Tuesday, July 3, 2018

জোড়া

ঘোড়া টা হাতে নিয়ে ওনার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। কত দিনের কত চেষ্টার পর আজ ওনার হাতে এসেছে সেই জিনিস টা। দু চোখ ভরে তাকিয়ে রইলেন ওটার দিকে।
বছর দশেক আগে লন্ডনের এক নামী অকশন হাউসে দেখেছিলেন সেই সুদৃশ্য ঘোড়ার গাড়ি টা। আগা গোড়া হাতির দাঁত দিয়ে তৈরী। তার ওপর সব হিরে পান্না চুনী দিয়ে সাজানো ডিজাইন। এক বার দেখেই ভাল লেগে গেছিল। মুঘল আমলের ঐ দুস্প্রাপ্য জিনিস টা হাত ছাড়া করতে মন চায়নি। তাই চড়া দাম দিয়ে কিনে ফেলেছিলেন।
টাকার পরোয়া উনি করেন না। ভগবানের আশীর্বাদে টাকার অভাব ওনার নেই। শুধু একটাই সখ। দুস্প্রাপ্য জিনিষের সংগ্রহ। ওনার সমস্ত ভালবাসা প্যাশন এই সংগ্রহ কে ঘিরেই। আর এর জন্য অনেক সময় আইন কানুনের তোয়াক্কাও তিনি করেন না।
শুধু একটাই খুঁত ছিল ঐ ঘোড়ার গাড়ির। গাড়ির সামনে দুটো ঘোড়া লাগাবার জায়গা থাকলেও ঘোড়া ছিল মোটে একটা। অন্য ঘোড়া টা নাকি চুরি হয়ে গেছিল কোনো এক সময়ে। তার পর আর পাওয়া যায়নি। যদিও অকশন হাউসের আর্কাইভে ওর ছবি দেখেছিলেন। নিখুঁত একটা ঘোড়ার গাড়ি। অবিকল এক রকম দেখতে দুটো ঘোড়া। গাড়ির সামনে দুটো হুকে আটকানো। 
শোবার ঘরের টেবিল টার ওপর সাজিয়ে রেখেছিলেন ওটাকে। তার পর দিনের পর দিন ওই একটা ঘোড়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেমন যেন জেদ চেপে গেছিল মনে। যে করেই হোক ওর জোড়া টাকে পেতেই হবে। চারিদিকে খোঁজ করতে শুরু করেছিলেন। ব্ল্যাক মার্কেট এও খোঁজ করতে শুরু করেছিলেন। কেন জানি না তার মনে হত ঐ একটা ঘোড়া তার জন্য অপয়া। ওর জন্যই তার ব্যক্তিগত জীবনে নেমে এসেছে নানান অশান্তি। ওর জোড়া টা পেলেই তার জীবনে সুখের দিন ফিরে আসবে। তাই মরীয়া হয়ে খুজছিলেন জোড়া টাকে।

কাজের জন্য দিল্লী গেছিলেন। এমনই সময় হঠাৎই আজ সকালে কলকাতার এক ব্ল্যাক মার্কেট অ্যান্টিক ডিলারের ফোন পেয়ে তড়িঘড়ি মর্নিং ফ্লাইট ধরে কলকাতা ফিরেই গেছিলেন তার কাছে। সেখানে গিয়েই হাতে পেয়ে গেলেন সেই অমুল্য জিনিষ। মুখে হাসি ফুটল তার। তবে কি এবার তার সুদিন আসবে। হারিয়ে যাওয়া সুখ শান্তি ফিরে পাবেন তিনি?
বেশ কয়েক ঘন্টা আগে
উসকো ঠিকানে লাগা দো। মেরে ক্লায়েন্ট কিসি ভি কিমত পে ফসনা নেহি চাহিয়ে।
কথা গুলো শেষ করেই ফোন টা তুলে নিল সে। ক্লায়েন্ট কে খবর টা দিতে হবে। দশ বছর ধরে যে জিনিস খুজছিল তার ক্লায়েন্ট, অবশেষে সেটা পাওয়া গেছে। লোক টার টাকার অভাব নেই। মু মাঙ্গে কিমত পাওয়া যাবে এই ঘোড়া টার জন্য। তবে তার আগে সেফটি ফার্স্ট। কলকাতার অ্যান্টিক ব্ল্যাক মার্কেট এর 
একছত্র অধীপতি সে। খুব সাবধানে কাজ করে বলেই এতদিন ধরে পুলিশের হাত এড়িয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এ লাইনে সাক্ষী রাখা মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা। তাই মাল টা যে সাপ্লাই দিল তাকে সরিয়ে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। ক্লায়েন্টেরও সেই রকমই নির্দেশ। কোনো ভাবেই যেন তিনি জড়িয়ে না যান এই ব্যাপারে।

ওর লোক আছে এসব কাজের জন্য। লোক টা ডেলিভারি দিয়ে টাকা বুঝে নিয়ে বেরতেই ওর লোক পিছনে লেগে গেছে। সুযোগ বুঝে ঠিক সময় মত কাম তামাম করে দেবে সালার। মুচকি হাসে সে। আজ অনেক টাকার মুনাফা হবে তার। মাল টা খুব কম টাকায় জিনিস টা বেচে গেছে তার কাছে। ছেঁড়া জামা, উস্কো খুস্কো চুল, বসে যাওয়া চোখ, পুরো নেশা খোর দের মত চেহারা। মাল টা মরলে পৃথিবীর জঞ্জাল সাফ হবে। আর একবার হেসে নেয় সে।
আরো বেশ কয়েক ঘন্টা আগে
রাত শেষের দিকে। মেইন গেটের দারোয়ান টা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। লোক টা নিঃশব্দে পাঁচিল টপকে ঢুকে পড়ে। তারপর পাইপ বেয়ে ছাদে উঠে, ছাদের খোলা দরজা দিয়ে নিচে নেমে আসে। তার পর ধীর পায়ে এগিয়ে যায় শোবার ঘরের দিকে। বাড়ির মালিক আজ বাড়ি নেই। তাই আজকের দিন টাই বেছে নিয়েছিল কাজের জন্য। শোবার ঘরের টেবিলের ওপরে রাখা ঐ তো জিনিস টা। নিঃশব্দে হুক খুলে ঘোড়া টা তুলে নেবার সময় চোখ পড়ে পাশে রাখা ছবি টার ওপর। হাত টা যেন একটু কেঁপে ওঠে। ছবি টা অনেক দিন আগের তোলা। দশ বছরেরও বেশি আগের। বাড়ির মালিক, তার স্ত্রী ও এক মাত্র ছেলে। সুখী পরিবার। মুখের কোনে যেন একটা করুণ হাসি খেলে যায় লোক টার। 
ঘোড়ার গাড়ি টা কেনার পরের বছরই স্ত্রী সামান্য অসুখে চলে গেল। ছেলে অনাদরে অবহেলায় বড় বড় হতে লাগল। কিন্তু বাড়ির মালিক এর একমাত্র ধ্যান জ্ঞ্যান হয়ে দাঁড়ালো এই ঘোড়ার গাড়ি। তার পর ছেলে টা যখন ড্রাগ এর নেশা ধরল তখন সমাজে নিজের প্রেস্টিজ রক্ষার জন্য ছেলে টাকেই তাড়িয়ে দিল।

আজ সে ড্রাগ অ্যাডিক্ট। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। চুরি, ছিন্তাই করে নেশার খরচ জোগায়। কানা ঘুষোয় শুনেছিল এই ঘোড়া টার নাকি হেভী ডিম্যান্ড বাজারে। মনের ভেতরে এক নৃশংস ঘৃনায় ডিসিশন নিয়ে ফেলেছিল। তার পর সুযোগ বুঝে আজকের রাতে...।
ছবি টা উল্টে দিয়ে ঘোড়া টা তুলে নিল সে।

কলমে-  Sid Ray
#pendrive

0 comments: