Saturday, September 22, 2018

গল্প : চোখেরভুল না সত্যি

চোখেরভুল না সত্যি

চোখেরভুল না সত্যি



অফিস থেকে বেরোতে বেরোতে একটু রাত হয়ে গেল। যখন বাইক স্টার্ট দিলাম ঘড়ি উল্টে দেখলাম রাত এগারোটা। ইসস! এতো দেরী হয়ে গেল আজ। ইচ্ছে করছিল বসের মাথাটা গুঁড়িয়ে দিই। এখন হাই রোড ধরে চল্লিশ মিনিট ড্রাইভিং। তার উপর কুয়াশা। দু হাত দূরের জিনিষ দেখা যাচ্ছে না।  বাইক চালালাম। উইন্ডচীটারের মধ্যে দিয়ে হাওয়া  ঢুকছে, ঠান্ডা লাগছে খুব।

হাই রোডে উঠলাম পাঁচ মিনিট পরে। লাইটের আলোয় দু হাত দূরের জিনিষ স্পষ্ট নয়। গাড়ির লাইট গুলো যেন মোমবাতির আলো। এগোচ্ছি কিন্তু তেমন জোরে চালাতে পারছি না, সাবধানে এগোতে থাকলাম। কিছুক্ষণ এগোনোর পর হঠাৎ দেখি এক জন হাত দেখাচ্ছে। এতো রাতে হাই রোডে কে? ভয় লাগল একটু। কাছে গিয়ে দেখি একজন মহিলা এবং আর একজন বৃদ্ধ একটু দূরে  দাঁড়িয়ে। এতো রাতে এরা কি করছে এখানে? দাঁড়ালাম। দেখলাম একটু দূরে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে, এমারজেন্সি লাইট জ্বলছে। ড্রাইভার সিটে বসে কিছু করছে। 

মহিলা বললেন , "গাড়িটা স্টার্ট নিচ্ছে না। কি বিপদ বলুন তো? যদি সামনে কোনো মেকানিক পান, পাঠাবেন একটু? তাহলে খুব উপকার হয়।  

এত রাতে মেকানিক কোথায় পাবেন ম্যাডাম - আমি বললাম।

দেখুন না আপনি তো ওদিকেই যাচ্ছেন। যদি পাঠাতে পারেন তাহলে খুব উপকার হয়,"। স্বরটার মধ্যে এমন কিছু ছিল -- আমি বললাম , আচ্ছা দেখছি। 

বাইক চালিয়ে কিছুক্ষণ চলার পরেই দেখি 
সর্দারের দোকান খোলা। বললাম সর্দার জী। থোরা দূর মে একঠো কার স্টার্ট নহি লে রহা হ্যায়। থোরা চলিয়ে  না মেরে সাথ। 

সর্দার বলল- ইতনা রাত গয়ে, সাবজি!  কিতনা দূর হ্যায়?

পাস মে হি হ্যায়। 

সর্দার নিজের জিনিষ পত্র গুছিয়ে নিয়ে আমার বাইকে বসল। মদের গন্ধ পেলাম। সর্দারের মৌতাতে বাদ সাধলাম। এই ভেবে কষ্ট পেলাম। আবার কারুর উপকারে আসতে পারব ভেবে, মনে মনে গর্ব বোধ হতে লাগল। 

ঘন কুয়াশা। দশ মিনিটে সাবধানে বাইক চালিয়ে  পৌছে গেলাম জায়গাটায়।  বাইক থামালাম জায়গাটাতে গিয়ে। 

সর্দার জি বলল- কহা হ্যায় গাড়ি সাবজি?

আমি অবাক হয়ে দেখলাম, কোথায় গাড়ি, কোথায় ভদ্রমহিলা বা বৃদ্ধ। চারিদিকে কুয়াশা আর  ঠান্ডা হাওয়া।শুনসান এলাকা। মাঝে মধ্যে দু একটা গাড়ি পাস করছে। 

 "সর্দারজি ! ইহা পর ই তো থা!" বিস্ময়ে বলি।

সর্দারজি কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর  বলে উঠল  - বাবু সমঝ গয়ে হাম। চলিয়ে গাড়ি ঘুমাইয়ে। 

গাড়ি ঘোরালাম কিন্তু গাড়িটা কোথায় গেলো। ভুল দেখলাম কি আমি?

সর্দার জি  ফেরার পথে আমাকে বলল, "আজ থেকে তিন বছর আগে এরকমই এক কুয়াশা মুখর রাতে, ওখানে একটা রোড অ্যাকসিডেন্ট হয় এবং  ঐ অ্যাকসিডেন্টে এক মহিলা, বৃদ্ধ আর ড্রাইভারের স্পট ডেড হয়ে যায়। 

লোকমুখে শোনা যায়  প্রতি বছর শীতের রাতে 
ঐ  জায়গাতে অনেকেই ওদের দেখেছে"। 

সর্দার জি বললেন- "আজ আপনে উনকো দেখ লিয়া বাবুজি! 

আমার সারা গায়ে কাঁটা দিতে লাগল। বাইক থেকে বোধহয় পরেই যাবো। কোনোমতে বাইক চালিয়ে এগোতে থাকলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই সর্দারজির দোকানের সামনে পৌছে গেলাম। বাইক নিউট্রালে এনে সর্দারজিকে বললাম, " উতরিয়ে সর্দারজি"।
কোনো শব্দ না পেয়ে পেছনের সিটে হাত দিলাম সর্দারজি কোথায়? গাড়ি থেকে কোনোমতে নেমে সাইড স্ট্যান্ড করে দেখি, সর্দারজি কোথাও নেই। কোথায় গেল লোকটা। দোকানে টিম টিম আলো জ্বলছে। সর্দার জি! সর্দার জি বলতে বলতে দোকানের দিকে এগিয়ে দরজা ঠেলি। ভেতর থেকে আওয়াজ আসে- কোন হ্যায়?

অবাক চোখে দেখি ভেতরে একটা লোহার চেয়ারে সর্দারজি বসে আছেন। আপ কব উতর গয়া বাইক সে? পতা নহি লগা।

সর্দারজি অবাক করে বলেন - কোন সা বাইক ভাইসাব! 

শীতের ঐ রাতে আমি ঘামতে থাকি।

সাহসে ভর করে বলি- মেরে বাইক মে, গাড়ি সারাতে আমরা গেলাম যে, একটু আগেই। সর্দারজি, মজাক মত কিজিয়ে প্লিস। 

সর্দার বলে-  মজাক নহি ভাইসাহাব। সচ্। ম্যায় নহি গয়া, কহিভি আজ। 

তাহলে আমার সাথে এই দোকান থেকে এক সর্দারজি গেল, সে কে? ভাবতে থাকি মনে মনে।

 ঠিক তখনই - "বাচ্চা! ইধর আনা",  এই বলে ডাক দিল সর্দারজি। তখনই একটা ছেলে ভেতর থেকে আসে। 

"বাবুকে জল দে একটু"। সর্দারজি বলেন ওকে।

 "বাবু বসো এখানে। জল খাও"। 

ভয়ে ভয়ে জল খাই।
 সর্দারজি বলেন- বাবু কেয়া হুআ? কহা সে আ রহে আপ। সর্দারকে সব খুলে বলতেই সর্দারজি কেমন যেন চুপ মেরে গেল একটু।

আমার গা ঠান্ডা হতে থাকল। হাত পা অবশ হতে থাকল ।

সর্দারজি গম্ভীর ভাবে বলে আইয়ে অন্দর মেরে সাথ, সর্দারের পেছন পেছন মন্ত্রমুগ্ধের মতো  ঘরের ভেতর গেলাম, সর্দারজি দেওয়ালে টাঙানো বড় একটা পোট্রেট দেখিয়ে বলে- "দেখো তো বাবু, কেয়া ইয়ে গয়া থা আপকা সাথ"। 

ফটোর দিকে তাকাতেই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। হ্যাঁ একদম সর্দারজির মতন দেখতে এক ভদ্রলোক একটু মোটা আর চোখে সাদা ফ্রেমের  পাওয়ারের চশমা।  

ভয়ে, বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করি- কৌন হ্যায় ইয়ে? 

মেরে পিতাজি ইনসেহি ই মিলে থে আপ। পিছলে সাল রাতকো আপ জহা গয়ে থে, ওহি মিলা থা, ইনকা লাশ। আঁখে পুরা বাহার থা। কিসিনে গলা দাবায়া হোগা বহুত জোরসে, অ্যায়সা লাগ রহা থা।  গাড়ি ঠিক করনে গেয়া থা এক আজনবি কে সাত।   দোনোকা লাশ উহা মিলা থা।  

আর শুনতে পারি নি। সম্ভবত জ্ঞান হারাই।    
সে রাত্রিতে আর বাড়ি ফেরা হয় না। সকালে গায়ে ধুম জ্বর নিয়ে চোখ খুলি দেখি সর্দার জি আর আমার গিন্নি। সকালেই চলে এসেছে ও। কাল রাতে ফোন করেছিল ও, সর্দারজি বলেছিল আমি ওখানে আছি। তাই নিতে এসেছে। কোনোমতে  বাড়ি ফিরি দুজনে । তারপর এক সপ্তাহ অফিস যেতে পারিনি।  এক সপ্তাহ পর অফিস জয়েন করি। 

রাতের দিকে আর হাই রোড দিয়ে ফিরিনা, এখনো মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করি, যা যা ঘটেছিল   সবটাই কি চোখেরই ভুল.....



লিখছেন  : সুশান্তকুমারসাঁতরা

0 comments: