Tuesday, September 25, 2018

গল্প : সহোদরা

সহোদরা        


গল্প : সহোদরা    


এই বত্রিশ বছরের জীবনে দ্বিতীয়বার বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চলেছে সুজাতা। সৌরভ মারা যাওয়ার পর,এই দুবছরে অনেক কিছু ঘটে গেছে। রাগ, ডিপ্রেশন,মেন্টাল কাউন্সিলিং,তারপর নতুন করে আবার পুরোনো বন্ধুর প্রেমে পড়া, বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া,অনেক কিছু....
সুজাতার একটা চার বছরের ছেলে আছে জেনেও, অংশু বিয়ের প্রস্তাব দেয়। সুজাতারও আপত্তি ছিল না।
অংশুর মা প্রথমে একটু 'না-না' করলেও,সুজাতার চার বছরের ছেলের মিষ্টি মুখটা দেখে, নিজের অজান্তেই মত দিয়ে বসে!
বিয়ের পরে পরেই ওরা নিজেদের ফ্ল্যাটে চলে যায়। যদিও চাকরির জন্য অংশুকে বছরের বেশিরভাগটা বিদেশেই থাকতে হয় বলে, সুজাতা ছেলেকে নিয়ে একাই ওই ফ্ল্যাটে থাকে।
মায়ে-ছায়ে বেশ কাটছিল দিনগুলো।
দুবছর পর যখন,সুজাতা আর অংশুর একটা ফুটফুটে মেয়ে হল, সমস্যাটা তখন থেকে শুরু হল। ছ'বছরের ছেলের মনে হিংসা ঢুকল। কেউ আর তাকে পাত্তা দেয়না। সব্বার মনযোগের কেন্দ্র ওই মেয়েটা।
বাচ্চাদুটো বড়ো হওয়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে সমস্যাটাও বাড়তে থাকল। অংশু তো বাড়িতে থাকে না, সব ঝামেলা সইতে হয় সুজাতাকে।
কোনোদিন ছেলে বাচ্চা মেয়েটার চুল ছিঁড়ে দিচ্ছে,কোনোদিন মায়ের অনুপস্থিতিতে মেয়েটার নরম গালে ঠাস ঠাস করে চড় মারছে ,কখনো মেয়েটাকে তুলে গ্রীষ্মের চড়া রোদে বসিয়ে দিয়ে আসছে......
সুজাতা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ছোটো বলে, অত্যাচারগুলোকে মজার ছলে উড়িয়ে দিলেও,দিন দিন বিষয়গুলো কেমন যেন গম্ভীর হয়ে যাচ্ছিল।
ছেলের বয়স তখন ষোলো কি সাতেরো, যথেষ্টই বড়ো!  এখন সে অনেককিছু বোঝে। এটাও বোঝে যে, বাড়িটা ওই বাজে মেয়েটার বাবার, অর্থাৎ তাতে তার বিন্দুমাত্র অধিকার নেই। এসব ভাবতে ভাবতে হয়তো, মেয়েটার সারা রাত জেগে করা হোমওয়ার্কের খাতাটা কুচি-কুচি করে ছিঁড়ে ফেলে বা নতুন কেনা টপগুলো ব্লেড দিয়ে কেটে দেয়।
মেয়েটা কিন্তু কোনো প্রতিবাদ করে না। মনে মনে প্রচণ্ড রাগ হলেও মুখে সে কিচ্ছুটি বলতে পারে না। ছেলেটাকে যে বড্ড ভয় পায়!
সন্ধ্যোবেলায়,বারান্দায় ক্রিকেট ব্যাটটা রাখার শব্দ পেলেই, মেয়েটা মায়ের আঁচল খোঁজে মুখ গোঁজার জন্য।
সুজাতা মাঝে মাঝে ভাবে,ছেলেটাকে হস্টেলে দিয়ে আসি গে, সব জ্বালা চুকে যাবে! পরক্ষনেই আবার মনে হয়, ছেলেটা কি ভাববে? ওর বাবা নেই বলে, ওকে পর করে দেওয়া হল! ওর মনে আঘাত লাগবে, প্রভাব পড়বে।
অনেকবার বোঝাতে চেয়েছে ছেলেকে, ওটা তো তোরই বোন রে, ওকে তো তুই-ই আগলে রাখবি, শাষন করবি।
ছেলে একগুঁয়ে, বলে 'ওটা লোকের মেয়ে। তুমি-ই বরং আগলে রাখো।'
অংশুকে কিছু বলাও যায় না,একেই বাড়ি ছেড়ে লোকটা বিদেশে পড়ে আছে, তার ওপর এসব চিন্তা দিয়ে আর ব্যস্ত করে লাভ কি!

ঐশী এখন কলেজে পড়ে। ফার্স্ট ইয়ার।
আর সপ্তর্ষি চাকরি খুঁজে চলেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে অন্য বাড়িতে যেতে চায়। লোকের বাড়িতে বসে, লোকের টাকায় খেতে, তার আত্মসম্মানে লাগে।
সেদিন ঐশীর ফার্স্ট ইয়ারের শেষ ফাইনাল পরীক্ষা। অন্যদিন হলে, সুজাতা নিজেই ঐশীকে কলেজ থেকে নিয়ে আসত কিন্তু আজ আর শরীরটা সায় দিচ্ছে না। অগত্যা ছেলের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
সপ্তর্ষি তখন ল্যাপটপে হার্ড মিউজিক শুনছে, মা'র ডাকে একটু বিরক্তই হলো বইকি। তারপর আবার যখন শুনলো ওই মেয়েটাকে কলেজ থেকে আনতে যেতে হবে, না শোনার ভান করে, হেডফোনটা আবার কানে দিল।
অনেক জোরাজুরির পরও ছেলেকে  রাজি না করাতে পেরে, শেষমেষ মোক্ষম অস্ত্র প্রয়োগ,
'তবে মায়ের মরা মুখ দেখিস!'
সপ্তর্ষি 80 km/hr বেগে গাড়ি চালাচ্ছে আর ঐশী চোখ বন্ধ করে, ব্যাগটাকে জাপটে ধরে বসে আছে।
হঠাৎ সপ্তর্ষির মথায় এলো, 'আচ্ছা, মেয়েটাকে যদি ফেলে দি? কি মজা হবে! সবাই ওকে দেখে হাসবে!'
জোরে ব্রেক কষে সপ্তর্ষি। আর মেয়েটা টাল সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে যায়।
সপ্তর্ষির জামাটা ধরে থাকলে হয়তো পড়তো না, কিন্তু বড়ো হওয়ার পর,কোনোদিনও কথা পর্যন্ত না বলা ছেলেটাকে ছোঁয়ার সাহস হয়নি।
 সপ্তর্ষি যা ভেবেছিল তার চেয়ে একটু বেশি কিছুই যেন ঘটে গেল। ঐশীর মাথাটা ফেটে যাওয়ার সাথে সাথে, পায়ে-হাতেও বেশ ভালো রকমের চোট লেগেছে। আশেপাশের লোকেরা ছুটে এসে, মেয়েটাকে যখন হাসপাতালে ভর্তি করার তোড়জোড় করছে, সপ্তর্ষি তখনও 'হাঁ' করে চারদিকে তাকিয়ে দেখছে, 'কোত্থেকে কি হয়ে গেল!'
একটু পরে নিজেই ফোন করে মাকে খবর দিল।
সেইদিনই রাতের দিকে সুজাতা ডক্টরের সঙ্গে কথা বলে,ঐশীকে বাড়ি নিয়ে এলো, সাথে অবশ্য সপ্তর্ষিও ছিল, হয়তো ঐশীর জন্য না, মায়ের জন্য। ঐশী সারাক্ষণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলেছে। পরীক্ষার পর কত্তকিছু প্ল্যান ছিল, সব নষ্ট হয়ে গেল!
আর সপ্তর্ষি বাড়ি এসে থেকে, দরজা বন্ধ করে,ফোনে মুখ গুঁজে বসে আছে।
হাসপাতাল থেকে ঐশীকে বাড়ি নিয়ে আসার সময় একবার মাত্র জিজ্ঞেস করেছিল, 'এখন কেমন আছো-ছিস, মানে আছিস? '
ঐশী এক মুহূর্তের জন্য কান্না থামিয়ে বলেছিল, 'তোমার গাড়িটা পচা '
তারপর আর কথা হয়নি।

সকালে উঠে ফেসবুক স্ক্রল করতে সপ্তর্ষি দেখে, সবাই ভাই-বোনকে জড়িয়ে ধরে ছবি দিচ্ছে, ডাউনলোড করা ভাই-বোন কবিতাগুলোয় সবাইকে ট্যাগ করছে, আরো কত কি...
আজ যে রাখী!
'যত্ত সব আদিখ্যেতা!' রেগে গিয়ে ফেসবুকটা লগ-আউট করে দেয় সপ্তর্ষি।
অন্যসময় হলে এসব জিনসকে জাস্ট কোনো পাত্তা দিত না। কিন্তু , কালকের ওই ঠোঁট ফুলিয়ে সাধের বাইকটাকে পচা বলা মেয়েটার মুখটা মন থেকে কোনোমতেই সরাতে পারছে না।
একরাশ অপরাধবোধ এসে ভিড় করল ওর চারপাশে,একটু একটু করে সারাটা ঘর যেন ভরে যেতে লাগল রাগে, ঘেন্নায়। দম বন্ধ লাগলে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো সপ্তর্ষি।
ঠিক আগের দিনের স্পিডটায়, বাইকে করে, বাজার থেকে একটা রাখী কিনে আনলো।
তারপর বলা নেই কওয়া নেই, এক্কেবারে সোজা ঐশীর ঘরে ।
ঐশী বোধহয় তখনও ঘুমোচ্ছিল, দরজায় জোরে শব্দ হওয়ায়, খানিকটা ভয় পেয়েই উঠে পড়ে!
সপ্তর্ষি রাখীটা ঐশীর কোলে ছুঁড়ে  দিয়ে বলে, 'অ্যাই , নেহ্ বেঁধে দে '
ঐশী অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে সম্পূর্ণ অপরিচিত এই ছেলেটার দিকে।
'ওই শোন, নিজের টাকা খরচ করে কিনেছি বুঝলি! নে, বেঁধে দে। '
সপ্ন না সত্যি বিচার না করেই, ঐশী রাখীটা সযত্নে, সপ্তর্ষির হাতে বেঁধে দেয়।
চোখ ভর্তি টলমল জল নিয়ে বলে, 'আর কুহেলিকে যে ওর দাদাভাই, রাখী বাঁধার পর গিফ্ট দেয়! '

' গিফ্ট!? আচ্ছা,তবে আজ থেকে এই ভালো ছেলেটাকে, 'দাদাভাই' বলার অনুমতি
দিলাম।পছন্দ তো 'পেঁচি'? '

এবারের ঝগড়াটা বোধহয় একটু অন্যরকম.....


© Aratrika Chakraborty

** সহোদরা গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো তা অবশ্যই নিচের কমেন্ট সেকশন এ জানান | পেন-ড্রাইভ এ লেখা পাঠাতে হলে আমাদের মেইল করুন : pendrivehub1@gmail.com

0 comments: