Tuesday, July 3, 2018

আমার সুইসাইড নোট

আমায় ক্ষমা করবেন সকলে। আমি আর পারলাম না অবশেষে এই পথই বেছে নিলাম। আর হ্যাঁ আগেই বলে দিই আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আসলে স্বেচ্ছা মৃত্যু এদেশে এখনও আইনসিদ্ধ নয় বলেই ভয় পাচ্ছি। নাহলে আমার মৃত্যুর পর পুলিশ আসবে, তদন্ত হবে তারপর আমার স্বামী,শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ কে তদন্তের মুখে পড়তে হবে। তারপর ABP আনন্দে ঘন্টাখানেক সুমন, ২৪-ঘন্টা তে মৌপিয়া ,আরও বাকিরা আমার পোস্টমর্টেম করবে তার থেকে বাবা এটা আগে বলে ফেলা ভালো নয় কি ? না আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।
কিন্তু আমার মৃত্যুর দায় আমি কারও ওপর বর্তে যাব না ঠিক। কিন্তু এ রাস্তা কেন নিলাম সেটা আমি লিখবই। আমার শান্তির জন্য। আমি জানি ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের যুগে হাতে লেখা জিনিস একটু বেমানান, তবুও লিখলাম। বাই-দি-বাই বলে নিই আমি ৩০ টা Amixide ( ঘুমের ওষুধ) নিয়ে বসেছি । কিভাবে ম্যনেজ করলাম ? লিখব না। 
চার বছর আগে অভি একদিন কলেজের ক্যান্টিনে এল। অভি মানে আমার বন্ধু অভিমূন্য। 
বলল- প্রিয়া একটা ছেলে এসেছে সেকেন্ড ইয়ারে । কিভাবে ম্যানেজ করল জানিনা। তোমাকে গেটে দেখেই লাভ এট ফার্স্ট সাইট। আমি জানি কলেজের সব ছোকরাকে ফিরিয়ে দিয়েছ শুধু তোমার চেহারার সাথে ম্যাচিং করবে না বলে। এবারে পারবে না।
আমি বললাম- তাই তা দেখাও দেখি ?
অভি- এই দ্যাখো বলেই পকেট থেকে মোবাইল বের করে গ্যালারি থেকে দেখাল ছেলেটিকে, উঃ সেই দেখতে ঠিক যেন বোঝে না সে বোঝে না সিনেমার আবির চ্যাটার্জি। এবং তার মতই ডান গালে একটা কাটা দাগ টোল পড়ার মত।
জিজ্ঞেস করলাম- কি নাম ওর?
মকবুল হোসেন।
কি? মুসলিম? 
অভি- কেন মুসলিম রা প্রেম করে না বুঝি? শোনো ছেলেটি বুনিয়াদপুরের আমার মামার সাথে পরিচিত, ব্রিলিয়ান্ট,তবে আর্থিক ভাবে খুব স্বচ্ছল নয়। তাই না করো না। আসলে আমি ঘটকালি করছি কারন আছে সে সময় হলে তোমায় বলব। আর একটা কথা বলতো আজ থেকে ৩০ বছর আগে যখন মোবাইল, নেট ছিল না তখন গৌরী শাহরুখ খান কে বিয়ে করেছিল। আর ২০১৪ সালে দাড়িয়ে তুমি ভাবছ হিন্দু মুসলিম? 
আমি- ঠিক আছে কাল বলছি। 
বলে ক্লাসে এলাম । বান্ধবীরা পেছনে ধরল আমায় অভি কি বলল? অফার নয় তো? কলেজ থেকে বেরুনোর মুখে সামনা সামনি অভি, মকবুল । মোবাইলে যা দেখেছিলাম এখানে তো আরও সেই লাগছিল। 
অভি- প্রিয়া বললে নাতো কিছু।
বললাম তো কাল বলব। বলতেই দেখলাম মকবুল একটা মিষ্টি হাসি দিল। 
না সারারাত ঘুমাতে পারিনি উত্তেজনায়। আগে অনেক প্রস্তাব পেয়েছি কিন্তু এরকম উত্তেজিত হয়নি। তারপরদিন কলেজে মাঠের কৃষ্ণচূড়া গাছের বাঁধানো জায়গায় তিনজন একসাথে জড়ো হলাম। 
কিন্তু কোন ও কথা বলেনি। শুধু বললাম ওকে। 
অভিমূন্য একবারে মনে হচ্ছে যুদ্ধ জয় করে ফেলল আর মুঠি কে সৌরভ গাঙ্গুলির মত দেখিয়ে বলল ‘ইয়েস’। 
অভি- আচ্ছা এখন ৩-টে বাজে আমরা যদি আর দেরি না করে বেরিয়ে পড়ি তাহলে ৪ টে নাগাদ পৌঁছে যাব।
জিজ্ঞেস করলাম – কোথায়?
অভি- কপোত কপোতীর স্বর্গ! কিরে মকবুল এনি প্রবলেম?
বললাম- ও ভিক্টোরিয়া। ঠিক আছে আমার প্রবলেম নেই। যদি ওর থাকে তো?
মকবুল- নো প্রবলেম।
তারপর সোজা লাভ প্যালেস এ।
অভি- এই যে দেব – শ্রাবন্তী তোমাদের মিলিয়ে দিলাম। তবে প্রথম দিন মাত্র ১ ঘন্টা । আমি তো সিঙ্গল একা একা ময়দানে বোর হয়ে যাব। এরপর দিন থেকে আমাকে ছাড়া এসো। আর সারাদিন কাটিয়ে যেও।
মকবুল- জি হুজুর।
অভি চলে গেল। আমরা ভেতরে ঢুকে এক বেঞ্চে বসে পড়লাম কিছুটা ঝোপের আড়ালে। যদিও এখানে কেউ কারও দিকে নজর দেয় না।
মকবুল- প্রিয়া আমার নাম মকবুল হোসেন।
আমি- আচ্ছা প্রেম যতই জমুক আগে ছেলেরা মেয়েদের নাম জানতে চায় আর তুমি কিনা আগে তোমার নাম বললে?
মকবুল-না আসলে আমি মুসলিম তো?
কেন? মুসলিম হলে প্রেম ভালবাসা করা যায় না বুঝি?
মকবুল- না না আমি তা বলিনি। আসলে কি ভাবে শুরু করব বুঝতে পারছিলাম না। তা তোমার আপত্তি নেই তো এই সম্পর্কে।
বললাম – আপত্তি থাকলে অন্তত এই জায়গায় আসতাম না। আচ্ছা আমাদের বিয়ে হলে তোমার বাড়িতে মেনে নেবে তো?
মকবুল- বিয়ে?
কেন ? বিয়ে শুনে চমকে গেলে কেন? শোনো বাস্তব কথা যদি বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় তাহলেই আমরা এগোব । নাহলে আমরা খুব ভাল বন্ধু। চয়েজ ইজ ইয়োরস ।
মকবুল- কুবুল হ্যা।
এই শোনো আমি বিয়েতে এই সব বলতে পারব না কিন্তু। আমি বিয়ে করব রেজিস্ট্রি অফিসে। 
মকবুল- ওকে । আচ্ছা টফি খাবে। আমার মামু বিদেশ থেকে নিয়ে এসেছে।
এ মা ছেলেরা টফি খায়! আমি তো ভেবেছিলাম তুমি চিল্ড বিয়ারের কথা বলবে।
মকবুল- জানো চার্লস ল্যাম্ব, সেই বহুখ্যাত ইংরেজ লেখক স্বপ্ন দেখেছিলেন যদি কখনও বিয়ে করেন তাহলে জমিদাররের মেয়েকে বিয়ে করবেন এবং তখন তিনি ঠাণ্ডা ব্র্যান্ডি জল দিয়ে পান করবেন। জানো আমিও কাল এইরকম স্বপ্ন দেখেছি। 
আর দেখো না । আমার বাবা এটি খুব ঘৃণা করেন।
এইভাবে গল্প করেই প্রায় ৪৫ মিনিট পার করে দিলাম।
এদিকে ভাবছি কি ক্যালাস রে বাবা এই জায়গায় গল্প করে সময় কাটায় আমায় জড়িয়ে ধর ।
মকবুল- কি ভাবছ?
বললাম ভাবছি তোমার ডান গালে যেমন কাটা দাগ আছে আমি যদি বাম গালে আমার দাঁত দিয়ে ওইরকম কাটা দাগ করে দিই।
বলেই ঝাঁপিয়ে পড়লাম তার বাম গালে। নিউটনের তৃতীয় সুত্রের প্রয়োগ পেলাম। আমাকেও তার উষ্ণ অধরের স্বাদ থেকে বঞ্চিত করল না। 
একি এক ঘণ্টার আগেই সব হয়ে গেল যে?
দেখলাম অভি পেছনে দাড়িয়ে সব দেখছিল।
অভি- না না আমি কিছুই দেখিনি এই মাত্র এলাম। আসলে বাড়ি থেকে ফোন এসেছে তাড়াতাড়ি যেতে হবে।
সেদিন এর মত চলে এলাম।
কিছুদিনের মধ্যেই বাড়িতে জেনে গেল।
....................................................................................
বাবা- টুকি তুই নাকি প্রেম করছিস এক মুসলিম ছেলের সাথে। 
না মানে বাবা ওই আর কি। 
বাবা- আরে পাগলি ভয়ের কি আছে? তা একদিন ডেকে নিয়ে ওকে সারপ্রাইজ দে । আর মেলামেশা যদি গার্জেনদের জানিয়ে করিস তাহলে আমাদের আর চিন্তা থাকে না। কারন তোরা বড় হয়েছিস।
বুকে বল পেলাম । বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। আবেগে।
মকবুল কে কিছু বললাম না। সেদিন সন্ধ্যা বেলা সিনেমা দেখে বেরুনোর পর ওকে বললাম চলনা আমার বাড়ি বাবা তোমায় ডেকেছে।
মকবুল- তোমার বাড়ী? এত তাড়াতাড়ি।
ইয়েস এত তাড়াতাড়ি। কারন বাবা জেনে গেছে। 
ওকে চল তাহলে-মকবুল বলে।
বাড়িতে এসে ওকে ভাল রকম আপ্যায়ন করা হল। এই সময়ে বড়দা ঢুকল। এনে সরাসরি মকবুলকে বলল –কি নাম তোর?
আমি বললাম দাদা ও মকবুল বাবা বলেছে তোমাকে ওর কথা তাহলে তুই তোকারি দিয়ে বলছ কেন?
বড়দা- একদম চুপ?
কি বে একটা মুসলমানের ছেলে হয়ে হিন্দু বাড়ির মেয়ের দিকে নজর দিস তোর চোখ তুলে নেব শালা।
এই কে আছিস গান চালা জোরে জোরে । 
আমি তখনও বুঝতে পারিনি কি হতে চলেছে। শুধু বললাম বাবা বড়দা কিসব বলছে।
বাবা- ও তোর দাদার কর্তব্য করছে।
বাবার কথা নিজের কান বিশ্বাস করতে পারছিলনা। 
এর মধ্যে দাদার তিন চার জন সাঙ্গপাঙ্গ ঘরে ঢুকে মকবুলকে ধরে ফেলল। আর বড়দা মুহূর্তের মধ্যে মকবুলের গলায় ব্লেড চালিয়ে দিল। 
তারপর কিচ্ছু জানি না। আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম। 
না বড়দার প্রভাবে কোন ও পুলিশ আমার কাছে আসেনি। জানি না কিভাবে ওর নিখোঁজ কেস চলেছে। তবে বন্ধুত্বের সুবাদে অভি অনেক কাছে এসেছে।
এত কাছে যে মকবুলকে ভুলিয়ে আমার হৃদয়ে জায়গা করেছে। চারবছর পরে কলেজ থেকেই ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ দিয়ে অভি চাকরি পেয়েছে এক ওষুধ কোম্পানির কোঅরডিনেটর হিসেবে। 
আমি নতুন সংসারে খুব ছিলাম একমাস। কিন্তু কাল ওর ল্যাপটপে একটি সিক্রেট ফাইল এ যা দেখলাম আমার সুইসাইড ছাড়া অন্য কোন ও পথ ছিল না। দেখলাম আমার আর মকবুলের প্রথম দিনের আলিঙ্গনের ছবি। তার মানে ও আমাদের বেঞ্চে বসিয়ে ঝোপের আড়াল থেকে ছবি তুলেছিল। এবং প্রতিটি ছবিতে মকবুলের জায়গা স্কেচ পেন দিয়ে ক্রস আর আমার ছবি হার্টস চিহ্ন দিয়ে ঘেরা। তার মানে আমাকে পাওয়ার জন্য অভি এসব করেছিল। আমাদের মেলানো, আমার বাড়ি লোকে দের জানানো, আর শেষে মকবুলের দুর্বলতা নিয়ে আমার কাছে আসা।
জানি না কেউ বিশ্বাস করবেন কিনা তবুও লিখলাম। মকবুল আমি আসছি।


#অভিজিত_মন্ডল
#pendrive

0 comments: