Monday, August 20, 2018

মুঝকো পিনা হ্যায় পিনে দো

সকাল সকাল মিঠুন চক্রবর্তীর এই গান শুনলাম, তখনও বিছানা ত্যাগ করিনি। সম্বিৎ ফিরতেই টের পেলাম ১৫-ই আগস্টে দেশাত্মবোধক গানের পরিবর্তে এই গান গাই গাইতে পারে একমাত্র ফটিক।
“গুরু আর কত এবারে উঠে পড়’’। বলেই আবার গাইতে শুরু করল “মুঝকো_পিনা_হ্যায়_পিনে_দো
মুঝকো_জিনা_হ্যায়_জিনে_দো’’।
দরজা খুলেই দেখলাম ফটিকের হাতে একটা তিন কুড়ি দশ এর বোতল ।
“আচ্ছা ফটিক আমি জানতাম স্বাধীনতা দিবস মানে তোর মত মাতালদের পান করার আবাধ স্বাধীনতা ; তা বলে সক্কাল সক্কাল”।
ফটিক এক পেগ খেয়ে বলল “ বালের স্বাধীনতা”।
যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল। বললাম-“ জানিস বিলিতি একটা প্রবাদ আছে গাধার সাথে কক্ষনও রসিকতা করো না , সে তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে পারে। নেহাত তুই আমাকে মাঝে সাঝে দুদণ্ড ভাল কথা বলিস নাহলে তোর মত পাবলিক তো আমার ছায়া মাড়াতে পারবে না; একদম দূর হয়ে যা আমার সামনে থেকে আর কখনও দেখা করবি না”।
আমার রাগ তাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করল না বরং কেষ্ট মুখার্জির মত দাঁত কেলিয়ে বলল “ এই তো গুরু রেগে গেলে তাহলে তোমরা ক্লাসে কি করে বাচ্চাদের সামলাও কে জানে?”
“ এই শোন পেশা নিয়ে কথা বলবি না বলে দিলাম”।
ফটিক- “ওকে বস বলেই আমার হাত দুটি ধরে ফেলল; কিন্তু স্বাধীনতা মানেই আমার কাছে ‘বালের স্বাধীনতা”।
বললাম “ফটিক কথাটা খুব কানে লাগছে রে প্লিজ আর বলিস না, একটু পরেই বেরিয়ে পড়ব স্কুলে উদযাপন করতে এই দেখ মোবাইলে সকাল থেকে ১০০ মেসেজ চলে এল স্বাধীনতার শুভেচ্ছা বার্তা আর তুই কিনা আজকের দিনে..................”
“সে তো দুদিন আগে থেকেই সবাই শুভেচ্ছা বার্তা পাঠাচ্ছে , আচ্ছা যদি তোমাকে তোমার প্রয়াণ এর শোক বার্তা আজকে পাঠায় কেমন লাগবে?’
“মানে”
“ মানে বুঝে নাও স্বাধীনতার দিনক্ষণই আসে নাই তো শুভেচ্ছা বার্তা!”
বললাম “ জানিস রবীন্দ্রনাথের ......”
“জানি জানি রবীন্দ্রনাথের চিত্রা কাব্যগ্রন্থের ‘আজি হতে শত বর্ষ পরে’ কবিতা যার নাম ‘১৪০০ সাল’ এর কথা বলছ আর বলতে চাইছ কবি গুরু যদি ১০০ বছর আগে বলতে পারে তোমরা দুদিন আগে কেন বলতে পারবে না? তাইতো?”
আমি একটা কথা বলতে পারলাম না শুধু বললাম “ফটিক!”
“ইয়েস ফটিক; শুধু তোমরাই পড়াশুনা করেছ আর কেউ করেনি বুঝি”
আমার রাগ অনেকটা পড়ে এল তাই বললাম “আচ্ছা ফটিক বালের স্বাধীনতা কেন বললি?”
“অবশ্যই বালের স্বাধীনতা, শোন আমি মনে করি ৭১ বছর আগে শুধু ইংরেজরা আমাদের জায়গা ছেড়েছে কিন্তু আজও আমরা স্বাধীন হতে পারিনি আজও পরাধীন রয়ে গেলাম”।
“কি বলিস আমরা এখন পরাধীন?”
“ইয়েস আমরা সবাই এখন পরাধীন দেশের নেতার কাছে , নাহলে মুকেশ অম্বানির কাছে বা youtube বা Whatsapp এর মত ইংরেজদের থেকেও আরও ভয়ঙ্কর সব মাথার কাছে না হলে শালা বৌয়ের কাছে”
“ এই যে যা তা বোকা শুরু করলি”
এবার ফটিক গর্জে উঠল আর তার নিজস্ব ভঙ্গীতে বলে চলল...
“ইংরেজরা না আসলে আজও আমাদের কোনও রাজার বাড়ির ক্রীতদাস হয়ে দিন কাটত ওরা এসেছিল বলেই রাজতন্ত্র শেষ হয়ে গিয়েছিল ওরা এসেছিল বলে আমাদের মধ্যে শিক্ষার বীজ বুনেছিল কিন্তু ওরা ভেবেছিল রাজতন্ত্র খতম মানেই এবার আমরা রাজা তাই তো ওরা নিজের অজান্তেই তৈরি করেছিল পরাধীনতার পরিবেশ তাইতো আমাদের সমাজের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল নেতাজী, ক্ষুদিরাম, ভগত সিং এর মত রক্তের যারা বুক চিতিয়ে লড়াই করে বলেছিল ইংরেজ যা তোর নিজের জায়গায় ফেরত যা তারপরেই এসেছিল আমাদের স্বাধীনতা”
“ কিন্তু আজ আবার আমরা পরাধীন নাহলে বল কেন আজ কারাগারে ধর্ষক থাকবে, পারবে না তোমারা শিক্ষিতের দল আন্দোলন করতে যে একজন ধর্ষক হিসেবে প্রমাণিত হলেই প্রকাশ্যে তাকে গুলি করে মারা হবে।
বল দেখি আজকে একটা বৃদ্ধাশ্রম দেখাতে পারবে যেখানে ঐ বুড়ো বুড়ি কোনও সাধারন ঘরের কেউ, সবার ছেলে আজ উচ্চশিক্ষিত চাকুরীজীবী আন্দোলন করতে পারবে না যদি ঐ বুড়ো বুড়ি কে তাঁদের সন্তান যদি নিজের কাছে না রাখে তাহলে তাঁর সব ধন সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে আর তাঁর সব সরকারী সুযোগ সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হবে”
“পারবে না সেই নেতাকে জোর করে টেনে নামিয়ে দিতে যার দৌলতে বিজয় মাল্য বা নিরব মোদী আজ ভারতের জনগণের টাকা মেরে বিদেশে ফুর্তি করছে। পারবে না এমন আন্দোলন করতে যেখানে SC, ST OBC বলে কিছু থাকবে না আমাদের একটাই category হবে আর সেটা হবে ভারতীয়।
তাহলে বছরে একবার নয় ৩৬৫ দিন তোমাদের ছবি নিয়ে সবাই পূজা করবে নেতাজী, ক্ষুদিরাম বা ভগত সিং এর মত তোমাদেরও বিপ্লবী হিসেবে। আর তোমরাই হবে সেই পুনঃপরাধীন ভারতের পুনঃ স্বাধীনতার বিপ্লবী।
আর ১৫-ই আগস্ট আসলেই সবার শালা দেশপ্রেম জেগে ওঠে তখন পকেটের মোবাইলে কয়েকটা ছবি নিয়ে একে ওকে চালান করে আর ক্লাবে পতাকা তুলে নিজের দেশপ্রেম জাহির করছে। সারাবছর পাশের বাড়ির বৌ কে তার মাতাল স্বামী গালমন্দ করছে রাস্তা ঘাটে মেয়েদের নিয়ে টিটকারি কেটে সিগারেট ফুঁকে আনন্দ করছে তার খবর কেউ রাখে না”।
“আমরা তো বছরে হাতে গোনা ছুটি পাই তাই তো আজকের দিনে একটু বেশি গিলে নিই, তবে বুক ঠুকে বলছি এনে দাও তোমরা শিক্ষিতের দল নতুন পুনঃ স্বাধীন ভারত বর্ষকে কথা দিলাম আমার এই সাথিকে গঙ্গা জলে ফেলে দেব আর আমার বাড়িতে সেই আন্দোলন কারীদের ছবি রেখে রোজ পূজা করব।
কিন্তু এখন আমাকে গাইতে দাও
মুঝকো_পিনা_হ্যায়_পিনে_দো
মুঝকো_জিনা_হ্যায়_জিনে_দো’’।
দেখলাম ততক্ষণে কিছু লোক আমাদের চারপাশে ফটিকের কথা শেষ হতেই বলল “জিও ফটিক”।
আমি শুধু মনে মনে বললাম “ ঈশ্বর এর মঙ্গল কর”।

0 comments: