Tuesday, July 3, 2018

ভাল থাকবেন স্যার


বিছানায় বালিশের পাশে মোবাইল নিয়ে ঘুমানো অভ্যেস করেছেন আমিরুল বাবু। নিজে শিক্ষক হয়ে সকলকে জ্ঞান দেন ঘুমানোর সময় যেন এই যন্ত্রটি যেন মাথার পাশে না থাকে। কিন্তু নিজে সে অভ্যেস ছাড়তে পারেননি। ফেসবুক, Whatsapp এর মত সোশ্যাল মিডিয়া জ্বরের হাত থেকে রেহাই পাননি। সেদিন সকাল সকাল Whatsapp এ একটি মেসেজ, তবে আননোন নাম্বার থেকে । প্রথমে এড়িয়ে যাচ্ছিলেন কিন্তু হেডিং এ ‘ভাল থাকবেন স্যার’ দেখে তিনি লেখাটি পড়লেন...............।

Sir, 
আমি আপনার ছাত্র মদন টুডু। আমার নাম শুনলে রাগে আমার লেখাটি পড়বেন কিনা জানিনা তবু ভরসা করে লিখছি। স্যার সেদিনের ক্লাসে আমি কিন্তু আপনাকে নকল করিনি। আপনি কি স্টাইলে পড়ান আমি সেটাই ধিরাজকে করে দেখাচ্ছিলাম। কিন্তু আপনি এসে আমার চুল ধরে যেভাবে পিঠে মেরেছিলেন দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তখন যে কি রাগ হয়েছিল বলে বোঝাতে পারব না স্যার। আর সেই রাগে ঘি ঢেলে দিলেন যখন এসে বললেন, ‘মদন তোকে খুব লেগেছে নারে’। মনে মনে আমার স্টকে যত খিস্তি ছিল বলে ফেলেছিলাম। আর কিছু বন্ধু এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দিল। আমার রাগের কথা ওদের; মানে কামতাপুরির নেতাদের বলে দিল। আমিও সাই দিলাম, ওরা স্কুল ঘেরাও করল । আপনার দিকে তখন সব মাস্টারের দল। শেষে বিচার বসল এবং ঠিক হল আপনি আমার কাছে ভুল স্বীকার করবেন। এবারে বেঁকে বসল আমার মা। ওর দাবি একটা মুসলা মাস্টার হিন্দুর ছেলেকে কেন মারবে , তাই ওকে ক্ষমা চাইতে হবে তাও স্কুলের বাইরে যেখানে হাজার খানেক লোক জমা হয়ে আছে। আর মায়ের হাতে একটা চটি যেটা ও আপনাকে মারবে বলে রেখেছিল। কিন্তু বাইরে নিয়ে আসতে পারিনি আপনাদের । আপনারা পুলিশ ডাকলেন তারাও এলেন ।কিন্তু গ্রামবাসী, কামতাপুরির কিছু তরুন রক্তের ছেলে তখন জেদ ধরল এবারে বিচার বাইরেই করতে হবে। তবু পারিনি আপনাদের বাইরে নিয়ে আসতে। কারন আপনাদের শিক্ষক দল, যেভাবে একসাথে এর প্রতিবাদ করেছিলেন সেদিন ওই বয়সে না বুঝলেও আজ বুঝেছি শিক্ষার কাছে সব অস্ত্র ভোঁতা। সেইদিনের সেই নীতি আজ কাশ্মীরে ফোর্স এর চাকরি করতে এসে বুঝছি। লড়াই করতেও শিক্ষা লাগে, আপনাদের মত স্থির বুদ্ধি লাগে আর আপনাদের মত একতা লাগে।
সেদিনের ঘটনার একবছর পর যখন স্কুল থেকে পাশ করে বেরিয়ে এলাম একদিন রাস্তায় আপনার সাথে আমার দেখা। আপনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘মদন ভাল আছিস’। স্যার মনে পড়ছে সেদিন কিন্তু সানগ্লাসটা খুলিনি। কেন জানেন? একবার ক্লাসে সানগ্লাস পড়ার জন্য কান ধরেছিলেন। না আমি সেই রাগে সানগ্লাসটা খুলিনি তা না। আসলে যেই বলেছেন মদন ভাল আছিস’ আমার বিবেকে যেন কেউ কষে থাপ্পড় বসিয়ে দিয়েছিল। আমার চোখ তখন জলে ভর্তি। কোন কথা বলতে পারছিলাম না। ঠিক স্যার আপনারা শিখকরাই পারেন এমন উদার হতে । এত অপমান সহ্য করেও সেই ভালবাসা সুলভ মন নিয়ে আমাদের খোঁজ নেওয়া? না স্যার অন্য কোন পেশার লোক এটা পারেন কিনা জানি না। 
সেই ঘটনার পর আরও একবছর স্কুলে ছিলাম। সত্যি বলছি স্যার আপনাকে একটু অন্য চোখেই দেখতাম। একদিন এক ছাত্র প্রার্থনা সভায় দাড়িয়ে দুষ্টুমি করছিল। আপনি মঞ্চ থেকেই ঘোষণা করেছিলেন ‘ আচ্ছা জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সময় টুকু তোরা ভাল করে দাঁড়াতে পারিস না’। আজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাড়িয়ে থাকি। একরকম ভাবে পাছে কোন বিদেশী শত্রু আমাদের দেশে হানা দেয়। আজ দেশের নেতারা তো দেশকে বসিয়ে যেতে বসেছে। স্যার আপনারাই পারেন একটা দেশকে মেরুদন্ড সোজা রেখে দাঁড় করিয়ে রাখতে। 
মনে পড়ছে স্যার আপনি একটা গল্প বলেছিলেন। যদি ভাল করে লেখাপড়া করিস তোর জীবনের দাম ১ এবারে তুই ভাল নাচ জানিস তোর জীবনের দাম ১০ আবার ধর তুই ভাল গান জানিস তোর জীবনের দাম ১০০ । এইভাবে তুই যত নিজেকে বিকশিত করবি তোর দাম বেড়ে বেড়ে ১০০০০০০ এইরকম হবে। আর তুই সব জানিস সব জানিস শুধু লেখাপড়া জানিস না তোর জীবনের দাম ০০০০০০০০। স্যার কিছু পিছিয়ে পড়া ছেলে নাচতে পারে, গাইতে পারে আবার লেখাপড়া নাই বলে সকাল বেলা রাস্তা ঝাড় দেওয়ার কাজ করে। স্যার সমাজে ০ দেওয়ার অনেক লোক আছে। কিন্তু ১ দিতে ভরসা শুধু আপনারা। 
সেদিনের পর থেকে আজ পাঁচ বছর অতিক্রান্ত। চেষ্টা করেছি আপনার সামনে গিয়ে একটি বার পা ধরে ক্ষমা চেয়ে আসি। পারিনি , কেন পারিনি বলতে পারব না। শুধু অনুভব করেছি কুম্ভকার মাটির তাল কে পিটিয়ে তাকে আগুনে পুড়িয়ে সৌন্দর্যের ভান্ডারে স্থান দেয়। মাটি কিন্তু কোন প্রতিবাদ করে না। আপনারা সমাজের কুম্ভকার আমাদের মত মাটিকে পিটিয়ে, ভালবাসায় পুড়িয়ে সমাজের সৌন্দর্যে ঠাই দেন । আজ শিক্ষক দিবসের সকালে আপনাকে প্রনাম জানাই। ভাল থাকবেন স্যার।
মদন
মেসেজটি পড়ে চোখের কোন ভিজিয়ে ফেললেন। হোক যত অপমান একটি হৃদয়ের শুদ্ধি ঘটাতে পেরে নিজেকে শিক্ষক বলতে গর্ব বোধ এটিই আমিরুল বাবুর পরম প্রাপ্তি,,,

0 comments: