Friday, September 21, 2018

কন্যাদায়

কন্যাদায়      

        


অচেনা বস্তির ছোট্টো ঘরটাতে আজ সাজ-সাজ রব।কোনো এক নামহীন খেতমজুরের বড় মেয়েকে,পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। ঘরের বাকি ছয় কি সাতটা ভাইবোনও,সাধ্যের সবচেয়ে দামি জামাগুলো পরে তৈরি। যাকে দেখতে আসা হচ্ছে,তার শ্যামবর্ণ মুখের ওপর ক্রমাগত পাউডারের প্রলেপ লাগানো হচ্ছে।ঠিক যেমন,জিনিসপত্র বিক্রির আগে দোকানি সব ধুলো-টুলো ঝেড়ে রাখেন! 
পাত্রপক্ষ এলো নির্ধারিত সময়ের ঘন্টা তিনেক পর। ততক্ষনে মেয়ে ঘেমে-নেয়ে একশা!  মুখের ওপরের সাদা, কৃত্রিম স্তরটা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে শ্যামবর্ণ মায়াবী মুখটা।মেয়ের বাবা কেতাত্থ বদনে,আধভাঙা তেল,নুনের কৌটোগুলো সরিয়ে ঘুপচি ঘরটার এককোণে বসার জায়গা করে দিল প্রায় এক-কুড়ি লোকের।
ধারের টাকায় কেনা খাবারগুলো গোগ্রাসে গিলতে গিলতে, পাত্রপক্ষের কোনো এক মুরুব্বী চোখ-মুখ কুঁচকে বলে উঠলেন 'ওই, চলনসই'।খাবার প্লেট থেকে,এক মুহূর্তের জন্য চোখ সরিয়ে কয়েকজন সমর্থনসূচক বক্তব্য পেশ করল,'ওই আর কি!'
পাত্রপক্ষের মুখে এ কিঞ্চিত সমালোচনা শোভা পায়না। অতএব,কেবলমাত্র বলার তাগিদে,কেউ একজন বলে উঠল,'মেয়ের বাঁ চোখটা কি খাটো?'
পর্দার ওপার থেকে মায়ের চোখরাঙানিতে,মেয়েটা  চোখদুটোকে যথাসম্ভব টান-টান করে মেলে ধরল।
বাড়ি যাওয়ার আগে পাত্রপক্ষ ঢেকুর তুলে বলল,
'কালো মেয়ে চলবে না'।এতক্ষণ ভ্যাপসা গরম ঘরটায় থেকে, মুখে-চোখে জমে ওঠা অজস্র ঘামের বিন্দুগুলোকে, তেলচিটে জামাটার হাতায় এক লহমায় মুছে ফেলে, খেতমজুর ডুকরে কেঁদে উঠল, 'আপনাদের দুটি পায়ে পড়ি,আমায় এ কন্যাদায় থেকে মুক্ত করুন'।
মুখটিপে খানিক হাসাহাসি করলেও, ছেলের বাপের দয়ার শরীর।তাই খেতমজুরের  শেষ সম্বল,আড়াই বিঘার 'বন্ধ্যা' জমিটা নিয়ে, বিয়েতে রাজি হল।
মেয়েটার কানে এই 'কন্যাদায়' শব্দটা বড্ড ভারী ভারী ঠেকল। দু-চোখ বেয়ে নেমে আসা জলের ধারাগুলো, গালের দৃঢ়,প্রতারক আবরণটা ধুয়ে দিল,  বাবাকে যে এত অসহায় আগে কখনও দেখেনি! 
সেদিন সারারাত মেয়েটা ঝাপসা আলোয়,বেশিরভাগ জায়গায় পারদ চটে যাওয়া আয়নাটায় নিজেকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখল।এতদিন চোখে না পড়া,অনেক 'খুঁত' আজ ধরা পড়ছে।
নির্ধারিত দিনেই মেয়ের বিয়ে হল।বাবা-মা অবশ্য স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেনি, এবার পরেরগুলোকে 'উদ্ধার' করতে হবে কি না! 
নিয়মমাফিক সেই দিনও এলো,যেদিন পৌরুষহীন কিছু পুরুষ সামাজিকভাবে,ধর্ষনের সুযোগ পায়। বাপের বয়সি বর,দাম নিয়ে কেনা নতুন জিনিসের মোড়ক খুলতে-খুলতে,ভারী গলায় জিজ্ঞেস করল,'তা নাম কি?' শুকনো মুখে হাসি টেনে আনার বৃথা প্রচেষ্টা করে, মেয়েটা খ্যাসখ্যাসে গলায় বলল,'নয়ন'।
    এ বাড়িতে আসা অবধি নয়নকে আর খাবার অভাব বোধ করতে হয়নি,এরা তিনবেলা করে পেটপুরে খেতে দেয়। আর পাঁচটা বাড়ির বউদের  মতো নয়নও সারাদিন কাজ করে চলে,বাড়ির সব কাজ, রান্না থেকে শুরু করে স্নানের জল ভরা অবধি। এছাড়া বরের তাসের আড্ডায় চা-জল পৌঁছানো, শাশুড়ির পা টেপা, পান সেজে দেওয়া,আইবুড়ো ননদের ফরমায়েশ খাটা, এগুলো তো উপরি পাওনা! 
এতসব করেও রাতে দু-দন্ড ঘুমানোর জো নেই,স্বামীর মন বুঝে চলতে হয়।তবুও নয়ন খুশি।
বস্তির ওই ঝুপড়ি ঘরটায় যেতে মোটে ভালো লাগেনা।এখানে এলেই নয়ন ঘরভর্তি ভাইবোনদের,তার সুখের কথা শোনায়,দুপক্ষের জীবনযাত্রার মানের তুলনা করে।প্রথম-প্রথম শুনতে ভালোলাগলেও,কিছুদিন পর দিদির কথাগুলো যেন একঘেঁয়ে ঠেকে। এ ওর কানে ফিসফিসিয়ে বলে, 'দিদির বড় দেমাক!'
বছর ঘুরতে না ঘুরতেই নয়ন পোয়াতি হয়। এই ক'মাস তার কাজের ছুটি।কল্পনায়, আগত নাতির মুখপানে চেয়ে শ্বশুড়ি নিজেই ঘরের সব কাজ-পাট চোকাচ্ছে। পেটের ভেতর বাড়তে থাকা মাংসপিন্ডটার ওপর নয়ন বড়ই কৃতজ্ঞ।মাঝখানে মোটা চামড়ার স্তরের ব্যবধানকে তোয়াক্কা না করেই,প্রাণপনে বাচ্চাটাকে জড়িয়ে ধরে বলে, 'এত সুখ যে আমায় কেউ কখনো দেয়নি রে!'
নয়নের দৃঢ় বিশ্বাস,ছেলেই হবে। বড্ড শান্ত থাকে,ছেলেরা তো অমনি হয়! মেয়ে হলে হ্যাংলাপনা করে,পেটের ভেতর ইতি-উতি ছুটে বেড়াত।
          সবার আশায় প্রবল ধারায় বারি বর্ষন করে, এক দুর্যোগের রাতে,ঘর আঁধার করে একটা ফুটফুটে মেয়ে এলো। মেয়ে,বাপের গায়ের রং পেয়েছে।কপাল থেকে শুরু করে, ঘাড় পর্যন্ত ঘন কালো চুলে ঢাকা।সবার মুখে একটাই কথা, 'ভাগ্য!' অতএব মেয়ের নাম হল 'ভাগ্য'।
নয়নের খুব এটা পছন্দ নয় মেয়েটাকে,তবে ফেলেও দিতে পারে না, 'লোকে কি বলবে!'
জন্মের দিনকতক পরেই, একদিন ভোরবেলা নয়নের চিৎকারে সামনের বাজারের লোকজন অবধি ছুটে আসে। দেখে, বাচ্চা মেয়েটার মুখ দিয়ে ফেনা বেরোচ্ছো। বাড়ির সকলে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে যতক্ষণে হাসপাতালে নিয়ে যাবে,এক হাত লম্বা দেহটা ঠান্ডা হয়ে গেছে!
দু-একদিন প্রবল বিলাপ করলেও,আবার সব কিছু স্বাভাবিক, এমনকি নয়নও!
মাস কয়েক পরেই, নয়ন আবার সন্তান সম্ভবা। এবার আর নয়ন ছেলের আশা করেনি। কথায় বলে, কেউ মারা যাবার পর পরই, কোনো মেয়ে গর্ভবতী হলে, সেই আত্মা এসে পেটে ঢোকে।অর্থাৎ,আবারও নয়নকে ওই মুখপুড়ি জ্বালাতে আসবে!
তবে,এবার অবশ্য ঘর আলো করে ছেলেই হলো।
           বহুদিন পেরিয়েছে, নয়ন এখন দুই ছেলে,এক মেয়ের মা।এই মেয়েটার অবশ্য 'ভাগ্যদোষে' মরার কোনো সম্ভাবনা নেই। তার আগে দুটি পুত্রসন্তানের উপস্থিতিই তাকে রক্ষা করেছে। ঠিক যেমন করে, ভিড়ের মধ্যে,এককোণায় লুকিয়ে প্রাণরক্ষা করা যায়। এভাবেই মেয়েটা জীবনের ষোলোটা বছর পার করে দিয়েছে। নাম 'রাই'।গায়ের রংটা মায়ের মতো বলেই, বাপ আজ দুবছর ধরে হন্যে হয়ে ঘুরেও,মেয়ের জন্য একটা পাত্তর জোটাতে পারল না।
রাই-এর প্রতি নয়নের টানটা একটু বেশিই। ছেলেবেলায় অবহেলা করেছে বটে, তবে এখন সবসময় আগলে রাখতে চায়। ছেলেদুটো বড্ড বাপ ঘেঁষা,উঠতে বসতে বাপের দেখে, মা-কে গালাগালি করে। রাই তেমন নয়,হয়তো মেয়ে বলেই নয়!
রাই রোজ-রোজ মুখে-চোখে লাল, নীল রং মেখে, সং সেজে বসে আর পাত্রপক্ষ বলে যায় 'পরে জানাবো '।
বছর তিন কেটে গেছে, এখনও রাইকে কেউ 'উদ্ধার' করেনি। পুকুপাড়ে,কলতলায়,প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে নয়নও এবার 'বোঝা'র ভার টের পেতে থাকে। মুখে প্রকাশ না করলেও, কথাবার্তায় অকারণ বিরক্তি ফুটে ওঠে। এ জায়গায়, সে জায়গায় মানত করে, মাথা ঠুকতে ঠুকতে,নিজের অজান্তেই  বাবার শেখানো বুলিগুলো আউড়ে চলে, 'কন্যাদায় থেকে মুক্তি দাও'।
সেদিন দুপুরবেলা ব্যপারটা ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেল। কোনো এক পাত্রপক্ষের মুখে আবারো 'না' শুনে,ঘরে ঢুকেই মেয়েকে হিড়হিড় করে টেনে বার করল রাই-এর বাবা। অস্রাব্য গালিতে, একমাত্র রাই ছাড়া বাকি সকলের কানে আঙুল পড়ল।এতসবের কারণ একটাই, 'আর কদ্দিন আমার ঘাড়ে বসে গিলবি? '
ঝামেলা শুনে নয়ন বেরিয়ে আসে। মারমুখী স্বামীকে আটকায় এই বলে, 'অতোবড়ো মেয়ের  গায়ে কেউ হাত দেয়! ' সব রাগ গিয়ে পড়ল বউয়ের ওপর। পরিপাটি করে সদ্য তৈরি করা খোপাটা, ছিঁড়ে ফেলতে চায় লোকটা। এবারে কারণ, 'তুই কালো বলে,তোর মেয়েটা কালো '।
দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার আগেই ঝগড়াটা মিটে গেল। খুশিমনে খেয়েদেয়ে, প্রতিদিনের মতোই, সবাই ঘুমোতো গেল। ঘুমোলো না শুধু নয়ন। সেই থেকে যে মেয়েটা দরজায় খিল দিয়েছে, এখনো খোলেনি!ঘুমন্ত স্বামীকে ফেলে, পা টিপে টিপে পৌঁছল রাই-এর জন্য বরাদ্দ চিলেকোঠার সেই অন্ধকার,গুমোট ঘরটায়।
রাই ঘুমোচ্ছে,ঠিক ভাগ্যের মতো। শান্তির ঘুম। ঠোঁট দিয়ে সাদা ফেনা গলে গলে পড়ছে, কালো মুখটার ওপর। নয়ন এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। তারপর আবার, জীবনের কাছে শেষ চালিকা শক্তিটুকু ধার করে, টলমল পায়ে, অসাড় দেহটার মাথার কাছে গিয়ে বসে।ঠান্ডা শরীরটায় হাত বোলায়। শাড়ির খুঁট দিয়ে, উপচে পড়া সাদা ফেনাটা মুছিয়ে দেয়। খানিকক্ষণ পাগলের মতো, মরা শরীরটাকে ঝাঁকিয়েই, অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। হাসির রেশ কাটতে না কাটতেই, পাশে পড়ে থাকা কীটনাশকের খোলা প্যাকেটটা থেকে একমুঠো মুখে পুরে, অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে, 'ভাগ্য!'               



 © Aratrika Chakraborty

1 comment: