Monday, October 1, 2018

গল্প : পোষ্টমর্টেম

     পোষ্টমর্টেম            


গল্প : পোষ্টমর্টেম,bangla golpo,choto golpo,golpo
গল্প : পোষ্টমর্টেম


সকাল থেকেই তিতলির মনটা বড্ড ভার হয়ে আছে। মায়ের সাথে দীর্ঘ ন'বছর কাটিয়ে আজ তার মনে হল, 'মা আমায় মোটেই ভালোবাসেনা। '
তিতলিরা সবাই ওর মাসির বাড়িতে এসেছে, মাসির মেয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে। ঘুম থেকে উঠে অবধি আজ একবারো মা-কে দেখতে পায়নি। মা সারাক্ষণ ব্যস্ত। তিতলিকে আজ একটু আদর পর্যন্ত করেনি। সন্ধ্যের দিকে মা যেই না ওর স্কুলের গল্প শুনতে বসেছে ওমনি,সাত-আটজন ভারী ভারী গয়না পরা আন্টি মা-কে ডেকে নিয়ে চলে গেল! সেদিন তিতলি প্রথমবার মা-কে ছাড়াই ঘুমিয়েছে।ওর ঘুমোনোর পর অনেক রাতে মা বিয়ের সব কাজ সেরে ঘরে এসেছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠেও বেচারা মা-র দেখা পায়নি, তার আগেই মা উঠে গেছে!
একটু পরে তিতলিকে খাবার দিতে এসে মা বলে গেল, 'আজ রাতে দিদিয়ার বিয়ে। আমি আর বাবা খুব ব্যস্ত।আজ কোনো দুষ্টুমি নয়। এই ঘরের মধ্যেই থাকবে,কেমন?'
এত অবহেলা মোটেই মুখ বুজে সহ্য করা যায়না!
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে, পিছনের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো তিতলি। বড়ো রাস্তাটার ধারে, কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এর আগে একা কখনো বাইরে বেরোয়নি,তাই 'হাঁ' করে রাস্তা দিয়ে পেরিয়ে যাওয়া গাড়ি-ঘোড়া, লোক-জন দেখতে থাকে। সব্বাই ছুটছে। পাশের জনকে ধাক্কা মেরে,মাটিতে ফেলে ছুটছে।ঠিক যেমন করে মনস্টার তাড়া করলে,সবাই ছোটে, তেমনি করে ছুটছে! তিতলিকে কেউ দেখছে না, এমনকি প্রিন্সেসের ছবি দেওয়া হেয়ার-ব্যান্ডটাকেও না!
এখানে সবকিছু কেমন যেনো উল্টো। কেউ
 রোগা-প্যটকা শরীরে,ভারী ভারী বস্তা পিঠে চাপিয়ে, নুয়ে-নুয়ে হাঁটছে আবার কেউ গনেশ ঠাকুরের মতো নাদুসনুদুস ভুঁড়ি নিয়ে, দোকানে বসে খাচ্ছে! রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে,তিতলির মতো একটা মেয়ে, খাবারের বোঝাটা নিজে বইতে চাওয়ায়,ফেলে দেবার ভয়ে ওর মা বকছে,আবার ওরকম বয়সেরই একটা মেয়ের দিকে তার মা এঁটো প্লেটগুলো মাজার পর ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে ধোয়ার জন্য, মেয়েটা কিন্তু একবারও ক্যাচ মিস করছে না!
তিতলি অবাক চোখে সবকিছু দেখে যাচ্ছে।হঠাৎ যেন ফ্রকটায় একটু টান পড়ল। সচকিত হয়ে সামনে তাকিয়ে দেখে, 'দাদা-দাদা' দেখতে একটা ছেলে ওর দিকে তাকিয়ে আছে!
----কি হয়েছে?একা-একা দাঁড়িয়ে যে? বাড়ির রাস্তা ভুলে গেছো?
----নাহ্!
----তবে?
তিতলি এক নিশ্বাসে সব ঘটনা লোকটাকে বলে চলল।
এমনিতে তিতলি খুব সহজে কারোর সাথে মেশে না,তবে এই লোকটাকে দেখে কেমন যেন 'ভালো ভালো' মনে হল। গাল ভর্তি খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, কোঁকড়া চুলগুলো ঘাড় ছাড়িয়ে এবার কাঁধে ঠেকার উপক্রম করছে!
তিতলির কথা শুনেই লোকটা হো-হো করে হেসে উঠল।
----সত্যি, খুব মর্মান্তিক ঘটনাই বটে! তা, বাড়ি কখন যাবে?
----বাড়ি যাবো না কক্ষনো।
----বেশ!আমার সাথে যাবে?
----কোথায়? তুমি কি 'ছেলেধরা'?
----হুঁ, সেরকমই কেউ!
ছেলেধরা শুনেও কেন জানিনা,তিতলি তার গোটা একটা হাতে করে, প্রাণপণে লোকটার শক্ত দুটো আঙুল আঁকড়ে ধরে হাঁটতে শুরু করল।
----তোমার নাম কি গো?
----নীল। ভালো নামও অবশ্য একটা আছে ,তবে সেটা বলব না। তোমার নাম?
-----তিতলি।
কথায় কথায় লোকটা তিতলির ঔটুকু জীবনের সবকিছু জেনে নেয়। হাঁটতে হাঁটতে ওরা এসে পৌঁছায়, একটা ফুটপাতের ধারে। শয়ে-শয়ে লোক, অ্যালুমিনিয়ামের চ্যাপটা বাটি নিয়ে, হাপিত্যেস করে বসে আছে।
----ওই যে ওরা!কি খায় দেখবে?
বলেই, একটা ডাস্টবিনের দিকে হাত বাড়ায় লোকটা।তিতলি দেখে, ডাস্টবিনটার চারপাশে মাছি ভনভন করছে।অসহ্য একটা দুর্গন্ধে,মাথাটা দপদপ করছে। আর চার-পাঁচটা বাচ্চা সেখান থেকে খুঁজে পাওয়া খাবারগুলো,কাড়াকাড়ি করে খাচ্ছে। ওদের মুখের 'হাঁ'গুলো অসম্ভব বড়ো, চোখে হিংস্র দৃষ্টি, গায়ে কোথাও একটা সুতো পর্যন্ত নেই,সারা শরীর জুড়ে শুধু ধুলো আর লালার মাখামাখি!
সকালে খাওয়া দুধ-কর্নফ্লেক্সটা যেনো তিতলির গলা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে, লোকটার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে চিৎকার করে উঠল,'অন্য কোথাও নিয়ে চলো '।
আরেকটু এগিয়ে গিয়েই,তিতলি থমকে দাঁড়ায়।
----এদের দেখছো? অজানা-অচেনা গাড়ি এসে এদের মেরে দিয়ে চলে যায়, তারপর এরা এভাবেই পড়ে থাকে সারাজীবন।
তিতলি দেখে আট-দশটা লোক এখানে-সেখানে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে রয়েছে। এদের কারোর দুটো হাত নেই বা পা নেই,সবাই ধুলোতে বসে গোঁগাচ্ছে !
সিন্ডেরালা, বারবি,নীলপরী-লালপরী সব যেনো মাথার মধ্যে জট পাকিয়ে যেতে লাগল। ওদের দিকে তাকিয়েই আনমনে তিতলি বলে উঠল,
   'নিয়ে চলো!'
ওরা এসে দাঁড়াল একটা ইঁটভাটার সামনে। তিতলির থেকে প্রায় দু-তিন বছরের ছোটো,হাজার হাজার বাচ্চা মাথায় করে ভারী ভারী ইঁট বইছে। পড়ে গিয়ে কারোর কারোর পা দিয়ে রক্ত ঝরছে, তবুও ওরা হাঁটছে.... জিব বার করে হাপাচ্ছে, মালিক এসে লাথি মারতেই, আবার হাঁটছে....
কেউ-কেউ আবার পিঠে আরও ছোটো কোনো ভাইবোনকে বেঁধে, হাঁটছে.....
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা 'বাজে লোকটার' জিন্সের জামায় মুখ ঘষতে ঘষতে, ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে তিতলি। মুখের ওপর পড়া চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে, লোকটা কোলে তুলে হাঁটতে শুরু করে।
তিতলির মাথায় তখন থেকে শুধু একটাই কথা ঘুরছে, 'পোষ্টমর্টেম!'
বাবাকে জিজ্ঞাসা করে, এর মানে জেনেছিল তিতলি। 'এটাই কি তবে সেই পোস্টমর্টেম?!'
সকালে যে জায়গাটায় তিতলি দাঁড়িয়েছিল, লোকটা ঠিক সেখানেই এনে নামিয়ে দিল। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
'বাড়ি চলে যেয়ো কেমন? '
তিতলি লক্ষী মেয়ের মতো ঘাড় নাড়ল।
বাড়িতে ততক্ষণে হুলুস্থুল কান্ড বেঁধে গেছে। পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে। তিতলির মা,সেই সকাল থেকে একঘেঁয়ে সুরে কেঁদেই চলেছে।
তিতলি বাড়ি ঢুকতেই,মা-বাবা দুজনে একসাথে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।বাবার এতক্ষণ আটকে রাখা কান্নার বাঁধ ভাঙল।দুজনে মিলে আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে লাগল আপেলের মতো গালদুটো। তিতলি তখনো কেঁদে চলেছে, তবে ওর  'এই' কান্নাটা দেখতে বাড়ির কেউই অভ্যস্ত নয়। বাচ্চামেয়েটা আকাশের দিকে চেয়ে রয়েছে শুধু, আর চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নেমে আসছে। অনেকক্ষণ ধরে প্রশ্ন করার পর, অবশেষে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে, ভারী গলায় মেয়েটা বলে উঠল,
'ওদের একটু খেতে দেবে প্লিজ?'

 © Aratrika Chakraborty

0 comments: