Tuesday, July 3, 2018

মুক্তির দিন

- কিরে প্রভা ,আজ এতো দেরি করলি যে !
-- আসতে পারলাম ,এই অনেক। কাল থেকে আর আসা হবে কিনা কে জানে !
-- কেন ,কি হলো আবার ?
-- কি আর হবে চন্দ্রা। ওই এক‌ই ব‍্যাপার। বৌমা বলেছে সকালে বেরোনো হবে না। এতে ওদের চা খেতে দেরী হয়ে যায়। তাছাড়া নাতিটার ইস্কুল যাওয়ার আগেও অনেক কাজ থাকে।
-- বাঃ। তোর তো দেখছি কোনো কিছুতেই স্বাধীনতা নেই। ওর ছেলে ,তা ও সামলাবে।
-- না রে ,নাতিটার জন্য করতে আমার খারাপ লাগে না। আমাকে খুব ভালোবাসে যে।
-- শোন প্রভা ,ভালোবাসা এক জায়গায় আর দাসীবৃত্তি আলাদা জায়গায়।
-- থাক্ না এসব কথা চন্দ্রা। এটুকু সময় পেয়েছি ,তুই তোর কথা বল। কাল থেকে আবার কি হবে কে জানে ।
-- কি আর হবে ,তুই এমন নিরীহ হয়ে থাকলে ,যা হচ্ছে তাইই হবে।
-- আমি কি করতে পারি বল।
-- অনেক কিছুই পারিস্। কিন্তু করার মতো ইচ্ছে‌শক্তি হারিয়ে ফেলেছিস্।
-- হারাবো না ,বল্। মানুষটা আমায় ফেলে একা চলে গেল। আর এখন বৌমার অত্যাচার সহ‍্য করে বেঁচে থাকার চেয়ে মরলেই বোধহয় মুক্তি পাই।
-- ধুর ,কি যে বলিস্ ! মরে গেলে আর মুক্তির স্বাদ পাবি কি করে ?
-- মৃত্যু ছাড়া যে আমার মুক্তি নেই রে।
-- কেন ,তুই ওদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দিতে পারিস্ না ?
-- কে যে কাকে ধাক্কা দেবে ! তোকে আমি একটা কথা বলিনি লজ্জায়। একদিন রাতে ছেলে এসে একটা কাগজে স‌ই করিয়ে নিয়ে গেল। বললো ওর দরকারের কাগজ।
-- তারপর ?
-- পরদিন জানলাম বাড়িটা নাকি আমি বৌমার নামে লিখে দিয়েছি।
-- বলিস্ কি ?
-- সেই জন‍্য‌ই তো বললাম ওরাই না আমায় কোনদিন বাড়ি থেকে বার করে দেয়।
-- শেষে কিনা তোর নিজের ছেলেটা‌ই এমন করলো !
-- ওকে আর কি দোষ দি বল্। যদি ওর লোভ থাকতো ,তবে তো নিজের নামেই করতে পারতো।
-- তবুও …
-- ওর কারখানার কাজটা বন্ধ হয়েছে প্রায় দশ মাস হলো। আয় নেই। এখন সংসার চলে বৌমার বাবার টাকায়। তাই বৌমার কথাই শেষ কথা।
-- আর তুই ? তুই কোথায় র‌ইলি ওই সংসারের ?
-- আমি তো নেই কোথাও। শুধু একটা অন্ধকার ঘর আছে ওই বাড়িতে ,আমি ওখানে‌ই থাকি।
-- বাঃ অসাধারণ। তোর থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়ে এখন তোকেই দাসী করে রেখে দিয়েছে।
-- থাক্ এসব কথা এখন।
-- একটা কাজের মেয়ে আছে না ওই বাড়িতে।
-- হ‍্যাঁ ,বাসন মাজে আর কাচাকাচি করে। তোদের পাড়াতেই তো বাড়ি মেয়েটা‌র।
-- হুম্ ,বুঝলাম। আচ্ছা তুই আমার কাছে এসে থাকতে পারিস্ না প্রভা ?
-- স্বামী‌র ভিটে কি করে ছাড়ি বল ! যত কষ্ট‌ই দিক ওরা ,ওই অন্ধকারে‌ই বাকি জীবন‌টা কাটিয়ে দেবো।
-- আর কাল যদি ওরা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বার করে দেয় ,তখন কি পায়ে পড়বি ছেলে-বৌমার ?
-- তখন যা আছে কপালে হবে। আমার কথা বাদ দে। তোর সংসার কেমন চলছে বল।
-- দিব‍্যি চলছে আমার সংসার। হ‌ইহ‌ই করে কেটে যাচ্ছে এক একটা দিন।
-- তোর সাথে প্রতিদিন সকালে দেখা হলে ,আমার সারাদিন‌টা খুব ভালো যায় জানি‌স্। কেমন যেন মনে জোর পাই বলে মনে হয়।
-- তাই বুঝি !
-- হ‍্যাঁ রে। কেমন মাঝবয়সে স্বামী‌কে হারিয়ে‌ও আবার সংসার পাতলি। আর সেই সংসারের সুখ তোর চোখে মুখে ফুটে উঠতে দেখি আমি রোজ।
-- আমি সত্যিই সুখী। আর এই সুখের আলো আমি তোর ওই অন্ধকার ঘরেও ঢোকাবো। এই বলে দিলুম।

(২)
এখন সকাল‌গুলো‌তেও আলো কম বলে মনে হয় প্রভাদেবীর। সেই‌দিনের পর থেকে আর প্রাতঃভ্রমণে যাওয়া হয়নি তার। তাই চন্দ্রা‌বতীদেবীর সাথে সাক্ষাৎ‌ও হয়নি বহুদিন। এদিকে ঘরের অন্ধকার যেন আরো ঘুট্‌ঘুটে হতে শুরু করেছে দিন দিন। এখন কাজের মেয়ে রেখাও মাঝে মাঝে‌ই ডুব মারে। আর তার সব কাজ গিয়ে পরে প্রভাদেবী‌র ওপর। তাছাড়া‌ও আরো অনেক ঘটনা ঘটে গেছে এর মধ্যে। একদিন ভাত গাল দিয়ে চান করে এসে দেখেন ,গ্যাস ওভেনের ওপর ভাতটা পুড়ছে। তারপর কোনদিন ডালে প্রচন্ড নুন ,কোনদিন তরকারীতে একগুচ্ছ চুল। একদিন তো বৌমা বিকেলে ঘর থেকে প্রভাদেবী‌কে ডেকে নিয়ে দেখালো যে গ‍্যাস ওভেনের আগুন জ্বলছে সেই দুপুর থেকে। এইরকম ভুল কাজের জন্য কম অত‍্যাচার‌ও সহ‍্য করতে হয়নি প্রভাদেবী‌কে। টানা দু’দিন খাবার বন্ধ করে দেওয়া হয় তার। আর তার ওপর আছে উঠতে বসতে গালমন্দ। প্রভাদেবী‌র মরে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পারেন না। শুধু দম বন্ধ করা একটা অন্ধকার ঘরে চোখের জল শুকতে থাকে নীরবে।
(৩)
এখন আর রাতে‌ও ঘুম আসে না প্রভা‌দেবী‌র। মনে হয় প্রাণ‌বাতি এবার নিভলো ব’লে। আজ রাতে হঠাৎ শুনতে পেলেন বৌমার গলার আওয়াজ। বৌমা চেঁচামিচি করে কিছু বলছে প্রভাদেবী‌র ছেলেকে।
-- কি বলছো কি এটা তুমি ?
-- যা বলছি ঠিক বলছি। আমি আর তোমার মা’কে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতে পারবো না।
-- বসিয়ে বসিয়ে মানে ? মা তো সারাদিন কাজ করছে।
-- কাজ ,ওগুলোকে কাজ বলে ? জিনিস‌পত্র নষ্ট হচ্ছে কেবল। আমি আর এসব মেনে নেব না।
-- তাহলে কি চাও তুমি ?
-- আমি চাই তুমি তোমার মায়ের একটা ব্যাবস্থা করো।
-- মানে ?
-- মানে এ বাড়ি থেকে এবার বিদায় করবো আমি।
-- কোথায় যাবে মা ?
-- সে তো তুমি বুঝবে। তোমার মা ব’লে কথা।
-- আমি কোথায় পাঠাবো মা’কে ? আমার‌ই মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। দোহাই তোমার এরকম বলো না‌।
-- তুমি না পারলে ,সে ব্যবস্থা আমি করে দিতে পারি।
-- কি ব্যবস্থা ?
-- রেখা আমাকে একটা ঠিকানা দিয়েছে। সেখানে নাকি সব বুড়ো‌বুড়িরা থাকে। ওইখানেই পাঠাও।
-- বৃদ্ধাশ্রম ? বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে বলছো মা’কে ?
-- হ্যাঁ ,তাইই বলছি। আমি খবর পেয়েছি ওখানে কোনো টাকা পয়সা দিতে হয় না। শুধু ফেলে আসলেই হলো। ওরা কি সব কুটিরশিল্প না কি সব করে খাওয়ার টাকা রোজগার করে। আর তাছাড়া তোমার মায়ের বদলে একটা রান্না‌র লোক রাখলে আমার খরচ কম হবে।
-- আমি একাজ করতে পারবো না। আমাকে ক্ষমা করো।
-- এ বাড়িতে ঠাঁই পেতে হলে তোমাকে একাজ করতে হবে ,কাল‌ই।
-- কাল‌ই ?
-- তবে কি পাঁজি দেখে ভালো দিনক্ষণ ঠিক করবো ? তোমার মা যেদিন বিদায় হবে , সেদিন‌ই হবে আমার ভালো দিন।
প্রভাদেবী যেন আর দাড়িয়ে থাকতে পারছেন না। পা’দুটো টল্‌মল্‌ করছে। চোখ থেকে অঝোর জল ঝরছে অনেকক্ষণ। কোনমতে নিজের ঘরে এসে বসলেন আর ঈশ্বর‌কে বললেন ,
-- হায় ভগবান ,এ কি করলে তুমি ? আমার শেষ নিঃশ্বাস‌টুকুও স্বামী‌র ভিটেতে ফেলতে দেবে না ?আমায় মুক্তি দাও।

(৪)
আজ ভোররাত পর্যন্ত ভূতের মতো অন্ধকারে‌র মধ্যে সমস্ত বাড়িটাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে বিদায় জানিয়েছেন প্রভাদেবী। সকাল হতেই ছেলে এসে যখন কথাটা বলার জন্য আম্‌তা আম্‌তা করছে ,প্রভাদেবী বললেন ,
-- কোথায় যেতে হবে বলো। আমি তৈরী।
-- মা আমায় ক্ষমা করো।
-- তুমি কেঁদো না। মানুষকে তো চলে যেতে‌ই হয় ,আমিও যাচ্ছি। শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা কোরো যেন এ যাত্রা‌ই আমার শেষ যাত্রা হয়।
-- মা …
-- চলো।
একটা মাঝারি মাপের ব‍্যাগ নিয়ে এগিয়ে চললে‌ন প্রভাদেবী। হঠাৎ দাড়িয়ে নাতির কথা জানতে চাইলে ছেলে বলে ,
-- ওর মা আজ ওকে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতে মানা করেছে।
প্রভাদেবী চোখ মুছলেন। তারপর একবার পিছনের দিকে তাকিয়ে আবার এগিয়ে চললে‌ন একটা অন্ধকার ঘর থেকে আরেক‌টা অন্ধকার ভবিষ্যতে‌র দিকে।

(৫)
বৃদ্ধাশ্রমের গেটে পৌঁছে প্রভাদেবী ছেলে‌কে বললেন ,
-- এবার তুমি ফিরে যাও। তোমায় কেউ দেখলে মন্দ ভাববে।
মা’কে শেষ‌বারের মতো প্রণাম ক’রে ছেলে ফিরে গেল। প্রভাদেবী অনেক‌ক্ষণ চেয়ে র‌ইলেন ছেলের চলে যাওয়া পথের দিকে। নিজেকে আর শক্ত রাখতে পারলেন না। চোখ ঝাপসা হয়ে উঠলো জলে। তারপর যখন সব দিকের পথ‌ই অচেনা মনে হলো ,অসহায়‌ভাবে মাটিতে বসে পরলেন প্রভাদেবী।
মুহূর্তে‌র মধ্যে কে যেন তার কাঁধ ধরে উঠে দাড় করালো আর বললো ,
-- কিরে ,আমার কাছেই আসতে হলো তো ?
প্রভাদেবী মাথা তুলে দেখলেন চন্দ্রা‌বতী। আর ওর পাশে দাঁড়িয়ে রেখা। সব যেন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে প্রভাদেবী‌র। কিছুই মেলাতে পারছেন না।
-- চন্দ্রা ,তুই এখানে ? আর রেখা ?
-- শান্ত হ প্রভা। সব বলছি। এই চেয়ার‌টায় বোস।
-- আমি তো কিছুই …
-- তোকে বলেছিলাম না ,তোর অন্ধকার ঘরে আমি আলো ঢোকাবো। এই সেই আলোর হদিশ।
-- মানে ?
-- এই হল আমার মাঝবয়সের সংসার। তুই তো জানতি যে আমি একটা বৃদ্ধাশ্রম খুলেছি।
-- হ্যাঁ ,তা জানতাম। 
-- এখানে‌ই অনেকে মিলে থাকি আমরা। জানিস্‌ই তো আমি স্বামী‌হারা ,নিঃসন্তান। তাই তো এতো বড় সংসার পাতলাম স্বামীর রেখে যাওয়া টাকায়। আর তোকে‌ও নিয়ে এলাম আমার কাছে।
-- আমায় নিয়ে এলি , কিভাবে ?
-- আরে বাবা ,সেদিন তোকে বলেছিলাম না , আমার সাথে এসে থাকতে ? কিন্তু তুই তো কিছুতেই মানলি না। পরে র‌ইলি ওই বেয়াক্কেলে মহিলার অত্যাচার স‌ইতে। কিন্তু আমি বুঝেছিলাম তুই ভালো নেই। তোর মুক্তির প্রয়োজন।
-- তারপর ?
-- তারপর রেখা‌কে একদিন ডেকে সব বললাম। মেয়েটা বড় ভালো। তোর কষ্ট দেখে ওর’ও খারাপ লাগতো। তাই আমার কথা মতো ও’ই তো ভাত পুড়িয়ে‌ছে ,ডালে নুন দিয়েছে , গ্যাস ওভেন অন করে রেখেছে ...আরো কতো কি করেছে। এমনকি রেখা‌ই তো তোর বৌমাকে , তোকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো‌র বুদ্ধি‌টা দিয়েছিল ,যদিও একটু বাঁকা সুরে। আর তাই আজ তুই মুক্ত।
-- চন্দ্রা …
-- এখানে সবাই স্বাধীন প্রভা। মুক্তির আলো ,বাতাস সবাই নিজের মতো করে নিতে পারে। কেউ কাউকে বন্দী করে রাখে না।
প্রভাদেবী তার বন্ধু চন্দ্রা‌কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন অনেকক্ষণ। চন্দ্রা‌দেবী বুঝলেন এ কান্না এক বন্দী‌র যে কিনা দীর্ঘদিন পর মুক্তির সূর্য দেখতে পেয়ে হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
প্রভাদেবী স্বাভাবিক হ’লে রেখার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেন এবং ধীরে ধীরে আশ্রমের ভিতরে প্রবেশ করেন। ভিতরের প্রাঙ্গণে অনেক অল্প‌বয়সী ছেলে‌মেয়ের ব্যাস্ত‌তা দেখে কারণ জানতে চাইলে ,চন্দ্রা‌দেবী বলেন ,
-- ওরা একটা এন .জি .ও থেকে এসেছে। আজ ১৫ই আগস্ট তো তাই উদ্‌যাপন করবে এখানে আমাদের সাথে।
প্রভাদেবী হঠাৎ বেখেয়ালেই বলে উঠলেন ,
-- ও ... আজ‌ই তো মুক্তির দিন।।



সমাপ্ত
© তন্ময় বর্মন

0 comments: