Tuesday, October 30, 2018

জন্মদিনে সুকুমার রায়কে নিয়ে সামান্য কয়েকটা কথা।( না বললেই নয়)


সুকুমার রায় আমার কাছে কে জানেন ? মাইকেল মধুসূদন,বিবেকানন্দের মতো এক অল্পদিনের 'অতিথি' ভিনগ্রহী যিনি বাঙালিকে একাই অনেকটা রাস্তা দেখিয়ে গেছেন!'কৈলাশে কেলেঙ্কারি'তে ফেলুর ডায়লগ লিখতে লিখতে সত্যজিতের বাবার কথা মনে পড়েনি ?যিনি সেই এলিয়েন...নিজের ক্ষমতা দান করে অন্যের বোধের পরিধি অনেকটা বাড়িয়ে গেছেন !
নিজে জিনিয়াস হয়েও বাবাকে নস্যাৎ করতে তিনি পারেননি ! তা নাহ'লে ফেলুর মতো ট্যাঁশ লোকের মুখে কি আর সিনেমায় বাবার লেখা ডায়লগ বসান? সাধে কি আর 'হযবরল'র ন্যাড়া( খাজা 'ক্রিয়েটিভ' রাইটার) আর হিজিবিজবিজকে পোরেন সিনেমার জটায়ুর মধ্যে ? তাঁর বাবাকে ভেঙে যে কতদিকে কানেক্ট করা সম্ভব,ছেলে সেটা ঠিকই বুঝেছিলেন !
মাত্র ৩৬ বছর বয়েসেই চলে গেছিলেন ভদ্রলোক ! সিংহভাগ তাঁকে কী তকমা লাগালেন? না... 'শিশু সাহিত্যিক' ,'ননসেন্স রাইটার' ইত্যাদি ! অনেকে তো ' ঠাকুরমার ঝুলি' ইত্যাদি ও অবলীলায় বলে দেন সুকুমার রায় লিখেছেন !
হিমানীশ গোস্বামী ঠিক বলেছিলেন যে বাংলায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ,সুকুমার রায় আর শিবরাম চক্রবর্তী এই তিনজন লেখকের কোনো বিকল্প আর কখনো তৈরি হবে না ! ভয়ংকর সত্যি কথা !নির্মম ও !
স্রেফ 'শিশুসাহিত্যিক ' ই যদি তাঁকে কেউ বলেন ,তাহ'লে জেনে নিন পুরো বাংলা সাহিত্যই তবে শিশু ! আমরা প্রত্যেকেই শিশু !
বাঞ্ছারামের একটা বিখ্যাত মিষ্টি আছে- প্রথম কামড় যখন দেবেন একরকম লাগবে ,দ্বিতীয় কামড়ে আরেকরম,তৃতীয় কামড়ে...
সুকুমার রায় ঠিক সেরকম ই একজন ! তাঁর জগৎটা আলাদাই ! এব্যাপারে ওয়াল্ট ডিজনির সঙ্গে অনায়াসে পাঞ্জা কষতে পারেন তিনি!
একটা ধোঁয়াটে জগতে আমাদের খেলিয়ে মেরেছেন তিনি!কেউ নিছক 'ছেলেখেলা' বলেই চালিয়ে দিয়েছেন !অনেকেই বুঝতে পেরেছেন তিনি একজন পাক্কা বিপ্লবী !সিস্টেমকে ব্যঙ্গ করেছেন তিনি ! আক্রমণ করেছেন !সব হেসে উড়িয়েছেন কিন্তু আমরা জ্বলে গেছি অস্বস্তিতে ! নিজেই পাগলা দাশু হয়েছেন !গাবদা বাক্স সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে ঘুরেছেন ,সবাই নানারকম ভেবে নিয়েছে, ইচ্ছে করেই তিনি সবাইকে চাবি ধরিয়েছেন...সবাই বাক্সের মধ্যে দেখেছে আরও বাক্স,পোঁটলা ইত্যাদি ! অ্যালিসের হাইঘা খরগোশের গর্তে নামার মতো হাতড়ে হাতড়ে সবাই শেষে চিঠি পেয়েছে-তাতে লেখা 'অতিরিক্ত কৌতূহল ভালো নয়।'
গালিভারের মতো বলুন বা অ্যালিস ই বলুন ,কখনো দেখেছি আমরা হোঁদলা প্রকান্ড হয়ে গেছে,তখন দেখেছি সুকুমার ছোট্ট হয়ে গিয়ে 'ফ্যাঁচ' হেসে সুড়ুৎ করে সরে পড়েছেন ! আবার নিমেষে হয়ে গেছেন অতিকায়, বুড়োরা ঠকঠকিয়ে কেঁপেছি তখন !
' আবোলতাবোল' ফেলে দিন, 'হযবরল' লোপাট করে দিন ! বলুন আর কী আছে সুকুমারে ? এভাবে সব ফেলতে ফেলতে যান- পা হড়কে পড়বেন 'অবাক জলপান' এ! ভাবুন তো এরকম একটা জিনিস আর কখনো পেয়েছেন বা পাবেন? মানুষ একদিন অন্য গ্রহে যাবে,দেখবেন এই বইটাই বাঙালি বগলদাবা করে নিয়ে যাচ্ছে !
ট্রয় যুদ্ধের পর এক বিজিত ট্রোজানদের যেকোনো একটামাত্র জিনিস নেওয়ার ই অনুমতি দেওয়া হয় ! এক বীর প্রথমে নিলেন দেবতার বিগ্রহকে !সবাই মুগ্ধ হয়ে তাঁকে আরেকটা জিনিস নেওয়ার অনুমতি দিলেন ! এবারে তিনি নিজের বৃদ্ধ পিতাকে কাঁধে ফেলে চলা শুরু করলেন ! মুগ্ধ গ্রিকরা তাঁকে সব জিনিস নেওয়ার অনুমতি দিয়ে দিলেন ! এরকম কিছু হ'লে আমি প্রথমেই নেব ' অবাক জলপান ' ! আর কী নেব ? আস্তে আস্তে ভাঙছি !

অদ্ভুত রহস্য রেখে গেছেন সব ! তাঁর ভেতরকার অদ্ভুত সব কলকব্জাওয়ালা ল্যাবরেটরিতে অনেক ভোলানাথ উঁকি দিয়েই চলেছে ! তল পাচ্ছে না !
নিজের আসন্ন মৃত্যুর আভাস তিনি লিখে গেছিলেন কবিতায় -'ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর/ গানের পালা সাঙ্গ মোর। ' মাত্র ৩৬ এই এরকম ম্যাচিয়োরিটি ! এরকম ভাবে ইহকাল-পরকাল নিয়ে ভাবনা !মনে হয় 'হযবরল'র টেকোবুড়োর মতোই তিনি স্কেলের তো বটেই,স্রোতেরও উল্টোদিকে শিশুর মতো একটা বেপরো্য়া মানসিকতা নিয়ে নিজের বয়েস বহু বহু বাড়িয়ে রেখেছিলেন !তাই আমরা ভাবি মাত্র ৩৬ এই তিনি ফুরিয়েছিলেন !আদপে কিন্তু তা নয় ই !

বহু জ্যোতিষার্ণবকে ফেল করানো এরকম লাইন তাঁর মাথায় মনে খামোখা ঘুরবেই বা কেন :
বুড়ো বলল, “তোমার যেমন বুদ্ধি! আশি বছর বয়েস হবে কেন? চল্লিশ বছর হলেই আমরা বয়েস ঘুরিয়ে দিই। তখন আর একচল্লিশ বেয়াল্লিশ হয় না—উনচল্লিশ, আটত্রিশ, সাঁইত্রিশ করে বয়েস নামতে থাকে। এমনি করে যখন দশ পর্যন্ত নামে তখন আবার বয়েস বাড়তে দেওয়া হয়। আমার বয়েস তো কত উঠল নামল আবার উঠল, এখন আমার বয়েস হয়েছে তেরো৷”
তিনি পারতেন !

 আর তিনিই পরে আসেন রবীন্দ্রনাথের প্ল্যানচেট টেবিলে -
 একমাত্র পুত্র সত্যজিতকে আশ্রমে রাখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন৷ রবীন্দ্রনাথ জানতে চান, ‘সুকুমার, কেমন আছ তুমি?’ সুকুমার বলেন, ‘অন্য কথা বলুন।’ রবীন্দ্রনাথ এরপর জিজ্ঞেস করেন, ‘পৃথিবীর সঙ্গে এখন তোমার যোগাযোগ আছে?’ সুকুমার উত্তর দেন, ‘নিশ্চয়ই, যোগাযোগ আছে।’ রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘আর কিছু বলো।’ সুকুমার বলেন, ‘আমার পৃথিবীর নেশা আজও কাটে নি। তাই পরলোকের কোনো সুর আজও মনে লাগে না।’

জীবনের প্রতি কী ভালোবাসা !! আহা !

'আবোলতাবোল' ,'হযবরল' নিয়ে অনেক পন্ডিত ,অনুসন্ধিৎসু অনেক ইন্টারেস্টিং সব গবেষণা করে গেছেন ! এগুলো বাদ ই রাখছি , এর বাইরেও আরেক নৃশংস সুকুমার আছেন ! খুনী সুকুমার ! 'বাজে গল্প ' সিরিজ পড়েছেন ? পড়তে পড়তে বুঝবেন সুকুমার চোখে আঙুল দিয়ে চোখ খুঁচিয়ে গর্ত করে সেই গর্ত দিয়ে হার্ট পর্যন্ত পৌঁছে গেছেন তিনি ! কোত্থাও এই সিরিজ নিয়ে আলচনা দেখি না... গল্পগুলো তুলে দিচ্ছি... অতি ছোট ! পড়া থাকলেও আরেকবার পড়ুন ,তারপর বলুন আমি ভুল বলেছি কিনা !

বাজে গল্প-১

দুই বন্ধু ছিলো , একজন অন্ধ আর একজন কালা। দুইজনে বেজায় ভাব। কালা বিজ্ঞাপনে পড়িলো আর অন্ধ লোকমুখে শুনিলো, কোথায় যেন যাত্রা হইবে, সেখানে সঙেরা নাচগান করিবে। কালা বলিলো , "অন্ধ ভাই চলো, যাত্রায় গিয়া দেখি"। অন্ধ হাত নাড়িয়া গলা খেলাইয়া কালাকে বুঝাইয়া দিলো, "কালা ভাই চলো , যাত্রায় নাচগান শুনিয়া আসি।"

দুইজনে যাত্রার আসরে গিয়া বসিলো। রাত দুপুর পর্যন্ত নাচগান চলিলো, তারপর অন্ধ বলিলো, "বন্ধু , গান শুনিলে কেমন?", কালা বলিলো, "আজকে তো নাচ দেখিলাম , গানটা বোধহয় কাল হইবে।" অন্ধ ঘনঘন মাথা নাড়িয়া বলিলো, "মূর্খ তুমি! আজ হইলো গান, নৃত্যটাই বোধহয় কাল হইবে।"

কালা চলিয়া গেলো। সে বলিলো , চোখে দেখনা তুমি নাচের মর্ম জানিবে কি? অন্ধ তাহার কানে আঙুল ঢুকাইয়া বলিলো "কানে শোননা , গানের তুমি কাচকলা বুঝিবে কি?" কালা চিৎকার করিয়া বলিলো "আজকে নাচ কালকে গান।" অন্ধ ঠ্যাং নাচাইয়া বলিলো, "আজকে গান কালকে নাচ।"

সেই হইতে দুইজনের ছাড়াছাড়ি। কালা বলে, " অন্ধটা এমন জুয়োচোর, সে দিনকে রাত করিতে পারে।" অন্ধ বলে , "কালাটা যদি নিজের কথা শুনিতে পাইতো, তবে বুঝিতো সে কত বড় মিথ্যাবাদী"

বাজে গল্প ২

কলকেতার সাহেব বাড়ি থেকে গোষ্ঠবাবুর ছবি এসেছে। এ বাড়িতে তাই হুলুস্থুল। চাকর বামুন ধোপা নাপিত দারোগা পেয়াদা সবাই বলে, “দৌড়ে চল, দৌড়ে চল।”

যে আসে সেই বলে, “কি চমৎকার ছবি, সাহেবের আঁকা।” বুড়ো যে সরকার মশাই তিনি বললেন, “সব চাইতে সুন্দর হয়েছে বাবুর মুখের হাসিটুকু—ঠিক তাঁরই মতন ঠাণ্ডা হাসি।” শুনে অবাক হয়ে সবাই বললে, যা হোক! সাহেব হাসিটুকু ধরেছে খাসা।”

বাবুর যে বিষ্ঠুখুড়ো তিনি বললেন, “চোখ দুটো যা এঁকেছে, ওরই দাম হাজার টাকা—চোখ দেখলে, গোষ্ঠর ঠাকুরদার কথা মনে পড়ে।” শুনে একুশজন একবাক্যে হাঁ হাঁ করে সায় দিয়ে উঠল।

রেধো ধোপা তার কাপড়ের পোঁটলা নামিয়ে বললে, “তোফা ছবি। কাপড়খানার ইস্ত্রি যেন রেধো ধোপার নিজের হাতে করা।” নাপিত তার ক্ষুরের থলি দুলিয়ে বললে, “আমি উনিশ বছর বাবুর চুল ছাঁট্‌ছি—আমি ঐ চুলের কেতা দেখেই বুঝ্‌তে পারি, একখান ছবির মতন ছবি। আমি যখনই চুল ছাঁটি, বাবু আয়না দেখে ঐ রকম খুশী হন।”

বাবুর আহ্লাদী চাকর কেনারাম বললে, “বলব কি ভাই, এমন জলজ্যান্ত ছবি—আমি ত ঘরে ঢুকেই এক পেন্নাম ঠুকে চেয়ে দেখি,বাবু ত নয়—ছবি।” সবাই বললে, “তা ভুল হবারই কথা—আশ্চর্য ছবি যা হোক।”

তারপর সবাই মিলে ছবির নাক মুখ গোঁফ দাড়ি সমস্ত জিনিসের খুব সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম আলোচনা ক’রে প্রমাণ করলেন যে সব বিষয়েই বাবুর সঙ্গে আশ্চর্য রকম মিলে যাচ্ছে—সাহেবের বাহাদুরী বটে! এমন সময় বাবু এসে ছবির পাশে দাঁড়ালেন।

বাবু বললেন, “একটা বড় ভুল হ’য়ে গেছে। কলকেতা থেকে ওরা লিখ্‌ছে যে ভুলে আমার ছবি পাঠাতে কার যেন ছবি পাঠিয়ে দিয়েছে। ওটা ফেরৎ দিতে হবে।”

শুনে সরকার মশায় মাথা নেড়ে বললেন, “ দেখেছ! ওরা ভেবেছে আমায় ঠকাবে! আমি দেখেই ভাবছি অমন ভিরকুটি দেওয়া প্যাখ্‌না হাসি—এ আবার কার ছবি।” খুড়ো বললেন, “দেখ না! চোখ দুটু যেন উলটে আসছে—যেন গঙ্গাযাত্রায় জ্যান্ত মড়া!” রেধো ধোপা সেও বলল, “একটা কাপড় পরেছে যেন চাষার মত। ওর সাত জন্মে কেউ যেন পোষাক পরতে শেখেনি।” নাপিত ভায়া মুচকি হেসে মুখ বাঁকিয়ে বলল, “চুল কেটেছে দেখ না—যেন মাথার উপর কাস্তে চালিয়েছে।” কেনারাম ভীষন ক্ষেপে চেঁচিয়ে বললে, “আমি সকাল বেলায় ঘরে ঢুকেই চোর ভেবে চমকে উঠেছি। আরেকটু হ’লেই মেরেছিলাম আর কি! আবার এরা বলছিল, ওটা নাকি বাবুর ছবি। আমার সামনে ও কথা বললে মুখ থুরে দিতুম না।” তখন সবাই মিলে এক বাক্যে বললে যে, সবাই টের পেয়েছিল যে, এটা বাবুর ছবি নয়। বাবুর নাক কি অমন চ্যাটাল? বাবুর কি হাঁসের পায়ের মত কান? ও কি বসেছে, না ভালুক নাচ্ছে?

বাজে গল্প ৩
কতগুলো ছেলে ছাতের উপর হুড়োহুড়ি করে খেলা করছে—এমন সময়ে একটা মারামারির শব্দ শোনা গেল। তারপরেই হঠাৎ গোলমাল থেমে গিয়ে সবাই মিলে “হারু পড়ে গেছে” বলে কাঁদতে কাঁদতে নীচে চলল।

খানিক বাদেই শুনি একতলা থেকে কান্নাকাটির শব্দ উঠছে। বাইরের ঘরে যদুর বাবা গণেশবাবু ছিলেন—তিনি ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কি হয়েছে?” শুনতে পেলেন ছেলেরা কাঁদছে “হারু পড়ে গিয়েছে।” বাবু তখন দৌড়ে গেলেন ডাক্তার ডাকতে।

পাঁচ মিনিটে ডাক্তার এসে হাজির—কিন্তু হারু কোথায়? বাবু বললেন, এদিকে ত পড়েনি, ভেতর বাড়িতে পড়েছে বোধহয়।” কিন্তু ভেতর বাড়িতে মেয়েরা বললেন, “এখানে ত পড়েনি—আমরা ত ভাবছি বারবাড়িতে পড়েছে বুঝি।” বাইরেও নেই, ভেতরেও নেই, তবে কি ছেলে উড়ে গেল? তখন ছেলেদের জিজ্ঞাসা করা হ’ল “কোথায় রে? কোথায় হারু?” তারা বললে, “ছাতের উপর।” সেখানে গিয়ে তারা দেখে হারুবাবু অভিমান করে বসে বসে কাঁদ্‌ছেন! হারু বড় আদুরে ছেলে, মারামারিতে সে প’ড়ে গেছে দেখেই আর সকলে মার খাবার ভয়ে সেখান থেকে চম্পট দিয়েছে। “হারু পড়ে গেছে” বলে এত যে কান্না, তার অর্থ, সকলকে জানান হচ্ছে যে, “হারুকে আমরা ফেলে দেইনি—সে পড়ে গেছে ব’লে আমাদের ভয়ানক কষ্ট হচ্ছে।”

হারু তখন সকলের নামে বাবার কাছে নালিশ করবার জন্য মনে মনে অভিমান জমিয়ে তুলছিল—হঠাৎ তার বাবাকে লোকজন আর ডাক্তার শুদ্ধু এগিয়ে আসতে দেখে, ভয়ে আর নালিশ করাই হ’ল না। যা হোক, হারুকে আস্ত দেখে সবাই এমন খুশি হল যে, শাসন-টাসনের কথা কারও মনেই এল না।

সবচেয়ে বেশি জোরে কেঁদেছিলেন হারুর ঠাকুরমা। তিনি আবার কানে শোনেন কিছু কম। তাঁকে সবাই জিজ্ঞেস করল, “আপনি এত কাঁদ্‌ছিলেন কেন?” তিনি বললেন, “আমি কি অত জানি? দেখলুম ঝিয়েরা কাঁদ্‌ছে, বৌমা কাঁদ্‌ছেন, তাই আমিও কাঁদ্‌তে লাগলুম—ভাবলুম একটা কিছু হয়ে থাক্‌বে।”

গায়ক নচিকেতা চক্রবর্তী একটা গল্প বলেছিলেন '' তাসা ফাসা নিয়ে ভোটে জেতার মিছিল বেরিয়েছে-একজন উদম নাচছে- সবাই বলল নাচছিস কেন?সে বলল আরে...নাচব না, লাল্টুদা জিতে গেছে! - 'তাতে তোর কী ?' 'তোর কী মানে... পল্টুদা হেরে গেছে ! ' তাতেই বা তোর কী!' লোকটা তখন বলল এই অভ্যেসে নাচি মাইরি !'
একবার ভাবুন তো না বুঝে হুল্লাটে যারা তাল মেলায় ,অন্যের জগজম্প দেখে তবেই জগঝম্প করে...  কত বছর আগেই তাঁদের ঠুকেছিলেন সুকুমার! ইদানিং সিনেমার সব বিশ্রি রিভিউর সঙ্গে এই গল্প মিলিয়ে দেখুন !
কী ' ডোন্ট কেয়ার' অ্যাটিচিউড নিয়ে লেখা এই সিরিজ ! ছোটবেলায় ছোট্ট বোনেদের নিয়ে একবার চলতে চলতে দেখেছিলেন এক ষণ্ডামার্কা লোককে - দু'হাতে তাঁর রক্তমাখা !  বোনদেরকে আড়াল করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সেই ছোট্ট দাদা ( পরে জানা যায় লোকটা পাশের পুকুরে সবে পাঁঠা কেটে ফিরছিল)

আর 'বাজে গল্প ৩' বোকা তোষামোদ, নিজেদের ভেতরকার সত্তাকে বিকানোর বিরুদ্ধে এক অসামান্য চাকু !
আমি বারেবারে পড়ি, অস্বস্তিতে ঘুমাতে পারি না ! একবার ভাবুন তো এগুলো ভেঙে শর্টফিল্ম বানালে কতটা ইন্টারন্যাশনাল লেভেল এর হবে !

তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধগুলো পড়ে আমি এখনো আনন্দ চোখের জল ফেলি ! এভাবেও ভালোবেসে,শেখাতে শেখাতে,নিজে শিখতে শিখতে নোট নিতে নিতেও অন্যকে জানানো যায় ?
ডিটেকটিভদের একটু তাচ্ছিল্যের চোখেই মনে হয় দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ! সুকুমার ও মনে হয় তাই ! অথচ তাঁর ছেলে জোয়ার আনলেন !
সত্যজিৎ বলেছিলেন লুই ক্যারল না থাকলে হয়ত সুকুমার হতেন না !
সুকুমারের 'নিধিরাম পাটকেল' না থাকলে তেমনি ' প্রোফেসর শঙ্কু' ও আসতেন কি না সন্দেহ !

তাঁর স্কুলের গল্পগুলোর সঙ্গে ভয়ঙ্করভাবে রিলেট করতে পারি !কীভাবে তিনি ক্লাসমেট আর টীচারদের সাইকোলজি এত অসাধারণভাবে দেখালেন !
'হিংসুটি' গল্প যেভাবে ভাইবোনদের রেষারেষি-হিংসা হিংসিকে ধরেছে... ভাবা যায় না !
'নতুন পণ্ডিত' পড়লে ভয়ে এখনো গা শিরশির করে ! কিছু গোলমাল হ'লেই এক মাস্টামশাই 'তবে রে হরিপ্রসন্ন' ছুটে গিয়ে হরিপ্রসন্নকে মারতেন ! হরিপ্রসন্ন কিছু করুক আর না করুক, কিছু হ'লেই 'টার্গেট' হত সে ! মেধাবী হরিপ্রসন্নর উপরে তিনি এত খাপপা ছিলেনই বা কেন? নিজে কি প্রতিভার সুবিচার পাননি বলে হরিপ্রসন্নকে সহ্য হত না? সুযোগ মতো তাঁকে 'জব্দ' করার জন্যই কি তক্কে তক্কে থাকতেন ?
কি?? আপনিও এরকম ফ্রাস্ট্রেশন আর কমপ্লেক্স এ ভরা টীচারদের নিশ্চয়ই পেয়েছেন যারা নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও বিশেষ ক'জনকেই শুধু বারেবারে চাঁদমারি বানান !এসবের সঙ্গে মিশিয়ে গল্পটাকে বারেবারে পড়লেই গা শিউরে ওঠে !
এছাড়াও 'চালিয়াৎ' ,' পালোয়ান' এসব গল্প একেকটা মাস্টারপিস ! অসাধারণ একেকটা ক্লাসরুম ড্রামা!
নিজের জীবনের সঙ্গে কাঁটায় কাঁটায় মেলাতে পারি এসব সাইকোলজিক্যাল গল্প !
'আজব সাজা' গল্পের 'পণ্ডিতমশাই খানিকক্ষণ কটমট করিয়া সকলের দিকে তাকাইয়া তারপর বলিলেন, "যা! তোরা ছেলেমানুষ তাই কিছু বললাম না। খবরদার আর অমন করিসনে।" সকলে হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল, কিন্তু পণ্ডিতমশাই কেন যে হঠাৎ‌ নরম হ‌‌ইয়া গেলেন কেহ তাহা বুঝিল না। পণ্ডিতমশায়ের মনে হঠাৎ‌ যে তাঁর নিজের ছেলেবেলার কোন দুষ্টুমির কথা মনে পড়িয়া গেল, তাহা কেবল তিনি‌‌ই জানেন।'
'হযবরল'র শেষে 'নীরস' আর 'এককেন্দ্রিক' মামাদের কানের মোচড়ে যখন এতবড় রূপকথা,এত সম্ভাবনা,এত প্রোজেক্ট ' তিনমাসের জেল আর সাতদিনের ফাঁসি' তে চলে যায়... ব্যথার মোচড়ে খালি খালি লাগে না বুক? বিদ্রোহের আগুন চিড়িক করে ওঠে না? ভুল বলছি?

কিংবা 'দাশুর খ্যাপামি' গল্পের ' আবার সে এসেছে ফিরিয়া' এসব লাইন কি এমনি এমনি অমরত্ব পেয়ে প্রবাদ হয়ে গেছে ?

এরকম ছোটবেলার সব মারাত্মক সাইকোলজিক্যাল গল্প লিখতে পেরেছিলেন তাঁর যোগ্য বোন লীলা মজুমদার !
সুকুমার রায় ছিলেন লীলার জীবনে ঈশ্বরের মতো। লীলাকে সারা জীবন বোধ হয় লালন করেছেন সুকুমারই। মৃত্যুর পরও। সুকুমারের অকালমৃত্যু লীলাকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল :
 ‘আমার তখন ১৫ বছর বয়স। ম্যাট্রিক ক্লাসে পড়ি... বড়দার ঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে দেখি সরু একটা নিচু খাটে সাদা চাদরে গা ঢেকে, বুকের উপর হাত দু’খানি জড়ো করে চোখ বুজে তিনি শুয়ে আছেন। তাকের উপর তাঁর রঙের শিশি, গেলাসে দাঁড় করানো অনেকগুলি তুলি রং মাখা, একটা ছোট্ট ন্যাতার পুঁটলি অনাদরে পড়ে আছে। ছেলের পায়ের উপর মুখ গুঁজে জ্যাঠাইমা পড়ে আছেন। খাটের পাশে একটা টুলে বৌঠান দু’হাত জোড় করে চোখ বুজে বসে আছেন। চোখের পাতার তলা দিয়ে অবিরাম ধারায় জল গড়াচ্ছে। মুখখানি পাথর কুঁদে গড়া, ভাবলেশহীন। মনে হল আমারও বুকের মধ্যে কি একটা ভেঙে যাচ্ছে। আর সেখানে দাঁড়াইনি।’
দাদার জিন আর ব্যাটন অনেকটাই বহন করতে পেরেছিলেন লীলা !

তাই তো বলি , সুকুমার রায় শতাব্দীতে ( হয়নি হয়নি ফেল- কোটি কোটি শতাব্দীতে)একটাই জন্মায় রে হারামজাদা !                                                                                                                                                                      অন্বয় গুপ্ত

1 comment:

  1. ''হাঁস ছিল সজারু, (ব্যাকরণ মানিনা)
    হয়ে গেল হাঁসজারু কেমনে তা জানিনা।''

    🙏🏻 শুভ জন্মদিন সুকুমার রায় 🙏🏻

    ReplyDelete