Tuesday, July 3, 2018

রাই এর মতো

-আচ্ছা রাই তোর তুই টা কী কখনো তুমি হবে না?
- টিভি সিরিয়াল আজ কাল খুব দেখছিস মনে হচ্ছে? 
-উত্তরটা পেলাম না কিন্তু..
-উত্তরটা কী হবে সেটা যখন খুব ভালো করেই জানিস তাহলে এই অবান্তর প্রশ্ন গুলো না করতেও পারিস.. 
- বাবা আজকাল এত সিরিয়াস হয়ে যাস একটুতেই 
- প্যারামাউন্ট এর ডাভ শরবত টা 50 থেকে 60 হয়ে গেছে 10 টাকা হাত খরচা এবার থেকে বেশি রাখিস অনি..

ঘুম ভাঙা সকাল, ট্রাফিক আর মন কেমনের ব্যস্ততা সকল কিছু যেখানে ছাপ রেখে যায় সেইখান থেকে শুরু হয় স্মৃতি ঘেরা ছোট্ট শহরের বুকে গড়ে ওঠা রাইসা আর নীল এর গল্প..নীল তখন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ছে রাইসা কলেজে হোনার্স এর চাপ সবকিছু সামলেই ভালোবাসার মানুষ কে সময় দিচ্ছে, ওদের আলাপ টা যদিও ফেসবুক থেকেই তারপর বন্ধুত্ব থেকে ধীরে ধীরে ভালোবাসা…। ভিজে মাটির গন্ধ থেকে শুরু করে ওরা এক ছাতার নীচে পথ হেঁটেছে, দেখেছে বিকালের রামধনু একসাথে। প্রিন্সেফ ঘাট থেকে দাঁড়িয়ে দেখেছে সেই ব্রিজ টা, কলকাতায় পুজোতে মিলিয়ে নিতো নিজেদের সাউথ থেকে নর্থ কোনোটাই বাকি যেতো না! ওরা ভীষণ ভালোবাসতো পরস্পরকে।
- কীরে সকাল থেকেই দেখছি চুপ চাপ ঝগড়া হয়েছে বুঝি নীল এর সাথে ফোন টা হাত থেকে নিয়ে বললো প্রজ্ঞা।
- না রে , হুর এটা কোনো মন খারাপের কারণ হলো? 
- বুঝি বুঝি এ বড়ো জ্বালা, মনের মানুষ পায় কয় জনা..
- এস বি নোট টা দিস তো আগের দিন ক্লাস এ ছিলাম না।
- ওকে ডার্লিং।

(কিছুক্ষণ পর)
-এই রাই আরে রাই শোন..
- ও তুই?
- কেনো তুই কী ভাবলি নীল?
- ইয়ার্কি না করে বল কী হয়েছে..
- তোর তো আজকের মতো ক্লাস শেষ আর আমার ও নেই চল ঢাকুরিয়া লেক যাবি?
- রাই তৎক্ষনাৎ চোখ টা বড়ো বড়ো করে তাকালো অনির দিকে
- আরে মিস্টেক মিস্টেক বেরিয়ে গেছে মুখ থেকে, কফি হাউস যাবি? এটাও পছন্দ হলো না বুঝি?
- না বলেছি কী একবারও।
- দুটো কোল্ড কফি উইথ ক্রিম…তারপর রাই জীবন নিয়ে কী ভাবলি..?
- বাবা কার মুখে এইসব শুনছি,বোকাটে ছেলেদের মুখে এইসব মানায় না অনি
- আহা বল না..
- কী বলবো..
- এবাউট ইওর ফিউচার প্ল্যানিং 
- নাথিং স্পেশাল.
- হবে কী করে তোর জীবন ওই নীল এই শেষ.
- আর তোর?
- ভাবছি তোর থেকে শুরু করবো
- হাসি পেলো না এত টুকু ও,রিয়েলি ব্যাড জোক..

বেশ গতানুগতিক এক ঘেয়ে জীবন টা বেশ চলছিল অনি এর সাথে.. কলেজ এর ফর্ম ফিল আপ লাইন এ ১স্ট দেখা ওদের, ভুল লাইন এ দাঁড়িয়ে পড়ার দরুন অনি রাই কে ঠিক লাইন টা দেখিয়ে দিয়েছিলো, ডিপার্টমেন্ট আলাদা। রাইসা হোনার্স আর অনি জেনারেল মানে পাস তবু ও ওদের পরিচিতিটা একটু অন্যরকম, একটু না অনেকটাই অন্যরকম। অনির পাগলামো বাচালতা এই সব কিছু বেশ আকর্ষণীয় রাইসার মতো এক সিরিয়াস মেয়ের কাছেও.
রাত তখন প্রায় 1 টা রাইসা বই পড়ার ফাঁকে ফাঁকে দেখে নিচ্ছে মোবাইল ফোনটা কোনো ফোন calls কিংবা sms আসলো কিনা নীল এর, কিছুক্ষণ পর একটা টুং করে sms আসার আওয়াজে মন টা আনন্দে ভরে উঠলো রাই এর, কিন্তু না নীল এর sms না.. 
"এই যে রাই পাগলী 10 টাকায় 10 টা ফুচকা ব্যারাকপুর এ একটা কাকু এখনো দেয়, আমার ও শুনে খুব অবাক লাগলো কাল কলেজ শেষ হলেই তোকে নিয়ে ইনভেস্টিগেশন এ বেড়াবো এখন তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পর আরে ওতো ভাবিস না আমি কাল কে ফুচকা ট্রিট টা দেবো, গুড নাইট, ইতি - প্যারামাউন্ট এর ডাভ শরবত "

এইভাবেই নীল এর sms না আসার কষ্টটা মুছে যায় ফুচকার গল্পে, এইভাবে অপেক্ষার যন্তনা টা একটু কম হয় রাইসার, ইঞ্জিনিয়ারিং কমপ্লিট করে ক্যাম্পাসিং এর জব তারপর এখন নীল আমেরিকায় নিজের লাইফ জব এইসব কিছু নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত হওয়ার দরুন ওদের এখন আর তেমন যোগাযোগ নেই। প্রথম দিকে কথা হলেও এখন আর হয় না। নীল এর সময় এর অভাব এর কথা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে নীল। তাই অভীমান করা বৃথা রাই জানে এইসব তবু ও যে অভীমান করে ভাবে নীল কোনো দিন হয়তো একটা sms এ সরি কিংবা লাভ ইউ বলে ওর অভীমান টা ভাঙাবে কিন্তু..........
- তারপর ফুচকা টা কিন্তু দারুণ ছিল.. 
- তুই যে বললি 10 টাকায় 10 টা,20 টাকা দিলি কেনো?
- এ বাবা তুই আগে বলবি তো ভুল করে হয়তো
- থাম অনি অভিনয় তোর দ্বারা হবে না.....

রাতের ক্লান্তি যখন চুপচাপ হয়ে যায় শহর যখন থাকে শান্তি প্রিয় ,একটা অন্ধকার ঘর অনি এর চোখের জল গুলো মিশে যায় বালিশে, চোখের পাতার ঝাপটানো গুলো ও কে নিয়ে যায় সেই দিন গুলোতে কলেজের প্রথম দিন থেকে রাইসা কে ভালো লাগা ওর সাথে কথা বালা যেন আকাশ ছোঁয়া অনুভূতি ,প্রথম যেদিন নীল এর কথা শোনে রাইসার মুখে বুকের বাঁ দিক টা ভীষণ চিনচিন করেছিলো সেদিন ১ম সিগারেটের চুম্বনে নিজেকে পুড়িয়েছিল আর বুঝতে পেরেছিলো ওর মতো বোকাটে ছেলেটাও কাউ কে ভালোবাসে.. তারপর থেকে রাই এর সাথে কাটানো মুহূর্ত গুলো কে জীবন করে নেওয়া, মন খারাপ টা কে লুকিয়ে রেখে রাই কে হ্যাপি রাখার সব রকম প্রচেষ্টা। এরপরও অনির মাঝে মধ্যে খুব স্বার্থপর হতে ইচ্ছা করে, মনে হয় রাই কে চিৎকার করে বলতে," তুই শুধু আমার আর কারোর না।" না ওই সব আর পারে না বলতে ভালোবাসা মানে কী শুধু পাওয়া? স্যাক্রিফাইস ও তো ভালোবাসার অপর নাম.. তাই নয় কী..?
- গুড মর্নিং রাই..
- সকাল সকাল ফোন কী ব্যাপের অনি? ধোসা খাওনোর প্লানিং এ আছিস নাকী? 
- না ভাবছি বিয়ে টা সেরে নেবো রোজ রোজ ওই সব ধোসা ফোসা না খেয়ে বউ এর হাতের রান্না খাবো..
- ইয়ার্কি করিস না তো সকাল সকাল এত জোক দিস না, একেতেই বেকার তারওপর বিয়ে..
- ঠিকই বলেছিস, আচ্ছা রাই আমি যদি নীল এর মতো এস্টাব্লিশড হতাম তুই আমাকে বিয়ে করতিস ভালোবাসতিস আমায়..?
- দেখ কর্ণটর দাম অনেক বেশি, বেশ কস্টলি, ফ্রিজে বরফ আছে চলবে তাতে? গরম মনে হয় তোর মাথা গেছে..

(কলেজে) 
- শুভ.... শোন না অনি কোথায় রে? 
কলেজ আসেনি?
- না রে আজ তো আসলো না! 
- ফোন ও করছি নট রিচএবেল..
- আচ্ছা রাইসা তোর বয়ফ্রেন্ড নীল নাকি অনি বল তো? 
আমি বুঝতেই পারিনা.. 
- তনু তুই খুব ভালো করেই জানিস অনি জাস্ট আমার ভালো বন্ধু.. 
- কী জানি বাবা..

( ঘড়ির কাটায় যখন রাত 12 টা..)
- হ্যালো মিস রাই.. 
- তোর ব্যাপার কী রে? কোথায় থাকিস?
- তাহলে আমার খোঁজ নিস?
- তাহলে রাখি..
- আরে আরে ঘড়ির কাটায় 12 টা বাজলো কিনা দেখতো..
- হ্যাঁ 12 টা কেনো? 
- হ্যাপি বালা বার্থডে রাই, উইশ ইউ এ ভেরী হ্যাপি বার্থডে.. 
- আবেগ নাকি অনুভূতি ওতো শত জানে না রাই দু চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসলো রাই এর!
- নীল এর কথা মনে পড়লো বুঝি?
- তুই কী করে বুঝলি 
- আরে রবিন কাকুর দোকানে রং চা 6 টাকা করে ভার, কাল ও খেলাম 5 টাকা ছিল জানিস, কী আর বলবো.. 
- 1 টাকায় তো বেড়েছে শয়তান।

সন্ধ্যায় যখন রাইসার বাড়িতে বন্ধু বান্ধবের ভিড়, রাইসা যখন সেজে উঠেছে রাই এর মতো অপরূপ সুন্দরে, শ্যাম্পেন আর উইশকির ভিড়ে সবাই টোল মলো তখন অনির না বলা প্রেম নিবেদনের প্রস্তুতির শেষ মুহুর্ত রাই কে দেখে চোখের পলক যেন পড়ছে না.. 
- কীরে ওরম ভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো?
খুব বাজে লাগছে নাকি? জানি মোটি লাগছে... 
- জানিস যখন আস্ক করছিস কেনো? 
- হুম.. তা তুই আজ কে এত ড্রেস দিয়েছিস,কী ব্যাপার? 
- বলছি মানে বলছি মানে
- কী মানে মানে করছিস তখন থেকে 
- মানে তোর মন ভালোরাখার দায়িত্ব টা (ওই দিকে ঘর জুড়ে মিউসিক এর শব্দ লাউড যেন সব কথা কে ছাপিয়ে যাচ্ছে) 
- কিছু শুনতে পারছি না কী বলছিস?

ওপার থেকে রাই এর চোখ দুটো পিছন থেকে ধরলো কেউ, চেনা হাতের ছোঁয়া ,চেনা চেনা অনুভূতি রাই এর বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো যেন সব কিছু থমকে গেছে যেন কোনো কিছু কানে আসছে না আর.. রাই এর ঠোঁট দুটো বলে উঠলো নীল.. 
- য়িআপ রাই.. উইশ ইউ এ ভেরি হ্যাপি বার্থডে রাইসা.. লাভ ইউ..
- রাই তখন নীল এর বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে আছে ওর ভালোবাসার মানুষ কে..

অন্যদিকে অনি এর আনা লাল গোলাপ টা উঁচু ছাদের কার্ণিশ থেকে পরে মিলিয়ে গেলো কোনো ওডি কিংবা সস্তার ট্যাক্সির নীচে.. চোখের জল টা মিলিয়ে গেলো ডিজে এর লাল নীল হলুদ আলোতে..
- এই অনি চল নীল এর সাথে আলাপ করিয়ে দি.. 
- আরে ঠিকাছে
- তখন কী যেন একটা মন খারাপের কথা বলছিলি.. মন খারাপ কেনো তোর? কী হয়েছে? 
- প্যারামাউন্ট এর ডাব সরবত টা 50 থেকে 60 হয়ে গেছে.. তোকে আর খাওয়াতে পারবো না যে.. অন্যদিকে পিয়ানো তে-

" তুমি সুখ ও যদি নাহি পাও, যাও সুখেরও সন্ধানে যাও.........."

কলমে- Puja Das

1 comment: