Wednesday, November 7, 2018

'জাল' প্রতাপচাঁদের গল্প : উনিশ শতকের চাঞ্চল্যকর মামলা

'জাল' প্রতাপচাঁদের গল্প  : উনিশ শতকের চাঞ্চল্যকর মামলা




২৪ শে অক্টোবর চলে গেল। ঐদিনে জন্মেছিলেন প্রতাপচাঁদ। সেই প্রতাপচাঁদের মারা যাওয়া, মৃত্যুর প্রায় চোদ্দ বছর পর আবার ফিরে আসা এবং সম্পত্তি দাবি করা নিয়ে যে মামলা চলেছিল, উনিশ শতকের তোলপাড় তোলা ঘটনা সেটা।
বিশ শতকের ভাওয়াল সন্ন্যাসীর কেসের সঙ্গে এর প্রায় ৯০ ℅ সাদৃশ্য ছিল। কিন্তু এরকম রুদ্ধশ্বাস কেস, যা রূপকথাকেও হার মানায়, অনেকটাই আন্ডাররেটেড! অথচ এই মামলাটাও ছিল রীতিমতো হাড় কাঁপানো! বাংলার রাজনীতি তোলপাড় করে দিয়েছিল এই ঘটনা।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দাদা সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই ঘটনা অবলম্বনে লিখেছিলেন ' জাল প্রতাপচাঁদ।'

II পূর্ব কান্ড II
প্রতাপচাঁদ জন্মান ১৭৯১ তে। রাজা রামমোহনের বয়েস তখন সতেরো কিংবা উনিশ, ডেভিড হেয়ার তখন ষোলো, প্রিন্স দ্বারকানাথ জন্মাবেন আরও তিন বছর পর!  আর বিদ্যাসাগর আসবেন প্রায় তিন দশক পর।

প্রতাপচাঁদ বিদ্যা-বুদ্ধিতে ছিলেন তুখোড়। কুস্তি, তীরন্দাজী,সাঁতার, ঘোড়সওয়ারি সবকিছু একদম হাতের মুঠোয়!  ভাওয়াল রাজার বিদ্যার দৌড় কিন্তু সেরকম ছিল না!
 মাত্র আঠাশ বছর বয়সেই প্রতাপ বিখ্যাত অষ্টমবঙ্গ আইনের খসড়া তৈরি করে ফেলেছিলেন।
প্রতাপের বিশেষ নাম ছিল ইংরেজদের ধোলাই দেওয়ার জন্য। প্রতাপচাঁদ একদিন ঘোড়ার গাড়িতে যাচ্ছিলেন, সামনে এক ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের ঘোড়ার গাড়ি এসে পড়ে। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব পথ ছেড়ে না দেওয়ায় সেখানেই তাঁকে চাবকে দেন প্রতাপচাঁদ!
 দুটো বিয়ে তাঁর - আনন্দকুমারী আর প্যারী কুমারী ।
তাঁর বন্ধুতালিকায় কারা ছিলেন?  রাজা রামমোহন থেকে শুরু করে ডেভিড হেয়ার, দ্বারকানাথ ঠাকুর কে না!

প্রতাপের বাবা বর্ধমান রাজ তেজচাঁদের নামডাক ছিল জনকল্যানমূলক কাজের জন্য!  তিনি ছিলেন বেহিসেবি, উচ্ছৃঙ্খল আর একেবারে 'চ্যাম্পিয়ন' লোক!
তাঁর রাণী ছিলেন 'মাত্র' আটজন!  জনশ্রুতি আছে, তেজচাঁদ প্রথম তিনটে বিয়ে করেছিলেন একই দিনে। আর চার নম্বর বিয়েটা করেছিলেন তার ঠিক এক সপ্তাহের মধ্যেই!
এরপরেই বৃদ্ধ তেজচাঁদ  পরানচাঁদ কাপুরের বোন কমলকুমারীর রূপে হাবুডুবু খেয়ে বিয়েতে মেল দ্রৌপদী হয়ে যান।
পাঁচ স্ত্রী থেকে একটাও ছেলে না হওয়ায় আবার হাত ধরেন নানকী দেবীর!  তাঁর গর্ভেই জন্মান আমাদের প্রতাপচাঁদ!
তেজচাঁদের একমাত্র পুত্র! ঠাকুমা বিষণকুমারী আর সৎ মায়েদের কাছেই তিনি মানুষ হন। ইহলোক ত্যাগ করার আগে ঠাকুমা সমস্ত সম্পত্তি উইল করেন প্রতাপকে!

১৮২০ র মাঝামাঝি কোনো এক অজানা জ্বরে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েন প্রতাপ! কালনার গঙ্গাতীরে তাঁকে অন্তর্জলির জন্য নিয়ে গিয়ে হাফ জল আর হাফ স্থলে তাঁকে রাখা হয় যাতে মৃত্যুর পর তিনি ডাইরেক্টলি স্বর্গে যেতে পারেন! কিন্তু  সেই রাত্রে তুমুল ঝড়জল শুরু হ'লে প্রাণের মায়ায় সব পাহারাদার পালায়! সকালে গিয়ে দেখা যায় লাশ গায়েব ! রাজবাড়ি থেকে ঘোষণা করে দেওয়া হয় কুমার মারা গেছেন, কিন্তু কেউ তাঁর লাশ দেখেনি!
এর পেছনে ছিল ভাইবোনের মাথা - কমলকুমারী আর পরানচাঁদ! কমলকুমারী ছিলেন ধুরন্ধর বুদ্ধিমতী! তেজচাঁদের পেয়ারের বলে প্রচুর ছড়ি তিনি ঘোরাতেন!
মদ্যপ প্রতাপের সঙ্গে তিনি নাকি প্রতাপের স্ত্রীর ছদ্মবেশে মিলিত হয়েছিলেন, সেই পাপবোধেই প্রতাপ গৃহত্যাগ করেছিলেন!
সারা বর্ধমান শোকের বদলে কৌতূহলী হয়ে উঠল! রাজকুমার মারাও গেলেন, কেউ তা দেখতেও পেল না...এ আবার কী!
শোক দেখা গেল না তেজচাঁদের মধ্যেও!  কয়েকমাস পর পুত্র সন্তানের জন্য আবার বিয়ে করে বসলেন সাত নম্বর রাণী উজ্জ্বলকুমারীকে! বছর ঘুরতেই তিনি অন্ত:সত্তা হ'লেন আর সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা গেলেন!
চালু পরানচাঁদ মওকা পেয়ে কমলকুমারীর এগারো বছরের ভাইঝি মানে পরানচাঁদের কন্যা বসন্তকুমারী র সঙ্গে ঘাটের মরা তেজচাঁদের বিয়ে দিলেন!
ছিলেন শালা, হ'লেন শ্বশুর!
আর পিসি-ভাইঝি এখন সতীন!

প্রতাপচাঁদ মারা গেছেন। ভাইবোন ঘুঁটি সাজিয়ে ফেলল!  পরাণচাঁদ বুড়ো তেজচাঁদকে নিজের পুত্র চুণিলাল কাপুরকে রাজার দত্তকপুত্র হিসেবে দেন! কমল -বসন্ত দুই সতীনের কোঁদলের মাঝে পড়ে পটল তোলেন তেজচাঁদ! চুণিলাল ' মহতাবচাঁদ' বাহাদুর নামে সিংহাসনে বসেন!

II মোচড় II

ঠিক চোদ্দ বছর পর হঠাৎ একদিন বর্ধমানের গোলাপবাগের গাছতলায় এক মুখ দাড়িওয়ালা  সুশ্রী এক যুবকের উদয় হয়!
পাশের মিষ্টির দোকানের গোপীনাথ ময়রা 'ছোট মহারাজ ' ফিরেছেন বলে তাঁকে দোকানে নিয়ে  গিয়ে মিষ্টি খাওয়ান!  ভিড় জমে যায়! সন্ন্যাসী দাবি করেন তিনিই প্রতাপচাঁদ!  রাজপরিবারের সব কিসসা তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মিলিয়ে দেন! ভিড় ভেঙে পড়লো এবার!
রাজবাড়িতেও খবর গেল। ভাইবোন ভয় পেয়ে গেলেন! পরানচাঁদ দলে নিলেন জেলাশাসক অগিলবি কে!
সন্ন্যাসী রাজবাড়িতে ঢুকতে পারলেন না!  উপরন্তু পরাণচাঁদের পেয়াদাদের তাড়া খেয়ে কিছুদিনের জন্য লোকালেন বর্ধমান স্টেশনের কাছে এক শিব মন্দিরে! জায়গাটার নাম হয়ে যায় 'বাজে প্রতাপপুর'। 'বাজে' মানে নকল প্রতাপ!
তাঁকে ভাগানোর জন্য বিজয় আর রাম নামের দুই লাঠিয়াল সহ এক দেওয়ান নিযুক্ত হন! দেওয়ান বাজে প্রতাপপুরের কাছে দীঘির ধারে আস্তানা গাড়েন বলে সেই জায়গার নাম পরে হয় ' দেওয়ান দীঘি '। এর পাশেই দুই লাঠিয়াল আস্তানা গেড়েছিলেন। সেই নাম পরিচিত হয় ' বিজয় রাম' নামে!
আবার লুকোচুরি খেলা চললো! প্রতাপ এই পালান তো কয়েকবার মিথ্যা মামলায় জেল ও খাটেন! একবার তাঁকে বাঁকুড়া থেকে গ্রেফতার করে হুগলী অবধি হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়!  পথে  কোনো খাবার আর জল পর্যন্ত দেওয়া হয়নি!
শান্তিপুরের উমেশচন্দ্র রায়,রানাঘাটের কৃষ্ণচন্দ্র পাল, কৃষ্ণনগরের নরহরিচন্দ্র, কলকাতার ব্যাঙ্ক অফ বেঙ্গলের বাঙালি ডিরেক্টর সুখময় রায়ের ছেলে বৈদ্যনাথ রায় প্রমুখ জমিদার প্রতাপকে লাঠিয়াল আর টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করেন। এঁরা ঐক্যবদ্ধ হন ফকির অলখ শাহ কে আসল প্রতাপ প্রমাণ করার জন্য!
১৮৪৫ এ প্রতাপ ৪৫টি নৌবহর নিয়ে কলকাতা থেকে কালনা রওনা দেন। শোনা যায় স্নান- খাওয়া- নাচঘর এর জন্য আলাদা আলাদা নৌকা ছিল, এমনকি ভাসমান চিড়িয়াখানা ও নাকি ছিল!
গঙ্গাঘাটে হট্টমেলা বসে গেল হারানো রাজকুমারকে দেখতে! পরাণচাঁদ কাপুরও ঘুঘু... জেলাশাসক ওগিলবির কাছে নিরাপত্তা চেয়েই রেখেছিলেন!  হাজার হাজার লাঠিয়াল তৈরি হয়ে তো ছিলই,উপরন্তু নির্দেশ দেওয়া ছিল যে কালনার কোনো দোকান যেন প্রতাপদের কোনো খাদ্য বিক্রি না করে!
রাতের আঁধারে রাজার বজরায় আক্রমণ হল!  তিরিশজন মারা গেল। গ্রেফতার হ'ল ৩৩৭ জন!  প্রতাপ জলে ঝাঁপালেও বন্দী করে হুগলী জেলে পোরা হয়!

II নাটক না প্রহসন? II

এরপর শুরু হল নাটক!  ১৮৩৮ এ শুরু হ'ল বিচার। কোম্পানির পক্ষে দাঁড়ালেন উকিল বিগলেন।
জনতা দাবি জানাল প্রতাপকে মানুষ করেছেন,এমন কাউকে আনা হোক!  প্রতাপের এক বৃদ্ধা পিসি তোতাকুমারী তখনও জীবিত ছিলেন! রাজপরিবার থেকে জানিয়ে দেওয়া হল যে তিনি এতোটাই অশক্ত যে আদালতে যাওয়া সম্ভত নয়!
দুই স্ত্রী কে ডাকা হ'ল!  রাজবাড়ি সটান জানালো দুই স্ত্রী নিশ্চিত যে প্রতাপ মৃত! পরপুরুষের মুখদর্শন করলে পাপের ভাগী হবেন তাঁরা!
১৮২০ তে প্রতাপের সমান হাইটের এক অয়েল পেইন্টিং এঁকেছিলেন জর্জ চিনারী!  সন্ন্যাসী দাড়ি কামিয়ে সেই ছবির পাশে দাঁড়াতেই সবাই অবাক হয়ে দেখল প্রতাপ আর তৈলচিত্রের উচ্চতা হুবহু এক!
কিন্তু দারুণ যুক্তি দিলেন উকিল - জীবিত অবস্থায় প্রতাপের উচ্চতা তো মেপে রাখা ছিল না!
এবার শরীরের নানা চিহ্ন পরীক্ষা করা হ'ল!  ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে প্রতাপের ডান কানের লতি সুতোর ধারে একটু কেটে গেছিল, সন্ন্যাসীর কানেও অবিকল এক দাগ দেখা গেল! প্রতাপের পিঠে ঘোড়ার কামড়ের দাগ ছিল। সন্ন্যাসী পোশাক খুললেন! দাগ পাওয়া গেল!  প্রতাপের হাঁটুতে দাগ আর হাতের আঙুলে ছ্যাঁকা লাগার দাগ ছিল, সন্ন্যাসীর ও তা পাওয়া গেল!

প্রতাপের ইংরেজ বন্ধু রবার্ট স্কটকে ডাকা হ'ল!  তিনি বর্ধমানে কিছুদিন ডাক্তারী করেছিলেন! প্রতি সন্ধ্যেতে দুজনে মদ্যপান করতেন! স্কট জানান, প্রতাপের মুখের ঘা তিনি একবার সারিয়েছিলেন, মাড়িতে গর্ত ছিল!  প্রতাপের কুঁচকিতে সিফিলিসের দাগ ছিল! এসব ই সন্ন্যাসীর দেহে পাওয়া গেল!
উকিল খাপপা হয়ে বললেন চশমা ছাড়া স্কট ভুল দেখছেন! এবার সন্ন্যাসী আশ্চর্য কথা বললেন!  স্কট নাকি বদ খেয়ালে রাস্তার কুকুরদের গুলি করে মারতেন! স্কট স্তম্ভিত হয়ে যান!  আসল প্রতাপ ছাড়া সে তথ্য কারুর জানবার কথা নয়!
এবার আদালতে এলেন গোলাপবাগের কর্মী  টমাস ইয়েথারড! তিনি স্পষ্ট জানালেন অলখ শাহ প্রতাপ ই!  কারণ রোজ প্রতাপের সঙ্গে তাঁর দেখা হত!

ব্যাপারটা জমে গেল যখন আদালতে এলেন ডেভিড হেয়ার!  দুজনের অনেকদিনের দোস্তি!  তৈলচিত্র দেখে হেয়ার জানান সন্ন্যাসী ই প্রতাপ!  রামমোহনের সঙ্গে যখন হেয়ারের বাড়ি গেছিলেন, তখন দূরবীণ দিয়ে তাঁরা রাতে তারা দেখতেন। সন্ন্যাসী সেই ঘটনা বলে দিলেন!দূরবীণ রাখার বাক্সের হুবহু বর্ণনা অবধি সন্ন্যাসী বলে দিলেন!  অযোধ্যার রাজাকে হেয়ার একবার একটা পোষা পাখি উপহার দিয়েছিলেন, সেটার কথাও জাল রাজা বলে দিলেন।তবুও   কোম্পানি কি এত সহজে ছাড়ে?

দ্বারকানাথ এসে পুরো পাশাটাই উলটে দিলেন! আলোড়ন উঠে গেল তাতে!  প্রতাপের বহু পুরনো বন্ধু তিনি! তিনি সটান জানালেন সন্ন্যাসী জাল! সবাই অবাক হয়ে গেল!  গবেষকদের মতে, দ্বারকানাথ ছিলেন ' কার এন্ড টেগোর' কোম্পানির একজন কর্তা আর বর্ধমান রাজপরিবারের একদন আইনগত উপদেষ্টা! সেজন্যই হয়তো রাজপরিবারের পক্ষেই তিনি মত দেন!  আর রাজবাড়ির উপঢৌকন হয়তো তাঁকে মিথ্যে বলিয়েছিল!
তাঁর সাক্ষ্যে বিচারপতিরা নড়েচড়ে বসেন! রাজবাড়ির কর্মচারীদের ডাকা হ'ল! তারা সব পরাণচাঁদের ভয়ে কাঁটা!  কার আর বুকের পাটা থাকবে! শেখানো বুলিই তারা উগরে দিল!
প্রশ্ন উঠল, কে প্রতাপের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করেছিল? রাজপুরোহিত মনুলাল জানালেন তিনি অসুস্থ থাকায়  অন্ত্যেষ্টি তে যেতে পারেননি!  তাঁর জামাই ঘাসিরাম সে কাজ করেছিলেন!  ঘাসিরামের বয়ান নেওয়া গেল না, কারণ তিন বছর আগেই তিনি ইহলোক থেকে   কেটে পড়েছেন!
আদালতে দোষী প্রমাণিত হলেন সন্ন্যাসী! রায়ে বলা হ'ল তার আসল নাম অলক শাহ কিংবা কৃষ্ণলাল ব্রহ্মচারী! তিনি নদিয়ার বাসিন্দা!  বিচারে হাজার টাকা জরিমানা আর ছ'মাসের জেল হয় তাঁর! সেদিন আর কেউ তাঁকে সাহায্য করেনি।

II উত্তর কান্ড II

ছ'মাস জেল খেটে আর বর্ধমানে ফিরলেন না প্রতাপ!  গেলেন কলকাতার চাঁপাডাঙায়। কলুটোলায় গোবিন্দ পরামাণিকের বাড়িতে তিনমাস থেকে তিনি বুঝলেন  তখন শিখদের সঙ্গে ইংরেজদের বিবাদ চলছে! শিখদের সঙ্গে তাঁর ষড়যন্ত্র চলছে, এই অজুহাতে আবার তিনি গ্রেফতার হতে পারেন!

ফরাসী অধিকৃত চন্দননগরে কিছুদিন থেকে তিনি শ্রীরামপুরে এসে সন্ন্যাস নেন!  তাঁর বেশ কিছু শিষ্য- শিষ্যা জোটে!  শহরের জ্ঞানীগুণীরা তাঁর কাছে এসে  নানা বিষয়ে আলোচনা চালাতেন!  তিনি যেমন ইংরেজি জানতেন, তেমনি বেদান্ত বিষয়ে ছিলেন মহাজ্ঞানী!
বহু শ্যামাসঙ্গীত, পদ আর আধ্যাত্মিক লেখা তিনি লিখেছিলেন!
রাজার ছেলেকে শেষ দিকে ভাগ্যবিড়ম্বনায়  দারিদ্র্যে জীবন কাটাতে হ'ল!
১৮৫৬ তে বরানগরের ময়রাডাঙা পল্লীতে ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে মারা যান তিনি। রাজপরিবারের একজন ও সেদিন যান নি!
বর্ধমানবাসী কিন্তু তখনও বিশ্বাস করতেন রাজকুমার  ফিরে এসে  বর্ধমানের হাল ধরবেন!  ঠিক যেন কিং আর্থার!  ক্রমাগত কানাঘুষো শুনে মহাতাব চাঁদ মানে চুণিলাল কাপুর ঠিক করলেন এমন কিছু করা দরকার যাতে, প্রতাপের মৃত্যু জনমানসে দৃঢ়ভাবে  প্রতিষ্ঠা করা যায়!  আদালত যাকে আগেই ১৮২১ এ মৃত বলেছে,তার জন্য সমাধি বানাবার কথা কেউ আগে চিন্তাও করেনি,  সেই প্রতাপচাঁদের  জন্য অম্বিকা কালনায় মন্দির তৈরি করা হয়! একে আমরা জানি প্রতাপেশ্বর শিব মন্দির বলে।
বাঁকুড়ার সোনামুখী থেকে ডেকে আনা হয় টেরাকোটা শিল্পী রামহরি মিস্ত্রীকে!
জনমানসে গেঁথে দেওয়া হ'ল যে প্রতাপ মৃত, তাই এই মন্দির!

প্রতাপের স্মৃতিতে কিচ্ছু লেখা নেই। শুধু লেখা আছে '' শ্রীরাধেশ সুবেশ রাসরসিকনন্দস্য দাসী মহারাজাধীশ প্রতাপচন্দ্র মহিষী প্যারীকুমারী মঠম। '' ( ইহা প্রতাপচাঁদের নামে কোনো মন্দির নয়, নিতান্তই প্যারীকুমারীর মঠ।)

( তৈলচিত্রের শিল্পী উইলিয়াম হেনরী ফ্লেরিও হাচিনসন।)

( ঋণ : বর্ধমান রাজ - নীরদবরণ সরকার।

ইতিহাসের প্রহেলিকা আর প্রতাপেশ্বর মন্দির - সোমেন সেনগুপ্ত।

জাল প্রতাপচাঁদ - সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

বর্ধমানরাজ- আব্দুল গণি খান।

বর্ধমান শহরের স্থান- নাম বৃত্তান্ত - ড. সর্বজিৎ যশ।

জাল রাজার কথা -বর্ধমানের প্রতাপচাঁদ - গৌতম ভদ্র।

দিব্যসুন্দর কুন্ডু এবং ইন্টারনেট।)                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 (অন্বয় গুপ্ত)

0 comments: