Monday, August 20, 2018

পেডোফিলিয়া

পেডোফিলিয়া
-----------------আপনি জানেন কি ভারতবর্ষে প্রতি ১৫৫ মিনিটে একটি ১৬ বছরের কম বয়সী শিশু ধর্ষিত হয়? প্রতি ১৩ ঘন্টায় একটি ১০ বছরের কম বয়সী শিশুকে যৌন নিগ্রহ করা হয়। প্রতি দুটি শিশুর মধ্যে একজন যৌন লালসার শিকার। এবং এদের মধ্যে ৫৬% ছেলে। এই হিসেবে প্রতি সেকেন্ডে কোনো না কোনো ভাবে ভারতবর্ষের কোনো না কোনো শিশু নোংরা স্পর্শ পাচ্ছে তার পরিচিত কারোর থেকে। হ্যাঁ, সবথেকে ভয়ংকর হল, শিশু নিগ্রহের ক্ষেত্রে অপরাধী ৯০% ক্ষেত্রে পরিচিত। তাই, কোনোভাবেই আপনার শিশুটি নিরাপদ নয়।

এই লেখাটি লিখতে লিখতেই আরো অনেক ফুল ঝরে যাবে, ভয় পাবে এবং আরো অনেক অপরাধী তৈরি হবে যারা ভবিষ্যৎ-এ এই শ্বাপদসঙ্কুল পৃথিবীকে শিশু জন্মের অযোগ্য করে তুলবে।

পেডোফিলিয়া। ‘উইকি’ বলে এটি একটি মানসিক রোগ, ের লক্ষণ শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ ও যৌন পছন্দ অনুভব করা এবং প্রিপিউবারসেন্ট বা ১৩ বছরের কম বয়সীদের সাথে সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসি পোষণ করা। তাই ধর্ষণের সাথে শিশু নিগ্রহকে একই সারিতে ফেলা উচিত হবে না। ধর্ষণ একটি পরিকল্পিত অপরাধ। পেডোফিলিয়া একটি মানসিক রোগ। যদিও সমস্ত আইনে পেডোফিলিয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এটা নয় যে সমস্ত পেডোফিলিক মানুষ শিশু নিগ্রহ করে। কারোর ক্ষেত্রে শিশুটিকে ছোঁয়া বা কোলে নেওয়াতেই তার যৌন তৃপ্তি ঘটে। সাধারণত পেডফিলিকরা পুরুষ হয়, তবে মহিলা পেডোফিলিকও আছে। একবার নয়, পেডোফিলিকরা বারবার অপরাধ করে। পরিসংখ্যান বলে একজন পেডোফিলিক সারা জীবনে গড়ে ৪৮টি বাচ্চার সাথে জোর করে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে! এমনকি এদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষকতা বা শিশুসুরক্ষা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত থাকে যাতে বেশি সংখ্যক শিশুর সংস্পর্শে থাকতে পারে। আরো বেশি চিন্তার বিষয় যে এরা খুব জনপ্রিয় হয় বাচ্চাদের কাছে। আপনার ধারণাতেও আসবে না যে যেই মানুষটাকে আপনি সবথেকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন সে স্বপ্নে আপনার সন্তানটিকে কামনা করে!
পেডোফিলিয়া কেন হয় সে নিয়ে অনেক ‘স্টাডি’ আছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পেডোফিলিক মানুষ ছোটোবেলায় যৌন নিগ্রহের শিকার বা খুব নোংরা যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। বুঝতে পারছেন অবস্থাটা? একজন পেডোফিলিক মানুষ যদি ৪০টি শিশুকে নিগ্রহ করে এবং তার মধ্যে ১০% বা ৪ জন যদি পেডোফিলিক হয়ে যায় তবে তাদের মাধ্যমে তিরিশ বছরের ব্যবধানে ১৬ জন পেডোফিলিক তৈরি হতে পারে। হ্যাঁ, সংখ্যাটা গুণোত্তর প্রগতিতে বাড়ছে।
সমস্ত রোগের মত পেডোফিলিয়ারও চিকিৎসা রয়েছে। যদিও খুব কম পেডোফিলিক নিজে কাউন্সেলিং করাতে যান। গবেষণায় দেখা গেছে রাগ, ‘রিজেকশন’, ভয় এগুলো পেডোফিলিয়া কমাতে তো পারেই না, বরং যৌন নিগ্রহ পরোক্ষভাবে বাড়ায়। মানসিক চাপ ও অস্থিরতায় পেডোফিলিক আরো অপরাধ করে ফেলে। এরা আমার আপনার সাথেই মিশে আছে। বিবাহিত, বাড়িতে সন্তান আছে অনেকেরই। আমার এই লেখাটা যারা পড়ছেন, তারা যদি কেউ এই রোগের শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যান। ওষুধ ও ‘বিহেভিয়ারাল থেরাপি’র মাধ্যমে পেডোফিলিয়া সেরে যায়। দরকার সমাজ থেকে এই ব্যাধি নির্মুল করার। আপনি না এগোলে হবে না।
একটা ঘটনায় প্রোফাইল পিকচার চেঞ্জ বা মোমবাতি মিছিল বা মুন্ড বা লিঙ্গচ্ছেদ করে সমস্যা মিটবে না যদি না রোগ সারানো যায়। সর্বস্তরে একটা সচেতনতা দরকার।
১. আইনটাও একটু পরিবর্তন করা দরকার যদি এই অবস্থা থেকে সমাজকে বের করতে হয়। একজন বাচ্চা তার সাথে করা নিগ্রহের প্রতিবাদ করতে পারে না। কারণ তাকে আমরা শেখাই বড়দের মান্য করতে হবে। এছাড়া ভয়, লজ্জা এবং বাবা-মায়ের উদাসীনতা তাকে আরো একলা, বন্ধুহীন করে দেয়। যদি ছোটবেলায় করা অন্যায়ের অভিযোগ সে বড় বয়সে করতে পারে, সেটা অনেক অপরাধ কমিয়ে দেবে।
২. শাস্তি আরো কড়া হওয়ার পাশাপাশি পেডোফিলিয়া নিয়ে সামাজিক প্রচার দরকার। সুনীল রাস্তোগী নামের একজন পেডোফিলিক ৫৪টি যৌন নিগ্রহের ঘটনা ঘটিয়েও বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশ কিছুবার জেল খেটেছে শুধু। কারণ ঘটনাগুলোর অনেক গুলোই রেজিস্টার্ড হয়নি সময়ে।
৩. দরকার সঠিক যৌনশিক্ষা। বাচ্চাদের নিজেদের যৌনাঙ্গ চেনানোর পাশাপাশি নোংরা স্পর্শ ও যৌনতা নিয়ে যদি বাড়িতে আলোচনা হয় তবে বাচ্চাটি অন্তত নিজের কথাটা বলতে পারবে। এটা দেখা গেছে বাচ্চার মুখে একবার - আমি কিন্তু মাকে বলে দেবো, এই কথাটা শুনে প্রচুর পেডোফিলিক পিছিয়ে গেছে।
৪. টিচিং, ননটিচিং, সাপোর্ট স্টাফ, সিকিউরিটি, ড্রাইভার নিয়োগ করার আগে স্কুল বা শিশু-কল্যাণ প্রতিষ্ঠানগুলো একবার পুলিশ ভেরিফিকেশন করিয়ে নিক। পেডোফিলিক অপরাধীদের আপডেটেড লিস্ট সরকার থেকে প্রতি মাসে প্রকাশ করা হোক।
আপনার শিশুটি খুব দামী। ওর শৈশবে দাগ লাগতে দেবেন না। পরিচিত, অপরিচিত, ডাক্তার, পুরোহিত কারোর সাথে একলা ছাড়বেন না। ওর কথা শুনুন। ওকে উড়তে দিন আকাশে।
একটা বাচ্চার গায়েও আঁচড় ফেলা যাবে না।
(জয়াশিষ ঘোষের লেখা, সৌম্য দাসের আঁকা)

0 comments: