Wednesday, September 12, 2018

সজনেফুল

গল্প : সজনেফুল


  কাল সারারাত বৃষ্টির পর শ্যাওলা রঙা রোদ উঠেছে সকালবেলা। এ সময় সাধারণতঃ বৃষ্টি হয়না কিন্তু গত দুদিন ধরে টানা বৃষ্টির পর আজ একটু থেমেছে। তবুও সারা আকাশ জুড়ে থমথমে ভাব। দুরে এককোণে হাঁটুগেড়ে বসে আছে মেঘ।

 বিছানা ছেড়ে উঠে একরাশ খোলা চুলকে স্যাঁতানো হাওয়ায় এলিয়ে দিতে দিতে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায় নির্ঝর। গত দু'দিন অফিস যাওয়া হয়নি তার বৃষ্টির জন্য। আজ রোববার। আজও সারাদিন এই এককামরা ছোট্ট ফ্ল্যাটের ভিতর বন্ধ থাকতে হবে তাকে। নির্ঝরের ব্যালকনি বেযে আ্যালামুন্ডার গাছ, বৃষ্টি ভিজে অনাবিল সবুজ। গাছের পাতা গুলো চিক্কণ ভিজে ভিজে। আজ আবার তার বড় একা, বড় নিঃসঙ্গ লাগছে। বড় বদ্ধ।

 বারান্দা দিয়েই সে দেখতে পেল, ছোট্ট একটা মেযে়কে, আগে দেখেছে কিনা খেয়াল পড়েনা। ঝুড়ি ভর্ত্তি সজনে ফুল নিয়ে সে চলেছে।, সকালের নির্জন রাস্তার ওধারের ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে। সাত আট বছরের শীর্ণ শরীরে হলদে ফ্রক অল্প ভেজা, কাঁখের ফুলের ঝুড়িটি সযত্নে প্লাস্টিক দিয়ে মোড়া। নির্ঝর তাকে ডাকে। রাস্তার ওপার থেকেই মিষ্টি গলায় সে জিজ্ঞাসা করে, "ফুল কিনবেন?"

 নির্ঝর তাকে উপরে আসতে বলে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দামাদামি করতে থাকে মেয়েটি । বারোটাকা শ', তার কমে দিতে পারবোনা।"
প্রায় ভিজে যাওয়া মেয়েটিকে নির্ঝর ভিতরে আসতে বলে। মেযেটি ভিতরে আসতে চায়না, "না না দেরী হয়ে যাচ্ছে আমার। কত নেবেন বলুন?"
এই সময় বাইরে আবার বৃষ্টি নামে।
 নির্ঝর মেয়েটিকে আবার ডাকে। খানিক ইতস্ততঃ মেয়েটি অচেনা ফ্ল্যাটে ঢুকতে সাহস পায়না। তাও ঢোকে। বৃষ্টি পড়ছে বাইরে আঝোর ধারে। অগত্যা মেয়েটিকে বসতে হয়। বলে,
- আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে আমি যাই। দেরী হলে মা খুব বকবে।
- বৃষ্টি পড়ছে যে।
- আমি এমনিতেই ভিজে গেছি।
- ফুল ভিজে যাবে।
- প্লাস্টিক দেওয়া তো। নেবেন? টাটকা ফুল একদম। ভোরবেলা কুড়োনো। নিন, পুরোটাই নিন।
- অত ফুল নিয়ে আমি কি করব?
- রাঁধবেন, ভালো ফুল, আচ্ছা আর একটু কমিয়ে দিচ্ছি দাম। দশটাকায় দিন,
- তুমি স্কুলে যাওনা?
- কি?! ইস্কুল? না। কত দেবেন বলুন?
- দুধ গরম করে দেবো, খাবে?
   মেয়েটা হকচকিয়ে থাকে। নির্ঝর উঠে যায়। দুধ গরম করে আনে। মেয়েটির দিকে গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
-ভিজে গায়ে ঠান্ডা লেগে যাবে। খাও-।
- কিছু মেশানো নেই তো এতে?
 হো হো করে হেসে ওঠে নির্ঝর। বলে, "তোমার নাম কি?"
- শায়েরী।
- খেয়ে নাও শায়েরী। কিছু মেশানো নেই।
"হাহাহা" - আবার হাসে নির্ঝর। ফলসা রঙের পালাজো লুটিয়ে মেঝেতে বসে পড়ে সে।
সেদিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে দুধের গ্লাসটি শেষ করে শায়েরী।
তারপর জিজ্ঞাসা করে "ওটা কি?"
- ওটা ল্যাপটপ। তুমি দেখবে?
নিরুত্তর মেয়েটাকে খানিকখন ফোটো দেখায় নির্ঝর।
শুকনো তোয়ালে দিয়ে গা মুছে শায়েরী তখন নির্ঝরের খাটে বসে আছে।
- তোমার বড় ফোন আছে?
- হ্যাঁ, আছে শায়েরী।
সাহস পেয়ে নির্ঝরের ট্যাবে আঙুল চালায় শায়েরী।
সেটা নাড়াচাড়া শেষ হলে, বুকসেল্ফের দিকে উঠে যায়। আঙুল দেয় থরে থরে সাজানো বইগুলোর গায়ে। জিজ্ঞাসা করে, "এত বই কি সব তোমার?"
- হ্যঁা, আমার। তুমি পড়াশোনা করোনা শায়েরী?
- না।
- কেন?
- এমনি।
- এমনি আবার কি? কি কর সারাদিন?
- এই যে বাজারে আমার মা শাক ডাঁটা সজনেফুল, এইসব বিক্রি করে। আমি মাকে সাহায্য করি। সন্ধ্যেবেলা মা একজনদের বাড়িতে রান্না করে। সেখানে আমাকে জল তুলে দিতে হয়। তাছাড়া সারাদিনও আমাকে অনেক গুলো বাড়িতে আর বাজারের কিছু দোকানে জল তুলে দিতে হয়। আর স্কুলে গেলে আমার মাইনে দেবে কে?
 কি বলবে বুঝতে পারেনা নির্ঝর। চুপ করে থাকে। শায়েরীই বলে,
- এত বই পড়ো তুমি? তুমি কি আন্টি?
- না, আমি একজন জার্নালিস্ট।
- কি?
- সাংবাদিক। খবরের কাগজের খবর জোগাড় করা বা বিভিন্ন আর্টিকেল লেখা আমার কাজ।
- ও। বাবা বলে, খবরের কাগজে সব মিথ্যে কথা লেখা থাকে।
কৌতুক বোধ করে নির্ঝর, পাকা পাকা কথা শুনে। বলে,
"ও, তাই বুঝি?"
- হ্যাঁ, বলে তো। বলে, বেশীটাই বানানো।
- তাই? হাহা- কি করেন তোমার বাবা?
- বাবা রাস্তা তৈরি করে। ড্রেন কাটে। শহরের এই যে সব পিচঢালা পথ, এসব বাবা তৈরি করতে পারে। অনেক লোকজনদের সাথে একসঙ্গে থাকে। অনেক দুর দুর চলে যায়। অনেক দিন পরপর বাড়ি আসে।
- খুব ভালোবাসো বাবাকে?
- হ্যাঁ খুব।
- আর মাকে?
- হুউম। অনেক। তোমার ঘরটা কি সুন্দর!
- তাই?! তুমি কোথায় থাকো বললেনা যে-
- জিজ্ঞেস করলে কখন? আমি ঐ ওভার ব্রীজের ওদিকটায় থাকি।
  হঠাৎ বাইরের দিকে খেয়াল পড়ে তার। ততক্ষণে বৃষ্টি ধরে গেছে।
"ইস্ কত দেরী হয়ে গেলো! আমি আসছি"
ঝুড়ি কাঁখে নিয়ে বেরিয়ে যায় শায়েরী।
নির্ঝর ডাকে, "দাঁড়া দাঁড়া শোন্ শোন্, বিছানায় যে এক বান্ডিল ফুল ফেলে গেলি, দামটুকু নিয়ে যা-"
ততক্ষণে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেছে শায়েরী। ব্যালকনি দিয়ে ঝুঁকে পড়ে নির্ঝর। দেখে, গাড়িঘোড়ার সতর্ক হর্ণ উপেক্ষা করে রাস্তা পেরোয় সে। তারপর ফুটপাথ ধরে ছুটে চলে যায়, সজনে ফুলের ঝুড়ি কাঁখে।                নির্ঝর আর তাকে দেখতে পায়না। মনটা হঠাৎ ফুরফুরে লাগে তার। বাদল ভাঙা রোদ্দুর তখন রাস্তার মোড়ে ঝাঁকড়া জারুল গাছটার মাথা থেকে ঝিলিক দিচ্ছে।

 ঘরে এসে আলমারি থেকে স্বপ্নিলের বাঁধানো ফোটোটা বের করে নির্ঝর। অনেক অনেক বছর বাদে সে স্বপ্নিলের চোখ দুটোর দিকে নিবিড় ভাবে তাকায়। না কোনো বিশ্বাসঘাতকতা নয়, নিখাদ একরাশ ভালোবাসা সেই দু'চোখে দেখতে পায় নির্ঝর। দশবছর আগেকার সেই ভালোবাসা।
 তারপর বিছানায় শায়েরীর ফেলে যাওয়া ভেজা সজনেফুল গুলোর দিকে চেয়ে, ওদের না ঽওয়া সেই মেয়ের কথা মনে পড়ে নির্ঝরের।
 বাইরের আকাশটা পরিষ্কার হয়ে আসে। অন্ধকার এককামরা ফ্ল্যাটের ভিতর বসে লাল হয়ে আসা সজনে ফুল গুলোর দিকে তাকিয়ে রক্তপাতের গন্ধ পায় সে।

কলমে : অদিতি রায়

0 comments: