Monday, September 10, 2018

চল কুন্তল এবং...

চল কুন্তল

চল কুন্তল এবং...

নরকে সারাবছর নানাবিধ টর্চার চলে,  প্রসাংঘাতিক সব  শাস্তি দেওয়া হয়,খাটানো হয়!
একদিন ঠিক করা হ'ল ঐদিনটায় সবাইকে রেহাই দেওয়া হবে।  সবার জন্য এন্টারটেইনমেন্ট এর ব্যবস্থা করা হবে!  অতএব ঠিক করা হ'ল যে সবাইকে সেদিন সিনেমা দেখানো হবে! কিন্তু লোকজন প্রচুর!  অসংখ্য!
কে আগে ঢুকবে?
হঠাৎ মূল পান্ডা বাগড়া দিলেন!...  তিনি নিজে টেকো,  তাই বললেন তাঁর দলের লোকেরা মানে টেকোরাই ঢুকবে প্রথম লট এ! তারপর বাকীদের কথা ভাবা যাবে!
কিন্তু তখন কোনো চুলওলা লোক সেখানে থাকতে পারবে না! ধরা পড়লে কপালে দুঃখ আছে!
পান্ডার মুখের উপরে কথা বলার দুঃসাহস কারুর নেই!
সব টেকোরা অন্ধকারে সিনেমা দেখতে বসে পড়ল! এক অ-টেকোও লুকিয়ে সেখানে ঢুকে পড়ল!  অত লম্বা লাইনে কে দাঁড়াবে!
কিন্তু অন্ধকারে সবার কপালে টর্চ ফেলে ফেলে সার্চ করা শুরু হ'ল!  লোকটা ঘাবড়ে গেল....।  ধরা পড়লে এই একটামাত্র এন্টারটেনমেন্ট বাতিল হয়ে যাবে!
মাথা খাটিয়ে লোকটা পাতলুন  খুলে ফেলে মাথায় পরে নিল আর মাথা নীচে দিয়ে পশ্চাদ্দেশ উলটে রইল!
টর্চম্যান চেকিং সেরে ফিরতে ফিরতে অন্যদের বলল নতুন একটা স্টাইল দেখলাম... একজন আবার টাকে সিঁথি কেটেছে!

জোকটা মনে পড়তেই ফিচিক করে হেসে উঠল মেট্রো স্টেশনে দাঁড়ানো ফাজিল প্রবীর!  পাশেই দাঁড়িয়ে অমলদা। মাথার ঢেউ খেলানো চুল আসলে পরচুলা।  স্ক্রীনে তারস্বরে বাজছে 'চল কুন্তল।' এই  চল কুন্তল' সিনেমা কিংবদন্তি হয়ে গেছে।  ২০১৭-১৮র অন্যতম সেরা সব জোক,মিম,ট্রোল তৈরি হয়েছে এই 'চল কুন্তল' নিয়ে।
দুই বৃদ্ধ আইন নিজেদের হাতে নিয়ে হুলিগ্যানদের বেদম প্যাঁদাবেন। আর গান বাজবে 'চল কুন্তল'। দুই বৃদ্ধই বিরলকেশ । ছবির নায়কের লম্বাচুল ! লম্বা কুন্তল নিয়েই সে এগোবে । রামকৃষ্ণ যেমন নরেনকে বলেছিলেন ,'আমার সর্বস্ব তোকে দিয়ে ফকির হলুম,' তেমনি এই বৃদ্ধদ্বয়েরও যেন বক্তব্য 'আমাদের তারুণ্য,আমাদের চুলসর্বস্ব টগবগে জীবন তোকে দিলাম । এগো !'
এই 'চল কুন্তল' ব্যাপক প্রভাবও ফেলছে!  'চলো দিল্লী 'র মতো লোকজনও এটা বলে নিজেদের শক্তি চাগিয়ে নিচ্ছেন!  শুভাকাঙ্ক্ষীরা 'ক্যারি অন' না বলে বলছেন 'চল কুন্তল'!  বাবলুকাকু এই শীতে লেপের নীচে গড়িমসি করেন... উঠবেন, স্নান করবেন এসব ভেবে আতঙ্কে ট্রেন মিস করেছেন দুদিন!  আজকাল অ্যালার্ম বাজলেই 'চল কুন্তল' বলে লেপ ছুঁড়ে এন্থু আনেন। প্রোগ্রামিং ঘেঁটে গেলে কম্প্যুটার এক্সপার্টরা কাঁধ মটকে 'মারো ডান্ডা ভাগাও ভুত' না বলে 'এহহহহ...চল কুন্তল' বলে আবার নতুন করে ট্রাই নিচ্ছেন। ময়দানের পাশের সুলেমান আজকাল তার বুড়ো ঘোড়ার পেটে পায়ের খোঁচা  দিয়ে 'চল মেরে লাল' না বলে 'চল কুন্তল' বলছে। হিসিখানার লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের লাইন এসেও যখন হিসি আটকে যায়, পেছনের লোকের গালাগালি খাওয়ার ভয়ে অনেকে আজকাল বলছে আয়...আয়... আয়... চল কুন্তল চল!
কবিগুরু এখন 'বাল্মীকি প্রতিভা' লিখকলে ডাকাতদলের মুখে হয়তো বসাতেন 'চল কুন্তল'।

' চল কুন্তল চল/ ঊর্ধ্বে স্ক্রীনেতে বাজে মাদল! '
মেট্রো ঢুকল।  অনুপম রায় ও গেয়ে উঠলেন 'চল কুন্তল'!  সাথে সাথে প্রবীর 'মেট্রো এসে গেছে, চল কুন্তল ' বলে অমলদার মাথার উইগটা টেনে নিয়েই মেট্রোয় উঠে গেল!

অমলদা মাথাজোড়া টাক নিয়ে এতোটাই বেকুব বনে গেলেন যে মেট্রোয় উঠতেই পারলেন না! আশেপাশের লোকজন হেসে উঠল!
এবার নিজেকে সামলে নিলেন অমলদা! হো হো করে হেসে বললেন ' আরে,আমি নিজেরটাই ধরে রাখতে পারিনি তো আপনাদেরটা রাখব! ' পাবলিক বুঝল ইনি রসিক লোক। থেমে গেল।  অমলদা বুঝলেন ছোটবেলায় ঈশপের গল্পে পড়া এই বুদ্ধি তাঁর নিজের কাজেই লাগল!

'কুন্তল' মানে চুল যখন চলে কিংবা run করে,তখনই ইন্দ্রলুপ্ত হয়! প্রথমদিকে তাঁর যখন টাক পড়ছিল, অনেকেই টোন-টিটকিরি করত। তখন তাঁর আদর্শ ছিলেন হরেনদা!
হরেনদার মাথায় ছিল গুনে গুনে পাঁচটামাত্র চুল।  সেটুকুই তিনি রেখে দিতেন।  কাটতেন না!  রাস্তায় বেরোলেই ফক্কড় ছেলেরা আওয়াজ দিত 'কি মামা... চুল বেচবে? আমরা কিনব! ' চুপচাপ হেঁটে বেরিয়ে যেতেন হরেনদা।  একদিন ছেলেরা আওয়াজ দিতেই তিনি সটান দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, ' হাঁ বেচব.... কিনবি তো? এক একটা চুল একশো টাকা করে। ' ছেলেরাও এককাঠি উপরে...  সটান পাঁচশো টাকা বার করে দিয়ে বলল, 'এবার বেচো। ' হরেনদা টাকা নিলেন আর জামার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে বগল থেকে ঘামে সপসপে পাঁচটা লোম তুলে এনে ওদের দিলেন।  ছেলেগুলো ক্ষেপে গেছিল। হরেনদা বলেছিলেন ' যেগুলো দেখছিলিস সেগুলো তো স্যাম্পেল!  আসল মাল গোডাউন থেকে বার করে দিলাম! '
সেই থেকে অমলদা টাক নিয়ে জোক খুঁজে বার করেন।মজা করেন। বলেন 'আসলে আমি লম্বা তো,তাই চুলগুলো আমার মাথার নাগাল পায় না,আমাকে ছাড়িয়ে উঠতে পারে না !'

কুন্তল বা চুল এমন এক বস্তু,যা স্থান বিশেষে নাম বদলায়।  মাথায় থাকলে চুল,গালে-থুতনিতে থাকলে দাড়ি (গালে থাকলে গালপাট্টা, চিবুকে থাকলে নুর),ঠোঁটের উপরে থাকলে গোঁফ, গায়ে-হাতে-পায়ে থাকলে লোম, চোখের উপরে থাকলে ভুরু!

অমলদার মনে পড়ল তাঁদের স্কুলে এক মাস্টারমশাই ছিলেন। বিরাট তেল চকচকে টাক ছিল তাঁর। পড়াতেন খুব ভালো। তিনি পেছন ফিরলেই সেই চাঁদের মতো চমকানো টাক লক্ষ্য করে ছেলেরা কেউ কাগজের গুলি,কেউ এরোপ্লেন ছুঁড়ত । তিনি রেগে তুলকালাম করতেন। ছেলেরা তাতে আরও মজা পেত! তিনি হেঁটে গেলে ছেলেরা মাথার পেছনে ফুঁ দিয়ে পালাত। কাউকে পাকড়াতে পারলে সে বলত টাকে মশা বসেছিল,সেটাকে না মেরে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছি। রাতদিন টাক টাক টাক শুনতে শুনতে তিনি পাগল পাগল হয়ে থাকতেন ! ছেলেরা আওয়াজ দিত ,'সার আপনার টাকে মশা' কিংবা 'আপনার টাকে জলের ফোঁটা।' মাস্টার রেগে উঠতেন। ওরা তো 'মাথা' ও বলতে পারত ! 'টাক' বলল কেন ?
একবার একটা ছেলে 'আমি টাকডুম টাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল' গাওয়ায় তিনি ভেবেছিলেন ইচ্ছে করেই তাঁকে ঠোকা হচ্ছে ! সে এক কান্ড !
আরেকবার তাঁর সামনে একটা ছেলে অনিচ্ছাকৃতভাবেই আচার খেয়ে টাকরায় জিভ দিয়ে 'টা-ক্' করে আওয়াজ করেছিল ! সেটা প্ল্যানমাফিক ভেবে ছেলেটাকে সোজা থাবড়ে দিয়েছিলেন!
একেবারে 'হ য ব র ল'র উদোবুড়োর মতোই ক্ষেপচুরিয়াস হয়ে থাকতেন ।
জ্বালাতনে শেষতক অতিষ্ঠ হয়ে তিনি হেডমাস্টারের কাছে গিয়ে নালিশ ঠোকেন। হেডস্যর ক্লাসে ঢুকে বেদম ধমকে শাসিয়ে যান !
কিছুদিন সবাই চুপ থেকে আবার জ্বালাতন করা শুরু হ'ল! আবার গেলেন হেডস্যরের কাছে ! হেডু এবার সবাইকে মারতে বাকী রাখলেন আর আড়ালে মাস্টারকে বললেন,'আপনিই বা বাচ্চাদের মতো বারেবারে নালিশ করেন কেন ?ছেলেদের সামলান। বারবার কি আপনাকে বাঁচাতে আমায় ছুটে আসতে হবে?'
সত্যিসত্যিই কিন্তু এবারে সবাই একদম চুপ হয়ে গেল। অনেক মাস ধরে আর কোনো ঝামেলা নেই !
আর কেউ না বুঝলেও অমল কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিলেন । মাস্টারমশাই এতে খুবই অস্বস্তিবোধ করতেন । তিনি বারেবারে ঘাড় ঘোরাতেন ,চাঁদিতে হাত বোলাতেন । ভাবতেন এই..এইবার বুঝি কেউ কাগজ ছুঁড়ল । নাহ্...কেউ ছুঁড়ত না ! তাঁর ফাঁকা ফাঁকা লাগত। নিজেকে পর মনে হ'ত। ছেলেদের দুষ্টুমিগুলো এবার তিনি মিস করা শুরু করলেন ! এদের চুপ থাকাটাই তাঁর অস্বাভাবিক মনে হ'ত ! নিজেও সব হিসেবের গরমিল দেখে কেমন মিইয়ে পড়েছিলেন !
হঠাৎ একদিন ঠাঁই করে একটা কাগজের দলা আবার তাঁর টাকে নিখুঁত টিপ করে কে ছুঁড়ে দিল । তিনি রাগ দেখালেন । ছেলেটাকে খুঁজলেন। পেলেন না । অমল নোটিশ করেছিলেন সেদিন থেকে মাস্টারমশাই খুব চনমনে হয়ে উঠেছিলেন । অমল বুঝেছিলেন রাগ দেখানোটা কৃত্রিম ছিল ।
তারপর থেকে মাস্টারমশাই আমুদে আর শান্ত হয়ে গেছিলেন। সবাইকে নিজের খরচে সার্কাস দেখিয়েছিলেন ।যদিও আর্থিক অবস্থা খুব ভালো ছিলনা তাঁর! ছেলেরাও তারপর তাঁকে আর সেভাবে বিরক্ত করেনি !
এরপর তিনি রিটায়ার করে যান। বিদায়ী অনুষ্ঠানে ছাত্ররা তাঁর কাছে অনেকেই ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিল । কিন্তু কাগজ ছোঁড়া ছেলেটাকে আর পাওয়া যায়নি ! অমল জানতেন মাস্টারমশাই শেষদিনতক সে ছেলেটাকে খুঁজেছিলেন ।
অমলদা ভাবলেন কারুর মাথায় চুল না থাকলে 'চুল তার কবেকার ' ,'পঞ্চনদের তীরে বেণী পাকাইয়া শিরে' এসব লাইন কিংবা 'চুলচেরা' ,'চুলোচুলি' এসব শব্দ তৈরিই হ'ত না ! জিগুরাত তৈরি হওয়ার সময়ে আক্কাদিয়ান লোকজন একদল লম্বা চুলে অন্যদল মুন্ডিত মস্তকে থাকত ! মুন্ডিতরা নিজেদের সভ্য মনে করে অহংকার করত!

মেট্রো ঢুকছে ।... অনুপম আবার 'চল কুন্তল চল' গেয়ে উঠলেন । মুচকি হেসে পাশের লোকটাকে অমলদা বললেন ,'বুঝলেন...মেট্রোর নামই মনে হয় কুন্তল।' ট্রেনে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে পুরনো একটা প্যান্টের বিল গোল্লা পাকিয়ে নিখুঁত টিপে টি.ভি স্ক্রীন এর দিকে ছুঁড়ে দিলেন অমলদা ।
প্রবীরটাকে কোনো ছুতোয় চাঁট দিয়ে হ্যাটা করতে হবে....

এক স্টেশনের 'চল কুন্তল' ক্ষীণ হয়ে অন্য স্টেশনেরটা জোরে শোনা যেতে থাকে !

( কাউকে অসম্মান বা আঘাত করার জন্য এই পোস্ট লেখা হয়নি !)


লিখছেন : অন্বয় গুপ্ত 

0 comments: