Wednesday, September 19, 2018

আকাশবাণীর ভূত নিয়ে কিছু কথা

আকাশবাণীর ভূত নিয়ে কিছু কথা


akashvani bhoot,hauntedolaces in kolkata
akashvani bhoot



আকাশবাণীতে আমি নাইট ডিউটি করি!... রাতবিরেতে এসপ্ল্যানেড মেট্রো থেকে আকাশবাণী পর্যন্ত হেঁটে যেতে আমার  প্রচন্ড ফ্রাস্ট্রেশন আসে!  কেন আসে  এটার ব্যখ্যা দেওয়া সত্যিই মুশকিলের!  ...  'দুঃখবিলাস' বলতে যেটা বোঝায়, সেটা তো হয় ই, কিন্তু ঐসময়ে ঐ এলাকায় গেলে একটা আচ্ছন্ন ভাব এসে যায় !   বারাসাত থেকে আমি ট্রেন ধরে দমদমে নামি... তারপর মেট্রো ধরি।  মেট্রো মানেই হাঁটা, আর সেটা মানেই ফ্রাস্ট্রেশন!  এই ক্ষুদ্র বিশ্বে আমি কে, কীসের নিমিত্তে আগমন এসব থিমওয়ালা হাবিজাবি চিন্তা অদ্ভুতভাবে  এসেই যায়।  কেন আসে জানি না!  এই অস্বস্তি এড়ানোর জন্য আমি বেশ ক'বার আমার অত্যন্ত অপছন্দের বাসজার্নি করে প্রায় বহুদূর ঠেঙিয়ে অবধি গেছি!  কারণ একটাই- না বাস একদম আকাশবাণীর সামনেই নামিয়ে দেয়!  ঐ অতটা রাস্তা পেরোনোর অস্বস্তি টা তাতে হয় না!  কিন্তু বিধি বাম!
নাইট ডিউটি করার দিন পৌনে আটটার মধ্যে ঢুকে যাওয়াটাই দস্তুর!   সেক্ষেত্রে বাস ধরব বলে ডিপোয় যেতাম পাঁচটা নাগাদ। আকাশবাণী পৌঁছতে পৌঁছতে  প্রায় সাড়ে সাতটা বাজত!  বহত আচ্ছা!  রাস্তা পেরোনোর হ্যাপা নেই, ধাঁধিয়ে যাওয়ায় সমস্যাও নেই!  কিন্তু মুশকিলটা হ'ল ঐ সন্ধ্যেবেলায় ধর্মতলা-বাবুঘাট অঞ্চলে কে ই বা আর যাবে!  অফিস ফেরতের সময় ওটা। তাই বাস পাওয়াটাই মহা ল্যাটার হয়ে দাঁড়ালো।ডিপোয় খালি বাস দেখে উঠতে গেলে পাদানিতে বসা কন্ডাক্টর বিড়ি চিবিয়ে বলে আরও আধা ঘন্টা পর ছাড়বে!  বাসে উঠলে বলে ধর্মতলার বেশি এগোবে না!  ও হরি! তাহলে সেই রাস্তা যখন পেরোতেই হবে, তখন মেট্রো নয় কেন!  অগত্যা স্টেশনের দিকে হাঁটা লাগাতে হ'ত!
চালাকি করতে গিয়ে মাঝে শেয়ালদা অবধি ট্রেনে  গিয়ে তারপর বাস ধরতে গেছিলাম কিন্তু বাবুঘাটের বাস সকালে যেমন এখোগুড়ের মাছির মতো থাকে, সন্ধ্যেতে গিয়ে মনে হ'ল বাবুঘাটের বাসের উপর স্ট্রাইক হয়ে রয়েছে!  যখন কলেজে পড়তাম, বহুদিন শেয়ালদা থেকে হেঁটেই ধর্মতলা গেছি। কিন্তু কাজের সময়ে সন্ধ্যেবেলা অতটা পথ পাগলের মতো হাঁটবই বা কেন!
আমি পড়তাম মৌলানা আজাদ কলেজে। তাই জানবাজার - এসপ্ল্যানেড - বাবুঘাট এলাকা খুব ভালোভাবেই চিনি। আমিনিয়া - আলিয়া -অনাদি( এখন বন্ধ হয়ে গেছে) তে যে কতবার খেতে গেছি ইয়ত্তা নেই!

বহুজনেই জানেন এই আকাশবাণীর ভূতের কথা! কিন্তু আমি নিজে এটা নিয়ে বিভিন্ন লেখা পড়লেও ব্যাপারটা একেবারেই মাথা থেকে চলে গেছিল ! আকাশবাণীতে আমার প্রথম ডিউটি পড়েছিল দোলের দিনে ! বাস-টাস সেভাবে চলছিল না বলে আমি সেদিন অতি তাড়াতাড়ি মানে সাতটারও মধ্যে এসপ্ল্যানেডে পৌঁছে যাই।তখন সময় কাটানোর জন্য গঙ্গার ধারে পায়ে হেঁটেই চলে যাই ! হোলি - গঙ্গা একটা অন্যরকম মাদকতা ! আকাশবাণীতে ঢুকে ফোন অন করতেই হুড়মুড় করে বন্ধুদের মেসেজ ঢুকল ! সবার ঐ এক কথা - ' আকাশবাণীতে কিন্তু ভূত থাকে... তোর ভয় করছে না?' সত্যি বলতে আমার ভয়ডর একটু কম ! শ্মশানে রাত কাটানো আর প্ল্যানচেট দেখা- দুই অভিজ্ঞতাই আমার আছে !ইয়ার্কি মেরেই উড়িয়ে দিলাম !

বারাসাতের হেস্টিংস হাউস নিয়ে দাদুর কাছে ছোটবেলায় গল্প শুনতাম। হেস্টিংস নাকি নাচ শিখতেন... সেই নেচে বেড়ানোর আওয়াজ নাকি আশেপাশে শুনতে পাওয়া যেত। কিন্তু হেস্টিংস আদৌ নাচ শিখতেন কিনা, সে ব্যাপারে আমি তেমন কিছু জানিনা !

আলিপুরের হেস্টিংস হাউসেও নাকি রাত্রে অলৌকিক ব্যাপারস্যাপার ঘটে থাকে।এখন এটা ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির ওম্যান্স কলেজ! মানুষের বিশ্বাস স্বয়ং হেস্টিংস নাকি এখানে আসেন। একদা গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস বাড়িটি তৈরি করে এখানে থাকতেন। এখনও নাকি ঘোড়ার গাড়ি ছুটিয়ে আসতে দেখা যায় কোনো এক ইংরেজকে। অনেকে বলেন ওয়ারেন হেস্টিংসই নাকি ঘোড়ায় জড়ে আসেন। ঘরে ঢুকে শশব্যস্ত হয়ে বিরক্তি সহকারে ফাইলপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করেন। আবার এমনও দেখা যায় ঘোড়া হাঁকিয়ে চলে যান। একবার নিউ ইয়ারের মাঝরাতে হেস্টিংস হাউসে নিউ ইয়ার পার্টি চলে বলে শোনা যায়। একইভাবে ফুটবল খেলতে আসা এক শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়াও এখানে পাওয়া গেছে অপঘাতে মৃত্যুর লাশ। লাশগুলো ছিল কাটাছেঁড়া। আবার এ জায়গা নিয়ে এমন মিথও আছে যে, অশরীরী আত্মারা সবচেয়ে বেশি এখানেই ঘোরাঘুরি করে।

তখনকার ‘ক্যালকাটা’, ষোড়শ শতকের ব্রিটিশ শাসনকালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল| এখানকার শতাব্দীপ্রাচীন যত দেওয়াল আর কাঠামোগুলোর আড়ালে লম্বা লম্বা ইতিহাস লুকিয়ে আছে।কলকাতার চারপাশে এমন এমন জায়গা রয়েছে যা অস্বাভাবিক কথা বলে এবং যেখানে ছায়াময় অশরীরী ঘুরে বেড়ায়, এসব জায়গা ভয় খাওয়ানোর মতোই| এমনই একটি স্থান হলো ‘পুরোনো আকাশবাণী ভবন”,যা অলটাইম হন্টেড হাউসের তালিকায় থাকে।
কলকাতার নতুন ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও সেন্টার’ ময়দানে অবস্থিত| কিন্তু পুরোনো ‘আকাশবাণী ভবন’ ছিল গারস্টিন প্লেসে| রবি ঠাকুর 'আকাশবাণী' নাম দেওয়ার আগে নাম ছিল ' ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কম্পানি লিমিটেড।'

কলকাতার পুরনো ভুতুড়ে বাড়ির মধ্যে এক নম্বর গারস্টিন প্লেস এবং দ্বিতীয় এর প্রথম অফিস।এখনকার আকাশবাণী কিন্তু নয়! আকাশবাণীর পুরনো অফিস গারস্টিন প্লেসে বারবার  অশরীরী আত্মার দেখা মিলেছে। ফাঁকা লম্বা করিডর, অজস্র স্টুডিও আর ব্রিটিশ কাঠামো মিলিয়ে আকাশবাণীর ভুতুড়ে অ্যাটমোস্ফিয়ার আছেই। আকাশবাণীর প্রথম দফতর উঠে যাওয়ার পর গারস্টিন প্লেস ভোল বদলেছে। এক সময়ের জনপ্রিয় রেডিও স্টেশন ছিল এটি। কেউ কেউ এখানে  হ্যাট-কোট পরা , সিগারেট মুখে ইংরেজ সাহেবদের ছায়া দেখেন যাঁরা মাঝে মধ্যেই ঘরে ঢুকতেন আর অভ্যেসবশত ফাইলপত্র নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতেন। আবার কেউ কেউ দেখেন মধ্যরাতে রেকর্ডিং রুমের বারান্দায় কে যেন গান শুনছেন।কারুর কারুর ধারণা হয়তো বেতারের আশ্চর্য বিজ্ঞান সে যুগের মনে জন্ম দিয়েছিল এসব ভুতুড়ে বিশ্বাসের। এখনো নানা স্টুডিও থেকেই রাতে ভেসে আসে যান্ত্রিক সুর। বলাই বাহুল্য, সেই যন্ত্রগুলো কোনো মানুষ বাজায় না!

এইরকমই একটি ঘটনার কথা শোনা যায় অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নিজের স্মৃতিচারণায় । সৌমিত্রবাবু তখন ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’র ঘোষক ছিলেন। একরাতে তিনি ওপরতলায় একটি ঘরে গানের ট্র্যাক বাজাচ্ছিলেন । তখনকার কালে, ট্র্যাক প্লেয়িংয়ের আগে, মাইক্রোফোনের ভলিউম কম ক’রে দেওয়া হতো, যার ফলে সামান্য গোলমালও মাইক্রোফোনে ধরা প’ড়ে যেতো। সৌমিত্রবাবু মাইক্রোফোনের ভলিউম কমানোর পর হঠাৎ লক্ষ্য করলেন একজন লোক ঘরের দরজায় ঠেলে ভিতরে ঢুকে আসার চেষ্টা করছে । লোকটির অকস্মাৎ এইরূপ আবির্ভাবে স্বাভাবিকভাবেই সৌমিত্রবাবু প্রথমটায় চমকে ওঠেন| পরক্ষণেই লোকটির ওপর অসম্ভব বিরক্তিও বোধ করেন।এইসময় সামান্য শব্দ মাইক্রোফোনে ধরা প’ড়ে যাবে এই আশঙ্কায় লোকটির ওপর একটি ক্রূদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন তিনি| ভালো ক’রে তাকিয়ে দেখেন লোকটি একজন গোরা সাহেব ।সৌমিত্রবাবুর মুখে হতাশা ও বিরক্তি দেখে সাহেবও আর না দাঁড়িয়ে হঠাৎই ওখান থেকে চলে যান| কিন্তু সৌমিত্রবাবু নিজের কৌতূহল- বিরক্তি চেপে রাখতে পারলেন না| সুযোগ বুঝে একফাঁকে নীচে রিসেপশনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,যে কাকে উপরতলায় তাঁর ঘরে পাঠানো হয়েছিল  । উত্তরে যা শুনলেন তাতে তিনি নিজেই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। “আমরা তো কাউকে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে দেখিনি দাদা, কাউকে এখান থেকে পাঠানোও হয় নি”। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেলো নিচের তলাটি ইংরেজ আমলে একজন ওয়াইন বিক্রেতার দখলে ছিল,... হয়তো সে সেই গোরা সাহেব যাকে সৌমিত্রবাবু দেখেছিলেন !

শুধু এই একটাই ঘটনা নয়, একবার সকালের গানের একটি অনুষ্ঠান চলাকালীন বিখ্যাত একজন ঘোষক হঠাৎ অনুভব করেন ঘরে অন্য কারুর অদৃশ্য উপস্থিতি !গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে তার, তিনি সঙ্গে-সঙ্গে বেরিয়ে রিসেপশনে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন ওই সময়ে ওই একই অনুভূতি এর আগেও অনেকেরই হয়েছে।

গারস্টিন প্লেসে আকাশবাণীর সাথে যুক্ত কম-বেশি অনেকেরই ভূত দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছিল! কেউ কেউ দেখতেন কোট-টুপি পরা সিগারেট মুখে কোনো এক সাহেব ভূতকে, যে যখন-তখন ঘরে ঢুকে ফাইলপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতো, মনে হতো এ যেন তার নিজের অফিস !অনেকে দেখেছে মধ্যরাতে রেকর্ডিং রুমের বাইরে আবছা আঁধারিতে ব’সে কেউ গান শুনছে !শুধু তাই নয়, অনেক রাতের দিকে বিভিন্ন স্টুডিওগুলি থেকে ভেসে আসতো সুরেলা যান্ত্রিক সুর| বলাই বাহুল্য, যন্ত্রগুলো কোনো মানুষ বাজাতো না শুনতে-শুনতে শিহরণ বয়ে যেত অনুষ্ঠান পরিবেশক বা পরিবেশিকাদের!  এই অশরীরীরা আজও হয়তো ইতিহাসের ভাঁজে আটকে আছে এই ভবনের মধ্যে…এদের কেউ গানের সমঝদার, কেউ গানপাগল…ঠিক যেমনট কয়েক শতক আগে তারা ছিল! এছাড়া করিডোর দিয়ে হঠাৎ বুট প’রে কারো হেঁটে যাবার শব্দ, প্রচন্ড গরমে হঠাৎ ঘরের মধ্যে বইতে থাকা ঠান্ডা ঝোড়ো হাওয়া, ঘরে চেয়ারটিতে কোনো গোরা সাহেবকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বসে থাকতে দেখা, কাজ করার সময় পিছন থেকে ঘাড়ের ওপর কারো ঝুঁকে থাকার অনুভূতি, ইত্যাদি আধিভৌতিক অনুভূতি তো নিত্যনৈমিত্তিক ছিল এখানকার কর্মীদের কাছে। কর্মীরা বলত এই ভবনে দুজন ভূত আছে, একজন বাঙালি আর অন্যজন ব্রিটিশ লালমুখো সাহেব! আকাশবাণী ভবনের শতাধিক গল্প বহু বিখ্যাত লোকের মুখে শোনা !

তবে যা রটেছে তার মধ্যে সব গল্পই যে সত্যি তা হয়তো নয়| কিন্তু শেষে অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে কোনো কর্মী একলা সন্ধ্যেবেলা বা রাত-বিরেতে কিংবা ভোররাতে কাজ করতে অস্বীকার করলো| তখন ম্যানেজমেন্ট অফিস স্থানান্তরিত করে ময়দানে নিয়ে আসেন।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় লিখেছেন -,"গারস্টিন প্লেসে আকাশবাণীর পুরনো বাড়িতে ভূতের কথা আমি অনেকের মুখেই শুনেছি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ও আমায় তাঁদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। দ্বিজেন তো এত ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন যে অজ্ঞান হয়ে যান।"

এই ভূতের ভয়ে  সন্ধেবেলা সে-বাড়ির ছাদ কেউ মাড়াতেন না। ও বাড়িতে নাকি সাহেব-ভূত আছে। ভূতে পিয়ানো বাজায়। পাশে একটা কবরখানা ছিল, ফলে ভূতের গল্পটা আড়েবহরে আরওই বেড়ে উঠেছিল।
হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকাশবাণী-র চাকরি ছেড়ে দেওয়ার একমাত্র কারণ ছিল এই সাহেব-ভূত!
এই ভূত নিয়ে মজার গল্পও আছে  ! 'মহিলামহল' এর কিংবদন্তি শিল্পী বেলা দে কে নিয়ে তাঁর এক সহকর্মী লিখেছেন -''বেলাদি কিন্তু দিব্যি ছাদে বসে অনেক সময় লেখালেখির কাজকর্মও সারতেন। ফাঁকা শান্ত জায়গা। বিশেষ কেউ যায় না। তাই বোধ হয় ভালই বাসতেন ছাদটা।

এমনই এক দিনে পিয়ানোর টুংটাং আওয়াজ শুনতে শুনতে উনি লিখছেন। নীচ থেকে নীলিমাদির তারস্বরে চিৎকার, ‘বেলা নেমে এসো। শুনছ না, ভূতে পিয়ানো বাজাচ্ছে!’

বেলাদি লেখা ছেড়ে হেলতে দুলতে উঠে দেখেন একটা কুকুর পিয়ানোর ওপর হেঁটেচলে বেড়াচ্ছে, তাতেই টুংটাং শব্দ। বেলাদিকে দেখে সে মাটিতে লাফিয়ে পড়ে কবরখানার দিকে পালিয়ে গেল।... এর পরও বেলাদির ছাদ-প্রীতি ছিল কি না, বলতে পারব না। কিন্তু ওটুকু ঘটনাও বা কম কী সে!''

পুরনো আকাশবাণীতে স্টুডিওর ঠিক পাশেই পুরনো সব রেকর্ড জমা করে রাখবার জন্য ছোট্ট একটা ঘর ছিল। একদিন দুই কর্মী গেছেন রেকর্ড আনতে । একজন রেকর্ড বাছছেন,অন্যজন তা গুছিয়ে রাখছেন। হঠাৎ  রেকর্ড বাড়িয়ে ধরার আগেই কে যেন সেটা কেড়ে নিল! দু'জনেই দেখলেন পাশে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন এক সাদা সাহেব। কেউ কিছু বোঝার আগেই তিনি মিলিয়ে যান! ওই ঘটনার পরেই নাকি প্রায়ই টের পাওয়া যেতে লাগল সাহেবের অস্তিত্ব। সন্ধ্যেবেলায় রেকর্ডরুমের আশেপাশেই !
ব্যাপারটা প্রথম ভাঙলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। ঐ 'সাহেব ভূতের' সঙ্গে নাকি অনেক বড় তারকার মোলাকাত আগেও হয়েছিল । বিকাশ রায়ের স্মৃতিচারণায় জানা যায় ভুতের কথা- '' আমাদের সঙ্গে এক অপূর্ব সহাবস্থান করেছিল এক সাহেবভূত । তার নাম গ্যারিসাহেব। সাহেবভূত কাউকে কিছু বলত না।বরং মাঝেমাঝে কাজের সময় আলমারি ধরে টানাটানি করলে বীরেনদা,মানে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র বকাবকি করতেন । ভূত ভয় পেয়ে চুপ করে যেত ।একবার শুধু একটা বেয়ারাকে পিছনের ঘোরানো সিঁড়িতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল। আমরা সাহেবের ওই সহযোগিতার জন্য খুব খুশি হয়েছিলাম।কারণ, ওই বেয়ারাটি ছিল ইউতিকারউল্লা সাহেবের খাস বেয়ারা।''
অনেকেই বলেছেন ,আকাশবাণী অফিসের পাশেই ছিল এক সিমেট্রি। সেখানকারই এক সঙ্গীতপ্রেমি সাহেব বেতর অফিসে আস্তানা গাড়েন। রাতের অফিসে অনেকেই শুনেছেন ভূত গ্যারিসাহেবের পিয়ানো বাজানোর শব্দ!
অল ইন্ডিয়া রেডিওতে চাকরি করার সময় এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল লীলা মজুমদারেরও । স্টুডিওয় অ্যানাউন্সারের চাকরি নিয়ে এসেছিলেন এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়ে। রাতে তিনি একবার ঘোষণা করার ঘরে যতবার ঢুকতে যাচ্ছিলেন,ততবারই তিনি দেখছেন,কেউ একজন পায়চারি করছেন,কিন্তু কোনো কাজ করছেন না! খোঁজ নিয়ে ভদ্রমহিলা জানলেন ওটা একটা সাহেবভূত ,সেই যে তিনি পালালেন,আর এলেনই না! মাসমাইনে নিতেও নয়!
 বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র জানিয়েছিলন , যদিও তিনি কখনও ভূত দেখেননি,তবে অনেকটা দেখার মতোই। তিনি বলতেন যে,এই ভূত কারও ক্ষতি করার বান্দা নয়। ভূতের সাংস্কৃতিক বোধের প্রশংসাও করেছিলেন তিনি। বীরেন্দ্রকৃষ্ণর সঙ্গে বেশ বোঝাপড়া হয়ে গিয়েছিল সাহেব ভুতের।
অবিশ্বাসীদের মতে, আকাশবাণীর কোনো এক বড়কর্তা সন্ধের পর নিজের বিনোদনের জন্য ওই রেকর্ডরুমকে ব্যবহার করতেন ! তাঁকে যাতে কেউ বিরক্ত করতে না পারে,সেজন্য নাকি তিনিই ভূতের গুজব ছড়িয়েছিলেন!

তবে রাত্রের এসপ্ল্যানেড সত্যিই প্রচন্ড ফাঁকা একটা জায়গা। আমি ইচ্ছে করেই বহুবার চেঁচিয়ে গাইতে গাইতে অনেকবার গেছি,কেউ ফিরেও তাকায়নি । সেই গান ভূতেদের পছন্দ হওয়ারই কথা! কারণ তেনারা বেতালা গানই পছন্দ করেন কিনা! সেই বেতালা গান শুনে তো উপেন্দ্রকিশোরের দুই চরিত্র গুপী আর কানাই ভূতের বর অবধি পেয়ে গেছিল।
অন্ধকারে আপনি যত বড়ো ব্যপ্তির জায়গায় থাকবেন,ততই নেশায় জড়াবেন ! আর ত্রৈলোক্যনাথ তো বলেইছেন জল জমে যেমন বরফ হয়, অন্ধকার জমেও নাকি ভুত তৈরি হয়!
আমার এক পরিচিত ভদ্রলোক বলেছিলেন যুবা বয়সে রাত্রে এসপ্ল্যানেড এর রাস্তায় চলতে চলতে তাঁর একবার চটি ছিড়ে গেছিল! বেকায়দায় পড়ে তিনি সামনে এক মুচি দেখতে পেয়ে সমস্যার কথা সেই বলতে যাবেন, মুচি ভ্যানিশ ! প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেছিলেন তিনি ! পরে জানা যায় সত্যিই এক মুচির ওখানেই নাকি আস্তানা ছিল ! সে মারা গেছে !

আসলে রাত্রে ওই এলাকায় গেলেই একটা অদ্ভুত হ্যালুসিনেশন আপনিই এসেই যায়। অসম্ভব মনখারাপ হতে থাকে - কারণ ছাড়াই! ডানদিকেই কার্জন পার্ক !রাইটার্স বিল্ডিং ও নাকি হানাবাড়ি !রাতে এখানেই ফাঁকা লবিতে কি সব নাকি হয়। সন্ধ্যার পর কেউই এই বাড়িটিতে থাকার সাহস দেখান না। যারা রাত কাটিয়েছেন, তাদের অনেকেই মাঝরাতে হঠাৎ কান্না, হাসি কিংবা চিৎকারের শব্দ শুনতে পেয়েছেন। নাইট গার্ডরা বলেন এখানের পাঁচ নম্বর ব্লক জায়গাটা নাকি সুবিধের নয়। বারান্দা দিয়ে কারা যেন হেটে বেড়ায়। শোনা যায় টাইপের শব্দ। মনে হয় খুব মনোযোগ দিয়ে কারা যেন কাজ করছেন। দোতলায়র সিড়িতে কারা যেন ভেসে উঠেই মিলিয়ে যায়। হঠাৎ করে কে যেন চিৎকার করে ওঠে।এখানেই এক সময় ছিল ভাং আর কলা গাছের জঙ্গল। একবার বেশ কয়েকজন ব্রিটিশকে এখানে কবর দেয়া হয়ছিল। লর্ড ভ্যালেন্টিনের লেখায় তথ্য মেলে দিল্লি থেকে আসা নব্য রাইটারদের মধ্যে ঘোড়ায় টানা গাড়ির খেলা কিংবা ডুয়েল চলতো। এতে করে সর্বদাই লেগে থাকতো খুন জখম।

আর ঐ অন্ধকার রাত্রে হাড় জিরজিরে ঘোড়া নিয়ে তার মালিককে যেতে দেখলেই আরেকটা শোনা কথা মনে পড়ে ! ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাব খ্যাত রেসকোর্স ময়দান রেসের সময়ে জমজমাট থাকে। যত সমস্যা নাকি সেখানে রাতে। কে বা কারা যেন ঘোড়া হাঁকিয়ে ছুটে বেড়ায় এখানে। স্পষ্ট দেখতে পাওয়া ঘোড়া পলকেই বাতাসে উবে যায়। শোনা যায় রয়্যাল পরিবারের ব্রিটিশরা এখানে ঘোড়া চালাতেন। একবার জর্জ উইলিয়ামস নামে এক ব্রিটিশ তাঁর বিখ্যাত সাদা ঘোড়া নিয়ে ময়দান চষে বেড়াতেন। সৃই দুর্দান্ত সাদা ঘোড়াটর নাম ছিল প্রাইড। প্রচুর রেস আর ট্রফি জেতার সুবাদে প্রাইডকে তখনকার সময় এক নামেই চিনত। উইলিয়ামস তাঁর ঘোড়াকে নিজের প্রাণের চাইতেও বেশি ভালোবাসতেন। কিন্তু একবার অ্যানুয়াল ট্রফি টুর্নামেন্টের আগে আচমকা প্রাইড অসুস্থ হয়ে পড়ে। উইলিয়ামস প্রাইডের প্রচুর যত্নআত্তি করলেও কোনো লাভ হয়নি। তিনি অ্যানুয়াল ট্রফি হেরে যান। এরপরই একদিন সকালে জর্জ দেখে, খোলা ট্রাকের ওপরে মরে পড়ে আছে তার প্রিয় সাদা ঘোড়াটি। প্রাইডের শোক আর মায়ায় জর্জও বেশিদিন পৃথিবীতে ছিলেন না। কিন্তু এখনো নাকি প্রত্যেক শনিবার পূর্ণিমার রাতে দেখা যায় জর্জ ও প্রাইডকে। রেসকোর্সজুড়ে সে বীরবিক্রমে পরিক্রম করে। প্রাইড এখনো জীবিত রেসকোর্স ময়দানে, এমনকি কলকাতাবাসী তাকে উইলিয়াম সাহেবের সাদা ঘোড়া হিসেবেই চেনে।

আকাশবানীর নতুন অফিসে ভৌতিক কর্মকান্ড নেই! একবার প্রোগ্রাম সেরে রাত দুটোয় আমি টয়লেটে ঢুকতেই পাশের জানলা দিয়ে অপ্রকৃতিস্থ একজন উঁকি মেরেছিল!
তবে সে মানুষই!

নচিকেতার বিখ্যাত 'পাগলা জগাই' গানটা যাঁরা শুনেছেন...তাতে একটা লাইন আছে - ' মিশকালো রাত আর পিচকালো রাস্তাকে পিষে দিয়ে ছুটে চলে ট্রাক।'
একদম এসপ্ল্যানেডের রাস্তার ছবি । শুধু হুহু করে গাড়ি আর গাড়ি ! আর অতটা রাস্তা হাঁটলে বিশ্বাস করুন অসম্ভব হাল্কা লাগে ,প্রবাসে থাকার দুঃখ,প্রেমে ব্যর্থতা,জীবনের মানে না পাওয়া--যাবতীয় খামতি আর সামনে কিছু প্রাপ্তিযোগ ঘটতে পারে  এরকম সব ভাবনা মিশে মিশে যায় ! অসম্ভব মুক্ত মনে হয় ! একইসঙ্গে দায়িত্ব নেওয়ার চিন্তা আর দায়িত্ব থেকে মুক্তির ফিলিংস আসে ! যত বেশি পথ,তত বেশি ঘেঁটে যাওয়া !

আমি চাই প্রোগাম চলাকালীন একদিন বীরেনবাবুর ভূত আমার উপরে চাপুক ! একটা দিনের প্রোগ্রাম অন্তত শ্রেষ্ঠ হবে !

আর বাইরে থেকে আকাশবাণীর অফিসে যেকোনোদিন যে কারুর আত্মা ঢুকে পড়তে পারে । ঐরকম গাড়িঘোড়ার ডেঞ্জারাস রাস্তা... প্রাণ হাতে করে পেরোতে হয়... সেরাস্তা পেরোতে গিয়ে যেকোনোদিন কারুর বডি পড়ে যেতে পারে ! বডি রাস্তায় কিন্তু আত্মা রুটিনমাফিক অফিসে ....
এসপ্ল্যানেডের রাস্তায় যাঁরা চলাচল করেন ,তাঁরা বুঝবেন !



লিখছেন : অন্বয় গুপ্ত

0 comments: