Friday, October 12, 2018

বিকেলবেলার জলছাপ

বিকেলবেলার জলছাপ



আজ এই খোলা জানলার পাশে বসে লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে নিজের কথা। নানা বয়সের স্মৃতি সন্ধ্যের বাতাসের মত ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাকে। কিন্তু তাদেরকে লিপিবদ্ধ করতে গেলেই তারা যেন কেমন এলোমেলো হয়ে যায়, ঠিক ভাবে। লেখা হয়ে ওঠে না প্রতি বয়সের অনুভুতি বা আর্তনাদ। কেন-ই বা লিখব সে একান্ত/ই আমার ব্যক্তিগত। তাকে সার্বজনীন    করার কী প্রয়োজন? তবু করতে ইচ্ছে হত। এখনো হয় বারবার। কিন্তু কেন ঠিক বলতে পারবো না। কারণ হিসেবে উঠে আসতে পারে জয় গোস্বামীর একটা লাইন:

"কোনোটা ব্যক্তিজীবনের, কোনোটা চলমান এই জীবন স্রোতের। এই দুই জীবনের ধাক্কা থেকে ছিটকে ওঠে কোনো ছবি, দুইয়ের একাকার হয়ে যাওয়ার মিলনে জন্ম নিতে চায় কেউ।"

          (নিজের জীবন বীজের জীবন: জয় গোস্বামী)

 সেই সদ্যজাতের নাম কবিতা, কিন্তু আত্মজীবনী? রবীন্দ্রনাথ একলা চলতে বললেও আমরা একলা থাকতে পারিনা। জীবনের ক্লেশ, আকাঙ্খা, স্পৃহা,  কারো সাথে ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছা আমাদের প্রত্যেকের। তাতে বেদনাও খানিকটা কমে। কিন্তু উপযুক্ত ব্যক্তির অভাবে পাতারাই হয়ে ওঠে সঙ্গী। জন্ম নেয় আত্মজীবনী। প্রত্যেকটা কবিতাও তাই আত্মজীবনীর অংশ। কারন সেগুলোও কোনো এক একটি মুহূর্তের অনুভূতির প্রতিফলন।

"নিজের জীবন বীজের জীবন" প্রবন্ধে পাওয়া যায়
আরও একটি লাইন -

 "পৃথিবীতে ও পৃথিবীর বাইরেও আমার জীবদ্দশায় যা কিছু ঘটেছে, ঘটবে সব ই আমার আত্মজীবনী"

--আমার মনে হয় কথাটা অসম্পূর্ণভাবে সত্যি। পৃথিবী ও পৃথিবীর বাইরে যেসব ঘটেছে বা ঘটবে তা আমার জীবনে যদি প্রভাব ফেলে তবেই তা আত্মজীবনী। শুধু প্রভাব নয় , সে জিনিস সম্পর্কে জানলাম অথচ কোনো প্রভাব হলোনা, তবে সেটাকে আত্মজীবনী বললেও বলা যেতে পারে।

তিনি এ ক্ষেত্রে উদাহরণ দিয়েছেন, এক সুপারনোভা বিস্ফোরণ -এর । এটা ঠিক সেটা তার আত্মজীবনীর মধ্যে পড়ে কারণ সেই ঘটনা তিনি সংবাদপত্র থেকে পড়েছিলেন কিন্তু তার জীবদ্দশাতেই আরো কত সুপারনোভা বিস্ফোরণ হয়েছে অসীম অন্তরীক্ষে, সে কথা তিনি জানেন না। তবে সেটাকেও কি তিনি আত্মজীবনী বলবেন? মনে হয়, না! মহাকাশ কেন পৃথিবী! তার জীবদ্দশাতেই পৃথিবীতে কোথায় কী ঘটে চলেছে যা তিনি জানতে পারছেন না। তাকেও কি তিনি আত্মজীবনী বলবেন?

 আসলে পরীক্ষার আগেই আমার পড়ার বই ছেড়ে কবিতা পড়তে ইচ্ছে করে। লিখতে ইচ্ছে হয় নিজের কথা। মনে হয় নাম দিই আত্মজীবনীর মত করে। আর মাত্র পনেরো দিন পর আমার মাধ্যমিক পরীক্ষা। তেতালা'র ঘরে জানলার পাশে আমি এখন বসে আছি , প্রতিসরণ এর চ্যাপ্টার লেখা খাতা দূরে ঠেলে দিয়ে গোধূলি দেখছি। পাশে পড়ে আছে "হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষ। "


আমার যখন বয়স ছয় কি সাত তখন কলকাতা বইমেলায় গিয়ে জয় গোস্বামীর কবিতা সংকলন 2 কিনেছিলাম। মনে আছে, যে স্টল থেকে কিনেছিলাম সেখানে স্বয়ং তিনি উপস্থিত। লেখক সুলভ হস্তাক্ষরে বইয়ের উপরে তিনি লিখেছিলেন , "শুভেচ্ছা, জয় গোস্বামী" । তখন তিনি আমার প্রিয় কবি ছিলেন না। তিনি কেন, কেউই ছিলেন না। পড়া তখন এতই বিরক্তিকর ছিল যে পাঠ্য বইয়ের বাইরে কোনো গল্প কবিতা পড়তামও না। তখন ইন্টারনেটও নেই, সারাদিন খেলাধুলা ই ছিল আমার কাজ। যে বইমেলার কথা বলছি তখন কে জয় গোস্বামী , কে কবিতা কিছুই জানিনা। তখন সেই টানা টানা জড়ানো হস্তাক্ষরে সেই দাড়িওয়ালা লোকটা কী যে লিখেছিলেন তা ও বুঝিনি। ফিরে এসে বই টা কোনোদিন খোলার প্রয়োজন ও মনে করিনি।


সেইসময় বাবা মাঝেমধ্যেই  ''বেণীমাধব'' গানটা শুনতেন। মন দিয়ে বা না দিয়ে পুরো গানটা শোনার ধৈর্য্য আমার হতোনা। তখন সবে কোনো একটা বই থেকে বাণী বসুর লেখা "রাসমনি" পড়েছি। সেই গল্পের কাহিনী পড়ার সময় আমার চোখের সামনে যেরকম ছবি ভেসে আসতো, খাটের পাশে রাসমণি ঘুমন্ত ব্যক্তির রক্ত খাচ্ছে। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে 'বেণীমাধব' গানটা হলে ঠিক একই রকম একটা ঘরের ছবি ভেসে উঠত আমার চোখের সামনে। ঘরের দরজার কাছে বেণীমাধব দরজা খুলছে আর গায়িকা তার বাড়িতে আসছে (তখন জানতাম না এটা জয় গোস্বামীর কবিতা) । তখন মনে হতো এত লোক থাকতে মেয়েটা বেণীমাধব এর বাড়ি ই কেন যাবে আর সেখানে গিয়ে কী করবে! তখন বেণীমাধব বলযে বেণী থেকে বিনুনি, আর সে থেকে একটা মেয়ে - তাই মনে হত বেণীমাধব একটি মেয়ে। "রাসমণি" গল্পেও ভ্যাম্পায়ার রাসমণি, নায়িকা রুবির রক্ত খেত। ফলে কল্পনায় গায়িকা হয়ে গেল রাসমণি আর বেণীমাধব হয়ে গেল রুবি। তখন গানের প্রথম লাইনটা শুধু মুখস্ত ছিল,  কিন্তু গাইতাম দুটো লাইন, সেকেন্ড টা ছিল আমার সংযোজন:

"বেণীমাধব বেণীমাধব তোমার বাড়ি যাবো
তোমার বাড়ি গিয়ে তোমার রক্ত চুষে খাবো"

একটা প্রবল হাসি পেল ছয় বছর বয়সের এই ভাবনার কথা ভেবে। এখন বুঝি "মোহন বাঁশি বাজিয়েছিলে তমাল তরুমূলে" র আসল অর্থ!

"তোমায় দেখে এক দৌড়ে পালিয়ে গেছি ঘরে
বেণীমাধব আমার বাবা দোকানে কাজ করে
কুঞ্জে অলি গুঞ্জে তবু, ফুটেছে মঞ্জরী
সন্ধ্যে বেলা পড়তে বসে অঙ্কে ভুল করি"


জয় গোস্বামী র কবিতার সাথে প্রত্যক্ষ পরিচয় আমার হল ক্লাস সেভেন। দুপুর বেলা আমি আর আমার ক্লাস টুয়েলভ এর দিদি খেতে বসেছি , আমার পায়ে মশা বসেছে।
 তখন দিদি বলে উঠল, "কী ফর্সা পায়ের ডিমে মশা - জানিস কার লেখা? অবশ্য তোর জানার কথা-ও নয়, বড়দের কবিতা।

 দিদির এই এক কথা। সব বড়দের! ও যে বয়সে সেটা নিজে পড়েছে সেই বয়সে আমি পড়লেও বড়দের! সে বড় ছোট তখন আমার মাথায় উঠেছে যদিও, বললাম, "কি ফর্সা পায়ের ডিমে মশা -  এটা আবার কোনো কবিতার লাইন হতে পারে নাকি?"
তখনও জানিনা সাহিত্যে কী হতে পারে আর না পারে। আমার জেদে বাধ্য হয়ে দিদি কবিতার বইটা এনে খুললো। তারপর ভাল করে বিধি নিষেধ চাপালো - '"ওইটা ছাড়া আর কোনো লাইন দেখবি না"
আমার মনে হলো কেন দেখবোনা! দিদি ওটা ছাড়া সব লাইন চাপা দিয়ে সেই লাইনটা দেখালো। কিন্তু এত চেষ্টা করে কী হল! সেই লাইনটা তো আর একা নেই -
"শাড়ী একটু উঠে যাচ্ছে" - দেখার সঙ্গে সঙ্গেই ওই কবিতাটা পড়ার আগ্রহ বেড়ে গেল! কবিতার নাম  "প্রেমের....-যাহ দিদি বই বন্ধ করে দিলো! কিন্তু আমার কৌতূহল বেড়ে গেল। দুপুরে বাড়ির সবাই ঘুমালেও আমার স্বভাব ছিল এটা ওটা ঘাঁটা।এইবার দুপুর গুলোতে শুরু হলো সেই কবিতা খোঁজা। সেই কবিতা খুঁজে পেতে বেশ কষ্ট করতে হয়েছিল। কারন কবিতার বই নিয়ে সেই প্রথম আমার ঘাঁটাঘাঁটি আর প্রেম শীর্ষক অনেক কবিতাই সংকলনে রয়েছে। যাই হোক, তারপর একদিন খুঁজে পেলাম সেই "প্রেমের কবিতা" আর তারপর একে একে খুঁজে পেলাম "টিউটোরিয়াল", "কলঙ্ক", "মা আর মেয়েটি", "যে মেয়েটি নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে " বা "প্রেমিক" এর মত কবিতাগুলি যেগুলো নিজের মত অর্থ নিয়ে আমার মনে জায়গা করে নিল।

"নতুন মেঘ পুরানো মেঘে এসে
মিশেছে, এই আকাশভেলা কার?
আবার বায়ু ছুটছে বায়ুবেগে
উপায় নেই অস্তে ফেরবার?"


 সবচেয়ে প্রিয় হয়ে উঠল "মেঘবলিকার জন্য রূপকথা", কবিতার অর্থ আজও সেভাবে বুঝিনা কিন্তু অদ্ভুত ভাল লাগতে পুরো কবিতাটাই মুখস্ত করে নিয়েছিলাম। ছেলেবেলার খেলার মাঠ তো পাইনি। মনে পড়ত গলির ভিতরের দৌড়াদৌড়ি। মনে হত, রাজারানী নেই, ঢাল তলোয়ার নেই, পক্ষীরাজ নেই -এ আবার কেমন রূপকথা!  একে ঠিক কী বলা যায়! বৃষ্টি কি মেঘের জন্য নাকি মেঘ বৃষ্টির জন্য? এসব ভাবতে ভাবতে বৃষ্টি নেমে আসে পাতার উপর।

"সঙ্গে সঙ্গে ঝমঝমিয়ে
বৃষ্টি এল খাতার উপর
 আজীবনের লেখার উপর
বৃষ্টি এল এই অরণ্যে....."


  আমার বায়োলজি ব্যাচ জীবনের সবথেকে স্মৃতিময় এবং প্রিয়।পড়তে আমার কোনো কালেই ভালো লাগত না ,কিন্তু ওখানে পড়তে গিয়ে পড়াটাকে ভীষণ আনন্দের মনে হতো। জানি বায়োলজি রাখব না আর, পড়তে হবে ইকোনমিক্স নিয়ে।গত সপ্তা'য় ছিল পড়ার শেষ দিন,সেদিন অন্য স্কুলের বন্ধুরা যাথের সাথে হয়তো আর কোনো দিনই দেখা হবে না তাদের জন্যও হলো মন খারাপ। স্যার এর সাথেও সেই শেষ দেখা।পরীক্ষার ভয় তো আছেই তাছাড়া বিচ্ছেদের মন খারাপ নিয়ে শেষ বার পড়া বুঝলাম স্যার এর থেকে। দেওয়ালে আটকানো একটা গরুর কাটিং,পড়া না পারলে স্যার বলতেন ওই গরুটা আমরা, সেদিনও সেটা দেওয়াল থেকে নির্লিপ্ত ভাবে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। স্যার প্রতিদিন সুগন্ধী ধূপ জ্বালাতেন পড়ার ঘরে, তখনও ধূপ পোড়া ছাই ঘরের এক কোণে পড়ে আছে, আমাদের পিছনের দরজা ঠেলে সেদিনও ঘরে ঢুকে পড়েছিল স্যার এর বেড়াল।

আমরা চারজন , যারা ছিলাম স্যারের খুব প্রিয় স্টুডেন্ট অথচ মাধ্যমিকের পর কেউ-ই আর বায়োলজি রাখবনা, ফেরার আগে স্যারকে প্রণাম করতে গিয়ে কাঁদলাম খুব।

তারপর বাড়ি ফিরলাম। ফিরতে ফিরতে মনে পড়ল দুটো লাইন,

"ছাত্রীদের মন ভালো।
যাওয়ার আগে ডালপালা ভেঙে শ্রদ্ধা নিয়ে গেছে।
আহত গাছের থেকে টপটপ রক্ত অশ্রু
মাটিতে চুপচাপ শুষে যায়।"


স্মৃতিগুলো একসময় মনের মধ্যেই মরে যাবে জানি, ফিরে আসবেনা এত টা বেদনা নিয়ে নিয়ে যতটা এখন হচ্ছে,

"ছাত্রীরা দেখল ভোরে উঠে
চাদর, বালিশ আর শোওয়ার ঘরের মেঝে ছেয়ে
মরে পড়ে আছে পুষ্পডাল"


এভাবে যখনই খুশীতে লাফিয়েছি বা যখনই কষ্ট পেয়েছি বদ্ধ দরজার আড়ালে তখনই বারংবার জয় গোস্বামীর কবিতা আমাকে আশ্রয় দিয়েছে। হয়তো বুঝিনি, কিন্তু তবু মনটা অদ্ভুত স্থিতিশীল হয়ে গেছে। অন্ধকারে অবরুদ্ধ কান্নায় এক একদিন মনে হয়েছে আমার জীবনের কল্পিত প্রেমিকের অবয়ব ই যেন জয় গোস্বামীর মত।

মেঘ ডাকবার বইয়ের মধ্যে থেকে নদীর অংশ হয়ে দূরে বেঁকে যায় সে, উদ্ভিদচারা থেকে রোপিত হয় জঙ্গল, ঝর্ণা থেকে সৃষ্টি হয় জলপ্রপাত আর পেজ মার্কারের সাদা পালক হাঁস হয়ে উড়ে যায় পরিযায়ী প্রেমের পথে।

কবিতার অর্থ আসলে এই প্রেমিকের ই মত। এক একটা বয়সে তার এক একটা জানলা খুলে যায়। আর সেই ঘরের দরজাটা খুঁজে যেতে হয় হয়তো সারাজীবন ধরে। আদৌ কি পাওয়া যায়?


"প্রথমে বুঝিনি, কিন্তু আজ বলো, দশক শতক ধ'রে ধ'রে
ঘরে পথে লোকালয়ে স্রোতে জলস্রোতে আমাকে কি
একাই খুঁজেছ তুমি? আমি বুঝি তোমাকে খুঁজিনি?"

লিখছেন : আত্রেয়ী রায়।

0 comments: