Monday, October 15, 2018

ঋণশোধ

                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                             

ঋণশোধ

আজকেও কাজে যেতে দেরী হয়ে গেল অলকার। গত দুদিন ধরে শ্বাশুড়ির জ্বর, ঘরের সব কাজ সেরে তারপর বেরোতে হচ্ছে ওকে। কিন্তু গরীবদের কষ্ট কি আর চোখে পড়ে কারোর? অনেক কষ্ট করে তিনটে বাড়ির কাজ পেয়েছে। আজ মনে হচ্ছে একটা গেল। একই পাড়ায় পরপর তিনটে বাড়ীর কাজ পেয়েছে। প্রথমে ঘোষ বাড়ির কাজে হাত দেয়। ঘর মোছা আর বাসন মাজা, ব্যস্ , মাসে আটশ টাকা। তারপর যায় মজুমদার বাড়ি। ওখানে কাজ টা একটু বেশি। ঘর মোছা, কাপড় কাচা, বাসন মাজা আর সকালের ব্রেকফাস্ট তৈরি করা। ওই বাড়ির বৌদি চাকরি করে তাই সকালের জলখাবার করার টাইম পায় না। শনি, রোববার টা বৌদির ছুটি তাই সেইদুদিন অলকাকে টিফিন করতে হয়না। এখানে পায় হাজার টাকা। শেষ বাড়ি টা হল রায় বাড়ি। এই বাড়ির বৌদি, মানে পূজা বৌদি ভীষণ ভাল। দাদা পুলিশের বড় পোস্টে আছে, অরিন্দম রায়। সবে দুই মাস হয়েছে বিয়ে করেছে। তারপর এই রানিগঞ্জে পোস্টিং হয়ে এসেছে। এই বাড়ির কাজটা ঘোষ বৌদিই জোগাড় করে দিয়েছে। এই বাড়িতে কাজ সবচেয়ে বেশি। পূজা বৌদির অল্প বয়স, তার ওপর নতুন বিয়ে, গুছিয়ে সব কাজ করতে পারে না। তাই বাকি সব কাজের সাথে তিনবেলার রান্নাটাও করে দিয়ে আসতে হয়। টাকাটাও তো কম পায়না, আড়াই হাজার।

"কি ব্যাপার তোমার অলকা, কটা বাজে দেখেছ? এত বেলা অবধি বাসি ঘর ফেলে রাখতে হয়? বাসন গুলোও পরে আছে ।কি যে করনা।" বাড়ি তে পা রাখার সাথে সাথে ঘোষ বৌদি শুরু করল।
"এই তো বৌদি, আমি এক্ষুনি সব করে দিচ্ছি। কি করব বল, শ্বাশুড়ি দুদিন হল জ্বরে পরে আছে। ওদিকটা সব গুছিয়ে আসতে হল, তাই দেরি হয়ে গেল। "আর সময় নষ্ট না করে ঝটফট সব কাজ সেরে ফেলল। নটা এখানেই বেজে গেছে। পরের বাড়িতে যেতেই মজুমদার বৌদি কিছু কড়া কথা শুনিয়ে দিল। এর পরদিন দেরি হলে যে কাজটা চলে যাবে সেটাও জানিয়ে দিল। মুখ বুজে মেশিনের মত সব কাজ করে ফেলল অলকা। হাঁফিয়ে উঠেছে। পূজা বৌদির কাছে কেমন আপ্যায়ন পাবে কে জানে। কলিংবেল বাজাতেই হাসিমুখে দরজা খুলে দিল বৌদি। " দেরি হয়ে গেল বৌদি, রাগ করো না"। পূজা কিছু বলার আগে নিজেই দোষ স্বীকার করে নিল অলকা।
"আরে ধুর, রাগ করব কেন? দেরী হতেই পারে। তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই, তোমার দাদা ভোরেই বেড়িয়ে গেছে কোলকাতায়। সেই রাতে ফিরবে। তুমি আগে চা কর, দুজনে মিলে খেতে খেতে গল্প করি, তারপর বাকি কাজে হাত দিও। "
"তুমি সত্যিই ভাল মানুষ গো বৌদি, দেখ তোমার খুব ভালো হবে। "
"আচ্ছা, আচ্ছা। এখন চা টা কর যাও। "

রাত হলেই এখন ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে অলকা। আবার শুরু হবে অমানষিকতার সিনেমা। শ্বাশুড়ি এখন ভালো আছে। "আপনি খেয়ে শুয়ে পড়ুন মা, রাত হল।" অলকা চায়না রাতের ছবিগুলো বুড়ি শ্বাশুড়ি দেখুক। কদিনই বাঁচবে, বয়স, রোগ আর দারিদ্র্য তিনটেই তো যমের মত মাথার সামনে দাঁড়িয়ে। " তুই কি ভাবিস, আমি চোখ বুজে থাকি মানেই কি ঘুমাই? আসলে চোখটাকে বুজে রাখি যাতে নিজের পেট থেকে বেড়োন পাপের কার্যকলাপ না দেখতে হয়। আমাকে তুই  ক্ষমা করে দিস মা"।শ্বাশুড়িকে হাত জোর করতে  দেখে অলকা হাতটা নামিয়ে দেয়, চোখের জলটা মুছিয়ে দেয়, " এরকম কথা বোল না মা,তুমি কেন ক্ষমা চাইছ? তুমি আছ বলেই তো মনে জোর পাই "।..."কিন্তু আমি আর কদিন বাঁচব? তারপর তুই... " পরের টা পরে দেখা যাবে এখন এসো, খেয়ে নাও। " শ্বাশুড়ির খাওয়া শেষে ওষুধ দিতে দিতেই দরজায় আঘাত পড়ল,
"এই শালি, দরজা খোল। " চিৎকার করছে অলকার স্বামী, বাদল, যার হাত ধরে বাবা মা কারোর কথা না ভেবে পালিয়েছিল, বিয়ে করেছিল। এই সেই পতিদেব। দরজা খুলে দিল অলকা। আকন্ঠ মদ গিলে ঘরে ঢুকল বাদল, সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেনা।
অলকার চুলের মুঠিটা ধরে দেওয়ালে ঠেসে দিল, " দরজা খুলতে এত দেরী করলি কেন মাগী? " অলকার মুখটা কুঁকড়ে গেছে, কোনরকমে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল জানোয়ারটার হাত থেকে। " মাকে ওষুধ খাওয়াচ্ছিলাম "। সজোরে গালে একটা চড় পরল, " ওষুধ খাওয়াতে এত সময় লাগে, আমাকে শেখাচ্ছিস? " পাশের ঘরে বাদলের মার দুচোখ দিয়ে জল পড়ছে, ছেলের এই পাশবিকতা আর সহ্য করতে পারছেনা।
"খেতে দেব? " অলকা জানতে চাইল।
" না, তোর ঐ ফালতু রান্না, সব শাক পাতা তুই খা আর ঐ বুড়ি মাগী টাকে খাওয়া।"
কথা না বাড়িয়ে অলকা নিজে খেয়েনিল।ওর তো না খেয়ে থাকলে চলবে না, ওকে যে খেটে খেতে হয়, তাছাড়া এই অত্যাচার গুলো সহ্য করতে গেলেও তো শরীরে জোর রাখতে হবে ওকে। খাওয়া হয়ে গেলে শুয়ে পড়ল আলো নিভিয়ে। একটু পরে বুঝতে পারল একটা জানোয়ারের থাবা ওকে টেনে নিচ্ছে তার দিকে, একটা হিংস্র, ক্ষুধার্ত পশুর মত ঝাপিয়ে পড়ল অলকার ওপর, আর আঁচড়ে খুবলে খেতে লাগল। একবার নয়,কখনও কখনও সারা রাতে ইচ্ছেমতো পশুটা তার ক্ষিদে মেটায়। আজকেও তাই হল। রোজ রাতে যন্ত্রণায় অলকা বালিশে মুখ গুজে কাঁদে, যাতে আওয়াজ না হয়।ক্লান্ত পশুটার ঘুম ভেঙে গেলে আবার যে মার খেতে হবে ওকে।

দুই বাড়ির কাজ সেরে অলকা পূজা বৌদির বাড়ি গেল । গা-হাত-পায়ে সাংঘাতিক ব্যথা। কাল রাতের অত্যাচারটা যেন এখনও নাড়িয়ে দিচ্ছে তার শরীরকে। "একি? তোমার কপালটা কাটল কি করে? " পূজা বৌদির চোখে কিছুই এড়ায় না। আর কোন বৌদির চোখে তো পড়ল না। "ওই দেওয়ালে লেগে দিয়েছিল " কথাটা ঘুরিয়ে দিতে চায় অলকা। "সত্যি বলছ? "  আরও কাছে গিয়ে অলকার হাতে কালশিটের দিকে ইশারা করে দেখাল পূজা, "এটা তাহলে কিসের দাগ?নিশ্চয়ই চোখের বদলে ভুল করে এখানে কাজল পড়েছিলে।তাই তো?" বৌদির চোখ এড়িয়ে কিছু যায়না। "আমাকে বল, হয়ত কোনব্যাপারে তোমাকে হেল্প করতে পারি"। আর চেপে রাখতে না পেরে কেঁদে ফেলল অলকা। "ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়েছি বৌদি, খুব গরীব ছিলাম, তাও বাবা কষ্ট করে পড়িয়েছিল। কিন্তু আমি তার দাম দিলাম না। স্কুল যাতায়াতের পথে বাদলের সাথে পরিচয়, প্রেম। পড়াশোনা লাটে উঠল। দুচোখে তখন শুধু বাদল আর বাদল। বাদল বলত আমাকে ছাড়া ও বাঁচবে না। বাবা একদিন জানতে পেরে খুব মারল। তখন আমার কাছে বাদল ছাড়া কেউ ভলো না, বাবা - মা তো সব থেকে খারাপ। নিমেষের মধ্যে ভুলে গেলাম সব, এক রাতে বাবা -মা কে কাঁদিয়ে বাদলের হাত ধরে পালিয়ে এলাম সোজা মালদা থেকে এই রানীগঞ্জ। আমি আগে মালদায় থাকতাম, বাদল ওখানে ওর এক বন্ধুর বাড়ি ঘুরতে গিয়েছিল। বাদলের মা খুব ভালো ,উনি আমাকে মেয়ের মত ভালোবাসতেন, এখনও বাসেন, নিজের ছেলের থেকেও। প্রথম প্রথম খুব ভালো কাটছিল, অভাব ছিল, ডাল ভাত খেতাম, তাও দুবেলা জুটত না কোনকোনদিন, তবু বাদলের ভালোবাসায় সব মানিয়ে নিয়েছিলাম। আমার শ্বশুর ছিল না, তাই বাদলের ওপর সব চাপ ছিল। ইঁটভাটায় কাজ করত। দুটো বেশি টাকা সংসারে আসবে ভেবে আমিও ওর সাথে ইঁটভাটায় কাজে ঢুকলাম। বেশ চলছিল।তুমি নিশ্চয়ই দাদার মুখে ছানু গুন্ডার নাম শুনেছ, ওই ইঁটভাটাটা ছিল তার। একদিন হঠাৎ কেমন সব কাজ করছে দেখার জন্য সেখানে ছানু এল। আমার ওপর কুদৃষ্টি গেল ওর। বিনা কারনে অফিসে ডেকে পাঠাত। শকুনের মত তাকিয়ে থাকত আমার দিকে যেন পেলেই খুবলে খাবে। বাদলকে বললাম সব। ও বিশ্বাস করল না, আমাকে বোঝাল, যে সব আমার মনের ভুল। ছানু একবার আমাকে জড়িয়েও ধরেছিল, সেদিন কোনররমে পালিয়ে এসেছিলাম। তারপর আর যাই নি। কিন্তু তারপর থেকে বাদল যেন কেমন হয়েগিয়েছিল। ছানুদের সাথে মেলামেশা শুরু করল। মদ, গাজা,মেয়েমানুষ সব কিছুর নেশায় আসক্ত হয়ে উঠল সে। সংসারে কোন টাকাপয়সা দিতনা। টাকা চাইলেই ক্ষেপে যেত। তারপর শুরু করল অত্যাচার আমার ওপর, শারীরিক,মানসিক
দুটোই। শ্বাশুড়ি মা আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তাঁকে, নিজের মা কেও মারতে ছাড়তনা। বুড়ি মানুষটা আমার ওপর নির্ভরশীল, তাই ছেলে অমানুষ বলে আমি তো আর মনুষ্যত্ব ভুলতে পারিনা। তাই কাজে নামলাম।যা মাইনে পাই, তার থেকেও ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এখন আফসোস করা ছাড়া আর কিছু করার নেই। মানুষটা চোখের সামনে কিভাবে পাল্টে গেল। আমাকে সহ্যই করতে পারছেনা। কাছে গেলেও মারছে, না গেলেও খিস্তি দিচ্ছে, মারছে। " আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছল।
" এখন সকালে বেডো়য় ,রাতে ঢোকে, কোনদিন আসেও না। সারাদিন ঐ ছানুর সাথে ঘুরে গুন্ডামি করে, তোলাবাজি করে, সাট্টা খেলে। "
চুপ করে পূজা শুনল সব কথা। " তুমি কি বাদলকে ছেড়ে থাকতে পারবে? "
"মানে? " অলকা অবাক হল পূজার এই প্রশ্ন শুনে ।
"এরকম স্বামী থাকার থেকে না থাকা ভাল। ব্লাডি রাস্কেল। " রেগে চেয়ার ছেড়ে উঠে গেল পূজা। " অনেক তো চেষ্টা করলে, পারলে ফিরিয়ে আনতে? তোমার তো ছেলেপুলেও হয়নি, তাই পিছুটানও থাকার কথা না, তাই না? ছেড়ে দাও, ওরকম লম্পট লোকের সাথে থেকে তিলতিল করে আর বাঁচতে হবে না। " একনাগাড়ে কথাগুলো বলে পূজা দম নিল।
হাসল অলকা, " কি যে বল বৌদি, কোথায় যাব? কে আশ্রয় দেবে আমায়? "
" তুমি আমার কাছে থাকবে। তোমাকে বলা হয়নি, কাল রাতে তোমার দাদা বাড়ি ফেরার পথে রিপোর্ট নিয়ে এসেছে, আমি প্রেগনেন্ট।" "সত্যি! আরেব্বাস, এতো দারুন খবর। " পূজা হাসল, "তাহলে বলো তোমার দায়িত্ব কি বাড়ল না? " "কিন্তু বৌদি...."  "কোন কিন্তু নয় অলকা, তুমি আমার কাছে চলে আসছ, ব্যস্। "

বাড়ি পৌছতেই অলকার চোখে পড়ল ভিড়। দৌড়ে এগিয়ে গেল, ঘরে ঢুকে দেখল শ্বাশুড়ি মেঝেতে পরে আছে। কাছে গিয়ে হাঁটু মুড়ে ধপ্ করে বসে পড়ল, জড়িয়ে ধরল শ্বাশুড়িকে, কত ডাকল, কিন্তু উঠল না ওর শ্বাশুড়ি মা, চিৎকার করে কেঁদে উঠল অলকা।ওযে একা হয়ে গেল, এই মানুষটাই তো ছিল, যে ওকে বুঝত, ভালবাসত। এখন কি করে থাকবে অলকা? পাশ থেকে কে যেন বলল, "বাদল কে খবর টা দাও। "
পাশের বাড়ির কাকিমা এসে অলকাকে সামলাতে লাগল, " আমি তোমার শ্বাশুড়ি কেমন আছে দেখতে এসোছিলাম। এসে দেখি এই ভাবে মেঝেতে পড়ে আছে। মনে হয় মাথা ঘুরে গেছিল। কি আর করবে বল, সবই কপাল। " বাদলকে কোথাও পাওয়া গেলনা। প্রায় এক ঘন্টা হতে চলল। অনেককষ্টে পাড়ার একটি ছেলে বাদল কে নিয়ে এল, " বৌদি, ছানুর ভাটিঁখানায় অবশেষে পেলাম। " বাদল নিজের পায়ে দাঁড়াতেও পারছেনা। কাঁদতে কাঁদতে অলকার চোখের জল শুকিয়ে গেছে। শ্মশান কাজ শেষ হতে রাত হল। পাড়ার লোক এসে বাদলকে দিয়ে গেল বাড়িতে। মেঝেতে কোনরকমে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ল। অলকা সারারাত শ্বাশুড়ির খাটের সামনে বসে কাটিয়ে দিল।

দুদিন ধরে কাজে গেলনা অলকা, পাশের বাড়ির ছেলেটাকে দিয়ে তিনবাড়িতে খবর পাঠিয়েছিল।  দুদিন ধরে  বাদলও বাড়ি ফেরেনি। তিনদিনের দিন কাজে গেল। পূজা বৌদি সব শুনল, " তোমার দাদা এলে দেখি বলে। যদি খোঁজ পাওয়া যার। কিন্ত তুমি কি করবে এখন?" অলকাকে চুপ করে থাকতে দেখে অলকা কাছে এসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল " ওই বাড়িতে কার কাছে থাকবে? একা থাকলেই তো পশুগুলো তোমার ওপর ঝাপিয়ে পড়বে। তুমি আমার কাছে আমার বোন হয়ে থাকবে। " অলকা ভেবে দেখল বৌদি ঠিক কথাই বলেছে। এইটাই ওর জন্য সব থেকে নিরাপদ জায়গা। রাজি হয়ে গেল সে। পূজা খুব খুশি হল।
 
দুদিন পর থানা থেকে ফিরতেই পূজা এগিয়ে এল, " কি গো, কোন খবর পেলে?"
"না, তবে খোঁজ চলছে। ওদের দলের দুজনকে ধরা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে, কিছু না কিছু খবর ঠিক পাওয়া যাবে। "
রান্নাঘর থেকে সবই শুনল অলকা। কোথায় যে গেল মানুষটা, কে জানে? অলকা বুঝে উঠতে পারল না ,যে মানুষটার প্রতি ওর ঘেন্না আসা উচিত, তাকে নিয়ে কেন ও চিন্তা করছে? নিজের ওপরই রেগে গেল,   "মরণও হয়না আমার।"

"পূজা,পূজা" বাড়ি ফিরেই চিৎকার করল অরিন্দম। "আরে এই তো আমি। খেতে দেব?" থানাটা কাছে বলে অরিন্দম লাঞ্চ টা বাড়িতে এসেই করে। খাওয়া শেষ হতেই, ফোন বাজল। " হ্যালো, হুম বলছি। কি? ওকে... ওকে, আমি আসছি। " ফোনটা রেখে পিছন ফিরেই দেখল পূজা দাঁড়িয়ে, "অলকাকে ডাকো, আমার সাথে যেতে হবে।" "কোথায় দাদা? " অলকা টেবিল পরিস্কার করতে করতে জিজ্ঞেস করল।
একটু ইতস্ততঃ করে অরিন্দম বলল, "ইঁটভাটার পিছনের খালে একটি বডি ভেসে উঠেছিল।ওখানে যারা কাজ করে তারা দেখে পুলিশে খবর দেয়। " অলকা আন্দাজ করতে পারল পরে কি শুনতে চলেছে। চেয়ারের হাতলটা শক্ত করে ধরে থাকল। পূজাও কেমন থতমত খেয়ে যেন দাঁড়িয়ে থাকল। "একবার যেতে হবে অলকা। তুমি শনাক্ত করলে আমরা সিওর হব ওটা বাদলের..... " পূজার ইশারায় চুপ করে গেল অরিন্দম। পূজাও সাথে যেতে চাইল, কিন্তু অলকা কিছুতেই রাজি হলনা। এই কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা যে ওকে একাই করতে হবে।

নদীর স্রোতের মত সময় বয়ে যেতে থাকল। রানীগঞ্জ থেকে ওরা কলকাতায় চলে এল। অরিন্দম একটা সুন্দর দোতলা বাড়ি কিনে ফেলল। পূজার এখন একটা জায়গায় সেট্ল হওয়াটা দরকার।

জীবনে সবটুকু হারিয়ে অলকা আবার নতুন করে বাঁচতে শিখছে। কোথাও কোন পুণ্যির কাজ হয়ত করেছিল, তাই পূজা বৌদি আর অরিন্দম দার মত মানুষ ওর জীবনে এসেছে। এরকম মানুষ আজকালকার দিনে দেখাই যায়না। পূজা বৌদি অলকাকে সবার কাছে নিজের বোন বলে পরিচয় দেয়। দাদাও ওকে বোনের মত দেখে, ওকে যথাযথ সম্মান দেন। অলকা ভাবে ওকি সত্যি এত যত্ন, সম্মান, ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য? পূজা বৌদি ওকে একটা সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছে। সেলাই এর কিছু কাজ ও আগে থেকে জানত। আবার নতুন করে শিখল। এক মাসের মধ্যে ও ভালো কাজ শিখে গেল। এলাকায় ওর কাজের বেশ সুনাম হল। অরিন্দম বাড়ির একতলাতে ওর জন্য স্কুল খুলে দিল, যেখানে অলকা সেলাই শেখাতে শুরু করল।
অলকা আজ অনেকটাই আত্মনির্ভরশীল। এর জন্য ও সারাজীবন পূজা বৌদি আর অরিন্দম দার কাছে ঋণী হয়ে থাকবে। অলকা আপ্রাণ চেষ্টা করে ওদের ভালো রাখার, দেখাশোনা করার। পূজা বৌদির ডেলিভারির দিন এগিয়ে আসছে। অলকাও মন দিয়ে যত্ন করছে তাকে। ঠিক সময়ে খাবার, ওষুধ সব কিছু ও নিজের হাতে দিচ্ছে।  কোনভাবেই কোন কিছুর ত্রুটি যেন না থাকে সেদিকে অলকা সবসময় খেয়াল রাখছে।

" এত দেরী হচ্ছে কেন অলকা ?" ও. টি র বায়রে দাঁড়িয়ে ছটফট করতে করতে বলল অরিন্দম। অলকারও চিন্তা হচ্ছে। একটু পরেই ডাক্তার বেড়িয়ে এল। একটি সুন্দর ফুটফুটে মেয়ের জন্ম দিয়েছে পূজা। আজকের দিনটা যে কি আনন্দের। অরিন্দম আর অলকা দুজনে পূজা আর বেবিকে দেখার জন্য ছটফট করতে লাগল। পূজা ভালো আছে। অলকা একদৃষ্টিতে দেখতে লাগল বেবিকে। ওর তো নিজের সন্তান হলনা, তাই ওর জীবনে এই বেবীটা যেন পরীর মত। " দাদা, এর নাম পরী দিলে হয়না? " আবদারের দৃষ্টিতে অরিন্দম এর দিকে তাকাল অলকা। "পরী? বাহ্, নাইস নেম। আর এ তো সত্যি আমাদের এঞ্জেল। থাক, পরী নামটাই থাক। "

পরীর আজ মুখেভাত। অরিন্দম, পূজার দুই দিকেরই কোন আত্মীয় স্বজন নেই।দুজনের বাবা মাও মারা গেছে। তাই, অরিন্দম এর কয়েকজন সিনিয়ার, জুনিয়ার অ্যাসোসিয়েটস, আর পাড়ার কয়েকজনকে নিয়ে ছোট করে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে বাড়িতে। অলকা পরী কে সাজিয়ে দিচ্ছিল। " আজ আমার পরী সোনাকে আমি পরীর মতো করেই সাজাবো। তাই না সোনা? " হলো তোমার মেয়েকে সাজানো? " দাদা, বৌদি যে কখন পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিল, খেয়ালই করেনি অলকা। " দেখো বৌদি আমাদের পরীরাণীকে, এরকম সুন্দরী পরী কি কেউ দেখেছে ? আবার কেমন পাকা হয়েছে দেখ, সাজার সময় কোন কান্নাকাটি নেই, এখন থেকেই সাজুনি হয়েছে "। তিনজনেই হেসে উঠল একসাথে। "অলকা, আজ পরীর মুখে অন্নের প্রথম দানা তুমি তুলে দেবে। "
অরিন্দম এর মুখ থেকে এরকম কথা শুনে অলকা এমন চমকে গেল যে ওর হাত থেকে
পরীর সব খেলনাগুলো মেঝেতে পড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল। " আমি..? " বিস্ময় ভরা মুখ নিয়ে তাকাল ওদের দিকে। " এতে অবাক হওয়ার কি আছে? বাচ্চার মুখে প্রথম ভাত তুলে দেয় বাচ্চার মামা, এটাই নিয়ম, কি তাইতো? মামা না থাকলে অনেক ক্ষেত্রে কাকারাও এই কাজটা করে থাকে। কিন্তু আমাদের কোন আত্মীয় নেই। আমাদের আত্মীয় বল, স্বজন বলো, এখন তো তুমিই, অলকা। তাই পরীর মামাও তুমি, কাকাও তুমি।" পূজা থামলো। অলকা বুঝতে পারছিলোনা, ওর সামনে যারা দাঁড়িয়ে তারা কি সত্যি মানুষ নাকি ভগবান। ওর চোখের জল যে বাঁধ মানছে না, " তোমরা কি বলছ বৌদি, আমি কি এতটা পাওয়ার যোগ্য? " " তুমি এর চেয়েও বেশী ডিজার্ভ কর। আর তোমার থেকে বেশী পরীকে কে ভালোবাসে? পরী যতটা আমাদের, ঠিক ততটাই তোমার। চলো অলকা, আর দেরী করোনা। " অরিন্দম এর কথাগুলো শেষ হতেই ছোট্ট হাতে পরী হাততালি দিয়ে উঠল। " দেখছ তো অলকা, তোমার পরীও প্রথম ভাত তার মামমাম এর হাতে খাবে শুনে কত আনন্দ পাচ্ছে। " পূজার কথাতে অরিন্দম ও হেসে ঘাড় নাড়ল। "তোমরা আমার জন্য যা যা করলে, আর আজ যে সম্মান তোমরা আমায় দিলে, আমি বোধহয় তা এই জন্মে শোধ করতে পারবনা।" অলকার চোখের জল মুছিয়ে দিল পূজা, " এরকম শুভ দিনে কেউ কাঁদে? নাও মেয়েকে কোলে নাও, চলো। " অলকার কোলে বসে ছোট্ট পরী ভাত মুখে দিল। অলকার মনে হল, এতদিন মিথ্যেই নিজের কপালকে দোষারোপ করত সে, আজকের দিনটা সব পাল্টে দিল। ওর মতো সুখী এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই, কেউ না। চারপাশে শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিও যেন তার চিন্তাধারা কে সায় দিল।

দেখতে দেখতে পাঁচটা বছর পেড়িয়ে গেল। বাবা, মা, মামমামের আদর, ভালোবাসায় পরী  বড় হয়ে উঠতে লাগল। মামমাম ছাড়া তো ও একমিনিটও থাকতে পারেনা। খাওয়া, স্নান করা, গল্প শোনা, ঘুমানো, পার্কে যাওয়া সবেতেই ওর মামমামকেই চাই। পূজাও নিশ্চিন্ত অলকা আছে বলে। রোজ বিকেলেই পরীর বায়না ওঠে পার্কে যাবে বলে। ওদের বাড়ির সামনে কোন পার্ক নেই বলে বেশ কিছুটা দূরেই যেতে হয়। অলকাই নিয়ে যায়  কিন্তু যেদিন সেলাই এর ক্লাস থাকে সেদিন পূজা নিয়ে যায়। আজ অলকার পালা। গাড়ি নিচে দাঁড়ানোই ছিল। কিন্তু আজ পরী ড্রাইভার আংকেলের পাশে বসার বায়না ধরল। অগত্যা অলকা পরীকে নিয়ে সামনে বসল। পরী সারারাস্তা যে কত কথা বলতে থাকল, তার কোন শেষ নেই।অলকাও সমান তালে ওর কথায় তাল দিতে থাকে। আসলে অলকার খুব মজা লাগে এই ভেবে যে এই টুকু পুঁচকে মেয়ের মনে কত প্রশ্ন জেগে ওঠে, আর অলকাও কি সুন্দর কচি মনের সব অবাস্তব প্রশ্নের যত্ন করে উত্তর দিয়ে যায়। হঠাৎ সামনের মোড় থেকে একটা লরি খুব স্পীডে এগিয়ে এল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিশাল জোরে একটা ধাক্কা লাগল গাড়িতে। অলকা দেখল ও কেমন শূণ্যে উঠে গিয়ে আবার জোরে নীচে এসে পড়ল, অন্ধকার হয়ে গেল সব। চোখ বুজে যাওয়ার আগে শুধু পরীর হলুদ জামাটা দেখতে পারছিল সে।

" আমি কিচ্ছু জানিনা, আপনি ডাক্তার, আমাদের কাছে আপনিই ভগবান,ওদেরকে আপনার বাঁচিয়ে তুলতেই হবে। " ডাক্তারের সামনে হাত জোর করে কাঁদছে অরিন্দম।কলকাতার সবথেকে বড় নার্সিংহোমে, সব থেকে ভালো ডাক্তার দেখছে অলকা আর পরীকে। পূজা বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। " ওরা না বাঁচলে আমার ওয়াইফও তো বাঁচবেনা, ডাক্তার। আমার সব শেষ হয়ে যাবে, সব। " " উই আর ট্রাইং আওয়ার বেষ্ট, মি. রায়। কত বড় অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে বুঝতে পারছেন? আমাদের যা ক্ষমতা তার সবই আমরা করছি। " ডাক্তার চলে গেল ভিতরে। পূজা হাপুসে কেঁদে যাচ্ছে, একটু আগেও একবার অজ্ঞান হয়ে গেছিল। খবরটা পেয়েই স্পটে ছুটে গিয়েছিল অরিন্দম। অলকার পার্সে সবসময় অরিন্দম এর ভিজিটিংকার্ড, আর একটা ছোট ডায়রিতে পূজা আর ওর মোবাইল নং টা লেখা থাকত। সেটা দেখেই কেউ হয়ত অরিন্দম কে ফোন করে খবর দিয়েছে। অত বড় ডাকসাইটে একজন পুলিশ অফিসার হয়েও স্পটে গিয়ে মাথা ঘুরে গিয়েছিল অরিন্দম এর। হয়ত আহত মানুষদুটো তার নিজের তাই। ড্রাইভার তো স্পট ডেড। অলকার অবস্থা মুখে বর্ণনা করার মত নয়। শুধু নার্ভ টা চলছে, অচৈতন্য অবস্থাতেও মুখ দিয়ে শুধু পরীর নাম টাই বেড়োচ্ছে। আর গাড়ির সামনের পাদানিতে ছোট্ট পরী মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। অরিন্দম পাগলের মত করতে লাগল, মেয়েটাকে কোনরকমে বের করে কোলে নিতেই "পরী"বলে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মুখ, বুক। হলুদ জামাটা লাল হয়ে গেছে। বুকটার মধ্যে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো কাঁদতে লাগল। অ্যাম্বুলেন্স করে দুজনকে নার্সিংহোম নিয়ে আসতেই ডাক্তার একবার চেক করেই আই সি ইউ তে অ্যাডমিট করে নিল। পূজাকে কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছিলনা অরিন্দম। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে ফোন করে পূজাকে নার্সিংহোম আসতে বলে লাইনটা কেটে দিল। কারন তারপরের কোন উত্তর ও আর দিতে পারবেনা। পূজা এসে সব শুনেই জ্ঞান হারালো। যতবার জ্ঞান ফিরছে শুধুই কাঁদছে। সব পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে নাজেহাল অবস্থা অরিন্দম এর।

নার্স এসে খবর দিল যে ডাক্তার ওদের চেম্বারে ডাকছেন। " বসুন।" চেয়ারে বসে কাতর,ভীত,জিজ্ঞাসু চোখে অরিন্দম আর পূজা তাকিয়ে থাকল ডাক্তার এর দিকে। অজানা একটা ভয় ওদের গলায় যেন দলা পাকিয়ে রয়েছে। " দেখুন, মি.রায়,আপনাদের মনের অবস্থা বুঝতে পারছি, বাট উই হ্যাভ টু ফেস দি রিয়ালিটি। মিস্ অলকা কে হয় আপনাদের?" "আমার বোন।" কাঁদতে কাঁদতেই বলল পূজা,অজানা আতঙ্কে গলাটা শুকিয়ে যাচ্ছে ওর। " ওনার অবস্থা খুবই খারাপ। অক্সিজেন চলছে। স্পাইনাল কড টা পুরোই ভেঙে গেছে। ব্রিদিং প্রবলেম হচ্ছে। টোয়েন্টি ফোর আওয়ারস অবজারভেসনে রাখতে হবে। বাট সরি টু স্যে, দেয়ার ইজ নো হোপ টু সারভাইভ। " অরিন্দম, পূজা যেন নিজেদের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছেনা। " আর পরী ?" " আপনাদের মেয়ে উপুর হয়ে পড়েছিল। মাথায় মারাত্মক আঘাত পেয়েছে। প্রাণে বেঁচে যাবে, তবে ওর ভিসনটা নষ্ট হয়ে যাবে। " অরিন্দম- পূজার মনে হল তাদের চোখের সামনেও যেন অন্ধকার নেমে এসেছে। " কোনকিছুই করার নেই ডাক্তারবাবু? " " দেখুন সব কিছু আমাদের হাতে থাকেনা। "উপরের দিকে হাত দুটো ইশারা করে বলল ডাক্তার,  "ভগবানের মর্জির কাছে আমাদের কি চলে? তবে পরীকে যদি কেউ আই ডোনেট করে দেন সি উইল গেট ব্যাক হার ভিসন।"

একবার অলকা, একবার পরী দুজনকেই কিছুক্ষন অন্তর অন্তর অরিন্দম আর পূজা গিয়ে দেখে আসছে আই সি ইউ তে। ওদেরকে কেবিনের ভিতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। তাই বায়রে থেকেই ওদের কে দেখছে,উদভ্রান্তের মতো কাঁদছে আর ছোটাছুটি করছে। রাতটা যেন কাটতেই চাইছে না।

প্রায় মাঝরাতে অলকার জ্ঞান এল। ও যে নড়তে পারবে না বুঝতে পারল। প্রথমেই ওর চোখের সামনে পরীর মুখটা ভেসে উঠল। মেয়েটা কেমন আছে জানার জন্য ছটফট করতে লাগল মনটা। ওর দুচোখের
কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। "এই তো
আপনার জ্ঞান এসেছে দেখছি, তুই যা ডাক্তার কে খবর দে। "কেবিনে ঢুকেই একজন নার্স আরেকজনকে নির্দেশ দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তার এসে চেক আপ করতে শুরু করল। মুখের  থেকে অক্সিজেন মাক্সটা নামিয়ে দিল অলকা। " আরে করছেন কি? কিছু বলবেন? " ডাক্তার কানটা নামিয়ে আনল অলকার মুখের সামনে, "পরী", কোনরকমে অলকা বলল।
" পাশের কেবিনে আছে, ভালো আছে।"
ডাক্তারবাবু কেবিন থেকে বেড়িয়ে এলেন। অলকার জ্ঞান ফিরেছে শুনে অরিন্দম আর পূজা বায়রেই দাঁড়িয়ে ছিল। " একবার দেখা করে নিন। ওনার অবস্থা খুবই খারাপ। শুধু
পরীর খোঁজ করছেন। " অলকাকে এই ভাবে দেখতে হবে কোনদিন ভাবতেও পারেনি ওরা। পূজা অনেক চেষ্টা করেও সামলাতে পারলনা নিজেকে। অলকাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল।
অলকার চোখ থেকেও জল পড়ে যাচ্ছে।ওর কাছে যে বেশী সময় নেই, সেটা অলকা ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। শুধু পরীকে একবার যদি দেখতে পারত। আবার অক্সিজেন মাস্কটা সরিয়ে দিল মুখ থেকে।অরিন্দম এগিয়ে এল, বুঝতে পারল অলকা কিছু বলবে। "পরী..."ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই পূজা আরও জোরে কেঁদে উঠল।
পরীর অবস্থার কথাটা না বলে পারলনা। অরিন্দম কিছুতেই আটকাতে পারলনা পূজাকে। পরীর অবস্থা শুনে অলকার দমটা যেন আটকে গেল। বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই যেন চলে গেল তার। ওর ইচ্ছে করছিল দৌড়ে গিয়ে পরীকে বুকটার মধ্যে জড়িয়ে ধরতে, আদর করতে। সবকিছুর জন্য নিজেকেই মনে মনে দোষ দিতে লাগল অলকা। পার্কে একদিন না গেলে কি এমন ক্ষতি হত। যে মানুষ দুটো তাকে এত ভালোবাসা দিল, তার মতো অভাগাকে আবার নতুন করে বাঁচতে শেখাল,  ভরসা করে তাদের সন্তান কে তার হাতে তুলে দিল, যাদের কাছে ওর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই, আজ ওর জন্য এই মানুষ দুটোর এই অবস্থা, ওর পরীর এই অবস্থাও তো ওর জন্য। অলকা নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না। ওর অবস্থা আরও ক্রিটিকল হয়ে গেল। নার্সরা পূজা আর অরিন্দম কে বের করে দিল। সারারাত যমে মানুষের লড়াই চলতে থাকল। অলকার চোখের সামনে শুধু পরীর মুখটা ভেসে উঠছে বারবার। অন্যদিকে পরীর শারীরিক অবস্থা আয়ত্তে এসেছে দেখে বাবা মাকে দেখতে দিল। পরীকে ঘুমের ইঞ্জেকসন দেওয়া হয়েছে। মেয়েকে এতক্ষণ পর দেখতে পেয়ে পূজা,অরিন্দম যেন প্রাণ ফিরে পেল। ডাক্তারবাবু একজনকে বাচ্চার সাথে থাকার পারমিশন দিয়েছেন। পূজাকে মেয়ের কাছে রেখে অরিন্দম বায়রে চলে এল। এখানেও তো কারোর থাকা দরকার। আজকের মতো দিন যেন কাউকে কখনও দেখতে না হয়, মনে মনে ঠাকুর কে  বলল অরিন্দম। ভোর হয়ে গেছে, ঘড়িতে দেখল, পাঁচটা বাজে। এমন সময় নার্স এসে ডেকে নিয়ে গেল ওকে। অরিন্দম বুঝতে পারল চরম দুঃখজনক সংবাদ টা শোনার সময় এসে গেছে।

পরীর হাতটা শক্ত করে ধরেই ঘুমিয়ে পড়েছিল পূজা। অরিন্দম এর ডাকে চমকে উঠে বসল। " কি গো, অলকা কেমন আছে গো? " পূজার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলল অরিন্দম। " অলকা কি আমাদের ছেড়ে থাকতে পারে, বলো। পরী যে ওর নয়নের মনি। তাই তো সশরীরে না থাকলেও পরীর চোখে অলকা সবসময় আমাদের কাছে থাকবে, আমাদের দেখবে। শেষ নিঃশ্বাস ফেলার আগে অলকা ওর চোখ দুটো  পরীকে দিয়ে গেছে , পূজা। " অরিন্দম কে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকল পূজা, "অলকা সবসময় মনে করত ও আমাদের কাছে ঋণী, তাই ও এভাবে ঋণশোধ করে দিয়ে গেল, কিন্তু আমাদের যে ঋণী করে দিয়ে গেল গো। " অরিন্দম, পূজা জানে লাখ চেষ্টা করেও এই ঋণ তারা কোনদিন শোধ করতে পারবে না, কোনদিনও না।                                                                                                                                                                                                                                                                             

লিখছেন: জয়িতা
 

#pendrive

#গল্প

0 comments: