Tuesday, July 3, 2018

নষ্টা

শিবানী দেবীর শরীরটা আজ বেশ অসুস্থ।বেশী কথা বলতে পারছেন না।তাই আজ আর ভিক্ষেও মেলেনি।বোধহয় আজ ট্রেন গন্ডোগোল তাই স্টেশনে খুব ভির।এত ভিরে দু-একজনের পায়ের চাপা খেয়েছেন শিবানীদেবী।এই ভিরে দম আটকে আসছে ওনার।একটু নি:শ্বাস নিতে টুকটুক করে লাঠিতে ভর দিয়ে প্লাটফর্ম থেকে নেমে এলেন শিবানীদেবী।প্লাটফর্মের বাইরে ট্যাক্সিস্ট্যান্ড।এখানেই একটা কোনে জায়গা করে শুয়ে পড়লেন শিবানীদেবী।
এক ট্যাক্সিওয়ালার পায়ের ধাক্কায় ঘুম ভাঙলো শিবানীদেবীর।ট্যাক্সিওয়ালা বলছে,"অ্যাই বুড়ি ওঠ।রাস্তা ছাড়। ট্যাক্সি নিয়ে বেরোবো।"...শিবানীদেবী উঠতে গিয়ে পড়ে গেলেন।গায়ে জ্বর আছে।ট্যাক্সির ভিতর থেকে এক ভদ্রমহিলা মুখ বাড়িয়ে বললেন,"আরে শিবানী বৌদি না??..কেমন আছ?"..এক অচেনা মহিলার মুখে নিজের নাম শুনে অবাক হয়ে তাকালেন শিবানীদেবী।বুঝতে চেষ্টা করলেন মহিলাটি কে??..পরমা না???..হ্যাঁ পরমাই তো।
বছর ষাটেকের বৃদ্ধা পরমাদেবী শিবানীদেবীকে বললেন,"উঠে এস বৌদি।গাড়িতে উঠে এস।"...শিবানীদেবী কিছু বলার আগেই ওনাকে হাত ধরে গাড়িতে নিয়ে তুললেন পরমাদেবী।কিছুক্ষণ পর গাড়ি একটা ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
পরমাদেবীর সুসজ্জিত ফ্ল্যাট।সমস্ত রকম আসবাবপত্রে ভর্তি।পরমাদেবী একটা সোফায় বসতে দিলেন শিবানীদেবীকে তারপর বললেন,"তোমায় একটা ভালো শাড়ি দিচ্ছি বৌদি তুমি এই ময়লা ছেঁড়া শাড়ি ছেড়ে ওটা পড়ে নাও।"....শাড়ি পড়ানোর পর শিবানীদেবীকে ভাত খেয়ে দিলেন পরমাদেবী।ক্ষুধার্ত শিবানীদেবী গোগ্রাসে খাবার গিলতে লাগলেন।মুচকী মুচকী হাসছেন পরমাদেবী।এবার তিনি বললেন,"মনে পরে বৌদি???সেই দিনটার কথা"...।পরমাদেবীর মুখে এই কথা শুনে দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল শিবানীদেবীর।


প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর আগের কথা।সেদিন এই পাড়ায় নতুন বউ হয়ে এসেছিল আঠারো বছরের শিবানী।এই পাড়ারই এক প্রাণোচ্ছল পনেরো বছরের মা-মরা কিশোরী পরমা।হেসে খেলে বেড়ায়। শিবানী বৌদি বলতে তো এক্কেবারে পাগল।খুবই ভাব জমে উঠলো।শিবানী আর পরমার,দুজনেই দুজনকে মনের সব কথা খুলে বলত।এভাবে তিন বছর কেটে গেল। কিন্তু তারপর একদিন হার্ট অ্যাটাকে পরমার বাবা মারা গেলেন।পরমা তখন গ্রাজুয়েশনের ছাত্রী।মা তো আগেই মারা গিয়েছিলেন।পরমার মামা প্রথমে এসে পরমাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন কিন্তু কিছুদিন পর পরমার সব সম্পত্তি দখল করে ওকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেন।পরমা আবার এই পাড়ায় ফিরে এল।কিন্তু কি খাবে ও??..একজনকে বলে একটা অফিসে চাকরী পেয়েছিল পরমা কিন্তু বস চরিত্রহীন।রোজ পরমাকে কু-প্রস্থাব দিতেন।পরমা অনেক চালাকি করে ওনাকে এরিয়ে গেলেও পাড়ার চ্যাংড়া ছেলেদের হাত থেকে ও বাঁচতে পারে নি।একদিন রাত্রে অফিস থেকে ফেরার পথে রাস্তায় ওকে ধরে ছিঁড়ে খেলো ওই ছেলেগুলো।
পরদিন সকালে ওর অচৈতন্য দেহটাকে নিয়ে কিছু লোক হসপিটালে দিল।আপাতত পুলিশ কেস হলেও সেটা বেশীদূর এগোলো না কারণ পরমার পাশে দাঁড়াবার মত কেউ ছিল না।হসপিটাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর পাড়ার লোকে পরমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিল কারণ ধর্ষিতা মেয়ের সাথে তো আর ভদ্রলোকেরা কথা বলে না।শিবানীও এখন পরমাকে দেখলে মুখ ঘুড়িয়ে নেয়।ওর অফিসের চাকরীটাও গেল।বস বলল,"যখন আমি ভদ্রভাবে চেয়েছিলাম তখন দিলে না আর এখন ওরা জোর করে কামড় বসালো তো??..দু:খিত তোমার মত নষ্টা মেয়েকে আমি অফিসে রাখতে পারব না।"..
এবার কি খাবে পরমা।খিদের জ্বালায় মরে গেলেও পাড়ার লোক ওর মত নষ্ট মেয়েকে খেতে দেয় না।
কদিন পর হঠাৎ পরমার জীবন বদলে গেল।ও দামি দামি পোশাক পড়তে শুরু করল।বাড়িতে গাড়ি এসে ওকে নিয়ে যেতে লাগলো।পাড়ার সবাই অবাক হয়ে গেল।পরমা কি কাজ করছে সেটা জানার জন্য খোঁজ খবর করতেই জানা গেল যে পরমা কল গার্লের কাজ করছে।ব্যাস্ আর যায় কোথায়।পাড়ার সকলে মিলে একজোট হয়ে পরমাকে পাড়া থেকে বের করে দিল।সেদিন এই কাজে মূখ্য ভূমিকা নিয়েছিল শিবানী।ও বেশ জোর গলায় বলেছিল,"একটা বেশ্যাকে আমরা আমাদের ভদ্র পাড়ায় রাখব না"...
এরপর কেটে গেল পঁয়তাল্লিশ বছর।শিবানীদেবীর ছেলে রক্তিম একদিন ঘুড়তে নিয়ে যাওয়ার নাম করে বৃদ্ধা শিবানীদেবীকে এই স্টেশনে ছেড়ে রেখে পালিয়ে গেল।তারপরথেকে শিবানীদেবী স্টেশনে ভিক্ষে করেন।
পরমাদেবী বলে চলেছেন,"তোমরা আমাকে পাড়ার থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর আমার ভালো জায়গায় চান্স হয়ে যায় জানো তো??..সাধারণ কলগার্ল থেকে হাই সোশাইটির এসকর্টে পরিনত হই।সারাজীবন ধরে কামিয়ে এই ফ্ল্যাট আর ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স করেছি।এখন তো বুড়ি হয়ে গেছি আর কামাতে পারি না।তা এই বেশ্যার ভাত তোমার মুখে রুচছে তো?"...দুচোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছে শিবানীদেবীর।মুখে কোনো কথা নেই।


0 comments: