Tuesday, October 23, 2018

' মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি' সিনেমা নিয়ে কয়েকটা আঁচড়। ( রিভিউ)


Movie রিভিউ:  মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি

Movie রিভিউ:  মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি


২০০৭ সালে 'আনন্দমেলা' মারফত আমার অন্যতম 'ঈশ্বর' শ্রী শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে আমি চিঠি পাঠিয়ে জিগ্যেস করেছিলাম তিনি গোয়েন্দা বরদাচরণকে নিয়ে  মজার উপন্যাস আর কেন লেখেন না?  সে চিঠি পৌঁছেছিল কিনা জানিনা!
তদ্দিনে বরদাকে নিয়ে লেখা টুকরো  গল্পগুলো পড়ে পাগল হয়ে গেছি। তবে সেগুলো পড়ার পর 'মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি'তে বরদার প্রথম আবির্ভাব সেভাবে আমার তখন ভালো লাগেনি! ঠিক মেনে নিতে পারিনি।

দাদাঠাকুরকে নিয়ে কিংবদন্তি  গায়ক রামকুমার চট্টোপাধ্যায়  একটা গল্প শুনিয়েছিলেন :
দাদাঠাকুর তখন নিতান্তই তরুণ... তাঁর ক্ষুরধার মস্তিষ্ক আর সাহিত্য প্রতিভার কথা খুব অল্প লোকেই জানে। একবার পুজোর সময়ে ইন্টেলেকচুয়ালদের আড্ডা জমেছে নির্মলচন্দ্রের বাড়িতে। মধ্যমণি হয়ে বসে আছেন রসরাজ অমৃতলাল বসু। অমৃতলালের সঙ্গে দাদাঠাকুরের আলাপ করিয়ে দিয়ে একজন বলল,'বড় ভালো লেখে ছেলেটি, মুখে মুখে ছড়া-কবিতা-গান রচনা করতে ওর জুড়ি নেই। ' রসরাজ বাঁকা চোখে তাকালেন দাদাঠাকুরের দিকে- '' তাই নাকি হে? তা শোনাও দেখি একখানি গান - না না, পুরনো রচনা হলে চলবে না, একেবারে টাটকা জিনিস চাই। " দাদাঠাকুর হাত জোড় করে বললেন, " আজ্ঞে, আগে আপনি আশীর্বাদ করুন, নাহলে গান বাঁধব কি করে?  '' রসরাজ বললেন, " আচ্ছা, কল্লুম আশীর্বাদ। এবার শোনাও দিকি! '
দাদাঠাকুর গেয়ে উঠলেন, " দুটো মনের কথা তোমায় বলি জগদম্বে। ''
দাদাঠাকুর কোন রাগে গেয়েছিলেন তা আর জানা যায় না, তবে রামকুমারবাবু গানটি গেয়ে শুনিয়েছিলেন কাফি রাগে।
আরেকটা গল্প অমরত্ব পেয়ে গিয়ে বাংলা চুটকি হয়ে দাঁড়িয়েছে :
 রামকুমার চট্টোপাধ্যায় তখন সবে নাম-টাম করতে আরম্ভ করেছেন। রেডিওয় সিটিং ছিল। গান করে বেরোচ্ছেন, দেখেন  দাদাঠাকুর রেডিও স্টেশনে ঢুকছেন। দাদাঠাকুর রামকুমারকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমাকে তো ঠিক চিনলাম না!" রামকুমার জবাব দিলেন, 'আজ্ঞে, আমি গাই'। দাদাঠাকুরের প্রশ্ন, "অ, তা কত সের দুধ দাও?''

এই ডায়লগটাই পরিচালক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় বসিয়েছেন ডাকাতদলের সর্দারের মুখে।
আবার সিনেমার ' ওগো লুচি ' গানটা নিধুবাবুর টপ্পা আর অমৃতলালের গান মিলিয়েই তৈরি!
পরিচালক কি সচেতন ভাবেই ট্রিবিউট দিয়েছেন দাদাঠাকুরকে?

জনগণের একটা অদ্ভুত জিনিস আমি কিছুতেই বুঝে পাই না...
ফেলুদার ভয়ানক ভালো সব উপন্যাস থাকতেও তাদের ৯০% এর সবচেয়ে বেশি প্রিয় ' বাদশাহী আংটি। ' টিনটিনের ফাটাফাটি সব কমিকস থাকতেও সবচেয়ে বেশি মধু পায় ' সূর্য দেবতার বন্দী ' র মধ্যে!
শীর্ষেন্দুবাবুর হাড় কাঁপানো একেকটা  উপন্যাস থাকতেও তারা বেশি মাতামাতি করে তাঁর প্রথম উপন্যাস  ' ঘুণপোকা ' নিয়ে।
একইভাবে তাঁর ' মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি' নিয়েও ক্রেজটা বড্ড বেশি। কিন্তু তাঁর অন্য কিছু বিখ্যাত  কিশোর উপন্যাস পড়লে 'মনোজ' অত্যন্ত ফ্যাকাশেই মনে হবে!
তবে এত উন্মাদনা কীসের?

'মনোজ' উপন্যাসটা যখন 'আনন্দমেলা'য় প্রথম বেরিয়েছিল( সম্পাদক নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী)   ,  বাঙালি পাঠক ওরকম 'অদ্ভুতুড়ে' লেখা পড়ে এতটাই চমকে গেছিল যে, সেই রেশটা এখনও একইভাবে রয়ে গেছে! তখনকার চমকে যাওয়া কিশোর রা পরবর্তীতে তাঁদের সন্তানদের ও তাঁদের নস্টালজিয়ার সন্ধান দিয়েছেন, তাই কপির পর কপি বিক্রি হয়েছে।
' মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি ' ব্যক্তিগতভাবে আমার তেমন পছন্দের নয়।
এটা শীর্ষেন্দুবাবুর প্রথম চেষ্টা!  এর প্লট চারিয়ে বা মিশে থাকা নানা খাম খুলে পরবর্তীতে ' গোলমাল ', ' সাধুবাবার লাঠি', ' সোনার মেডেল', ' বিপিনবাবুর বিপদ ' এসব উপন্যাস লেখা হয়েছে!
পরবর্তীতে যে এসব উপন্যাস আরও লেখা হবে, সেরকম গন্ধ 'মনোজ' এ ছড়িয়ে আছে!

আর 'মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি' উপন্যাসে শীর্ষেন্দুবাবু তাঁর আশ্চর্য সুন্দর জীবনদর্শন মিশিয়েছেন ভজ বাজাড়ু আর  রাজামশাই এর কাহিনিতে! আমার ধারণা  পুরো উপন্যাসকে সরের মতো টেনেছে এই ব্যাপারটাই! গোলোক মাস্টারের কাছে ' ছোট ' হয়ে অন্যায়কে শায়েস্তা করার স্পৃহা ভজ বাজাড়ুর মধ্যে যেভাবে জেগে ওঠে,তার মধ্যে দিয়ে তিনি নিজের লুকানো অতৃপ্তি আর ঝাল যেভাবে মেটাতে চান, তা অনবদ্য!!
আর আমার মতে উপন্যাসের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হ'ল গোরিমান এপিসোড!

এবার সিনেমা নিয়ে সামান্য কিছু কথা বলি...

আর সেটা বলার জন্য কেন্দ্রে রাখছি গোয়েন্দা  বরদাচরণ চরিত্রকে! বাংলা সাহিত্যে আলোড়ন তোলা চরিত্র বরদাচরণ!  কল্কেকাশি প্রভৃতির মতোই মজার গোয়েন্দা সে!সম্ভবত  শীর্ষেন্দুবাবুর নিজেরও খুব প্রিয় চরিত্র বলে তিনি বরদাচরণকে নিয়েই কয়েকটা  মজার গল্প ও লিখেছেন - ' গোয়েন্দা বরদাচরণ', ' তাহলে ' ইত্যাদি !
একদিকে চাঁচাছোলা  রাফ বাস্তবের পুলিশ  শবর দাশগুপ্ত আর অন্যদিকে এই বরদাচরণ-  শীর্ষেন্দুবাবু মিরাকল ঘটিয়েছেন!
' মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি ' উপন্যাসে এই বরদাচরণ অনেকটাই ক্লাউন!  কিন্তু পরবর্তী ছোটগল্পগুলোতে প্লট মজার কিন্তু বরদাচরণ সিরিয়াস আর অনেকটা আধুনিক ও!  তার সহকারী চাক্কু আর কুকুর ডঙ্কি (  কোথাও টমি)!

কিন্তু এই বরদাচরণকেই পর্দায় হড়কে ফেলেছেন পরিচালক! দেখিয়েছেন বরদা টেলিফোনে ফেলুদা আর ব্যোমকেশের সঙ্গে বাতচিৎ চালায়!
ব্রাত্য বসু দারুণ অভিনয় করেছেন তবে বরদাচরণ ঝুলে গেছে স্ক্রিপ্ট এ!
 অনিন্দ্যবাবুর সেন্স অফ হিউমারের আমি ভক্ত, কিন্তু এরকম পাতি আইডিয়া তাঁর থেকে অন্তত আশা করিনি।
শীর্ষেন্দুর জগৎ একেবারেই আলাদা। বরদাচরণের ও!  সেটাকে নিয়েই প্লট দানা বাঁধে!
সেখানে ফেলু, ব্যোমকেশ,হোমস,পোয়ারো এদের নাম এসে তালটাই পুরো কেটে গেছে। তার উপরে বরদা এখানে ০০৭ লেখা শার্ট পরেন।এমন একটা পিরিয়ড পিস এ আর এরকম 'অন্য' একটা জগতে এসব ঢুকে  তালেগোলে হরিবোল হয়ে গেছে!
' বাঁটুল দ্য গ্রেট ' এর জগৎ ও প্রথমে অন্যরকম ছিল...  ভালুক-পুলিশ-উটপাখি ইত্যাদি নিয়ে অদ্ভুত আলাদা একটা সুন্দর জগৎ!  কিন্তু পরে তাতে চলমান বর্তমান জগৎ ঢুকিয়ে আমার মতে রসভঙ্গ হয়েছে!

পড়বার হাস্যরস একরকম, সেটার অ্যাপিল পর্দায় ফুটিয়ে তোলা সহজ নয়!  অনিন্দ্য ৯০% সফল হয়েছেন তাতে! প্রচুর বুদ্ধিদীপ্ত ডায়লগ আর তাঁর প্রিয় 'পান' এর দারুণ ব্যবহার করেছেন তিনি!
কিন্তু তা সত্ত্বেও  ছবির তাল একদম  কেটে গেছে!  প্রতিটা বগি সুন্দরভাবে তৈরির কথা ভেবেছেন কিন্তু বগিগুলোর জয়েন্ট এর কথা সেভাবে ভাবেননি!
পিস্তল পাওয়ার পর
ভজবাবুর রূপান্তরটা ঝড়ের মতো খাপছাড়া ভাবে ঘটে যায়... কোন দাগ ই ফেলে না!
মাঝখানের কাকের দৃশ্যটা ছিল ভরকেন্দ্র। সেটা খুবই খারাপ হয়েছে।পুরো ছবিটাই সেটার জন্য উল্টে পড়েছে!  চিন্ময় রায় পরিচালিত 'টেনিদা' কিংবা সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের কাকাবাবু সিরিজের মতো এখানেও অ্যানিমেশন এর কাজ আছে!
তবে অ্যানিমেশন এখানে বেশ স্মার্ট!  তবে সব জায়গায় ঠিক জমেওনি!
অভিনেতারা দুরন্ত অভিনয় করেছেন সবাই! 
এই ছবির ট্রাম্পকার্ড শিলাজিৎ!  ডাকাত সর্দারের ভূমিকায় তিনি অনবদ্য!  ছবির মিউজিকটাও করেছেন ফাটিয়ে। অনিন্দ্য চাইলেই 'চন্দ্রবিন্দু'কে দিয়ে সেটা করাতেই পারতেন!  কিন্তু শিলাজিৎ এর পাগলামোটাকে তিনি চেয়েছিলেন।
'পাতালঘর' ছবির ( 'গয়নার বাক্স' র ও গন্ধ আছে)  মতো গান দিয়ে অনেক কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছে ছবিতে। কিন্তু দর্শক কানেক্ট করতে না ও পারেন!  কাকের দৃশ্যকে মিউজিক ও বাঁচাতে পারেনি। উপন্যাসে কাকটাও একটা চরিত্র হয়ে উঠেছিল কিন্তু সিনেমায় সেটা প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়েও ধোপে টেকেনি।

আর রাজার টাকা গোনার মতো ওরকম স্পেশাল একটা 'আইটেম' কে সিনেমায় সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখানোই হ'ল না অথচ এর উপরে অনেকটা  হিউমার, বার্তা আর দর্শন নির্ভর করে ছিল!
দৃশ্য বোনার ত্রুটির জন্য ছবিটা স্রেফ গোবরে পড়ল! কিন্তু জমাটিয়া দৃশ্যগুলো দুরন্ত ক্যামেরায় দারুণভাবে ফোটানোর ইচ্ছা ছিল!

আসলে ছবি তৈরির চেষ্টাটা এতটাই  অসাধারণ ছিল যেটা সত্যিই মুগ্ধ করে। সেট সাজানো, পোশাক ইত্যাদি সত্যিই চমৎকার!  পুরো পিরিয়ড পিস এর গন্ধ লাগা! আর অনিন্দ্যর ছবি মানেই নস্টালজিয়া !  অনেকদিন পরে ছোটবেলার বিখ্যাত ধাঁধা ''সি এইচ এ এল কে 'চলকে' না 'কল্কে'?" সিনেমায় দেখে খুব মজা পেয়েছি!

কিন্তু কব্জি ডুবিয়ে খেয়েও শেষে শুধু শশার ঢেঁকুর তুলেই তৃপ্ত হতে হ'ল!

0 comments: