Tuesday, July 3, 2018

চক্ষুদান

হৃদয়পুর গ্রামের মধ্যমনি হলো এই চৌধুরীদের জমিদার বাড়ি। যদিও এবাড়িতে এখন আর কেউই থাকে না। পূর্বসূরিরা সব স্বর্গবাসী হয়েছেন আর উত্তরসূরিরা হয়েছে বিদেশবাসী। তবে সুখের কথা হলো দূরে থেকেও ছেলে মেয়েরা এ বাড়ির যত্নআত্তিতে কোন ত্রুটি রাখেনি কখনো আর প্রতিবছর দুর্গাপূজোয় সপরিবারে বাড়ি ফিরতেও ভোলেনা তারা। তাই এ বাড়ির বনেদিয়ানা ও চাকচিক্য এখনও বজায় আছে অতীতের মতোই। অতীতের মতোই এখনো পুজোর দু’মাস আগে বাড়ির কেয়ারটেকার তথা ম্যানেজার সুপ্রিয় হালদার নিজ হাতে পুজোর আয়োজন শুরু করেন। প্রায় পঞ্চাশ মাইল দূর থেকে ডেকে আনেন প্রতিমা গড়ার চেনা পুরনো মানুষটাকে। তারপর থাকে নিমন্ত্রণ ,খাওয়া-দাওয়া ,আলোকসজ্জার ব্যবস্থাপনা। এ বছরও আয়োজন শুরু হয়ে গেছে ঠিক সময়মতোই।
হারু পাল গত উনচল্লিশ বছর ধরে এ বাড়িতে দূর্গা মূর্তি গড়ার কাজে নিযুক্ত রয়েছেন। পুজোর প্রায় দেড় মাস আগে তিনি এ বাড়িতে চলে আসেন এবং সম্পূর্ণ একা হাতে তৈরি করেন দেবীর প্রতিমা। নামের মধ্যে কোন গাম্ভীর্য না থাকলেও তার ব্যক্তিত্বে এক অন্য রকমের গাম্ভীর্য লক্ষ করা যায়। তার শিল্পীসত্তার প্রতি তার যে গর্ব এবং অহংকার রয়েছে সেটা প্রায় সকলেরই জানা। আটষট্টি বছরের এই প্রায় বৃদ্ধ মানুষটি সচরাচর কারো সাথে কথা বলেন না ,সে ছোট হোক কিংবা বড় কেউ। তবে আড়ালে খেয়াল রাখেন তার শিল্পের প্রশংসায় কোন ঘাটতি পড়ছে কিনা। ঘাটতি তেমন একটা না পড়লেও গত বছর এমনই একটা ঘটনা তার নজরে পড়েছিল। ব্যাপারটা মেনে নিতে না পারলেও স্বভাববশত তিনি কিছু বলতে পারেননি তখন। কিন্তু এই বছরও যখন সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল তখন তিনি আর নিজেকে চেপে রাখতে পারলেন না। প্রতি বছরই প্রতিমা নির্মাণ চলাকালীন গ্রামবাসীরা মাঝে মধ্যেই প্রতিমা দর্শন করতে আসতেন আর শিল্পীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতেন। ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েরাও হা করে তাকিয়ে থাকত তার এই নির্মাণ কাজের দিকে। মুখে কিছু প্রকাশ না করলেও হারু পাল নীরবে সে প্রশংসা মেখে নিত তার মজ্জায়। গত বছরও এর অন্যথা হয়নি। প্রতিদিন বিকেলবেলা এ বাড়িতে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা খেলা করতে আসে আর মাঝে মাঝে খেলা ফেলে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে হারু পালের হাতের কাজের দিকে। গত বছর তার খেয়ালে আসে একটি দশ-বারো বছরের ছোট মেয়ে প্রতিদিন বিকেলে এ বাড়িতে আসে কিন্তু হারু পালের হাতের কাজের দিকে একবার ফিরেও তাকায় না। গতবছর ব্যাপারটাতে সেভাবে আমল না দিলেও এ বছর যখন একই ঘটনা রোজ ঘটতে থাকল , হারু পাল নিজের স্বভাব ভুলে একদিন মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করে বসলো ,
-- “এই মেয়ে তুই রোজ আসিস্ , তবু এদিকে চাস্ না কেন রে , আমার হাতের কাজ তোর ভালো লাগে না ?”
এই কথা শুনে সেই মেয়ে বলল ,
-- “ভালো খারাপের আমি কি বুঝি দাদু , তবে শুনেছি তোমার হাতের কাজ খুব সুন্দর।”
-- “তবে দেখিস্ না কেন ?”
-- “আমি তো চেয়েই থাকি দাদু , তবে দেখতে পাই না। আমার চোখে তো সব‌ই অন্ধকার।”
হারু পাল হঠাৎ যেন চমকে উঠলো। কিন্তু ওর হাতের কাজ থামল না। মনে মনে খুশি হতে চাইলো এই ভেবে যে ওর শিল্পকর্মের খ্যাতিতে তাহলে কোনো খামতি পড়েনি। তবে এটুকু বাচ্চার অন্ধত্ব বোধ হয় এই অহংকারী শিল্পীকেও খুশি হতে দিল না। তবু নিজের স্বভাবে নিজেকে বেঁধে নিয়ে হারু পাল আবার কাজে মন দিল।
এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই বাচ্চা মেয়েটি এসে হারু পালকে নানা প্রশ্ন করত। তবে হারু পাল সে সবে তেমন একটা গা করেনি কখনো। শুধু কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝে চেয়ে দেখেছে মেয়েটির চোখের দিকে। মেয়েটির টানা টানা চোখ দুটো যেন দেবীর চোখের মতো সুন্দর অথচ সে চোখে দৃষ্টি নেই।

(২)
-- “আমাকে জ্বালাস না তো। এই সমস্ত সেলাই আমায় মহালয়ার আগেই শেষ করতে হবে।”
-- “মহালয়া কবে মা ?”
-- “আর মাত্র এক মাস বাকি।”
-- “সে তো অনেক দেরি ,মা।”
-- “আমার কি আর একটা কাজ রে ? দেখতে দেখতেই চলে আসবে মহালয়া।”
-- “আমাকে মহালয়ার গল্প শোনাও না মা।”
-- “মহালয়ার গল্প ? সে তো কত বার বলেছি।”
-- “আমি ভুলে গেছি আমাকে আবার বলো না মা। তোমার মুখে মহালয়ার গল্প শুনতে আমার খুব ভাল লাগে।”
-- “এই কাজের সময় এত জ্বালাস না তুই !
আচ্ছা শোন ...
মহালয়া হল পিতৃপক্ষের শেষ আর দেবীপক্ষের শুরু। অশুভ শক্তি দমনের জন্য এইদিন দেবী মর্তে আগমন করেন। ওই দিনই আগমনীর আরাধনা শুরু হয়। এইদিন গঙ্গায় বিভিন্ন মানুষ তর্পণ করেন। আর এই দিন‌ই দেবীর চক্ষুদান হয়। যদিও …”
-- “চক্ষুদান মানে কি মা ?”
-- “মানে এই দিন যিনি দেবীর মূর্তি গড়েন , তিনি দেবীর চোখ এঁকে দৃষ্টি দান করেন।
এবার আমায় কাজ করতে দে।”
-- “আচ্ছা মা যিনি মূর্তি করেন তার অনেক ক্ষমতা , নইলে ভগবানকে দৃষ্টি দান করেন কিভাবে ?”
-- “অতশত জানিনা ,এবার আমায় কাজ করতে দিবি ?”
-- “বলো না মা ,কিগো ?”
-- “হ্যাঁ রে বাবা ,এত বড়বড় দেবদেবী যে তৈরি করছে , তাতে চোখ দেবার ক্ষমতা থাকবে না তার ?”
মায়ের কথা শুনে যেন অবাক হয়ে যায় মেয়েটি , তবে কি মানুষ ঈশ্বরের চেয়েও বেশি ক্ষমতা রাখে !

(৩)
রোজকার মতো আজও মেয়েটি ঠাকুরদালানে আসে আর হারু পালের সাথে রোজকার মতোই অনেক কথা বলতে থাকে। হারু পালের কানে সব কথা পৌঁছলেও সে কোনো উত্তর দেয় না , নিজের কাজেই ব্যস্ত রাখে নিজেকে। মেয়েটি কোনো উত্তর না পেলেও নিজের আগোছালো কথাগুলোকে সাজিয়ে যায় একের পর এক। কিন্তু প্রশ্নরাও উত্তরের অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে এক সময় বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আজ বাড়ি ফেরার সময় তেমনই এক প্রশ্নের তীর ছুড়ে দিয়ে যায় মেয়েটি হারু পালের দিকে। বাড়ি যাওয়ার সময় মেয়েটি বলে ,
-- “তুমি তো আমার কোন কথারই উত্তর দাও না দাদু , তবে একটা জিনিস চাইলে আমায় দেবে আমায় ?”
হারু পালের সামান্য কৌতূহল হলেও কোন উত্তর দেয় না সে। তখন মেয়েটি বলে ,
-- “মা বলে তোমার অনেক ক্ষমতা , অনেক বড় বড় দেব-দেবীর চোখ এঁকে দৃষ্টি দিয়েছো তাদের। অমনি দুটো চোখ আমায় এঁকে দিতে পারে না তুমি ?”
হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া যেন হারু পালের সমস্ত অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দিলো। তার উনচল্লিশ বছরের শিল্পীসত্তার অহংকার যেন নিমেষেই চুরমার হয়ে গিয়েছিল। হাতের কাজ থামিয়ে যেন উত্তর খুঁজতে বসেছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নের।
এই প্রশ্নেরও কোনো উত্তর না পেয়ে মেয়েটি বাড়ি ফিরে গিয়েছিল কিন্তু ঠাকুর দালানেই ফেলে রেখে গিয়েছিল ওর প্রশ্নের শব্দগুলোকে যাদের প্রতিধ্বনিতে সারারাত চোখের পলক এক করতে পারেনি হারু পাল। একটা গভীর উপলব্ধি বার বার নাড়া দিয়েছে তাকে। মনে মনে ভাবে ,
-- “এই শিল্পীসত্তা ,এই অহংকারের মূল্য কি , সত্যিকারের জীবনের শিল্পী হয়ে উঠতে পারলাম কোথায় !”

(৪)
কাল সারারাতের প্রবল ঝড়-বৃষ্টির পর আজকের সকাল একটা আটষট্টি বছরের নতুন মানুষের জন্ম দিল। হারু পাল নিজের কাজ ফেলে সকাল থেকে তাকিয়ে আছে এই বাড়ির গেটের দিকে। তারপর অনেক অপেক্ষার পর যখন ছোট্ট মেয়েটি এলো , হারু পাল নিজে থেকেই জিজ্ঞাসা করল ,
-- “এই মেয়ে এত দেরি করলি যে।”
মেয়েটি খানিক অবাক হল হারু পালের কথা শুনে। তারপর একটু মনমরা গলায় বলল ,
-- “কাল রাতে অনেক কেঁদেছি গো দাদু। তাই সকালে উঠতে দেরি হয়ে গেছে।”
-- “কেঁদেছিস কেন ?”
-- “ভেবেছিলাম তুমি দুটো চোখ এঁকে দেবে আমার। তাহলেই আমি আবার দেখতে পাবো। কিন্তু তুমি তো কিছুই বললে না কাল তাই খুব কষ্ট হয়েছিল গো।”
-- “ধুর পাগলী মেয়ে ,এসব ভুল কথা। আমার কোন ক্ষমতাই নেই। আমি একজন নিতান্তই মৃৎশিল্পী মাত্র। তাছাড়া দেবতা আমাদের গড়ে , আমরা কি আর দেবতা গড়তে পারি ?
-- “তবে যে মা বলল …”
-- “সে হয়তো তোর মন রাখতে বলেছে।”
এরপর বেশ কিছুক্ষণ দুজনে চুপ করে রইল।
তারপর হারু পাল একটু নরম স্বরে বাচ্চা মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করলো ,
-- “তোর নাম কি মেয়ে ?”
-- “আমার নাম মুন্নি। একটা অন্য নাম‌ও আছে , মনস্বিনী।”
-- “বাঃ ,খুব সুন্দর নাম।”
-- “তোমার নাম কি দাদু ?”
-- “আমাকে সবাই হারু বলেই ডাকে তবে আমারও একটা অন্য নাম ছিল সেটা আমি নিজেও ভুলতে বসেছি। সে নাম কেবল খাতায়-কলমে।”
-- “আচ্ছা দাদু তুমি তো কারো সাথেই কথা বলো না। তা আজ আমার সাথে কথা বলছো যে ! আমি অন্ধ বলে ?”
-- “না রে মুন্নি। কথা বলতাম না কারণ এতদিন আমি অন্ধ ছিলাম। এখন সব দেখতে পাচ্ছি স্পষ্ট ভাবে।”
-- “আমারও খুব দেখতে ইচ্ছে করে , জানো দাদু ?”
-- (হারু পাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো)“জানি মুন্নি। কিন্তু দেখতে না পাওয়াতে যেমন কষ্ট আছে তেমনি দেখতে পাওয়াতেও আছে অনেক কষ্ট।”
-- “দেখতে পাওয়া তে কি কষ্ট দাদু আমি তো কিছুই বুঝলাম না।”
-- “সে তুই বুঝবি না। ওসব কথা থাক। আচ্ছা মুন্নি তোর বাড়িতে কে কে আছে ?”
-- “আমি আর মা”
-- “আর তোর বাবা ?”
-- “আমি তো কখনো দেখিনি তাকে ,তবে মা বলে বাবা ভগবান এর কাছে গেছে আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে আনতে।”
বুকের ভিতরটা কাল রাত থেকেই কষ্টে ভিজে আছে আর এখন চোখের ভিতর একটা জলের আস্তরন জমা হতে শুরু করেছে হারু পালের। নিজেকে সামলে হারু পাল বলে ,
-- “তুই ঠিক দেখতে পাবি রে মুন্নি , তোর বাবার প্রার্থনা ভগবান নিশ্চয়ই শুনবে একদিন।”
এরপর মুন্নি বাড়ি ফিরে গেলে হারু পাল ভেজা চোখেই মূর্তি গড়ার কাজে মন দেয়।

(৫)
-- “দাদু ,তুমি কোথায় দাদু ?”
মুন্নির গলার আওয়াজে হটাৎ ঘুম ভাঙে হারু পালের । দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর কখন যেন চোখ লেগে গিয়েছিল তার। উঠে বসে বলল ,
-- “এইতো আমি মুন্নি ,একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ,তুই কখন এলি ?”
-- “এই মাত্র এলাম আমি , দাদু।”
চারদিকে বাচ্চাদেরকে খেলতে দেখে হারু পাল জিজ্ঞাসা করল ,
-- “তুই ওদের সঙ্গে খেলিস না ?”
-- “খেলতাম তো ,কিন্তু এখন আর খেলতে ভাল লাগে না আমার।”
-- “কেন ?”
-- “দেখোনা ,কানামাছি খেলাতে আমার চোখে কেউ কাপড় বাঁধে না ওরা আমি কত করে বলি তবুও। আবার যখন চোর পুলিশ খেলা হয় আমি পুলিশ সেজে কখনোই চোর ধরতে পারি না ,আর যখন চোর সাজি আমাকে মুহূর্তের মধ্যে ধরে নেয় ওরা , ঠিকঠাক লুকোতে পারি না আমি।”
-- “ও এই কথা ,তা সে যাক্‌গে। তবে কি করতে ভালো লাগে তোর মুন্নি ?”
-- “আমি ছবি আঁকতে খুব ভালোবাসি”
-- “তুই আঁকতে পারিস্ ?”
-- “হাতে ধ’রে মা যা শিখিয়ে দেয় ,আমি নাকি হুবহু সেটাই এঁকে দিতে পারি , মা বলে।”
-- “বাঃ , এতো চমৎকার ব্যাপার ,তোর তো ভারি গুণ দেখছি।”
-- “তুমিও তো আঁকতে পারো দাদু ,আমাকে আঁকা শেখাবে ?”
-- “কি আঁকতে চাস্ আমায় বলিস ,আমি তোকে শেখাবো।”
-- ‘আমার যা নেই ,আমার সেটাই আঁকতে বড় ইচ্ছে করে দাদু। আমায় চোখ আঁকা শিখিয়ে দেবে ?”
-- “আচ্ছা কাল থেকে খাতা পেন্সিল নিয়ে আসিস্ , আমি শেখাবো তোকে।”

(৬)
ঠাকুর গড়ার কাজ অনেকটাই শেষের দিকে। মহালয়ার আর মাত্র পনেরো দিন বাকি। মুন্নি প্রতিদিন হারু পালের কাছে আঁকা শিখতে আসে। আজ বিকেলে যখন মুন্নি হারু পালের সাথে গল্পে ব্যস্ত ,তখন মুন্নির মা মুন্নিকে নিতে আসে ঠাকুরদালানে। তখন হারু পালকে দেখে বলে ,
-- “মুন্নি আপনাকে খুব জ্বালায় তাই না জ্যাঠামশাই ? আমি ওকে কতবার আসতে মানা করি কিন্তু কিছুতেই শুনতে চায় না”
-- “না না বৌমা আমাকে একদম জ্বালায় না ও।
বরং ও না আসলেই আমার কাজে মন বসে না আজকাল।”
-- “ও চোখে দেখতে পায় না তো তাই হাজারো প্রশ্ন ঘোরে মাথার মধ্যে”
-- “তুমি ঠিক‌ই বলেছ বৌমা। তা ওর চোখের জন্য ডাক্তার দেখিয়েছো ?”
-- “হ্যাঁ , দেখিয়েছি জ্যাঠামশাই। ডাক্তার বলেছে ও ভিতর থেকে সুস্থ আছে। নতুন ক’রে চোখ পেলেই আবার দেখতে পাবে।”
-- “কিন্তু নতুন চোখ পাবে কোথায় ?”
-- “এই সদর হাসপাতালেই অপারেশন হবে বলেছে ডাক্তার। চোখের খোঁজ পেলেই আমায় হাসপাতাল থেকে ফোন করে জানাবেন। দু’বার ফোন করে জানিয়েও ছিল ,কিন্তু অপারেশনের খরচ অনেক তাই এগোতে পারিনি। তবে এখন আমি একটু একটু করে টাকা জমাচ্ছি ওর অপারেশনের জন্য।
-- “তুমি চিন্তা করোনা বৌমা ,সব ঠিক হয়ে যাবে আমি সারাক্ষন মা দুগ্গার কাছে প্রার্থনা করি যেন মুন্নি আবার দেখতে পায়।
কিরে , মাকে দেখিয়েছিস তোর আঁকাটা ?
-- “এই দেখো মা আমি তোমার চোখ এঁকেছি”
-- “বাঃ ,খুব সুন্দর হয়েছে মা।
এবার বাড়ী চলো অনেক বেলা হল। আসি জ্যাঠামশাই।
-- “এসো বৌমা”

(৭)
এখন সকাল থেকেই মুন্নি এই ঠাকুরদালানে এসে বসে থাকে। আঁকে ,গল্প করে ,আর কত কত প্রশ্নের ভীড়ে দিন কেটে যায় দাদু আর মুন্নির। রোজকার মতো আজও মুন্নির রুটিন বদলায়নি। মেঝেতে বসে আঁকতে আঁকতে মুন্নি জানতে চায় ,
-- “কাল তুমি কোথায় গিয়েছিলে দাদু ?”
-- “মায়ের চোখ আঁকার সরঞ্জাম আনতে গিয়েছিলাম। তুই এসে ফিরে গেছিস্ বুঝি ?”
-- “হ্যাঁ তো। কত বার এসে ডেকেছি তোমায়। কিন্তু কোন সাড়া পায়নি। তারপর ম্যানেজার জেঠুর কাছে জানতে পারলাম যে তুমি এখানে নেই শহরে গেছো।”
-- “আগের দিনই তোকে বলবো ভেবেছিলাম কিন্তু ভুলে গেছি কথায় কথায়। তোর অভিমান হয়েছে বুঝি ?”
-- “তা তো হয়েছেই। তুমি জানো না যে তোমার সাথে কথা না বললে আমার ভালো লাগে না।”
-- “তা বললে হয় মুন্নি , আমি আর ক’দিন আছি বল। পূজো শেষ হলেই তো আবার ফিরে যাব নিজের গাঁয়ে। দেখতে দেখতে মহালয়াও চলে এলো।
-- “আর কতদিন বাকী মহালয়ার , দাদু ?”
-- “আর মাত্র সাত দিন বাকি। আমার কাজ‌ও প্রায় শেষের দিকে। তোর আঁকা হল ? তুই …
কথাটা শেষ করার আগেই হঠাৎ মুন্নির মা হাঁপাতে হাঁপাতে গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকলো। হাসিমুখে ঠাকুরদালানের কাছে এসে বললো ,
-- “জ্যাঠামশাই ,একটা ভালো খবর আছে।”
-- “কি খবর বৌমা ?”
-- “এক্ষুনি হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছিল। চোখের ব্যবস্থা হয়ে গেছে আর অপারেশনের খরচ‌ও ওরা ব্যবস্থা ক’রে দেবে বলেছে। কাল‌ই আমাদের যেতে হবে।”
-- “বাঃ। এতো খুবই আনন্দের খবর। দেখলে বৌমা বলেছিলাম না দুগ্গা মা ঠিক মুখ তুলে চাইবেন।”
-- “কোন এক নৃসিংহ প্রসাদ নামের ব্যক্তি নাকি মুন্নি কে সাহায্য করছে। কাল আমি আগে তার পা ছুঁয়ে প্রণাম করব।”
-- “তবে আর দেরি কোরো না বৌমা ,কাল সকাল সকাল‌ই বের়িয়ে পড়ো। 
যা মুন্নি তাড়াতাড়ি গিয়ে ফিরে আয়। আমি অপেক্ষা করবো।”
এতক্ষণে মুন্নির মুখ যেন খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে সকালের আলোর রঙ্ নিয়েছে।

(৮)
মহালয়ার ঠিক আগের দিন বিকেলে মুন্নি হাসপাতাল থেকে ফিরলো। এখন মুন্নি সব দেখতে পায়। আলো আর অন্ধকারের মধ্যে তফাৎ বোঝে। বাড়ি ফিরেই মুন্নি মাকে নিয়ে ছুটে গেল ঠাকুরদালানে। কিন্তু অনেক ডাকাডাকি করেও দাদুর দেখা পেল না। ম্যানেজার জেঠু জানালো ,কাজ সেরে হারু পাল বলেছিল দুদিনের জন্য বাড়ি যাবে আর মহালয়ার আগেই ফিরে আসবে। কিন্তু ফিরে না আসায় লোক পাঠানো হয়েছিল হারু পালের গ্রামে। একটু আগেই সেই লোক ফিরে এসে জানায় যে হারু পাল তাকে বলেছে ,
-- “ঠাকুরদালানের সমস্ত কাজ আমি সেরে এসেছি পূর্বেই। আর আমার জীবনের সেরা চোখগুলো আমি এঁকে ফেলেছি আমার ছোট্ট দুগ্গা মায়ের মূর্তিতে। তাই বাকি রইল যে কাজ তার জন্য মুন্নিকে বলো ওর দাদু ওকে যে চোখ আঁকা শিখিয়েছে সে চোখ যেন ও ঠাকুর দালানের মূর্তিতে এঁকে দেয় মহালয়ার দিন। ও খুব পারবে।”
ম্যানেজার জেঠু মুন্নির কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলো ,
-- “কিরে মুন্নি ,পারবি তো ? 
মুন্নির নতুন চোখগুলো তখন জলে ভাসছে পুরনো একটা মানুষের জন্য। কোনো উত্তর না দিয়েই ও গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে গেল এই অচেনা ঠাকুরদালান ছেড়ে। ম্যানেজার জেঠু একটা টাকাভর্তি খাম হাতে এও জানালো যে , তাকে এখন আবার হারু পালের গ্রামে যেতে হবে এই টাকা দিয়ে আসতে। খামের উপরে লেখা নামটা চোখে পড়ল মুন্নির মায়ের। যাতে লেখা আছে শ্রীযুক্ত নৃসিংহ প্রসাদ পাল। মুন্নির মা এতক্ষণে বুঝতে পারল কেন হাসপাতালে এত চেষ্টা করেও সাক্ষাৎ করতে পারেনি সেই ব্যক্তির সঙ্গে যে মুন্নিকে চক্ষুদান করেছে।

মহালয়ার দিন সকাল বেলা মুন্নি এঁকেছিল দাদুর শেখানো চোখগুলো ঠাকুর দালানের মূর্তিতে। কিন্তু আজ ওর দাদুর একটা কথা খুব মনে পড়ছে , “দেখতে না পাওয়াতে যেমন কষ্ট আছে তেমনি দেখতে পাওয়াতেও আছে অন্যরকম কষ্ট।”
(সমাপ্ত)
© তন্ময় বর্মন

0 comments: