Friday, October 5, 2018

গল্প:Care করি না

           Care করি না           

                           
গল্প,ছোটগল্প,bengali short stories
গল্প: Care করি না


----গরম লাগছে, না?
নরম গলার স্বরে, অজানা রোধের মান নির্ণয় করতে গিয়ে থেমে যায় তিয়াষা। খাতা থেকে মুখ তুলে তাকায়। ঘন পালকে ঘেরা দুটো চোখ যেন, উত্তরের আশায় থমকে আছে। চোখে চোখ রেখে ওপর-নীচে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায় সে। আদেশ পেয়ে ততক্ষণাত ফ্যানের ব্লেডগুলো ঘুরতে শুরু করে।
সাতেরোর সঙ্গে তিরিশের এই হিসেবটা কিছুতেই মেলাতে পারে না ক্লাস টুয়েল্ভের তিয়াষা। খুব বেশিদিন না, মাত্র ১ বছর হয়েছে এই ব্যাচে জয়েন করেছে, তারপর থেকেই, পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে! স্যারকে মনে ধরেছে। সে তো কতজনকেই ওর ভালো লাগে।রাস্তা-ঘাটে,স্কুলে-বাসে কত্ত লোকের ওপর হুটহাট ক্রাশ খায়! এবার নাহয় স্যারকে ভালো লেগেছে, ব্যাস এটুকুই। সীমাটাও এটুকুই। কিন্তু এই সীমার বাইরেটা বড্ড বিপজ্জনক। ইদানীং তিয়াষা টের পায়, সীমার বাইরের জগতের অস্তিত্ব। ভয় হয়, অথচ ভালোও লাগে। মাঝে-মাঝে সবকিছু কেমন যেন, এর বোঝার ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।
এই যেমন, ছ-সাতজন ছেলেমেয়ের মাঝে একমাত্র এর পারমিশন নিয়েই রোজ ফ্যানটা চলে। কেন চলে? কেউ জানে না।
এতজনের কাছে পেন থাকতে, সেই বদরাগী সুদর্শন পুরুষ তিয়াষার Disney Princess-এর বক্সটা খুলে পেন বার করে নেয় যখন তখন। কেন নেয়? কেউ জানে না।
টিউশন কামাই করে, পরেরদিন কিছু একটা excuse দিলেই, অন্যরা ছাড় পেয়ে যায়। তিয়াষা পায় না। ভদ্রলোক গম্ভীর গলায় বকুনি দেন।তারপর  তিয়াষা,চোখের ওই কালো বলগুলোর দিকে তাকালেই, তার গলার স্বর নরম হয়ে যায়। কেন হয়? কেউ জানে না।
তিন-ফুট দুর থেকে 'ফু-ফু' করে, তিয়াষার গায়ে বসা মশা তাড়ায়, পড়াতে-পড়াতে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে,তিয়াষা চুপচাপ থাকলে ইচ্ছে করে ওকে পড়া ধরে। উঁহু, এগুলোর কারণও কেউ জানে না।
তিয়াষা বুঝতে পারে একটু-আধটু। মনকে বোঝায়,  কিচ্ছুটি বোঝেনি সে। নিজের মনেই কিছু একটা বোকা-বোকা অজুহাত খাড়া করে, মনকে শান্ত রাখে। কিন্তু পরেরদিনই ওর সব ঠুনকো যুক্তি ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয় ওরকমই কোনো একটা ঘটনা।
সদ্য যৌবনে পড়া মেয়েটা, পাহাড়ি ঝর্নার মতো চঞ্চল, প্রাণবন্ত। বসন্তের আগমন অনভিপ্রেত নয় মোটে। তার সারাটা নির্জন দুপুর, একাকী রাত কাটে প্রায় দ্বিগুণ বয়সি এক সুদর্শন পুরুষের সাথে কল্পনার চাদর জড়িয়ে।নিষিদ্ধ আদিম খেলায় মেতে ওঠে, কল্পনায়। ঘুম থেকে ওঠে যখন, সারা গায়ে তার আদর মাখানো। পরিচিত পারফিউমের গন্ধ মাখানো। একরাশ অপরাধ বোধ মাখানো। তবে তাতে অনেকটা সুখ মেশানো।
পরেরদিন পড়তে গিয়ে আর তার চোখে-চোখ রাখতে পারে না মেয়েটা। তারপর আবার সেই নরম গলার স্বর, যা শুধু তিয়াষার জন্যই প্রযোজ্য,  লজ্জা, অপরাধবোধ, ভয় সবকটাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়... সব.... সব.....
তিয়াষা বুঝে উঠতে পারে না,যদি সত্যিই ভালোবাসে তবে বলে না কেন? ভীতু নাকি? আবার ভয়ও হয়, ও ভুল ভাবছে না তো?! কিন্তু পরেরদিনই আবার এমন কিছু একটা হয়,যে তিয়াষা চাইলেও ভাবতে পারে না,ভালো না বাসার কথা।
এরকম করেই কেটে যাচ্ছে এক-একটা দিন। সেই 'সীমাবৃত্ত'টার পরিধি ধীরে-ধীরে বাড়ছে। তিয়াষা চায়, এভাবেই চলুক....... অনন্তকাল।

দিনগুলো বেশ কাটছিল,উত্তেজনায়,ভয়ে,
আনন্দে.... 
অগোছালো মেয়েটা নিজেকে একটু একটু করে সাজিয়ে তুলছিল।অধৈর্য মেয়েটা,সপ্তাহের দুটো নির্দিষ্ট দিনের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে শিখেছিল। সবজায়গায় ঘুমচোখে আধঘন্টা লেটে পৌঁছানো মেয়েটা, কাকভোরে উঠে সক্কলের আগে কোনো এক 'গন্তব্যে' পৌঁছাতে শিখেছিল।
তারপর...তারপর ঠিক যেমনটা সিনেমায় হয়?তেমনি।সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেলো।
আড্ডার ফাঁকে, হঠাৎ করে এক বান্ধবী যখন বলে উঠল, 'অ্যাই জানিস স্যারের না, বিয়ে!' আর পাঁচজনের সাথে তিয়াষাও হিহি করে হেসে উঠেছিল। অবশ্য কেঁদেওছিল, তবে তা বাড়ি ফিরে,শাওয়ারের তলায়। হুঁ, যে মেয়েটা কথায় কথায় ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ফেলত যখন-তখন, ততদিনে সে কান্না চাপতেও শিখে গেছিল।
এমন কান্না সে এর আগে কখনো কাঁদেনি। এক্কেবারে আনকোরা। নিজের ওপর ঘেন্নায় মাটিতে যেন মিশে যেতে চাইছিল।
গোছানো মেয়েটা আবার ছড়িয়ে ফেলল নিজেকে।
ধাতস্থ হতে সময় নিল, এক সপ্তাহ অর্থাৎ 'দু-দিন'।

    আজ আবার পড়তে যাবার দিন। শরীর খারাপের অজুহাত দেখিয়ে টানা একসপ্তাহ ক্লাস এড়িয়ে গেলেও, এর চেয়ে বেশি আর সম্ভব নয়। বাবা-মা সিরিয়াস কিছু ভেবে বসবে।
বেছে বেছে, এক্কেবারে কোণাটায় গিয়ে কুঁকড়ে বসল তিয়াষা। সকাল আটটার ক্লাসে, স্যার যেখানে অন্যদিন দশ-পনেরো মিনিট দেরি করে আসেন, আশ্চর্যজনকভাবে ছাত্রছাত্রীদের, আজ তার দেখা মিলল কিছুক্ষণ আগেই।
হঠাৎ করে চকচকে, বুদ্ধিদীপ্ত চোখদুটো যেন উদভ্রান্তের মতো কাওকে খুঁজতে-খুঁজতে ,এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়াল।
---- এগিয়ে বসো।
---- No, I'm alright
খাতায় কিছু একটা আঁকতে আঁকতে যথাসম্ভব careless ঢঙে বলল তিয়াষা। বেশ খানিকক্ষণ কাওকে কোনো কথা বলতে না শোনায়, চোখ তুলে দেখে, ঘন পালকে ঘেরা চোখদুটো স্থির হয়ে আছে ওর ওপর। চাইলেও আর চোখ ফেরাতে পারে না তিয়াষা। তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে। সময় যেন থেমে আছে ওদের জন্য। নিজের সর্বস্বটুকু দিয়ে এই মুহূর্তটাকে ধরে রাখতে চায় তিয়াষা। শার্টের খোলা বোতাম থেকে উকি দেওয়া, বুকের ঘন জঙ্গলটায় নাক
ঘষতে-ঘষতে বলতে চায়, 'You are only Mine'

আবার যেনো একটু একটু করে মাটি ছেড়ে হাওয়ায় ভাসতে শুরু করেছিল একরত্তি মেয়েটা। তবে সে সুখ টিকলো না বেশিদিন। কল্পনার বুদবুদে ভাসতে ভাসতে, হঠাৎ করে খুব জোরে আছড়ে পড়ল মাটিতে। আসছে সপ্তাহেই বিয়ে।হাত-পা যেনো অবশ হয়ে আসতে লাগলো। তবে প্রথমবারের চেয়ে তিয়াষার মনের ক্ষতটার গভীরতা কম। এবার প্রভাব পড়ল শরীরে। ভালোই হল, এই সপ্তাহটা ক্লাস কামাই করার জন্য অজুহাত খুঁজতে হল না।বন্ধুদের কাছে জানা গেল, 'স্যার ছুটি দিয়েছেন। আগামী 14 দিন। '
বিয়ের ছবিগুলো একের পর এক
social media-য় আসতেই, অাপনা-আপনি তিয়াষার finger cross টা আলগা হয়ে গেল। আপাদ-মস্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো মেয়েটাকে। তিয়াষার চেয়ে বেশ খানিকটা বড়ো,তবে সুন্দরী নয় মোটে। মনকে এই বলে সান্ত্বনা দিতে থাকলো সারাটা দিন। বাড়ির সকলকে তার ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞাস করে বেড়াতে লাগলো, 'দেখতে কেমন? ' কেউ খারাপ বললেই সারা বাড়ি দাপিয়ে বেড়াল আনন্দে, আবার ভালো বললেই শুকনো হাসি হেসে, পালিয়ে গেল কোথায় যেন।

ঠিক চোদ্দোটা দিন পর, যথারীতি আবার ক্লাস শুরু হল। বিছানার ওপর পড়ে থাকা চুলের ক্লিপ,  বডিলোশনের বোতল পড়ে থাকতে দেখে,চোখ ভর্তি টলমল জল নিয়েও কোনোমতে নিজেকে সামলে নিলো তিয়াষা। তারপর 'তিনি' এলেন,কফি হাতে। গাল ভর্তি দাড়ি, চুলগুলো ঘাঁটানো, তবুও আজ যেন একটু বেশিই স্নিগ্ধ লাগছে। তিয়াষা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, পরিচিত প্রত্যুত্তরের আশায়। তবে আজ বোধহয় সবকিছুই নতুন। সে আজ আর  তাকায়নি। কোল থেকে না বলে খাতা কেড়ে নেয়নি। পেনে চেয়ে নিয়েছে, পাশে বসা ছেলেটার কাছে। তিয়াষা তখনো তাকিয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে, পরিচিত প্রত্যুত্তরের আশায়.....
বাড়ি ফিরেই ব্যাগ থেকে খাতা-বই বার করে, মেঝেতে সজোরে ছুঁড়ে ফেলল মেয়েটা। তার
দু-গাল বেয়ে নেমে আসছে নোনতা জলের ধারা। সারা ঘর তছনছ করে, কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে।
গাল দুটো তখনো ভেজা....

ঘুম থেকে উঠেই নিজেকে অদ্ভুত রকমের হালকা লাগল তিয়াষার। ঘরটার অবস্থা দেখে নিজেই নিজের মাথায় চাঁটি মেরে, গোছাতে শুরু করল একমনে। সে যেন একটা 'মনস্টার'-এর কবলে পড়েছিল এতদিন। যে মনস্টারটা ওকে পড়ায় concentrate করতে দিত না, মনখুলে হাসতে দিত না,'নিজের' মতো থাকতে দিত না। উফফ্, বাঁচা গেছে বাবা! কিন্তু এভাবে প্রতিশোধ না নিয়ে কি কাওকে ছেড়ে দেওয়া যায়! উমহু,তিয়াষার সাইকোলজি তা বলে না। অতএব শুরু হল, প্রতিশোধের লড়াই......
একগুঁয়ে মেয়েটা দিনরাত এক করে, পরীক্ষার আগের ছ'টা মাস,বইয়ে মুখ গুঁজে পড়তে শুরু করল। ইন্সপিরেশন? ওই মনস্টারের মুখটা।
এই ক'মাস পড়তে গিয়ে,একবারো ওই মনস্টারের চোখের কালো বলগুলোর দিকে তাকায়নি তিয়াষা। হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকা, বুকের ঘন জঙ্গলটার দিকেও না। জানে, ওতে এখন অন্য কেউ নাক ঘষে আদর খায়। শেষ ক্লাসের দিনও ইচ্ছে করে কামাই করেছে ও। কারণ যে লোকটার কোনো emotion-ই নেই, তার কাছে শেষ বা শুরু কোনোটাই ম্যাটার করে না। বরং সেদিন বাড়িতে বসে 'তার' ছবি এঁকে,মুখটা মার্কার দিয়ে কাটাকুটি করেছে। এই টেকনিকটা বড্ড ভালো। মনে প্রশান্তি আনে।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর, অবশেষে এলো রেজাল্টের দিন। এবার অবশ্য তিয়াষার ফিঙ্গার ক্রশটা আর আলগা হয়ে যায়নি।
রেজাল্ট দেখে, বিছানায় খানিকক্ষণ নাচানাচির পর, ফোনটা হাতে নিতেই একগাদা মেসেজের ভিড়ে, একটা মেসেজে গিয়ে চোখ আটকে গেল। মনস্টার। তিয়াষার বাবাকে ফোন করে,কিছুক্ষণ আগেই রেজাল্ট জেনেছে সে। তবুও তিয়াষাকে মেসেজ করেছে,শুধুমাত্র 'congrats ' জানাতে।
বুকের ভেতরটা আবার সেই আগের মতো
'ধড়াস-ধড়াস' করতে শুরু করেছে তিয়াষার। অনুভূতিরা প্রশয় পাবার আগেই,ছোট্টো একটা রিপ্লাই দিয়েই, ব্লক করে দিল।
তাতে লেখা,
'Thanks for ignoring me'

© Aratrika Chakraborty

0 comments: