলে ২২ বছরের অমিক কর্মসূত্রে বাইরে। 
পরিচয় দিতেই বলল – “আসুন দিদিমণি আপনার কাছেই যাব ভাবছিলাম জ্বরটা ছেড়ে গেলেই যেতাম” ।
পাকা ছাদ কিন্তু প্লাস্টার না করা বাড়ির দেওয়াল। ঘরে ঢুকতেই নজরে এল মদন চোখ বন্ধ করে বিছানায়। ওর কাছে যেতেই নজরে পড়ল একটি ছবি। নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না সুজাতার। পেন্সিল দিয়ে আঁকা তাঁর ছবি মদনের বাড়িতে কেন? তাহলে কি আবার ভুল করল সুজাতা। এই বয়েসের একটি ছেলে তাঁর ছবি একে দেওয়ালে টাঙিয়ে রেখেছে।
“ও আমার মেয়ে সুলেখা, বছর খানেক আগে গলায় দড়ি দিয়ে মারা যায় । ওর বাবা আরেকটি বিয়ে করে একমাসের মধ্যে তাই ওকে আমরা নিয়ে চলে এসেছি”- পেছন থেকে আওয়াজ দিল মদনের দিদা।
আরও বলতে লাগল- “মা মরা ছেলে শুধু মাকেই খুঁজে বেড়াত, ও ১০ দিন আগে এসে বলল দিদা আমার মা চলে এসেছে স্কুলে; ও রোজ আপনাকে ভাল করে দেখত আর একটু একটু করে ছবি আঁকত। ও ছোট থেকেই ভাল আঁকে। আমি ওকে বলেছিলাম বাবা আমি তোর মা কিন্তু সেদিন বলে গিয়েছিল দিদা আমি আগে যেমন মাকে কাতুকুতু দিতাম আমিও আজ মাকে স্কুলে দেব। আমি বারণ করেছিলাম কিন্তু...”।
আর শুনতে পেল না সুজাতা একজন জোরে থাপ্পড় বসিয়ে দিল তাঁর গালে। চোখের জল বাঁধ মানল না গালের পথ ধরে স্রোতের বেগে আছড়ে পড়ল যেন। না এ থাপ্পড় কোনও মানুষের নয় বিবেকের। 
সুজাতা ধীরে ধীরে মদনের কাছে এগিয়ে গেল। ডাক দিল “মদন”। শুনতে পেয়েই চোখ খুলে তাকাল মদন। সুজাতাকে দেখতে পেয়েই ডাক দিল “মা”। 
আর কোনও কথা বলতে পারল না সুজাতা ওকে জড়িয়ে ধরল। দুজন দুজনকে জড়িয়ে খুব কাঁদল এখন। এ এক অনাবিল আনন্দ CL, মেডিকেল, CCL, DA, পে কমিশন সব এর কাছে মিছে। 
পেছনে দিব্য আর মদনের দিদার চোখেও জল।


লিখেছেন : অভিজিৎ_মণ্ডল

1 comment: