Thursday, June 28, 2018

যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে

কু-উউউউ ঝিক্ ঝিক্ ঝিক্ ঝিক্...আওয়াজ টা শুনলেই বুবুনের মনটা আনন্দে নেচে ওঠে।ঐ আওয়াজ করা গাড়িটাতে চড়েই তো ও প্রতিবছর মামাবাড়ি যায়।ওর মামাবাড়ি বীরভূমের এক গ্রামে।গরমের ছুটি মানেই বুবুনের কাছে ওর মামাবাড়ি।ওর মামাবাড়ির পাশের বাড়িতেই থাকে মনি।ওর খুব ভালো বন্ধু।মনি খুব সুন্দর হাতের কাজ জানে,সবই নিজের চেষ্টায় শিখেছে।প্রতিবছর নববর্ষের কার্ড ও নিজের হাতে করে,আর বুবুনের জন‍্য গুছিয়ে তুলে রাখে।বুবুন ও কলকাতা থেকে নতুন নতুন জিনিস কিনে আনে মনির জন্যে।

                      মনির বাড়ি আটচালা মাটির ঘর।ঐ ওপর আর নিচের চালার মাঝে যে সংকীর্ণ জায়গাটা ওটাই ওদের স্বর্গ, গুপ্তধন সযত্নে লুকিয়ে রাখার জায়গা।ঐখানে দাঁড়ানো যায়না,শুধু বসা যায়,দাঁড়ালেই মাথা ঠেকে যায় চালে।মনি কার্ড ছাড়াও কাগজের ফুল বানায়,রুমাল সেলাই করে,উল বুনে টুপি বানায়,মাফলার বানায়,গেন্জিতে নকশা করে আর সব কিছু সবার চোখের আড়ালে জমিয়ে রাখে বুবুনের জন‍্যে।বুবুন মামাবাড়ি এলেই একটা একটা করে তুলে দেয় বুবুনের হাতে।এটাই ওদের খেলা।বুবুন মনির দেওয়া টুপি,মাফলার পরে আর মনি দেখে আনন্দ পায়।

                আর তো দশদিন পরেই গরমের ছুটি পড়বে।বুবুন দিনগোনা শুরু করে।দশ-নয়-আট-সাত-ছয়-পাঁচ-চার-তিন-দুই-এক।আজ বুবুন মামাবাড়ি যাবে।দাদু নিতে আসবে স্টেশনে।কি মজা!কতদিন পরে আবার দেখা হবে মনির সাথে।উফ্!কি আনন্দ যে হচ্ছে বুবুনের!কতদিন পর.......মনি কি নতুন কিছু বানিয়েছে ওর জন্যে?বুবুন তো গোলাপ ফুল আঁকা দামী কার্ড কিনেছে,একটা সুন্দর পুতুল নিয়েছে সঙ্গে পুতুলের জন্যে কিছু পুঁতি-চুমকি-সুতো আর কাপড়।মনি নিজের হাতে পুতুলের মালা-চুড়ি-কানের দুল বানাবে আর পুতুলকে সাজাবে।সত্যি,মনির হাতে মনে হয় জাদু আছে।না হলে,এত সুন্দর সুন্দর জিনিস কেউ বানাতে পারে!মনি জানেও না বুবুন এবার ওর জন‍্যে কি নিয়ে যাচ্ছে।বুবুন মনে মনে ভাবছে মনি পুতুলটা দেখলে আনন্দে নেচে উঠবে,আর ওর মুখের হাসিটা বুবুনের খুব ভালো লাগে।উফ্!ভাবলেই মনটা নেচে উঠছে।কিন্তু, মনি এবার ওর জন‍্য কি বানিয়েছে।নতুন কি দেবে সে?প্রতিবারই বুবুন মনে মনে একথাটা ভাবে আর মনে করে ও আর কত নতুন কিছু বানাবে!এবার মনে হয় ঐ আগের কিছুই একটা দেবে।ওটা কি কলকাতা যে রোজ নতুন কিছু বানাতে পারবে?কিন্তু না।বুবুনের সব সন্দেহে জল ঢেলে মনি ওকে নতুন কিছুএকটা দেয়।আচ্ছা,এবারে ও কি দেবে?

                ভাবতে ভাবতে বুবুন মামাবাড়ি পৌঁছেযায়।ঘরে ঢুকে ব‍্যাগটা মেঝেতে ছুঁড়ে দিয়েই এক ছুটে ও চলে যায় মনির বাড়ি।হাতে নেয় পুতুল ভরা ব‍্যাগটা।

―মনি,মনিইই,দেখ আমি এসেছি।

―কে রে?বুবুনের গলা মনে হচ্ছে।

―হ‍্যাঁ রে,আমি বুবুন রে...দেখ চলে এসেছি।

মনি ছুট্টে বেরিয়ে আসে।দশ বছরের দুটি শিশুর মন আনন্দে নেচে ওঠে।ওরা হাত ধরাধরি করে বেশ কয়েকবার গোল গোল করে ঘুরে ঘুরে নেচে ওঠে।বেরিয়ে আসেন মনির মা বাবা।ওনারাও বুবুনকে খুব ভালোবাসেন।

―চল্ চল্ বুবুন,ওপরে আয়।

―হ‍্যাঁ,তাড়াতাড়ি চল্।

                 ছোট্ট ছোট্ট মাটির সিঁড়ি বেয়ে দু'জনে ঐ স্বর্গরাজ‍্যে এসে পৌঁছায়।বুবুন তার ব‍্যাগ থেকে পুতুল আর তার সাজ সরঞ্জাম বের করে দেয় মনির হাতে।মনি হাতে নিয়েই আনন্দে লাফিয়েওঠে।মনির কথা মনে রাখেছে বুবুন।আগের বছর কথায় কথায়মনি একটা ভালো পুতুলের কথা বলেছিল।বুবুন মনে করে নিয়ে এসেছে।আনন্দে মনির সুন্দর মুখখানি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

―এবার দেখ বুবুন,আমি তোর জন্য কি বানিয়েছি।

―তাড়াতাড়ি কর মনি।

―হ‍্যাঁ,এই দেখ।

                মনি আস্তে আস্তে খোলে টিনের বাক্সটা।একটা সুন্দরহাতপাখা বানিয়েছে সে,তালপাতা দিয়ে।আর তার ওপর উলের ছোট্ট ছোট্ট ফুল।

―ওঃ,কি দারুণ!আহা,কি সুন্দর হাওয়া রে।

দ'জনেই হেসে উঠল।

―আরও আছে।

―আরোও কি?ওমা!

মনি একটা ব‍্যাগ বানিয়েছে।পুরো বাজারে দেখা ঐ ব‍্যাগটার মত।নীল মোটা কাপড় দিয়ে তৈরি।তর ওপর সাদা রং দিয়ে আঁকা রবীন্দ্রনাথের সাইড্ ফেস্।উফ্,মারাত্মক!আর ঐ রবীন্দ্রনাথের মুখের ছবির নীচে লেখা―

                     "যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,

                                            তখন মনে রেখো।।"

―দারুণ হয়েছে ব‍্যাগটা।কি করে বানালি রে?কোথায় শিখলি?

―নিজেই।সেদিন টি ভি তে একজনকে দেখলাম, এরকম একটা ময়ূর আঁকা ব‍্যাগ একদিকে ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।পরেরবার ২৫শে বৈশাখ তুই এটা ব‍্যবহার করিস।

―হ‍্যাঁ,করব।অবশ্যই করব।

―আর জানিস,ডাক্তার কাকু বলেছেন আমার না কি ক‍্যান্সার না কি একটা হয়েছে।

―কি বললি তুই?কি হয়েছে?

আঁতকে ওঠে বুবুন।চোখ জলে ভরে যায়।কোনোরকমে সামলে নেয় নিজেকে।

―ক‍্যান্সার।

             মনি জানে না ক‍্যান্সার কি,কিন্তু কলকাতার নামী-দামী স্কুলে পড়ার দরুণ এই বয়সেই বুবুন ক‍্যান‍্সারের সাথে বেশ ভালোভাবেই পরিচিত।সেদিন ক্লাসে জয়া ম‍্যাম বলছিলেন ক‍্যান্সারের রুগীদের বাঁচার আশা জোগাতে হয়,যদিও ক‍্যান্সার একটি মারণ রোগ।বুবুন জিঞ্জেস করে,"আচ্ছা মনি,ক‍্যান্সার কি বল?"

―আমি জানিনা রে।ওষুধ তো খাচ্ছি।ঠিক হয়ে যাবে।

―ও।

      সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে চলে আসে বুবুন।খুব মন খরাপ হয়ে যায় ওর।মানে, মনি আর থাকবে না?তবে ওর কি হবে!ও কার সাথে এত খেলা করবে?কার জন‍্য আসবে মামাবাড়ি?কাকে বলবে মনের মধ্যে সারাবছর ধরে জমিয়ে রাখা হাজারো কথা?ভাবতে ভাবতে মাথা ব‍্যথা হয়ে যায় ওর।

                  দেখতে দেখতে দিন শেষ হয়ে আসে।বুবুন ফিরে আসে কলকাতায়।ভুলে যায় মনির ক‍্যান্সারের কথা।স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে ব‍্যস্ত হয়ে পড়ে।

            সামনেই ২৫শে বৈশাখ।প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে।এবার ২৫শে বৈশাখে বুবুন একটা একরং এর কমলা পাঞ্জাবি পরবে।কাঁধে নেবে মনির দেওয়া ঐ সুন্দর ব‍্যাগটা।২৪শে বৈশাখ,২৫শে বৈশাখের চরম প্রস্তুতি শেষে বাড়ি ফিরেছে।কালকে যে ওকে সকাল ছ'টায় স্কুলে পৌঁছতে হবে।

―উঠে পড় বুবুন,সোনা ছেলে আমার, স্কুলে দেরি হয়ে যাচ্ছে বাবা।

              ঝপ্ করে উঠে পড়ে ও।হাত-মুখ ধুয়ে, পাজামা-পাঞ্জাবি পরে তৈরী হয়ে নেয় আর ব‍্যাগটা নিয়ে স্কুলে যায়।ব‍্যাগটা বুবুনের মায়ের ও খুব পছন্দ বুবুন স্কুলে গিয়ে এক মুহূর্তের জন্যও কাছছাড়া করেনা।ওটা কাঁধে ঝুলিয়েই মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে উদাত্ত কন্ঠে বলে―

                     "মরণ রে তুঁহু শ‍্যামসমান।"

আবৃত্তি শেষে হাততালি।অনুষ্ঠান শেষে ফিরে আসে বাড়ি।

                     কিন্তু বাড়ি এত থমথমে কেন।বুবুনের মনটা এত খারাপ লাগছে কেন?কি হয়েছে?ও ছুট্টে ঘরে ঢুকে গেল।বাড়িতে  ঢুকে দেখে মা চেয়ারে বসে,মায়ের চোখে জল।এক অজানা আতঙ্কে কেঁপে উঠল বুবুনের বুক।ও কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

―মা

―বাবু।মনি...

―কি ?মনি!কি হয়েছে মনির?বল মা বল!মা,বলনা....

চিৎকার করে কাঁদতে থাকে বুবুন।

―মনি আর নেই বুবুন।আজ সকালে.....

মা আর বলতে পারেনা।কান্নায় জড়িয়ে যায় গলা। বুবুনের কাঁধ থেকে খুলে পড়ে যায় ব‍্যাগটা। ও যেন শুনতে পায়,"পরেরবার ২৫শে বৈশাখ তুই এটা ব‍্যবহার করিস।"

       বুবুন তাকিয়ে দেখে ব‍্যাগটার দিকে।সাদা রং দিয়ে আঁকা রবীন্দ্রনাথের মুখ,তার তার নীচে লেখা -

                          "যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, তখন মনে রেখো।।"


লিখেছেন : Arena Patra

0 comments: