Friday, September 21, 2018

গল্প : অন্যস্রোত

অন্যস্রোত 

গল্প : অন্যস্রোত 


নতুন বিয়ে হয়ে আসা বাচ্চা মেয়েটা,বিছানায় এক অপরিচিত লোকের আদর খেতে খেতে কঁকিয়ে ওঠে , 'ছেড়ে দাও আমায়'।  কখনো বা কেঁদে ফেলে। বলে, 'আমি বাড়ি যাবো।  নিজের বাড়ি।' অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে  লোকটা। বলে,  'এখন থেকে এটাই তোমার নিজের বাড়ি, বুঝলে?'  নাহ্ , কথাগুলো আদর মাখানো নয়। 
   মেয়েটা কিছুতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে না ওই পরিবেশে। না,শ্বশুরবাড়ির নিত্য নতুন অত্যাচারের বিরুদ্ধে তার কোনো অভিযোগ নেই। সেসব তো মেয়েদের সহ্য করতেই হয়, তার মা-ও করেছে। তবে, ওই লোকটাকে কোনো মতেই বরদাস্ত করা যায় না। সারাক্ষণ অধিকার ফলানোর চেষ্টা, চমকে ওঠা হুংকার.... কই, বাবা তো কক্ষনো এমনটা করতো না?  
সন্ধ্যে নামলেই ভয়ে কুঁকড়ে যেত মেয়েটা। একটু পরেই যে 'সে ' বাড়ি ফিরবে!  তারপর............ তারপর সারাটা রাত তাকে কাটাতে হবে ওই লোকটার সাথে। ওর কষ্ট হবে। ছুঁড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে করবে লোকটাকে। পারবে না। ওই দানবের তুলনায় তার দৈহিক শক্তি যে নগন্য!  লোকটা পৈশাচিক উল্লাসে মেতে উঠবে। 
মেয়েটা মাঝে মাঝেই ভাবে,রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যাবে। একছুটে চলে যাবে মায়ের কাছে। মনে পড়ে যায় ,সদ্য বিধবা হয়ে বাপের বাড়িতে আশ্রয় খুঁজতে আসা দিদিকে ,বলা মায়ের কড়া কথাগুলো। 
মেয়েটা পালিয়ে যায়। পালিয়ে যায় সেই পথ ধরে, যে পথে পা রাখলে,আর কোনো মেয়েকে সমাজে ঠাঁই দেওয়া হয় না। 
এ পথে নেমে, মেয়েটা প্রথমবার 'স্বাধীনতা' চেখে দেখে। মন্দ না! 
প্রতিদিন কতো বয়সের,কতো মানসিকতার লোক আসে তার কাছে। কেউ আসে শরীরের ক্ষিদে মেটাতে, কেউ আসে শুধুমাত্র নগ্ন নারী-শরীরের গঠন দেখতে, কেউ বা কাছে টেনে নেয় বুকের মধ্যে জমিয়ে রাখা কষ্টটা ভাগ করে নিতে, একে -অপরের মনের কথা শুনতে বা শোনাতে। 
    বাড়ি ফিরে স্নান করলেই তার মনে হয়,সমস্ত পাপ শরীর বেয়ে ধুয়ে গেল । 
এই 'অপবিত্র' মেয়েটাকেই ভালোবাসতে শুরু করল একজন। হ্যাঁ, খদ্দের-ই বটে!  
সদ্য যৌবনে পা রাখা মেয়েটারও আবেগে ভেসে যেতে বেশি  সময় লাগেনি। 
একদিন, ওই ছন্নছাড়া ছেলেটার সাথেই বিয়ে হয় তার। ঘটা করে অবশ্য না, ছেলের সাতকূলে যে কেউ কোত্থাও নেই!  
দুজনে মিলে ছোট্টো একটা সংসার সাজায়। ঠিক যেন, খেলনাবাটির মতো। ছোট্টো,তবে পরিপাটি করে গোছানো। 
ছেলেটা সারাদিন কাজ খুঁজে বেড়ায়, আর তারপর সন্ধ্যে নামলে  বাড়ি ফিরে আসে। মেয়েটা কাজ সেরে বাড়ি আসে মাঝরাতে। ছেলেটা সারাটা সন্ধ্যে  পরিশ্রমের ফসলগুলো একে একে হাজির করে  স্ত্রী-র মুখের সামনে। বেশিরভাগ দিনই হয়তো ক্ষিদে থাকেনা, তবুও স্বমীর হাতের পড়া সদ্য ফোস্কা আর ঘামে ভিজে থাকা জামাটার দিকে তাকিয়ে, খেয়ে নেয়। 
তারপর দুজনে ক্লান্ত দেহগুলো বিছানায় এলিয়ে দেয়। নাহ্, ছেলেটা আর আগের মতো শরীর দেখতে ব্যস্ত হয়না। সে জানে,এই শরীরটার ওপর অনেকের অধিকার রয়েছে। তাই সে, স্নেহে চোবানো আঙুলগুলো দিয়ে মেয়েটার চুলে বিলি কাটতে থাকে, যতক্ষণ না পর্যন্ত তার চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে....

লিখছেনআরাত্রিকা চক্রবর্তী

0 comments: