Friday, December 21, 2018

তৃতীয় লিঙ্গের সন্তান

তৃতীয় লিঙ্গের সন্তান


পাঁচ বছর বয়স হতে না হতেই শৌনক যখন আধো আধো স্বরে বলল, "মা, আমি চা বানাব|" সেদিন শৌনকের মা শর্মিলা দেবী যারপরনায় অবাক হয়েছিলেন| মা-ঠাকুমার কাছে শুনেছিলেন ছোটো থেকেই নাকি তার রান্নার প্রতি ভীষণ ঝোঁক| কোন ছোটোবেলায় যে ভাত-ডাল-চচ্চরি আর মাছের ঝোল শিখেছেন তার কোনো ইয়াত্তা নেই| তারপর বয়সে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রান্না নিয়ে কত এক্সপেরিমেন্ট করেছেন, মা-ঠাকুমার রেসিপি নিজের মতো করে স্বাদ এনেছেন আর বাবা-কাকা খেয়ে আঙ্গুল চেটেছে| ছোট্ট শৌনকের কথা শুনে আজ একলহমায় সব কথা যেন ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে উঠল শর্মিলা দেবীর|  পাড়ার পুজোর অষ্টমীর খিচুরী রান্নার প্রতিযোগিতায় সেরা রাঁধুনির খেতাবটাও যেন গত তিন বছর ধরে রেজিস্ট্রি হয়ে থাকত শর্মিলা মিত্রের নামে| সেবার শর্মিলাদের পাড়ার দুর্গাপুজোয় অষ্টমীর বিশেষ অতিথি বিখ্যাত ব্যাবসায়ী অবিনাশ সেনের বছর কুড়ির সুবেশা তন্বী তথা  পাড়ার সেরা রাঁধুনী খেতাব বিজেতা শর্মিলার রান্না করা খিচুরী মুখে দিয়ে, তিনি যেন মায়ের হাতের সেই স্বাদ খুঁজে পেলেন আর মনে মনে নিজের পুত্রবধূরূপে মা দুর্গার সামনে আর্শিবাদ করলেন|

 ঠিক পুজোর পরেই অবিনাশ সেন মিত্র বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন| মধ্যবিত্ত মিত্র বাড়ির সদস্যরা এ প্রস্তাবে যেন হাতে চাঁদ পেলেন| কিন্তু সদ্য কলেজে ভর্তি হওয়া শর্মিলা এই প্রস্তাব না মেনে নিজের পড়াশুনার দাবী জানালে, তা স্থায়ী হল না| মধ্যবিত্ত একান্নবর্তী সংসারে বাবা-কাকার আদেশ মেনে নেওয়াই রীতি সেটা ভালো করে  মেয়ের মস্তিষ্কে প্রবেশ করিয়েদিলেন শর্মিলার মা অনুসূয়া দেবী|

তারপর যথারীতি বর ও তার বন্ধুদের সাথে তাকে দেখতে আসা এবং আর চোখে বর  অনিমেষকে দেখতে তার খুব একটা খারাপ লাগেনি| এরপর বিয়ে-বাসর রাত-হানিমুন পেরিয়ে শাশুড়িবিহীন বড়লোক শ্বশুরবাড়ীর গৃহকর্তী হয়ে উঠতে খুব বেশি সময় সময় লাগেনি শর্মিলার| বিয়ের পরের স্বপ্নের মতো কেটে যাওয়া দিনগুলো আরও রঙিন করেছিল প্রেগেনেন্সি কিটের পজেটিভ সাইন| ব্যাস্ততম সেনবাড়িতে নতুন প্রাণের আগমনের অপেক্ষার উৎসব শুরু হয়েছিল আর শর্মিলা হয়ে উঠেছিল সেই উৎসবের মধ্যমনি| কিন্তু এই আনন্দ-উৎসবের আলোকে ম্লান করে দিয়ে শর্মিলা জন্ম দিয়েছিল কিন্নর সন্তানের| অবশ্য আধুনিক সমাজের উচ্চবিত্ত সেনপরিবারের সদস্যদের মতে বংশের কলঙ্ক জন্মগ্রহণ করেছিল শর্মিলার কোলে তাই অবিনাশ সেন ও তার সুপুত্র সদ্যজন্মানো সন্তানকে কোনো সরকারী হোমে পাঠিয়ে দিয়ে দ্বিতীয় সন্তানের প্ল্যানিং করাটাই শ্রেয় বলে মনে করেছিলেন| অবশ্য শর্মিলা ওই জ্যান্ত পুতুলটাকে অপটু হাতে মাতৃসুধা পান করিয়ে নিজের পরিপূর্নতাকে অনুভব করেছিল| কোনো এক অজানা শক্তিতে বলীয়ান হয়ে হাসপাতাল থেকে ছুটি হওয়ার পরে নিজের সন্তানকে আঁকড়ে ধরে পাড়ি দিয়েছিলেন অজানা ভবিষ্যতের উদ্দ্যেশে আর সন্তানকে নিজের কাছে রাখার পুরস্কার হিসেবে যথাসময়ে ডিভোর্স লেটার হাতে পেয়েছিলেন তিনি| তারপর নিজের হাতের রান্নাকে অস্ত্র বানিয়ে সামান্য হোম ডেলিভারীর অর্ডার সাপ্লাই দিতে দিতেই আজ বিরাট পাঁচতারা হোটেলের মালকিন শর্মিলা মিত্র|
পুরোনো কথাগুলো ভাবতে ভাবতে চোখের কোন দিয়ে কয়েক ফোঁটা নোনতা জল গড়িয়ে গেল শর্মিলার|
-"মা, ও মা দেখ ফটোর বুড়ো দাদুটা বাইরে তোমাকে খুঁজছিল|", চিৎকার করতে করতে ঘরে ঢোকে শৌনক| চোখের কোনটা মুছে ঘুরে দাঁড়াতেই  কেঁপে ওঠে তার শরীর| নোংড়া কাপড়, বলিরেখাযুক্ত মুখ, অসুখের ভারে বয়স্ক হয়ে যাওয়া রুগ্ন শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে  আছেন সেদিনের প্রতাপশালী অবিনাশ সেন, তার প্রিয় পুত্র ও পরিবারের কাছ থেকে বিতাড়িত হয়ে এসেছেন তার তৃতীয় লিঙ্গের নাতী বা নাতনীর কাছে একটু আশ্রয়ের খোঁজে|
(সমাপ্ত)                                                                                                                                                                                                                                                                                                                            নীলাঞ্জনা

0 comments: