Sunday, August 26, 2018

বয় ফ্রেন্ড

বেশ কয়েক মাস ধরে দুলুদার বিয়ের কথা চলছিল। এক সময়ে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেলো। দুলুদার বাবা এসে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে গেলেন। দুলুদা আমাদের চেয়ে অনেকখানি বড়। কিন্তু আমাদের সঙ্গে বন্ধুর মত ব্যবহার করতো। দুলুদা টিপিক্যাল পাড়ার ছেলে। সবসময়ে খেলাধুলা , পাড়ার পুজো , রবীন্দ্র নজরুল সন্ধ্যা এই সব নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। দুলুদাই আমাদের বয়সী ছেলেদের সিগারেট খাওয়া শিখিয়ে ছিলো। মাঝে মধ্যে দুলুদার বাড়ি গিয়ে বেশ আড্ডা মেরে আসতাম।
দুলুদার বোনের নাম নীলু। নীলু নামটা আমার কানে ছেলেদের নাম বলে শোনাতো। নীলু আমার চেয়ে এক ক্লাস নিচে এক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ত। রোগা পাতলা নীলু ভিশন ডানপিটে মেয়ে , আর সব সময়ে মুখে কথার খই ফুটছে। কখন কোথায় কি বলে বসবে তার ঠিক নেই। তাই আমি ওকে দুরে দুরে রাখতাম। নীলু ওই সময়ে শহরতলিতে সাইকেল নিয়ে এপাড়া ওপাড়া ঘুরে বেড়াত। প্রতি বছর স্কুলের স্পোর্টসে ওর বেশ কিছু প্রাইজ বাঁধা ধরা ছিল।
দুলুদার বৌভাতের অনুষ্ঠানের জন্য ওদের বাড়ির ছাদে ম্যারাপ বাঁধা হয়েছে। সেদিন সকালে কি একটা কাজে ওদের বাড়ির ছাদে গেছি দুলুদার সঙ্গে দেখা করতে। দেখি দুলুদা নেই , নীলু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্যান্ডেল বানানোর মিস্ত্রিদের সঙ্গে কথা বলছে। আমাকে দেখেই বলে উঠলো " আজ সন্ধ্যায় অনেক লোক আসবে। আমাকে দেখা শোনা করতে হবে। তুমি সারাটা সন্ধ্যা আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকবে। " আমি হাঁ বা না কিছু না বলে চুপ করে রইলাম। কিছু বলা মানে নীলুর দশ কথা শুনতে হবে।
সন্ধ্যাবেলা সেজে গুজে গেছি দুলুদার বাড়ি। আমাকে দেখেই নীলু একহাতে আমাকে ধরে টেনে নিয়ে গেলো ভিতরে। সেখানে ওর যতো , মাসি পিসি , মাসতুতো , পিসতুতো বোনেরা ভিড় করে আড্ডা মারছে। সবাইকে থামিয়ে দিয়ে আমার পরিচয় দিলো যে আমি নাকি দুলুদার সবচেয়ে প্রিয় ছোটো ভাই। তারপ শুরু করে দিল আমার গুণ কির্তন। আমি নাকি খুব ভালো ফুটবল খেলি , ডিস্ট্রিক্ট টিমে খেলেছি , ডিবেটে অনেক প্রাইজ জিতেছি , রাত দিন নাকি পড়াশুনায় ব্যস্ত থাকি। কিছুতেই কিছু আর আমাকে বলতে দেয়না। ওর মুখের কথার বিরাম নেই।
তারপর এক সময়ে আমাকে নিয়ে ওদের বাড়ির গেটের কাছে নিয়ে দাঁড় করলো। তখন আমন্ত্রিতরা সব আসতে শুরু করেছে। নিলু ওদের গায়ে গোলাপ জল স্প্রে করা শুরু করে দিলো। আমি পাশে চুপ চাপ দাঁড়িয়ে। একটু পরে জনা পাঁচ ছয় নীলুর স্কুলের বন্ধুরা হই হই করে এসে পড়ল। নিলু এক হাতে আমায় ধরে বন্ধুদের সঙ্গে এক কোনে গোল করে পাতা চেয়ারে নিয়ে বসলো। নীলু যদিও রোগা পাতলে ছিলো , কিন্তু ওর বন্ধুদের চেহারা দেখার মতন। নীলুর ভয়ে আমি ওদের কাউকেই ভালো করে দেখার সাহস পাচ্ছিনা। একটু নির্বিকার হয়ে চুপ করে বসে রইলাম। তারই মধ্য নিলু বলে উঠলো " এ হচ্ছে সেই যার গল্প আমি তোদের বলি। " বেশ শুরু হয়ে গেল মেয়ের দলের প্রশ্নবান আর মন্তব্যের ঝড়। ওরা সবাই ধরে নিয়েছে আমি হয়তো নীলুর বয়ফ্রেন্ড। সবাই বেশ আমায় আপনি আপনি করে কথা বলছে। তখন আমার সেই বয়সে যখন  কেউ আমাকে আপনি করে সম্ভাষণ করতোনা । ওদের এক একটা 'আপনি' ডাক যতই মিষ্টি হোক , আমার কানে বেশ বিঁধছে। বুঝতে পারছি কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। কিন্তু নীলুর চোখ দেখে কিছুই বলার সাহস পাচ্ছিনা। অনেকক্ষণ আড্ডার নামে নীলুর বান্ধবীরা আমায় বেশ ৱ্যাগিং  করলো , আমিও কাঁচু মাচু হয়ে শুনে গেলাম। এক সময়ে আড্ডা ভাঙ্গলো। ওর বান্ধবীরা সব খেতে গেলো। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে নিজের রাগ সামলে , নীলুকে একলা পেয়ে জিজ্ঞস করি কি ব্যাপার।
ওই ডানপিটে নীলু মুখ নিচু করে মাটির দিকে চেযে বলে উঠলো " আমার বন্ধুরা সবাই তাদের বয়ফ্রেন্ডের গল্প করে। আমি ওদের বানিয়ে বানিয়ে আমার বয়ফ্রেন্ডের গল্প করতাম। এই বিয়ে বাড়ির আসরে ওরা সবাই আমার বয়ফ্রেন্ডকে দেখার আগ্রহে এসেছে। তাই তোমাকে এগিয়ে দিলাম। লক্ষিটি কিছু মনে করোনা। " তারপর নিলু চুপ চাপ মাথা নিচু করে ভিতরে চলে গেল।
আমি বেবাক দাঁড়িয়ে রইলাম।


লিখেছেন : SANAT MISRA
#pendrive

0 comments: