Tuesday, December 18, 2018

বেঁচে থাকার সাহিত্য

বেঁচে থাকার সাহিত্য 


রবীন্দ্রনাথ একটি কবিতায় লিখেছিলেন,— ‘ওরে নবীন ওরে কাঁচা/ অাধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা ।’ তিনি লেখাটি লিখেছিলেন তাঁর বার্ধক্যে এসেই । রবীন্দ্রনাথের বৃদ্ধ বয়েসে বাংলা সাহিত্যের নতুন দিগন্ত নিয়ে হাজির হয়েছিল কল্লোলেরা । তাঁরা ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা করতো , কিন্তু সাহিত্যের ধারাবাহিকতাকে বের করে এনেছিল রবীন্দ্রবৃত্তের বাইরে । বুদ্ধদেব বসু, তারাশঙ্কর , অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত সহ প্রমুখ সাহিত্যিকেরা রচনা করেছিল তাঁদের সৃষ্টিশীল লেখা । সেইসময়ের বিভিন্ন পত্রিকাতেও ছাপা হত রবীন্দ্রনাথের লেখা , এবং সেসব লেখা ছাপা হত নতুনদের লেখার পাশাপাশি । সাহিত্যের এই যে বৃহৎ জগৎ , যেখানে লিটিল ম্যাগেরা চিরকাল ব্রাত্য হয়ে এসেছে , অবহেলিত হয়ে এসেছে । অথচ সাহিত্যের প্রায় সিংহভাগ কবি লেখকের লেখালিখির জীবন শুরু এই লিটিল ম্যাগের পাতা থেকেই । কবি যখন তাঁর যাবতীয় চিন্তা ও বিবেকবোধ নিয়ে লেখার জগতে আসে , এই লিটিল ম্যাগেরাই তার জন্য দরজা খুলে দেয় । ছাপা হয় তাঁর কবিতা ,গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ইত্যাদি । প্রথমে একটি পত্রিকা , এবং তারপরে ধীরে ধীরে তাঁর লেখা ছড়িয়ে পড়ে বহু পত্রিকায় । সামান্য পরিচিতি পেলে বাণিজ্যিক পত্রিকায় দু’একটি লেখা বের হয় সেই কবির । তারপর অনেক সাহিত্যিকই আর ফিরতে চান না লিটিলদের জীবনে । কোন মানুষই-বা ফিরে আসতে চায় সংক্ষিপ্ত জীবনের কাছে ! আমরা প্রত্যেকেই অস্বীকার করি আমাদের লেখার জন্মকে । বেছে নিই স্বীকৃতি , ভুলে যাই আমাদের কর্তব্যগুলোকে, যা নিয়ে একসময় আমরা শুরু করেছিলাম আমাদের লেখার জীবন । ততদিনে হয়তো লিটিলরা খুঁজে নিয়েছে নতুন কোনও কলমকে , তরুণ সেই রক্ত যা লিখছে মানুষের নিজস্ব ভাষা , তারণ্যের স্পর্ধা । সেই রক্ত সেই তেজ সেই তারুণ্য একদিন প্রৌঢ় কবিটিরও ছিল , কিন্তু আজ তা ম্লান । সাহিত্যের নিজেরও একটা সংসার আছে , বোঝা আছে । সেই বোঝা টানতে টানতে প্রৌঢ় কবিটি পৌঁছে গেছে প্রতিষ্ঠানের দরজায় । সেই কারণেই হয়তো তাঁকে বাতিল করতে হয়েছে তার লেখার জন্মস্থানকে । কিন্তু , লিটিল,— তারাই একমাত্র পারে টিকে থাকতে । যুগান্তের ঝড় যাদের নত করতে পারে না , তারাই তো পারে পৃথকভাবে নিজেদের অস্তিত্বকে জানান দিতে ।



বছর ছয়েক আগে অামিও যুক্ত ছিলাম একটা লিটিল ম্যাগের সঙ্গে । সম্পাদনা করতাম না , কিন্তু প্রায় নিযুক্ত ছিলাম সম্পাদনারই কাজে । আরও একটা ছোট্ট ব্যাপার ছিল , আমি লিখতাম মূলত লিটিল ম্যাগেই । নিজেদের পত্রিকা ছাড়াও লিখেছি অনেক লিটিল ম্যাগে , আবার অনেক লিটিল ম্যাগে লিখিওনি ।  কারণ, লিটিল ম্যাগ সংখ্যায় প্রচুর । তুলনায় বাণিজ্যিক পত্রিকার সংখ্যা অনেক কম । অদ্ভুত একটা ব্যাপার হল , লিটিল ম্যাগগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক পত্রিকার মতো তেমন কোনও প্রতিযোগিতা নেই, একে অপরকে নিয়ে কোনও বিদ্বেষ নেই । নেই কোনও বিশিষ্ট লেখককে ধরে রাখার প্রবণতাও । লিটিলরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের বন্ধু, তাদের অবস্থান একে অপরের পাশাপাশি । এই সততা আছে বলেই হয়তো লিটিলরা আজও টিকে আছে বই বিপণি ও কেতাবিবাজারের কেন্দ্রে । ব্যাপারটা ভেঙে বলি । লিটিলরা বেশিরভাগই তরুণ , কিছু প্রবীণরাও আছেন তবে তাঁদের পত্রিকা ইতিমধ্যে পরিচিতির একটা জায়গা পেয়েছে । শ্যামলদার ‘কবিসম্মেলন’ , সঙ্গীতাদির ‘শুধু বিঘে দুই’ কিংবা আরও একটু নামগুলোর তালিকা বৃদ্ধি করলে এসে পড়বে ‘চার্বাক’, ‘প্রমা’ ,‘অন্যপ্রমা’ , ‘কৌরব’ , ‘কবিতা পাক্ষিক’ , ‘মাসিক কবিতাপত্র’ , ‘কবিতা ক্যাম্পাস’ ইত্যাদি অসংখ্য কাগজ যেগুলো মানুষের বইয়ের ঝোলাতে লক্ষ্য করা যায় , অন্তত যারা কলেজস্ট্রিটে নিত্য বইয়ের সন্ধান করে বেড়ান । বেশ কিছু পত্রিকা যেগুলোতে মূলত গবেষণাভিত্তিক কাজ ছাপা হয়, সেগুলো লিটিল থেকে পা বাড়িয়েছে প্রকাশনার কাজে । কিন্তু এখনও বেরোয় সেইসব কাগজ , যেমন—‘কবিতীর্থ’ , ‘এবং মুশোয়েরা’ , এই দুটি কাগজে বিগত বহুদিন ধরে বিশ্বসাহিত্যের একটা বিরাট কাজ বাংলায় অনুবাদ করে চলেছে , বা বিদেশি কবিদের নিয়ে লেখালিখি করছে । এসব নামকরা লিটিল ম্যাগের বাইরেও আরও লিটিল ম্যাগ আছে । একেবারে অাঞ্চলিক সেসব পত্রিকার প্রায় সমস্ত কবি বা লেখকই অপরিচিত আমাদের কাছে । কিন্তু তাঁরা বিরাট একটা ভূমিকা পালন করে এসেছে লোকসাহিত্যের ক্ষেত্রে । কলকাতার প্রেস থেকে ছেপে সেসব পত্রিকারা ট্রেনে চড়ে ফেরৎ যায় গ্রামে-গঞ্জে-মফঃস্বলে । এখন অবশ্য জেলায় জেলায় প্রেস হয়েছে , ছাপা হচ্ছে আঞ্চলিক কাগজপত্র, কিন্তু শহরের শিক্ষিত মানুষেরা সেসব পড়ে দেখার গুরুত্ব দিচ্ছে কই ? ফলত , বিক্রি নেই , সম্পাদকের নিজের বাড়িতেই বিছানার নিচে জমা হচ্ছে সেইসব পত্রিকার বাণ্ডিল । নিজেদের পকেট থেকে পয়সা বের কর বড়জোর চার-পাঁচটা সংখ্যা ছাপাচ্ছে , শেষে অার্থিক ক্ষমতায় কুলাচ্ছে না বলে সেই পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । অামি নিজেই লিটিল ম্যাগের মেলা থেকে এমন অনেক পত্রিকার পুরনো সংখ্যা কিনেছি যেগুলো এখন বন্ধ হয়ে গেছে ।  সেসব সংখ্যায় সুনীল,শক্তি এবং আরও পরে জয় গোস্বামীর মতো নামকরা কবিরা একসময় লিখতেন । এখন পত্রিকাগুলো হয়ে উঠেছে তাঁদের লেখার জীবাশ্ম । 


ব্যাপারটা অসত্য নয় । কেননা, লিটিল ম্যাগ যারা করেন, তারা সাহিত্যকে ভালবাসেন তাদের অন্তরের গূঢ় আবেগ থেকে । প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির লোভ তাদের হয়তো থাকে না । আর সেই জন্যেই নিজস্ব পকেটকে তারা নির্দ্বিধায় বিলিয়ে দেয় পত্রিকাটির স্বার্থে । লিটিলরা বয়সে কাঁচা , কিন্তু তারাই উপযুক্ত কাঁধ যারা দ্বিধাহীনভাবে তুলে নিতে পারে সচেতন কর্তব্যগুলোকে । এর মধ্যে আমি কোনও অন্যায় দেখি না । লিটিল ম্যাগরা মূলত বিজ্ঞাপন পায় না , কোনও সংস্থা তাদের ওপর আর্থিক বিশ্বাস রাখতে পারে না । কেননা, বিজ্ঞাপনদাতারা সাহিত্যমনস্ক নয় , যেহেতু লিটিল ম্যাগের বিক্রি তেমনভাবে নেই ,তাই লিটিল ম্যাগকে সাহায্য করার মানুষও তেমন নেই এই অর্থনীতির বাজারে । ছাত্রছাত্রীরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা , আর্থিক ব্যয়ভার সামলে এই পত্রিকাগুলো বের করে । সেখানে তারাই হয়তো লেখে বেশিরভাগ । কিছু ক্ষেত্রে পাশে দাঁড়ান অধ্যাপকরা । কখনও তাঁরা আর্থিক সাহায্য করেন, কখনও লেখা দিয়ে সাহায্য করেন, কিংবা যোগাযোগ করিয়ে দেন তৎকালীন সমাজে প্রতিষ্ঠিত নামকরা কবি সাহিত্যিকদের সঙ্গে । কিন্তু সেসবও একদিন পরিস্থিতির চাপে ঝাপসা হয়ে যায় । ছাত্রছাত্রীদের পড়াশুনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বদলাতে হয় , অধ্যাপকরা অবসর নেন, লিটিলের দল ভেঙে পড়ে । ফলে সেই পত্রিকা একসময় তার পরবর্তী সংখ্যা প্রকাশ করতে বহুবছর সময় পার করে ফ্যালে , এবং কখনও তা বন্ধও হয়ে যায় । 



তাহলে প্রশ্ন হল, লিটিলরা কীভাবে জয়ী হচ্ছে এই সাহিত্যের দুনিয়ায়  ? লিটিলরা তুলে অানে মানুষের ভিতরকার ভাষা, নেপথ্যের কাহিনি , আঞ্চলিক লোকসাহিত্য কিংবা তারা তাদের ধুলোভরা পৃষ্ঠায় জমিয়ে রাখে টুকরো টুকরো সামাজিক সত্যগুলো , যা একচেটিয়া ধারণা থেকে আসেনি , যা এসেছে তরুণদের সততা ও নিরলস পরিশ্রম থেকে । সাহিত্যের যাঁরা গবেষক, তাঁরা মূলত গবেষণার জন্য তথ্য সংগ্রহ করে এই লিটিল ম্যাগগুলো থেকে । একজন কবির রচনসমগ্র সম্পাদনা করার আগে সম্পাদকেরা খুঁজতে থাকে সেইসব বন্ধ হয়ে যাওয়া লিটিল ম্যাগ যেখানে প্রথম জীবনে সেই কবিটি লিখে এসেছেন অজস্র লেখা । পুরনো সেইসব লিটিল ম্যাগ তখন কেনা হয় চড়া দামে , কেনা হয় গবেষণার প্রয়োজনে, নতুন বই করার জন্যে । শুরুতে যে লিটিলরা পায় সমাজের উঁচুতলার অত্যন্ত অবহেলা , একদিন তারাই হয়ে ওঠে মহামূল্যবান সাহিত্যসম্পদ । কিন্তু সেইসব তরুণেরা , তারা কেমন আছে সেসব কেউ খোঁজ নেয় না । তাদের মধ্যে থেকেই অনেকে হয়তো এখন হয়ে উঠেছে খ্যাতনামা সাহিত্যিক , যাঁদের কলম শুরু ঐ লিটিল থেকেই । ক্ষুদ্র কীভাবে বৃহৎয়ের দ্বারা ভর্ৎসিত হয়, অপমানিত হয়, তা আমরা অল্পবিস্তর সকলেই দেখেছি । কিন্তু লিটিল ম্যাগ সেই ভর্ৎসনা ফিরিয়ে দেয় শতগুণে বর্ধিত করে , কারণ তাঁরা স্পর্ধায় মাথা নত করে না । 


শেষে বলি, আমি যে পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম তাও এখন প্রায় বন্ধ, কিন্তু লিটিল ম্যাগের ভিতরে আমি আজও দিন কাটাই । সংগ্রহ করি তাঁদের, লেখা পাঠাই কোনও কোনও লিটিল ম্যাগে ।  লিটিল ম্যাগ মেলায় গিয়ে বসে পড়ি কোনও একটা পত্রিকার টেবিলে । চারপাশে আরও টেবিল, আরও পত্রিকা, সহস্র তরুণেরা আজও আমার বন্ধু । এমনও হয় কোনও পাঠককে আমি বিক্রি করতে পেরেছি দু’এক কপি পত্রিকা । বাড়ি ফিরি একরাশ আনন্দ নিয়ে ।  কেননা , লিটিলরাই তো সাহিত্যের সত্যিকারের মহৎ প্রাণ । আমাদের বেঁচে থাকার সাহিত্য । 

লিখছেন - শুভদীপ নায়ক

0 comments: