Thursday, June 28, 2018

নিশীথিনী

নিশীথিনী



আদি সিগারেটটায় সুখটান মেরে ফেলে দিল।একঘেয়েমি রোজরুটিন থেকে একটু মুক্তি পেতে মাঝেমাঝেই আদি ছোটোখাটো সফরে বেরোয়।এবার যেমন অফিসের টানা চারদিনের ছুটি পেয়ে দীঘা এসেছে।আদি অন‍্যদের থেকে খানিক আলাদা।রিহানাকে হারানোর পর থেকে একাই থাকতে পছন্দ করে।আর তার সবচেয়ে পছন্দের সময় রাত্রিবেলা।রাতেরবেলা বেশ একা একা ঘুরে বেড়ায়।আকাশের চাঁদ আর তারা তার নিস্তব্ধ সঙ্গী।এখন রাত বারোটা।খাবার খেয়েই একা একা বেরিয়ে এসেছে সমুদ্রের দিকে।বেশ দেখতে লাগছে সমুদ্রটাকে।ঐ যে দূরে একটা আলোর বিন্দু,আসছে কোনো নৌকো বা জাহাজ।দিকভুলে,পথ খুঁজে ঠিক পৌঁছে যাবে নিজের জায়গায়।দেখে ভাবে, সত্যি, মানুষের জীবনটাও এরকমই,যে যার গন্তব‍্য খুঁজে নেয় ঠিক।আর যারা দিকভুলে একবার হারিয়ে যায় ফিরতে পারেনা আর।রিহানা আজ তার জীবনে অতীত।খুব ভালোবাসত আদি রিহানাকে।রিহানা ওকে ভালোবাসতো না বললে খুব ভুল বলা হবে।কিন্তু, রিহানা নিরুপায় ছিল।আকন্ঠ ঋণ জর্জরিত বাবাকে বাঁচাতে রিহানা বাধ‍্য হয়ে বিয়ে করে আকাশকে,সেটা আদি খুব ভালোভাবেই বুঝেছিল।তারপর আর কোনোদিন ও রিহানাকে দেখেনি।ওরা নাকি বিয়ের পরে আমেরিকা চলে গেছে।

            এমনসময় সামনে একটা ছায়া দেখে আদির বুকটা কেঁপে উঠল।ও কোনোদিন ভূতে বিশ্বাস করেনা।কিন্তু, মেয়েটার সাদা শিফন শাড়ির আঁচলটার ঝাপটা আদিকে বেশ ভয় পাইয়ে দিয়েছিল।দেখল,সামনে মেয়েটা এখনো দাঁড়িয়ে।চুলগুলো সমুদ্রের হাওয়ায় উড়ছে।রিহানার সাথে ও সমুদ্রে ঘুরতে আসতে চেয়েছিল, মনে মনে রিহানাকে খানিকটা এমনই দেখতে চেয়েছিল সে।কিন্তু মেয়েটা কে?খুব কৌতুহল হল আদির।আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল মেয়েটার কাছে।মেয়েটাকে দেখতে কেমন বোঝা যাচ্ছেনা,কিন্তু বেশ আকর্ষক চেহেরা।মেয়েটার কিছুটা কাছে যেতেই মেয়েটা পেছন থেকেই আদির হাতটা ধরে টান মারল,খানিক অপ্রস্তুত হয়ে আদি বেশ বুঝতে পারল,মেয়েটা এখানে ঘুরতে আসা অল্পবয়সী বড়লোক ছেলেদের নিশিসঙ্গী।নিজের ওপর নিজের রাগ হল আদির।কিন্তু, একি!মেয়েটা কে?

―"রিহানা"

             নামটা শুনেই মেয়েটা আদির হাতটা ছেড়ে বেশ কিছুটা পিছিয়ে গেল।

―"আদি,ক্ষমা করে দিও আমায়,বিশ্বাস করো,এসব কিছুই আমি মন থেকে করিনি।বিশ্বাস করো আমায়।ক্ষমা করে দাও..."

রিহানার চোখের জল আদি কোনোদিন সহ‍্য করতে পারেনা।আজও পারলনা।রিহানাকে কাছে টেনে বালিতে বসল,নিজের হাতেওর চোখের জল মুছিয়ে দিল।

―"এবার বলো কি হয়েছে?বেশ তো বিয়ে করেছিলে,সংসার করেছিলে"

―"হ‍্যাঁ,বিয়ে হয়েছিল তো।ঐ যে আকাশের সাথে।জোর করে তোমার থেকে দূরে সরে গেছলাম।তারপর..."

―"তারপর?"

―"ভেবেছিলাম তোমায় ভুলে সংসারটাই করব,যখন আর সেটা ছাড়া তোমার কাছে ফেরার কোনো উপায় নেই।"

―"সেটাই তো স্বাভাবিক রিহানা।"

―"কিন্তু,ফুলশয‍্যার রাতে আকাশের আসল রূপটা দেখলাম।জানো আদি,সেদিন সকাল থেকেই আমার সাথে কি ভালো ব‍্যবহার করেছিল,আমিও ভাবছিলাম ওকে আমারসবটা বলে ওর সাথে সাযরাটা জীবনকাটিয়ে দেব।জানোই তো,হিন্দু মেয়েরা সিঁদুরের ওপর কতটা দুর্বল।কিন্তু ওদিন রাতেসবাই ফিরে গেলে,আকাশ ঘরে আসে,আমার হাতে একটা গিফট্ বক্স ধরিয়ে দেয়।খুলে দেখলাম ভেতরে স্কচ্।আমি কিছু বুঝতেপারলাম না।এমন সময় ঘরের মধ্যে ওর তিনচারটে বন্ধু ঢুকে এল।সারারাত আমায় জোর করে মদ খাইয়ে আমায় সাথে নোংরামি করে।আমি কিছু বললে আমায় মারধোর করে।এভাবে চলতে চলতে আজ আমায় ও রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে।বহু বার বেরিয়ে আসতে চেয়েছি,কিন্তু, বারবার ভয় দেখিয়ে আটকে রেখেছে,আমার কিছু করার নেই।সেইসময় আমি আর তোমায় খুঁজে পাইনি,একবার পালিয়েগিয়েছিলাম, কিন্তু বাপের বাড়িতে ও আমার জায়গা হয়নি।"

           কথাগুলো বলে রিহানা কন্নায় ভেঙে পড়ল।

―"রিহানা,ওঠো।"

   রিহানা তাকিয়ে দেখন আদি পাশে দাঁড়িয়ে আছে,ডান হাতটা বাড়ানো তার দিকে।

―"এসো,ওঠো,চলো আমার সাথে।"

      রিহানা আস্তে আস্তে হাতটা বাড়িয়ে দিল,উঠে দাঁড়ালো।আদি কোনো কথা না বলে রিহানাকে কোলে তুলল,সমুদ্রের চর থেকে হাঁটতে লাগল দূরের দিকে,দু'জোড়া চোখ শুধু পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল নিষ্পলকে।।



লিখেছেন  : Arena  Patra

0 comments: