Tuesday, September 11, 2018

জাঙিয়া বৃত্তান্ত


বাংলায় একটা প্রবাদই আছে - 'হাতিকে জাঙিয়া পরানো !' এর মানে হ'ল কঠিন কোনো কাজে নামা ! স্রেফ ফ্যাশন স্টেটমেন্ট আর রঙমিলান্তি দেখানোর জন্য সুপারম্যানের স্রষ্টারা ওকে প্যান্টের উপরে জাঙিয়া পরিয়েছিলেন ! সুপারম্যানের বুকে 'S' লেখা থাকে জাঙিয়াকৃতির পঞ্চভুজের মধ্যে ! সুপারম্যানের জাঙিয়ার বুক-পকেট( এটাও বাংলার একটা প্রবাদ) না থাকলেও বুকে জাঙিয়া আছে !

তবে স্টান্টম্যান ,সার্কাসের খেলোয়াড় আর ক্রিকেটাররা প্যান্টের উপরে জাঙিয়া পরেন বংশরক্ষার আতঙ্ক থেকে ! সেখানে ফ্যাশন নেই !

বিমবোদার প্রাইভেট টিউশন এর ব্যাচ জমে উঠেছে। কোত্থেকে হঠাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ে এখন প্রতি সপ্তাহেই একজন-দু'জন করে স্টুডেন্ট ভর্তি হয়। ছাত্রীর সংখ্যাই বেশি।অনেকেই সুন্দরী।  সেই আনন্দে বিমবোদার স্টাইল বেড়ে গেছে। তিনি ঘরটাকে সাজিয়েছেন।  নিজেও টিপটপ থাকেন।
ওঁর মায়ের একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বাই আছে!
একদিন ভরা ব্যাচের মধ্যে বিমবোদার মা এসে একটা ন্যাতা দিয়ে সবার সামনেই চেয়ার,বুককেস,টেবিল মোছা শুরু করলেন।  সবাই উশখুশ করতে লাগল,কারুর চোখ চড়কগাছ হয়ে গেল। কারণ ভদ্রমহিলা যে ন্যাতা দিয়ে মোছামুছি করছিলেন,সেটা একটা আস্ত পুরনো জাঙিয়া!
বিমবোদা বেজায় বিরক্ত হলেন!  কিন্তু বেশি বিরক্তি বা লজ্জা প্রকাশ করাটাও সেই মুহূর্তে তাঁর পক্ষে চাপের ছিল!
তবুও তিনি বললেন ' আরে... সব তো পরিষ্কার ই রয়েছে! তোমার আবার মোছবার কি দরকার!' মা বুঝলেন না!  তিনি বললেন, ' না না.. এতজন রয়েছে... আরেকটু মুছে দিই! '
সবার সামনে ঘষে ঘষে মুছে 'ফিনিশিং টাচ' দিয়ে তবে তিনি গেলেন।
প্রেস্টিজ আর রাগে অন্ধ হয়ে বিমবোদা সেদিন ভিস্কোসিটি পড়াতে গিয়ে ক্যাপিলারিটি পড়িয়ে ফেললেন!

শাড়ি দিয়ে লুঙি বানিয়ে পরা কিংবা জাঙিয়াকে ন্যাতা বানিয়ে ব্যাবহার করা আমি দুচক্ষে দেখতে পারি না!  খুবই নিম্নরুচির মনে হয়(যদি সংসারে একেবারেই অভাব না থাকে)!  অনেকেই কাজান্তে বাড়ি ফিরে শুধু জাঙিয়ামাত্র পরেই ঘুরে বেড়ান,দোকান করেন (কোমরে পাউচব্যাগ বেঁধে নেন),বাড়িতে আত্মীয় বা লোক এলেও তাই ই পরে থাকেন,তাঁদের একদম জঘন্য লাগে ! অ্যাপেলোর মতো দেহসৌষ্ঠবও যে ওঁদের আছে,সেটাও না !
একসময় রীতিমতো স্যুইমিং ক্লাবে যেতাম ! বীভৎস মোটা কিংবা লোমশ ছেলেদের সাঁতারের জাঙিয়া পরে যাতে বীভৎস দেখতে না লাগে,সেজন্য ওদের জন্য হাফপ্যান্ট থাকত !
'কাকাবাবু সিরিজ' এর 'সন্তু কোথায় ? কাকাবাবু কোথায়?' তে বাথরুম যাওয়ার আগে বাইরে পোষাক ছাড়তে লজ্জা পাচ্ছিল কিডন্যাপড হওয়া সন্তু ! ভিলেন টিটকিরি দিয়েছিল ,'জাঙিয়া আছে তো?' বলে !
আমাদের এক টীচার সেরকমই শুধুমাত্র 'রাজু' কোম্পানির অন্তর্বাস পরেই একদিন বাড়িতে ছিলেন ! আমরা ছেলেরা কী দরকারে তাঁর বাড়িতে যেতেই লজ্জা পেয়ে দরজার পরদায় নিজেকে জড়িয়ে বোকার মতো লাফালাফি করে কথা বলেন আর আমাদের ঝাড়েন ! অথচ তিনি স্মার্টলি কথা বলতে পারতেন কিংবা চট করে চেঞ্জ করে আসতে !
তারপর থেকে ওঁর নাম হয়ে যায় 'রাজুবাবু' !
অনেকে আবার 'জাঙ্গিয়া' শব্দটা উচ্চারণ করাটাকেই অশ্লীল বলে মনে করেন! তাই 'আন্ডারওয়্যার', 'ছোট প্যান্ট ' এসব শব্দ ব্যাবহার করেন।
  আমার এক ভাই ছোটবেলায় নাকিসুরে কথা বলত!  একবার চারবছর বয়েসে এক জন্মদিনের প্রোগ্রামে গিয়ে এক্সট্রা পরোটা খেতে চেয়েছিল! সেটা দেওয়ার পরেই ও চেঁচিয়ে বলেছিল, '' পরোটাটা পুরো 'নাঙ্গিয়া' র মতো দেখতে! '' পঞ্চভুজ পরোটা ওর জাঙিয়ার মতো দেখতে লেগেছিল আর কী! এতে ওর বাবা খুব রেগে গেছিলেন।  তিনি বুঝেছিলেন তাঁরা বাড়ি ফিরে গেলেই ওঁদের রুচিবোধ আর শিক্ষা নিয়ে কানাকানি শুরু হবে!
এই জাঙিয়া ব্যাপারটা ভালো না বদ এটা নিয়ে একটা ঘটনা আছে-
এক প্রাইমারি স্কুলে নার্সারি তে পড়া আমারই এক চেনা ছেলের গার্জেন কল হয়েছিল 'নোংরা' কথা বলার জন্য! সে ক্লাস চলাকালীন ক্লাসমেটকে  বলেছিল ' তোর জাঙ্গুভাই আছে?'
আসলে আধো ন্যাকামো মেরে আমরা যেমন 'ল্যাপি','হাবি', ' বার্ডি' এসব বলি তাই যাতে শুনতে 'বিশ্রী' না লাগে সেজন্য  ওকে 'জাঙ্গুভাই' বলতে শেখানো হয়েছিল!
সেই স্কুলে শীতকালে চিনচিনে ঠান্ডায় অনেক বাচ্চাই পটি করে ফেলত! আয়ামাসি ওদের নিয়ে ছুটতেন!  একহাত দিয়ে নিজের নাক টিপে ধরতেন, অন্যহাত দিয়ে এক এক করে বাচ্চাদের কাপড় ছাড়াতেন।  প্রথমে মাঙ্কিক্যাপ,তারপর ফুল সোয়েটার, তারপর হাফ সোয়েটার, তারপর ফুলশার্ট, তারপর প্যান্ট,  তারপর যেই দেখতেন ভেতরে জাঙিয়া, রেগে গিয়ে বলতেন 'ভেতরেও আবার প্যান্ট!  কী যে দরকার! ' আসলে তিনি যেখান থেকে এসেছিলেন, সেখানে বাড়তি একটা জাঙিয়া হয়তো বিলাসিতা!

'হেগো'দের কাছে এই জাঙিয়া  কখনো হাগিস এর কাজ করে। ছোলা বলে একটা ছেলের কথা আগে লিখেছিলাম।  স্কুলবাস থামিয়ে ঘাসে হেগে জাঙিয়াকে টিসুপেপারের কাজে লাগিয়েছিল!

বুড়ো দামড়া বয়েসেও জাঙিয়া না পরার মতো ক্যাবলামো অনেকেই করে ! কারুরটা দেখনদারি , কেউ একদম হাবাগোবা । কিন্তু এজন্য নানা রোগ বাঁধতে পারে । এখনও দেখি অনেকে বুড়ো হয়েও পরে না !
আমেরিকায় নাকি ব্যাগিস প্যান্ট পরার উপরে একবার নিষেধাজ্ঞা জারি হতে বসেছিল ! কারণ ম্যারিকানরা নাকি অধিকাংশই জাঙিয়া-টাঙিয়া পরার ধার ধারে না । ঐসব প্রচন্ড ঢলঢলে ব্যাগিস প্যান্ট মাঝেমাঝেই নীচে নেমে আসে ,সেজন্যই ব্যানড্ হচ্ছিল ( ম্যারিকানদের আবার লজ্জা কীসের !)

 ক্লাস টুয়েলভ এ একটা পড়ার ব্যাচে ইচ্ছাকৃতভাবে একটা ছেলে জাঙিয়া না পরে মেয়েদের মাঝে গিয়েই চোয়াড়ের মতো বসে থাকত। স্যর সেটা ধরতে পেরেছিলেন( সবাই ই পারত ) ! তিনি বলেছিলেন - 'খোকা, শিগ্রি টয়লেটে যাও... আর পরদিন থেকে প্যামপার পরে আসবে,কেমন?'
আমার এক পরিচিত পাড়ার কাকুজাতীয় লোক ছিলেন। সাধারণত লোকে তাঁকে 'ভোলেভালা','ক্যাবলা' এসব বললেও তাঁর দৃষ্টি দেখে আমার বরাবরই তাঁকে পারভার্ট মনে হত ! একবার এক বিয়ের বাড়িতে অনেক সুন্দরী সম্বলিত একটা ঘরে কন্যাযাত্রীদের সবাই যে খাটে বসবেন তার উপরে নিজের জাঙিয়া ছেড়ে গেছিলেন ! খাটের মাঝখানে ! বিকৃত মানসিকতার লক্ষণ এটা এবং অবশ্যই উদ্দেশ্য ছিল ! বরপক্ষের একজন ব্যাপার বুঝে সে জাঙিয়ার উপর সটান একটা ফুলের মালা রেখে দিয়েছিলেন। সেটার ফোটোও তোলা হয়েছিল। হাসির রোল উঠে গেল! ব্যাস্...কাকু পড়ে গেলেন বিপাকে । মালা তুললেই ধরা পড়বেন । জাঙিয়া ফেলেই তিনি পালিয়েছিলেন !

জাঙিয়া না পরার বিপদ একদিন দেখেছিলাম । পুজোর সময়ে একবার পাড়ায় এক বাড়িতে নর্থ বেঙ্গল থেকে ক্লাস থ্রির একটা বাচ্চাছেলে এসেছিল ! সে জাঙিয়া পরত না ! ঘুরে এসে বাড়ি ঢোকার পর জিন্স এর চেইন জোরসে খুলতে গিয়ে সেটা পুরুষাঙ্গের চামড়ায় বিশ্রীভাবে আটকে যায় ! এদিকওদিক হ'লেই মারাত্মক কিছু হতে পারত ! ওদের বাড়িতে তখন একজন বৃদ্ধ আর ক'জন মহিলা । আমাদের বাড়ি এসে ওঁরা হাউমাউ করে উঠলেন। বাচ্চাটাকে পাঁজাকোলা করে আমি ছুটলাম। সাথে গেলেন ওর দাদু আর পিসি । ভ্যানে করে নার্সিং হোম এ গিয়ে দেখি বড়ো কোনো ডাক্তার নেই ।পুজোর মরসুম! আরএমও আর কয়েকজন ওয়ার্ড বয় ওকে নিয়ে বেড এ শোয়ালেন! প্ল্যান করা হ'ল জিন্সটাই কেটে ফেলা হবে ! বিরাট একটা কাঁচিও আনা হ'ল। আর সবাই মিলে চেইনটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলেন ! বাচ্চাটা কানফাটানো চিৎকার শুরু করল -' নকাই কেটে দেবে রে...আমার নকাই কেটে দেবে !' সেই চিৎকারে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়ে গেল ! শেষতক বাচ্চাটাকে চেইনমুক্ত করার পর আরএমও একেবারে ধমকে দিলেন ! সাফ বলে দিলেন 'এতো বুড়ো খোকা জাঙিয়া কেন পরেনা? এবার সত্যিই নকাই বাদ দিতে হবে!' আমাদের বাড়ি থেকে ঐ বাচ্চাটাকে একটা হলুদ আরেকটা কমলা জাঙিয়া কিনে দেওয়া হয়েছিল!

কার কেমন রুচি সেটা বোঝা যায় জাঙিয়ার রঙ দেখে । এক ব্যক্তিত্বপূর্ণ ভদ্রলোকের বাড়ি তাঁর জাঙিয়া টাঙানো ছিল ! সেটার রঙ ছিল বাসন্তী ! দুধারে গোলাপী সুতোর কাজ ছিল আর সারা জাঙিয়াময় নীল কালিতে 'ইউরোপ-প্যারীস-লন্ডন' লেখায় ভর্তি ছিল! সেদিন থেকে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা উপে যায়!
আরেকটা বাচ্চাকে নিয়ে ওর বাবাকে জাঙিয়া কিনতে দেখেছিলাম। দোকানি কৌটো থেকে একের পর এক জাঙিয়া বার করছেন ।সাধারণত লোকে কেনে কালো,গ্রে এসব ডীপ কিংবা সোবার কালারের। দোকানি দেখালেন একটা টকটকে লাল ! বাবা বললেন ,'অসাধারণ দাদা ! কী রঙ দেখালেন !' ছেলে বলল,'এটাই আমি নেব ! রঙ আর কে দেখবে !'
একবার এক বন্ধুর সাথে এক কাউন্সেলিং এ গেছিলাম ! চারদিকে লোকে লোকারণ্য! বন্ধুটি খুব চটপটে ! কিন্তু হঠাৎ ও খুব উশখুশ করা শুরু করল ! একবার বাথরুমে গিয়েও ফিরে এল। বলল এত নোংরা যে ঢুকতেই পারেনি ! ভাবলাম হয়তো বেশ জোরে ওর পায়খানা পেয়েছে ! কাছাকাছি কোথায় সুলভ আছে ভাবা শুরু করলাম ! বন্ধু ভীষণ টায়ার্ডের মতো আর দু'পা চেপে,কখনো দুদিকে টেনে অদ্ভুতভাবে হাঁটা শুরু করল!
পরে আমায় বলেছিল ,'উরিশ্-শালা ! আমার জাঙিয়াটা ছিল আজকে মহা লুজ ! একদম পিছলে কালো কারের মতো হাঁটুর নীচে নেমে আসছিল! আমি না পারি দাঁড়াতে,না হাঁটতে ! পায়ের নীচ অবধি নেমে এলে কী হ'ত বল মাইরি !'

শেষ করি জাঙিয়া নিয়ে একটা চালু জোক দিয়ে ! অনেকেই জানেন !
এক ভদ্রলোকের কালেকশনে কয়েকটা অসাধারণ জাঙিয়া ছিল। কোনো কারণে সেগুলো বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য ছিল ! তিনি রোজ তাই জিপ নামিয়ে বেরোতেন । দেখুক লোকে ! লোকে সেই জাঙিয়া দেখত,হাঁ হ'ত আর হাসত !ভদ্রলোক তাতে গর্ব অনুভব করতেন !
একদিন ভুলবশতঃ তিনি জাঙিয়া পরতে ভুলে গেলেন আর অভ্যেসবশতঃ তিনি জিপ নামিয়েই রাস্তায় নামলেন ! তাই দেখে একটা ছেলে হাঁ হয়ে গেল ! ভদ্রলোক বললেন দেখ,ভালো করে দেখ... বাড়িতে আরও দু'টো আছে !

0 comments: