Monday, August 27, 2018

প্রেমপত্র এবং

প্রেমপত্র জিনিসটা আমি ঠিকঠাক  প্রথম পাই কলেজ লাইফে পা দিয়ে! তারপর বেশ কয়েকটা পেয়েছি। কিছু কালেকশন এ আছে আর কিছু অন্যের হাতে দিয়ে বলেছি অন্য কোথাও চালিয়ে দিতে!
এটা নিয়ে বিশাল পোস্ট দেব না... শুধু ছোট্ট কয়েকটা কথাই বলব!

ব্যাপারটা নিয়ে প্রথম ধারণা জন্মায় 'টম এন্ড জেরি' দেখে!  একজন আয়েশ করে চিঠি লিখত,আর তার ভৃত্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মারধোর খেয়েও সেসব  পৌঁছে দিয়ে আসত!

স্কুল লাইফে নিজের সম্পর্কে ঠিকঠাক ধারণা ছিল বলেই যাদের উপর ক্রাশ ছিল, তাদের চিঠি তো দিই ই নি, পাব সে আশাও করিনি। তাদের পিছনে ছিল বোম্বাই মার্কা সব ছেলেপিলে আর আমার মুখটা ছিল হারপিকের বোতলের মতো! তাই চিঠিচাপাটি দেব সেই ভাবনা আসতেই ভয় পেয়ে গেছি! ওরা মরা চামড়া ঝাড়ার মতো ব্যাগ থেকে চিঠিপত্র ঝাড়ত আর ফেলত!

বরং অন্যের চিঠি অনেকবার লিখে দিয়েছি! একটা ছেলে আমায় বলেছিল গান লিখে দিতে! সেটা নিজের নামে চালাবে! আমি একসময়ে মিশনের ছাত্র ছিলাম!  সেখানে পড়াকালীন প্রচুর ভজন, শ্যামাসংগীত ইত্যাদি লিখেছিলাম। সেসবের জন্য আমার ক্রিয়েটিভ লেখাও ওরকম ধরনেরই হয়ে যেত!  মিশনের প্রভাব আর কি!
এই গানটাও হয়ে গেল আধ্যাত্মিক গোছের! অনেকটা 'তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা' ধরণের!   মেয়েটা কী বলেছিল জানতে পারিনি তবে ওর বাবা নাকি চিঠিটা দেখে ফেলেছিলেন!  আর নাকি বলেছিলেন এটা কে লিখেছে? বাহ্!  বেশ ভালো বাংলা তো! অভিজাত বাংলা!
ছেলেটাকে আর মেয়েটাকে তারপর থেকে প্রায় ই একসঙ্গে দেখা যেত! ধ্রুবতারা আর ধ্রুব থাকেনি!


মিশনে চিঠিচাপাটি লেখার হিড়িক সেভাবে দেখিনি!  স্কুল বদলে বারাসতে আসার পর নানারকম টিউশনির ব্যাচে গিয়ে ঢুকলাম! সেসব ব্যাচে ঢুকেই জীবনটাকে মোটামুটি দেখতে শিখেছিলাম!  নতুন স্কুল আর পড়ার ব্যাচে এসে দেখলাম চিঠি লেখা কাকে বলে!  রক্ত দিয়ে চিঠি(ব্লেড, ছুরি,কম্পাস দিয়ে খুঁচিয়ে), চুমু বোঝানোর জন্য লালা লাগানো চিঠি, চোখের জল লেপ্টানো চিঠি...যতরকম হয়!
কেউ বড়লোক, রেগুলার হ্যামবার্গার খায় এটা বোঝাতে পারলে কেউ চিঠি লিখে তার উপরে ঢেঁকুরই তুলে দিত, যেন এনভেলপ খুলেই গন্ধ পাওয়া যাবে!
তখনও অন্যের চিঠি আমি কয়েকবার লিখে দিয়েছি!
আর তারাই হ'ল জিগরি দোস্ত যারা বন্ধুর চিঠি পৌঁছে দেওয়ার জন্য ভয়াবহ সব মিশনে নামে!

একবার ক্লাসের নামকরা এক তুমুল গুন্ডা ছেলে(তখনই তার বয়েস ছিল এখনকার আমার মতো) আমার সামনে পাথরের মতো এসে বসেছিল! এদের কাছে দেশী পিস্তল, ন্যাপলা এসব থাকত!  কিন্তু আমার সঙ্গে বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল ওদের!  হঠাৎ দেখি সেই দুর্দান্ত  ছেলেটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে!  অনেক কষ্টে  একটা খামবন্ধ চিঠি বার করে আমার হাতে দিয়ে বলল ' শুচিস্মিতা অনুপস্যরের কাছে পড়ে না? তুই ও পড়িস... এটা একটু পৌঁছে দিস! '
আমি বিশাল ল্যাটায় পড়ে গেলাম!  প্রথমত অনুপস্যার আমায় সাংঘাতিক ভালোবাসেন! ধরা পড়লে আমার রেপুটেশন শেষ!  দ্বিতীয়ত, শুচিস্মিতা আমার ছোটবেলার বন্ধু!  সে ই বা কী ভাববে!  তৃতীয়ত,  ঐ ব্যাচে কড়া পাহারা!  চিঠি পাচার করাটাই সাংঘাতিক!
না না করেও শেষ অবধি চিঠিটা নিয়ে নিই!
কচ্ছপমার্কা মশার কয়েল এর প্যাকেটে ভরে সেটা ঐ ডেঞ্জারাস ব্যাচে অনেক কসরত করে জমা দিয়েছিলাম! সে অন্য গল্প!
চিঠিটা পড়ে শুচিস্মিতা খুব ক্ষেপে গেছিল!  ব্যাচ শেষে গুন্ডাকেও দেখা যেত বাইরে!
এরপর দু'সপ্তাহের জন্য শুচিস্মিতা গায়েব হয়ে যায়... ফেরে সিঁদুর নিয়ে! আমি পুরো ব্যোমকে গেছিলাম!
 মনে হচ্ছিল নিউজপেপারটা টিপ করে ছুঁড়তে পারিনি!

স্কুল জীবনে পিওনগিরি করা ছাড়াও নিজের লেটারবক্সে চিঠিও পেয়েছিলাম খানতিনেক!কে যে লিখেছিল তখন ধরতে না পারলেও পরে ঠিক বুঝেছিলাম। একবার একজনের হাত মারফত ও পাই!
পড়া শেষে একবার রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম... দমাস করে আমার পিঠে একটা চিপস এর প্যাকেট উড়ে এসে আছাড় খেয়েছিল!  তাতে একটা চিঠি আটকানো ছিল!

কলেজ জীবনে বেশ কয়েকটা পেয়েছিলাম!  কারা যে দিত বুঝতাম না!  আজ ও বুঝিনি!
বেশিরভাগ ই ভিড় ব্যাগে চেন ফাঁক করে ঢুকিয়ে দিত!  কেউ খাতায় গুঁজে দিত!
একবার ব্যাচ থেকে বেরনোর পর শুনেছিলাম এক মা ফিসফিস করে মেয়েকে বলছেন ' কি রে!! চিঠিটা ঠিকঠাক দিয়েছিলিস তো?'
একটা চিঠিতে নজরুল এর কবিতা লেখা ছিল ''. যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে, অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে'!

আমার এক টীচারের স্ত্রী খুব পজেসিভ ছিলেন! স্যরের মাইনের খামে এক ছাত্রী প্রেমপত্র ভরে দেয়!  স্যর সেটা যত্ন করে কালেকশনে রেখে দেন!  তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে এটা নিয়ে তাঁর ব্যাপক ঝামেলা হয়েছিল!

আর একটা দুর্দান্ত চিঠি পেয়েছিলাম... শার্লক হোমসের 'হাউন্ড অব দ্য বাস্কারভিলস' কিংবা 'ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি'তে নিউজ পেপার থেকে অক্ষর কেটে কেটে বসিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল যাতে প্রেরকের হাতের লেখা, ছাপার জায়গা এসবের হদিশ না পাওয়া যায়!
আমার চিঠিটায় একেকটা অক্ষর লিখেছিল একেকজন!
স্বাভাবিকভাবেই ধরতে পারিনি ওটা কার লেখা! তবে বুঝেছিলাম অত গোপনীয়তা যখন,সেটা নিশ্চয়ই পরিচিত কেউ,যার হাতের লেখা আমি চিনি!
আর আসত ফোনে-ফেসবুকে প্রচুর মেসেজ!  সেটাও ধরতে পারেনি!  একবার চিঠির সঙ্গে পেয়েছিলাম একটা পরীক্ষার সাজেশন পেপার! সেটার দাম দুশো টাকা!  কলেজপাড়ায় পাওয়া যায়!
 আমার এক হ্যান্ডসাম বন্ধু একসময় তিয়াসা বলে একটা মেয়ের জন্য চিঠি লিখে লেডিজ হস্টেল এর বাইরে ঘোরাঘুরি করত দারোয়ানের হাত দিয়ে পাচার করবে বলে!  কিন্তু সুবিধা করতে পারছিল না!  দারোয়ান একদিন ধমকে বলে ' দেবপ্রিয়া?  সুলগ্না? কার জন্য? জানি না ভেবেছিস কিছু? ভাগ! '

আমি তখন ওর কাঁধে চাপড় মেরে বলেছিলাম ' পাগলা.. এই দু'জায়গায় চান্স নে, হয়ে যেতে পারে!'

রিচার্ডসনের 'পামেলা'কে ইংরিজি সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস বলা হয়! পাড়ার অশিক্ষিতা ঝি-চাকরাণীরা তাঁর কাছে প্রেমপত্র লেখাতে আসত। এই ব্যাপারটা নিয়েই প্লট ফেঁদে তিনি 'পামেলা' লেখেন!

আমি সেসব পত্রলেখিকাদের সেভাবে ধরতেই পারিনি।!
তবে চিঠির চেয়েও প্রেমের ইচ্ছা আর সেটারই পারফিউম লাগানো প্রেয়সীদের উপহারগুলো অনেক বেশি মায়াবী মনে হয়! সেটায় প্রেমিকা ধরা দেয়, প্রেম ধরা না ও পারে!

আর ছাত্রীর কাছ থেকে পাওয়া প্রেমপত্র শিক্ষকের কাছে একটা দারুণ জিনিস!  সে অভিজ্ঞতা আমার নেই!

( উৎসর্গ  : বসন্তের কোকিল শ্রীসৌরদীপ চট্টোপাধ্যায়!  যাঁর থেকে এই ব্যাপারে অভিজ্ঞতায় আমি অনেক পিছিয়ে!)

0 comments: