Wednesday, October 24, 2018

রিভিউ : 'এক যে ছিল রাজা। '



এক যে ছিল রাজা


২০১১ সালে সুভাষ ঘাইয়ের প্রযোজনায় ঋতুপর্ণ ঘোষ ' নৌকাডুবি ' সিনেমাটা বানিয়েছিলেন। আমরা তখন স্কুলে পড়ি। তদ্দিনে সৃজিত মার্কেটে চলে এসেছেন। 
সেই সিনেমায় টাইম পিরিয়ড দেখানোর ক্ষেত্রে অনেক স্বাধীনতা নিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ ! 
একটা দৃশ্যে ছিল মোক্তার রমেশ( যিশু সেনগুপ্ত) তার 'স্ত্রী' কমলা( রিয়া) কে বলছে শুয়ে পড়তে কারণ তার রাত হবে। ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলা রীতিমতো জমে উঠেছে। পুরোটা স্টাডি করে তবেই সে শোবে!
তখন কে জানত যে সাত বছর পরে সেই যিশু সেনগুপ্ত ভাওয়াল সন্ন্যাসীর ভূমিকাতেই নামবেন! 

'হেমলক সোসাইটি ' র পর সৃজিত জানিয়েছিলেন তিনি দুর্ধর্ষ বিদেশী থ্রিলার ছবি ' টুয়েলভ অ্যাংরি মেন ' অবলম্বনে ' ডজন ' নামে একটা ছবি বানাবেন। সে ছবি যদিও আর হয়নি!
তার মানে দাঁড়াচ্ছে যে কোর্টরুম ড্রামা সৃজিত পছন্দ করেন।
সেজন্যই তক্কে তক্কে ছিলেন। আর সুযোগ পেয়েই বিশ্বের অন্যতম সেরা সর্বকালের কোর্ট কেসগুলোর অন্যতম ভাওয়াল এস্টেটের রাজার মামলার ঘটনাটা নিয়ে ছবি তৈরিতে হাত দিয়েছেন!
আমি নিজে যা দেখলাম তা হ'ল অধিকাংশ মানুষ ই জানেন না যে ভাওয়াল রাজার কেসটা আসলে কী ছিল!  অনেকেই ভাওয়াল প্রসঙ্গ বলতে শুধু উত্তমকুমার আর 'সন্ন্যাসী রাজা' ই বোঝেন!
সৃজিতের 'জাতিস্মর' এর দৃশ্যটা মনে করুন - বাজারে গিয়ে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি কে সেটা জিগ্যেস করতেই সবার একেবারে নাস্তানাবুদ অবস্থা!
এটাও সেরকম ই!
উত্তমকুমারের সিনেমাটা আসল ঘটনার ছায়া অনুযায়ী তৈরি অনেকটাই কাল্পনিক একটা কাহিনি ছিল।
সেখানে কোর্টরুমের রুদ্ধশ্বাস ড্রামার কোনো জায়গাই ছিল না!
সৃজিতের ছবিও কিন্তু পুরোপুরি কেঠো বাস্তব নয়!
একজন আমায় অসাধারণ প্রশ্ন করলেন ' যে রাজার জন্য প্রজারা প্রাণ পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত, সেই রাজাকে  কীভাবে সৃজিত কীভাবে লম্পট হিসেবে দেখালেন? '
চমৎকার!  কেউ আবার এরকম ও বলেছেন যে সিনেমাটা নাকি কোন এক নভেলের কপি! সাধু!  সাধু!

অনেকেই বলছেন অঞ্জন দত্ত - অপর্ণা সেনের কী দরকার ছিল! সেই প্রসঙ্গে আসছি... ।

আস্তে আস্তে মূল ঘটনা আর সৃজিতবাবু কী করেছেন সেটায় ঢোকা যাক!

জাল প্রতাপচাঁদ মামলার কথা শুনেছেন?  উনিশ শতকের অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ঘটনা ছিল সেটা!  সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও সেই ঘটনা নিয়ে লিখেছিলেন। ভীষণ লোভ হচ্ছে সেই ঘটনা বলবার কিন্তু পোস্ট টা প্রকান্ড বড়ো হয়ে যাবে আর ফেসবুকেও আঁটবে না... তাই বাধ্য হয়ে কয়েকটা আঁচড়েই ছেড়ে দিচ্ছি!
বর্ধমানের জমিদারপুত্র প্রতাপচাঁদ মৃত্যুর চোদ্দ বছর পর ফিরে এসেছিলেন। জনতার আদালতে প্রতাপচাঁদ আসল রাজা হিসেবে সহানুভূতিমূলক স্বীকৃতি পেলেও কোম্পানির আদালতে জাল বলেই প্রতিপন্ন হয়েছিলেন।
তেজচাঁদের ছেলে ছিলেন প্রতাপচাঁদ। নারীলোলুপ ছিলেন তিনি। বৃদ্ধ বয়সে বিয়ে করেন সুন্দরী যুবতী কমলকুমারীকে। অসুস্থ তেজচাঁদের জমিদারির অনেকটাই চলে গিয়েই কমলকুমারী আর তাঁর ভাই পরাণচাঁদের হাতে। তেজচাঁদের ছেলে প্রতাপচাঁদ তাঁদের সঙ্গে কাজিয়ায় জড়ালেন। তাঁকে বারকয়েক হত্যার চেষ্টা করছি হ'লে প্রাণের মায়ায় প্রতাপচাঁদ কালনায় পালালেন। অজানা অসুখে সেখানেই মারা গেলেন তিনি।কালনার গঙ্গায় তড়িঘড়ি তাঁকে সৎকার করে ফেলা হ'ল! সন্তান শোকে বিহ্বল না হয়ে বৃদ্ধ তেজচাঁদ ফের বিয়ে করেন। সেই স্ত্রী মারা যান!
সেকালে আইন অনুযায়ী জমিদারির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে অপুত্রক দেশীয় জমিদারদের দত্তক পুত্র নিতে উৎসাহিত করা হত।
সেই সুযোগ নিয়ে পরাণচাঁদ তেজচাঁদকে নিজের ছোট ছেলেকে দত্তক দেন। উপরন্তু কয়েকমাস পরে নিজের কন্যা বসন্তকুমারী র সঙ্গে বিয়ে দিলেন তেজচাঁদের। শালা, শ্বশুর দুইই হ'লেন!
তেজচাঁদের দুই বউ কমলকুমারী আর বসন্তকুমারী আবার সম্পর্কে পিসি- ভাইঝি। আবার দুই সতীন ও! দুজনের মধ্যে অশান্তি চরমে উঠল। মাঝে পড়ে গিয়ে মারা গেলেন তেজচাঁদ! 
হঠাৎ দু'বছরের মাথায় বর্ধমানে উদয় হলেন অলখ শাহ নামে এক ফকির!  তিনি দাবি করলেন তিনিই প্রতাপচাঁদ - তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হলেও তিনি শ্মশান থেকে পালিয়েছিলেন। এখন এসেছেন জমিদারি ফিরে পেতে। পরাণচাঁদের ডিক্টেটরশিপে অতিষ্ঠ হয়ে অন্যান্য অনেক রাজকর্মচারীই ফকিরের পক্ষে দাঁড়ান। পরাণচাঁদের ষড়যন্ত্রে প্রতাপচাঁদ জেলে গেলেন। ছাড়া পেয়েই মামলা ঠুকলেন!
দু'বছর ধরে রুদ্ধশ্বাস মামলা চলল। পরাণচাঁদের প্রচুর প্রতিপত্তি থাকলেও ফকির প্রচুর সমর্থক পেয়েছিলেন।
প্রচুর সাক্ষী থাকলেও শেষরক্ষা হ'ল না!
১৮৩৮ এ মামলা শেষে কোম্পানির আদালত তাঁকে বর্ধমানের রাজকুমার বলে মানলো না!  তিনি চিহ্নিত হয়ে গেলেন ' জাল প্রতাপচাঁদ ' বলে।

প্রায়  ৯০% মিল থাকা ভাওয়াল রাজার ঘটনায় এবার কিছু আলো ফেলা যাক!

অবিভক্ত বাংলাদেশের ভাওয়াল এস্টেটের কর্তৃত্ব নিয়ে এই মামলার মূল ফোকাস ছিল মামলার বাদীর পরিচয়। তিনি নিজেকে ভাওয়াল রাজকুমার হিসেবে দাবি করেছিলেন। অথচ তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বছর দশ আগে!

ভাওয়াল এস্টেটে প্রায় ৫৮০ বর্গমাইল  এলাকা জুড়ে প্রায় ৫ লাখ প্রজা বাস করত। রমেন্দ্রনারায়াণ রায় ছিলেন এস্টেটের মেজো কু মার!  নামেই জমিদারি পরিচালনা করতেন। শিকার, নারী সংসর্গ, বিলাসে জীবন কাটাতেন। বহু রক্ষিতা ছিল তাঁর। এসব কারণে তিনি সিফিলিস বাঁধিয়ে ফেলেন।
মতি ফেরানোর জন্য তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়!

 চিকিৎসার জন্য ১৯০৯ সালে তিনি দার্জিলিং এ যান। আর ৭ ই মে ২৫ বছর বয়সে সেখানেই তিনি মারা যান। মৃত্যুর কারণ হিসাবে বলা হয় বিলিয়ারি কলিক, মানে গলব্লাডার স্টোন। দার্জিলিং এ তাঁর 'শবদেহ ' দাহ করা হয়। শ্রাদ্ধ হয় মে র ১৮ তে।

কিন্তু আদালতে প্রশ্ন ওঠে যে আদৌ সেই রাত্রে কী ঘটেছিল!  প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে হঠাৎ শিলাবৃষ্টি শুরু হওয়ায় শেষকৃত্যে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা অন্যত্র আশ্রয় নেন..   তখন মৃতদেহ গায়েব হয়ে যায়!
রমেন্দ্রর বিধবা স্ত্রী বিভাবতী দেবী তাঁর ভাই সত্যেন এর সঙ্গে ঢাকায় চলে যান। ব্রিটিশ  কোর্ট অফ ওয়ার্ডস কুমারদের বিধবা স্ত্রীদের পক্ষে এই জমিদারির মালিকানা নেয়।

রমেন্দ্রর শবদেহ গায়েব হওয়ার গুজব হাওয়ায় ভাসতে থাকে। কেউ বলে তাঁকে জীবিত দেখেছে, কেউ বলে তিনি সন্ন্যাস নিয়েছেন।
রমেন্দ্রর বোন জ্যোতির্ময়ী খোঁজ চালিয়ে যান, সারা বাংলা চষে ফেলা হয়!

১৯২০-২১ এ বাকল্যান্ড বাঁধের কাছে ভস্মমাখা এক সন্ন্যাসীর উদয় হয়। চমৎকার স্বাস্থ্যের কারণে তিনি সবার চোখে পড়েন। শিগ্রী গুজব ছড়ায়। রমেন্দ্রর ভাগ্নে বুদ্ধু দেখে ঠিক বুঝতে পারেন না। হাতিতে করে সন্ন্যাসীকে পাঠানো হয় জয়দেবপুরে।
ঢাকায় তাঁকে দেখতে আত্মীয় - প্রজা ভেঙে পড়ে। হঠাৎ সন্ন্যাসী রমেন্দ্রর দুধ-মা র নাম মনে করতে পারেন। অথচ এই তথ্য শুধু তাঁর পরিবার জানত!
সন্ন্যাসী বলেন দার্জিলিং এ অসুস্থ হওয়ার আগের ঘটনা তাঁর বিশেষ মনে নেই। জঙ্গলে বৃষ্টিভেজা অবস্থায় নাগা সন্ন্যাসী সাধু ধর্মদাস তাঁকে উদ্ধার করে বাঁচিয়ে তোলেন।
তারপর তিনি প্রায় দশ বছর ধরে সারা ভারত ঘোরার পর স্মৃতি ফেরত আসে। গুরুর আদেশে তিনি তাই ভাওয়ালে ফিরে আসেন।

এবার শুরু হয় মামলা। ১৯৩০ এর ২৪ এ এপ্রিল। জেলা জজ অ্যালান হেন্ডারসন বিচারপতি পান্নাবল বসুকে এই মামলার বিচারে নিয়োগ করেন। বিজয় চন্দ্র চক্রবর্তী কাজ করেন সন্ন্যাসীর প্রধান উকিল হিসাবে। বিবাদীপক্ষের উকিল ছিলেন অমিয়নাথ চৌধুরী । ১৯৩৩ এর ৩০ এ নভেম্বর বিচার শুরু হয়।
কোর্ট অফ ওয়ার্ডস ও ছিল বিবাদী পক্ষে। বিবাদীপক্ষ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন এই নিরক্ষর সাধু রমেন্দ্র হতে পারে না। ব্রাহ্মণ তো নয় ই!
প্রমাণিত হয় রমেন্দ্র ও প্রায় নিরক্ষর ছিলেন। জেরায় রক্ষিতা এলোকেশী জানান, পুলিশ তাঁকে ঘুষ দিয়ে সাক্ষ্য দেওয়া থেকে আটকানোর  চেষ্টা করেছে।
দাবি ওঠে সিফিলিসের প্রায় লাস্ট স্টেজ এর জন্য গায়ে যে দগদগে ঘা থাকার কথা, সন্ন্যাসীর গায়ে তা নেই। সন্ন্যাসী মূলত উর্দু বলতেন, কারণ তিনি ভ্রমণ করতে করতে তিনি বাংলা ভুলে গেছেন। কুমারের চোখের রঙ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
দুপক্ষই কয়েকশ' সাক্ষী হাজির করে। কুমারের বোন বলেন সন্ন্যাসীর চেহারায় তাঁদের বংশের ছাপ আছে, এবং তিনি বাংলা বলতে পারেন। বিভাবতী বলেন কুমারের সঙ্গে সন্ন্যাসীর চেহারার মিল নেই।
কুমারের ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী অন্নদাকুমারী দাবি করেন রমেন্দ্র বাংলা লিখতে ও লিখতে এবং ইংরেজি বলতে পারতেন।  পরে ভাষাজ্ঞানের প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা চিঠিগুলো জাল বলে প্রতিপন্ন হয়।
গুরু ধর্মদাস দোভাষীর মাধ্যমে জানান যে ভাওয়াল সন্ন্যাসী তাঁরই শিষ্য সুন্দরদাস। আগে সে ছিল লাহোর নিবাসী শিখ ধর্মাবলম্বী মাল সিং! ধর্মদাস অসুস্থ হয়ে পড়ায় আদালত কক্ষের বাইরে তাঁকে নিতে হয়।  বিচারক ১৯৩৬ এর ২৪ এ অগাস্ট বিস্তারিত ব্যখ্যাসহ সন্ন্যাসীর পক্ষে রায় দেন। নিজেও অবসর নেন বিচারকের পদ থেকে।
দ্বিতীয় মামলার সময়ে রমেন্দ্রর সম্পত্তির ভাগ থেকে সন্ন্যাসীকে টাকা নিতে অনুমতি দেওয়া হয়। অন্যান্য বিষয়ের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অর্থ গ্রহণ স্থগিত রাখেন।

অমিয় চৌধুরী মামলা থেকে সরে দাঁড়ান। বিভাবতী দেবী কিন্তু হাল ছাড়েননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে মামলার আপিল ১৯৪৩ পর্যন্ত বন্ধ থাকে।
বিভাবতী দেবীরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে আপিল করে। জার্মান হানায় কাউন্সিলের কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অধিবেশন হয় হাউজ অফ লর্ডসে।
২৮ দিন শুনানির পর ১৯৪৬ এর ৩০  জুলাই দাবিদারের পক্ষে রায় দেন।

ফরেন্সিকের দিক দিয়েও এই মামলা দারুণ ইন্টারেস্টিং ছিল।
কুমারের বর্ণ ছিল সাদা-গোলাপী, চুল ছিল হাল্কা বাদামী, চুল ছিল ঢেউ খেলানো এবং গোঁফ ছিল মাথার চুলের চাইতে পাতলা। চোখ ছিল বাদামী, নিচের ঠোঁট ডানদিকে কোঁচকানো, কান কিনারের দিকে চোখা, কানের লতি গালের দিকে সংযুক্ত নয় আর ছিদ্রযুক্ত, অ্যাডামস অ্যাপল প্রকট, উপরের বাঁ দিকের মাড়ির দাঁত ভাঙা, হাত ছোট, বাঁ হাতের তর্জনী আর মধ্যমা ডান হাতের চেয়ে ছোট, ডান  চোখের নিচে ছিল আঁচিল,পা ছিল খসখসে আর জুতোর নম্বর ছিল ৬, শিশ্নের নিম্নভাগে ছিল আঁচিল।
সন্ন্যাসীর ও কাকতালীয়ভাবে এসমস্তই ছিল।  এমনকি দুজনের ই মাথা আর পিঠে ফোঁড়ার দাগ, কুঁচকিতে অস্ত্রোপচারের দাগ আর ডান বাহুতে বাঘের থাবার দাগ ছিল। বিতর্ক ছিল শুধু সিফিলিসের ক্ষত নিয়ে।
তাছাড়া ফোটো, হাঁটার ধরণ, ভাবভঙ্গিতে যথেষ্ট মিল ছিল।

ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়ার পদ্ধতি এই মামলার সময়ে চালু থাকা সত্ত্বেও সম্ভবত ১২ বছর আগে নিখোঁজ হওয়াতে তা নেওয়া হয়নি!
এরকম একটা সাংঘাতিক কোর্ট কেস নিয়ে সৃজিতবাবু আর তাঁর টিম ঠিক কী করলেন সেটা একটু দেখা যাক।
সৃজিত পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ' দ্য প্রিন্সলি ইম্পস্টর ' অবলম্বনে এগিয়েছেন।
' সন্ন্যাসী রাজা'য় রাণীর সঙ্গে ডাক্তারের একটা সম্পর্ক দেখানো হয়েছিল। আর রাজার রাজ্য ত্যাগের একটা মহান ব্যাপার এসেছিল।
কিন্তু আসল লড়াই ছিল ব্রিটিশ সরকারের দেশীয় রাজত্ব গ্রাসের গুড়ে বালি দেওয়া এক সন্ন্যাসীর, যে নিজেকে দাবি করেছে জমিদারের রক্তের বলে।
কিন্তু আসল ভিলেইন ঠিক কে? ডাক্তার কিংবা রাজার শালা ই বারেবারে ভিলেন হয়ে যান। সত্যবাবু আর আর বোনের দিক থেকে দেখলে নিজেদের আখের গোছানোর প্রশ্ন ওঠে ঠিকই কিন্তু কোর্ট অফ ওয়ার্ডস যেভাবেই হোক মামলা জিততে কেন এত মরিয়া হয়ে উঠেছিল?
এ লড়াইয়ে দেশী বিচারপতিরা কিন্তু রাজার পক্ষেই নামেন।
গল্পের রস জমাতে ডাক্তার- শ্যালক জুটিকেই ভিলেন হিসেবে নামিয়ে দেওয়া যায়!

উত্তমকুমারের সিনেমার একটা ব্যাপার আমাকে রীতিমতো ভাবাচ্ছে৷ ডাক্তার সেখানে প্রতীক - একই দেহে ডাক্তার আর শ্যালককে ইঞ্জেক্ট করা। হিন্দু-মুসলিম দুই প্রজাই তাঁকে পেটায়! ( 'ইনসানিয়াৎ' এ হিন্দু-মুসলিম চাঙ্কি পান্ডে আর সানি দেওল যেভাবে বিদেশী শক্তি টম অল্টারকে একসঙ্গে মারেন) ব্যাপারটা বুঝে নিন এবার!
রাজা প্রজাবৎসল ছিলেন কিন্তু মদ আর নারীর নেশায় ডুবে থাকতেন। তাঁকে না পেয়ে ডাক্তারের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়ান রাণী।  রাণীর স্নান করার দিঘী পেরোলেই ছিল আশুতোষ ডাক্তারের ঘর। যদিও সে ঘর লিজ নিয়েছে এক প্রোমোটার।
সৃজিতরা এই শালা- ডাক্তার জুটিকেই ভিলেন বানিয়েছেন। বরং কম জায়গা দিয়েছেন র‍্যাঙ্কিনদের, যে ক্যালভার্ট ডেথ সার্টিফিকেট দিলেন তাঁকে নিয়েও তেমন কিছু বলা  হ'ল না। গলব্লাডারের কথা তিনি কি আদৌ শ্যালকের কথাতেই লিখেছিলেন?

সৃজিতরা  শুরুটা করেছিলেন দুর্দান্ত!  মেক আপ নিয়ে বলার কিছুই নেই ( 'কাবুলিওয়ালা' তে ছবি বিশ্বাসের দাড়ি নিয়েও অনেক প্রশ্ন উঠেছিল) !  কারণ ওটার প্রসঙ্গ এখানে আর আনছি না!
কুমারের দোষ, বাকীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এসবও চমৎকার দেখিয়েছেন। কিন্তু তাঁর মন পড়ে ছিল কোর্ট এর দিকে। সেখানে চেষ্টা করেও তিনি সামলাতে পারলেন না।
কারণ চরিত্র,সাক্ষীদের শল্কমোচন আর ছাব্বিশ ভল্যুমের বিখ্যাত এই কেস আড়াই ঘন্টায় দেখানো চাট্টিখানি কথা নয়! তবুও ছবি অনেক লম্বা করা হয়েছে । গল্প বলতেও চেয়েছেন আবার কোর্টরুম ড্রামাটাও দেখাতে চেয়েছেন।
 কিন্তু অভিনব একটা চেষ্টা করেছিলেন! কংগ্রেসি জে. এন চ্যাটার্জি কে তিনি করেছেন ভাস্কর আর অমিয় চৌধুরী হয়েছেন অনুপমা দেবী!
কেন ই বা অঞ্জন দত্ত আর অপর্ণা সেন?  এটা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অপর্ণাকে কেনই বা নারীবাদী করে দেওয়া হ'ল?
এর দুটো উত্তর আছে! এক, বিভাবতী( চন্দ্রাবতী) দেবীর দিক ব্যখ্যা করতে নারীবাদী উকিল দরকার ছিল।
আর দুই, সৃজিতের সামান্য একটা ইচ্ছা। সৃজিতের 'চতুষ্কোণে' চিরঞ্জিত - অপর্ণার জায়গায় আগে থাকার কথা ছিল অঞ্জন- অপর্ণার!  সেই সুপ্ত ইচ্ছাটাই এখানে পূরণ করে নিয়েছেন। সেই বিচ্ছেদ হওয়া কাপল, রেষারেষি - মিলিয়ে দেখুন!সেই যেন ' চতুষ্কোণ ' এর জুটিটাই!  সেই ফ্লেভারটাই ফের ফেরাতে চেয়েছেন! সৃজিতের সিনেমা লক্ষ্য করে আমি দেখেছি তাঁর স্টাইল হ'ল  মূল গল্পের প্যারালালি একটা কাপল রাখা!
দুই উকিলের চোখা সংলাপ সত্যিই  বেমানান ঠেকলেও আমার ধারণা এর পেছনেও কারণ আছে!
তারান্তিনো, গাই রিচি এঁরা পিরিয়ড পিসকেও রক এন' রোল স্টাইলে বানান!  এই ধরণের পরিচালকদের প্রভাব এড়ানোটাই মুশকিল ! তাই পিরিয়ড পিসকেও একটু রক এন রোল করা, নাটক বা সিনেমাকে 'হিট' করা এসব কারণও আছে!  আর কোর্ট দৃশ্য যাতে বোরিং না হয় সেই চেষ্টাও করা হয়েছে! আমরা তো পুরনো পিরিয়ড পিসের নাটককে একটু হাততালিজনক করার জন্য একটু বেয়াড়া, একটু চটুল জিনিস ও মিশিয়ে দিই কখনো!  এটা ভালো না খারাপ জানি না।

অনেকটা সময় নিয়েও রাজার গল্প আর আদালত দেখাতে গিয়ে খেই সামান্য হারিয়েছে। আদালতে চুল চেরা বিশ্লেষণ ব্যাপারটাই আসেনি! অত সময় কই!

আমার ধারণা একটা শুরু আর শেষ থাকা গল্প বলার দরকার ছিল। যারা ভাওয়াল কেস জানেনা, তাদের কাছে নিছক সিনেমার কাহিনি হিসেবে ভালো না ও লাগতে পারে! রাফ কোর্টরুম ড্রামার দিকে এগোতে গিয়েও Srijit অনেকটা উত্তমকুমারদের ফলোই করেছেন। সেটা যখন করলেন ই তখন শ্যালক- ডাক্তারের নানা শেডস গুলো আরও দেখাতে পারতেন।
একটা গল্পকে 'হাজির' করার  দিক দিয়ে বিচার করলে কিন্তু ' সন্ন্যাসী রাজা' ই এগিয়ে থাকবে। যদিও এরকম পলিটিক্যাল একটা থ্রিলারে উত্তমকুমার জড়িয়ে গিয়ে  অনেকটাই রোমান্টিক হয়ে গেছিলেন ভাওয়াল রাজা।
' এক যে ছিল রাজা' তে যিশুর অভিনয় আর পরিশ্রম সাংঘাতিক ।  রয়্যাল ব্যাপারটাও দারুণ দেখানো হয়েছে!..
কিন্তু এটা যে একটা ষড়যন্ত্রের  গল্প, সেদিকে ফোকাসটা আরও বেশি থাকলে ভালো হত! চাইলেই আরও ডার্ক করা যেত! কল্পনার আশ্রয় যখন নেওয়াই হয়েছে, রাজার গল্প আর কোর্টের নাটকের মধ্যে মনে হয় যেকোনো একদিকে বেশি নজর দেওয়া উচিত ছিল!
ক্যামেরার কাজ অসাধারণ!  বরং সৃজিত সুলভ ক্যামেরার অকারণ চরকিপাক এখানে নেই!
প্রথমার্ধ বেশ সুন্দর কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধ একটু সাবধানী, সঙ্গে চমক দেওয়ার চেষ্টা।

তবে ছবিটা দেখতে ভালো লাগে। অভিনয়, ডায়লগ, ক্যামেরা,মিউজিক  সবমিলিয়ে দেখতে ভালো লাগে!
শুধু নিটোল একটা গল্প বলতে পারেনি!

এক 'রাজা'র জীবনের  সংগ্রাম আর অবিশ্বাস্যভাবে ফিরে আসা, এই ব্যাপারটা মানে 'রাজা'র গল্পটা সোজাপথে আসেনি

0 comments: