Monday, October 8, 2018

মিত্তি

মিত্তি


শীতের সকালের মিষ্টি রোদেই লাল হয়ে যাওয়া ফর্সা মুখ,মাঝখানে দুটো ইয়া বড়ো-বড়ো গোল চোখ বসানো , ফ্রক পরা বছর তিনেকের এক বাচ্চা মেয়ে, কোমরে হাত দিয়ে সকাল থেকে ঠাঁই বাগানে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাগান পরিষ্কার ঠিকমতো হচ্ছে কিনা, তার দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। কেউ অবশ্য বলেনি,তবুও নিজের তো একটা কর্তব্যবোধ আছে নাকি! 
মিত্তি। হ্যাঁ, এর থেকে উপযুক্ত নাম অভিভাবকেরা খুঁজে পাননি।
'age is just a number ' কথাটা শুধু
বুড়ো-বুড়িদের সান্ত্বনা দিতেই ব্যাবহার করা হয় না, ছোটো কাওকে, সম্মান প্রদর্শনের কাজেও লাগে। যেমন, এ বাড়িতে মা ,বাবা, ঠাম্মি  তো বটেই এমনকি কাজের মাসি থেকে রান্নার কাকিমা পর্যন্ত এনাকে সমীহ করে চলে।
আগে, ভাস্কর পন্ডিত আসার ভয়ে , সন্ধ্যের আগেই মায়েরা যেমন সব কাজ-পাট যুদ্ধকালীন  তৎপরতায় সেরে নিত, মিত্তি ঘুমোলে বাড়ির লোকও ঠিক তাই করে।
ভুলেও ভাববেন না, 'ওমা কি মিত্তি! ' ওইটুকু বাচ্চার মধ্যে প্রতিশোধস্পৃহাও রেয়েছে।
মিত্তি ঘুমোচ্ছে,এমত অবস্থায় 'নিরীহ' মা সুযোগ বুঝে,মেয়ের নোখগুলো,কুটকুট করে নেলকাটারে কেটে দিয়েছে। মিত্তি জেগে দেখে, এ কী!  এ যে ঘোর অন্যায়!  ঘুমন্ত অবস্থার সুযোগ নিয়ে, বিপক্ষকে পরাজিত করা যে, পাপ !
দুপুরবেলা মা যেই না ঘুমিয়েছে, ওমনি মিত্তি ,মায়ের সদ্য নেলপলিশ লাগানো নোখগুলোতে , চোখ বন্ধ করে, সর্বশক্তি দিয়ে, কামড় বসিয়েছে। নেলকাটার চালানো তার সাধ্যে কুলোয়নি, অগত্যা ক্ষুদে-ক্ষুদে দাঁতগুলো দিয়েই কাজ সারতে হলো! 
ওদিকে ঘুমের ঘোরে আঙুলে কামড় খেয়ে,
'বেচেরা' মা যখন 'ইঁদুর-ইঁদুর' বলে চিৎকার জুড়েছে, মিত্তি তখন খাটের তলায়, পা ছড়িয়ে বসে, কান এঁটো করা হাসি হাসছে! 
না, মিত্তি কার্টুন দেখে না। এ যুগের বাচ্চাদের চেয়ে সে কয়েকধাপ এগিয়ে। মা যখন টেনেটুনে 'Disney Movie' দেখতে বসায়, মিত্তি ছুট্টে ঠাম্মির ঘরে চলে যায়। মিত্তি দেখে, বাংলা সিরিয়াল, এবং ঠাম্মি কখনো-সখনো ভুলে গেলেও, মিত্তি ভোলে না। নামসহ সব 'সিরাল'- এর সময়সূচী তার জলের মতো মুখস্থ!
মিত্তিদের বাড়িতে কেউ এলে,খেতে বসার আগে, মিত্তি অতিথিকে একটু গোপনে দেখা করার প্রস্তাব দেয়। এইটুকু বয়সে মেয়ের এরূপ মিশুকে স্বভাব ও আতিথেয়তায় বাড়ির সকলে খুশিই হয়। কিন্তু মিত্তির উদ্দেশ্য আরোই মহৎ। গলায় দৈনতা মিশিয়ে, সে অতিথিকে হাত নেড়ে বোঝায়, 
' আমাদেল  তলকালি সব কম - কম। এত্তু কম খেয়ো কেমন ?'
দু-একবার এই ঘটনা হওয়ার পরেই বাবা -মা ব্যাপারটা ধরে ফ্যালে। এখন বাড়িতে কেউ এলে এক্কেবারে শেষবেলায় মিত্তিকে নিয়ে আসা হয়
'তা-তা'করতে!
তবে মিত্তির মধ্যে এত ভলো গুনের সমাহার যে, এসব ছোটোখাটো দোষ তাতে, বেমালুম চাপা পড়ে যায়।
যেমন, বাড়িতে,কোথায় পিঁপড়ে হলে, বাড়িসুদ্ধু লোক যখন, ফিনাইল ঢেলে পিঁপড়ে মারতে ব্যস্ত,  মিত্তি তখন, তার ভাগের গোটা 'বিকুত' টা গুঁড়ো করে পিঁপড়েদের খাওয়াচ্ছে, মানে ওদের গায়ের ওপর ছড়াচ্ছে আর কি!
বিস্কুট খেয়ে জল না খেলে পিঁপড়েদের গলায় লাগবে না বুঝি! তাই, ছোট্টো-ছোট্টো হাতে,একটা গ্লাসে জল ভরে এনে, পিঁপড়েদের ওপর ঢেলে দেয়। জলের স্রোতে অবশ্য আর্ধেক পিঁপড়ে ভেসে চলে যায়,  তবুও, মরার আগে বিস্কুট-জলটা তো খেয়ে মল্লো !
তা বলে কি বাড়ির লোকের বিরোধিতা করবে মিত্তি? উঁহু,এমন বিশ্বাসঘাতক সে নয়! 
পিঁপড়েদের খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলে,মিত্তি রান্নাঘর থেকে কাঠের খুন্তিটা নিয়ে, রে-রে করে পিঁপড়েদের দিকে তেড়ে আসে। তারপর শুরু হয় পিঁপড়ে নিধন পর্ব! 
এক্ষেত্রে, পিঁপড়ের জীবন সম্পর্কে অনিশ্চয়তা থাকলেও, কাঠের খুন্তিটার পরিণতি সম্পর্কে
যে-কেউ নিশ্চিত হতে পারে।
রান্নাঘর থেকে খুন্তি নিয়ে আসার সময়
 রান্না- কাকিমা, যদি কোনরকম বাধা দিতে আসে,মিত্তি খুন্তির দু-ঘা বসিয়ে বলে, ' আর বনমাসি কব্বি? '  এরূপ হুমকি আর নির্যাতনের পর, সেই মহিলা দ্বিতীয়বার আর কোনো কথা বলার সাহসটুকু সঞ্চয় করে উঠতে পারে না।
         ব্যাং-রা সারাক্ষণ বৃষ্টিতে ভেজে, অথচ ওদের কোনো রেনকোট নেই! মিত্তির দয়ার শরীর।
চিপস্-চকলেটের প্যাকেটগুলো ব্যাং- দের
দু-একবার পরাতে গেছিলো। তবে, ওরা এতো লাফালাফি করে যে, মিত্তি পেরে ওঠেনি!
না বাপু, এমন অবাধ্য ছেলে, মিত্তি মোটে পছন্দ করে না। 'যাহ্! চলেই যা। ছদ্দি কর গে!' বলে, রেগে গিয়ে ব্যাং গোষ্ঠীর সঙ্গে বিচ্ছেদ করেছে।
        কদিন হলো,এক নামী স্কুলে মিত্তিকে ভর্তি করে, বাপ-মা সবে একটু দম নিয়েছে কি নেয়নি,ওমনি হুড়মুড়িয়ে একগাদা অভিযোগ এসে জমা হলো মিত্তির নামে!  তবে, আপনি যদি ন্যায়ের সমর্থক হন, সেগুলো শুনে কোনোমতেই মিত্তির বিরুদ্ধে যেতে পারবেন না।
স্কুলের মধ্যবয়স্কা এক ম্যাম, মিত্তিকে দেখলেই কোলে তুলে,তার ফোলা-ফোলা গালদুটো টিপে দেয়। না,মিত্তি মোটেই গান্ধীবাদী নয়, এক গাল টিপলে কোনোমতেই সে আরেক গাল বাড়িয়ে দেবে না।
প্রতিবাদস্বরূপ, 'হেয়ার-ফল'-এর সমস্যায়
 ভুগতে-ভুগতে 'ইনসোমনিয়া'য় আক্রান্ত হয়ে পড়া ম্যামের,চুল ধরে,জোরসে একটান মারে মিত্তি। যতক্ষনে ম্যাম, 'আহা-হা-হা-না-না-না' করে চুল ছাড়াতে যাবে,ততক্ষনে তার দুগাছা চুল মিত্তির হাতের মুঠো ছাড়িয়ে ফুরফুর করে হাওয়ায় উড়তে শুরু করেছে! 
দুটো বাচ্চা ক্লাসে ঝগড়া করেই চলেছিল। ঝগড়াটা অবশ্য মৌখিক পর্যায়েই ছিল,কিন্তু এভাবে দুটো বাচ্চা চোখের সামনে 'শিশুসুলভ' আচরণ করে যাবে, তা তো আর মিত্তি হতে দিতে পারে না!  তাই,
দুজনকেই দু থাপ্পড় কষিয়ে দেয়। তাপ্পর ওরা কান্নাকাটি করল ঠিকই, কিন্তু ঝগড়াটাতো থামল না কি! 
স্কুলের মাঠে একটা বাচ্চা ইঁদুর মরে পড়েছিল, তার সারা গায়ে পিঁপড়ে ধরেছে।
এই ঘটনা বাড়িতে ঘটলে, মিত্তি এক বোতল ডেটল ওই 'উঁদুল' বাচ্চার উপর ঢেলে, তাকে সুস্থ করত। কিন্তু এখানে কোনো উপায় না দেখে, মিত্তির তত্ত্বাবধানে সেই মরা ইঁদুরের ওপর, বোতল-বোতল জল ঢালা হল।এরপর ওই 'উঁদুল ' বাচ্চাকে, মিত্তির পাশে বসা মেয়েটার ব্যাগের ওপর, ফ্যানের ঠান্ডা হাওয়ায় চিৎ করে শোয়ানো হল। পশুপ্রেমহীনা মেয়েটা আপত্তি জানালে, তাকে বোঝানো হল,  ওর ব্যাগে ভালো কার্টুনের ছবি,মিত্তির ব্যাগে পচা ভূতের ছবি,  আর 'উঁদুল' যেহেতু এখনও বাচ্চা তাই মিত্তির ব্যাগের ওপর শোয়ালে,সে ভয় পেতে পারে! এ যুক্তিতে মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ থাকলেও, তার ব্যাগ থেকে অসম্ভব বিচ্ছিরি রকমের আঁশটে গন্ধ
বের হতে থাকলে,মিত্তির নামে কমপ্লেন করে।

স্কুলে গিয়ে ক্ষমা-টমা চেয়ে মিত্তির বাবা-মা বাড়ি ফেরে। মিত্তি ঘুমিয়ে পড়লে, বাবা গম্ভীর গলায়
মা-কে বলে, 'এ মেয়ের পড়াশোনা হবে তো রাণু?'

এক চোখ খুলে রিনরিনে গলায় মিত্তি বলে ওঠে,
"হবে তো লানু? "       


 ©Aratrika Chakraborty

0 comments: