Sunday, December 16, 2018

রিভিউ : কিশোরকুমার জুনিয়র

রিভিউ : কিশোরকুমার জুনিয়র


কবীর সুমন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তাঁর 'পেটকাটি চাঁদিয়াল' গানটা গৌতম ঘোষ ভালো গাইতে পারবেন। এঁদের 'কন্ঠী' বলে তাচ্ছিল্য  করা হ'লেও এঁরা দম রাখেন!  এঁরা জানেন যে কিশোরকুমারের 'দুখী মন মেরে' গাইতে না পারলে পাবলিক মেরে বার করে দেবে।

যাদবপুরের বাংলা বিভাগে পড়তে পড়তেই একটা গল্প শুনেছিলাম ...  শ্রী শঙ্খ ঘোষ মহাশয়ের একবার গলায় সমস্যা হয়েছিল... সেজন্য মাইক ইত্যাদি আনা হয়! শ্রীঘোষ বক্তব্য রাখার সময়ে স্ট্যান্ড থেকে মাইক খুলে হাতে নিয়েছিলেন আর বলেছিলেন ' কিশোরকুমার স্টাইল। '
এই মাইক খুলে হাতে নেওয়ার কায়দাটা কিশোরকুমার ই জনপ্রিয় করেন। আমার আত্মীয়-স্বজন অনেকেই তাঁর স্টেজ শো দেখেছেন!  তিনি রীতিমতো নেচেকুঁদে, জগঝম্প করে গাইতেন!  কখনো আসতেন ঘোড়ায় চেপে, কখনো পালকি চড়ে, কখনো আবার সাইকেল চালিয়ে! সে এক দেখবার মতো জিনিস ছিল!  অথচ গলায় থাকত একইরকম মাদকতা... সুর একফোঁটা নড়ত না!
তাঁর ছেলে অমিতকুমার কী বলছেন শুনে নেওয়া যাক :
'' বাবা যখন লন্ডনে গিয়েছিলেন, ওখানকার শিল্পীদের স্টেজ শো দেখে বেশ অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। বুঝেছিলেন, পশ্চিমি শিল্পীরা যেভাবে স্টেজ মাতিয়ে রাখেন, তেমন করে মাতানোর কথা আমরা ভেবে উঠতে পারি না। পশ্চিমি গানে বডি ল্যাঙ্গোয়েজ খুব ইম্পর্ট্যান্ট। দর্শককে আরও ইনভলভ করে রাখার জন্য হাস্যরস পরিবেশনেও তুখোড় হতে হবে। দেশে ফেরার পরে ভাবলেন, ‘আরে! এটা তো এখানেও চালু হওয়া উচিত!’ যেই ভাবা সেই কাজ।
আগে স্টেজ শোয়ের ব্যাপারে কোনও ইন্টারেস্ট ছিল না ওঁর। বহু জলসাদার দরজা থেকে ফিরে গিয়েছেন। সবাইকে পত্রপাঠ বিদায় করেছেন। পরে বুঝেছিলাম, অসামান্য প্রতিভাধর ব্যক্তিরা কখনও স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন না। নিজেই তৈরি করেন নিজের স্রোত। আর তার পরে অন্যান্যরা সেটা অনুকরণ করেন।
তখন বাবা ইনকাম ট্যাক্সের চাপে জেরবার। বিকল্প রোজগারের কথাও ভাবছিলেন মনে মনে। দর্শকের কাছে কিশোরকুমারের চাহিদা তখন তুঙ্গে। অবশেষে মঞ্চে অবতীর্ণ হলেন কিশোরকুমার।
মঞ্চে উঠে প্রথমেই একটা ডিগবাজি খেলেন বাবা। সঙ্গে সঙ্গে দর্শকমহলে হই-হই। তখন হেমন্ত, মান্না দে-রা সবাই গাইতেন হারমনিয়াম বাজিয়ে। কিন্তু বাবা যে-কাজটা করলেন, তাতে দর্শকের তাক লেগে গেল। কিশোরকুমারের গায়কীর সঙ্গে একাত্ম হতে মাত্র এক মিনিট সময় লেগেছিল। নিজে অভিনয় করতেন বলে, গানের মুড অনুযায়ী বদলে ফেলতেন কায়দাকানুন।"

অথচ খুব কম লোকেই জানেন জীবনের একটা বড়ো সময় পর্যন্ত ভালোরকম ই লাজুক ছিলেন কিশোর... বিশেষ করে কেউ মিউজিক কনসার্টে গান গাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেই পালাতেন। একবার প্লে-ব্যাক সিংগার অ্যাসোসিয়েশন-এর ফান্ড রেইজিং প্রোগ্রামে গান গাওয়ার কথা ছিল কিশোরকুমারের। তাঁর স্টেজ- আতঙ্কের কথা অ্যাসোসিয়েশনের অনেকেই জানতেন। তাই তালাত মামুদের উপর দায়িত্ব ছিল কিশোরকুমারকে ঠেলে স্টেজে তোলার। কিন্তু, তালাত মামুদ বাড়িতে গিয়ে দেখেন কিশোরকুমার ঘরে তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে গিয়েছেন।

 পরে সুনীল দত্ত কিশোরকুমারের এই স্টেজ আতঙ্ক দূর করেছিলেন।
সুনীল বলেছেন :
''সিনেমা করতেন, প্লে ব্যাক করতেন। আমার মনে হল, এই লোকটাকে দিয়ে যদি মঞ্চে গাওয়ানো যায়, তাহলে কেমন হয়। বললাম, গুরুজি, একবার ভাবুন তো, পাহাড়ে বরফের উপর দাঁড়িয়ে জওয়ানরা আপনার গান শোনে। তারা যদি আপনাকে সামনে থেকে দেখে, তাহলে কত ভাল হয়! কিছুটা নার্ভাস ছিলেন। রিহার্সাল হল। নিয়ে গেলাম নাথুলা সীমান্তে। আমি বললাম, আমি সামনে থাকি, আপনি পেছনে দাঁড়িয়ে গেয়ে যান। কিশোরদা ধরলেন, ‘মেরে সামনে ওয়ালি খিড়কি মে / এক চাঁদ সা টুকড়া র্যাহতা হ্যায়’। জওয়ানরা ভাবছিল, হয়ত আমিই গাইছি। অমনি আমি সামনে থেকে সরে গেলাম। কিশোরদাকে দেখে সে কী হাততালি! থামতেই চায় না। কিশোরদা বললেন, এত ঠান্ডায় জওয়ানরা দাঁড়িয়ে আছে, আমি গান গাইতে পারব না! একের পর এক গান গেয়ে শোনালেন। সেই শুরু, তারপর স্টেজেও মাতিয়ে গেলেন দেশের নানা প্রান্তে, এমনকি দেশের বাইরেও। কিশোরদাকে নিয়ে যদি সত্যিই কোনও ইতিহাস লেখা হয়, তাতে আমার নামও থাকবে। আমিই তো প্রথম স্টেজে গাইয়েছিলাম।''
কল্যাণজির কথায়  :

"স্টেজ শো করার ব্যাপারে কিশোরদাকে অনেকবার বলেছি। উনি বারবার বলেছেন, এত লোক থাকবে। তাদের সামনে গান গাওয়া সম্ভব নয়। তাঁকে বোঝালাম, আপনি কাদের ভয় পাচ্ছেন ? যারা দর্শকাসনে বসে থাকবে, তারা কেউ তো আর গুলাম আলি, লতা মঙ্গেশকার বা মহম্মদ রফি নয়। আপনি তাদের ভয় পাচ্ছেন ? কথাটা ওঁর মনে ধরল। বললেন, গাইব। এমন গাইলেন, সবাইকে পাগল করে দিলেন।"

একবার সিভিক ক্লাস চলাকালীন কলেজে এভাবে বেঞ্চে তবলা বাজাচ্ছিলেন কিশোরকুমার। এরজন্য শিক্ষকের কাছে কড়া ধমকও খান তিনি। কিন্তু, কিশোরকুমারের পাল্টা উত্তর ছিল গান গেয়েই তিনি অর্থ উপার্জন করবেন। তাই এখন থেকে এভাবেই হাত ও গলা পাকাচ্ছেন।

আমি কিশোরকুমারের অন্ধ ভক্ত! অনেক ছোটবেলা থেকেই  আমার বাড়িতে নানান রকমের গান শুনে আমি অভ্যস্ত। পল রোবসন থেকে স্বপন বসু - সব!
কিশোরকুমারের গান শুনে সেই থেকে আমি আজ অবধি প্রাণের আরাম পেয়ে আসছি - সেই জায়গা আর কেউ নিতে পারেননি।আমি প্রবল মাথা গরম করে ঝামেলা করলে বা অসম্ভব দুঃখ পেলে বাড়ির লোক  কিশোরকুমারের গান চালিয়ে দিতেন!  বিভিন্ন আড্ডায় আমায় যদি গান গাইতে হয়, আমি দশটা গান গাইলে তার মধ্যে অন্তত আটটাই কিশোরকুমারের গান গাই!
দিনে অন্তত দুটো কিশোরকুমারের গান আমি শুনি ই!
তাঁর গান নিয়ে কেউ নেগেটিভ কথা বললে আমি আঘাত পাই!  ভাস্কর চক্রবর্তী তাঁর দিনলিপিতে লিখেছিলেন কিশোরকুমারের কন্ঠে রবীন্দ্রসংগীত ' আমার বেলা যে যায় ' শুনে তাঁর দিনটা নষ্ট হয়েছিল!  আমার খুব মনোকষ্ট হয়েছিল সেটা পড়ে!
তাঁকে নিয়ে যত রকমের লেখা কিংবা ইন্টারভিউ পাই, সবেতেই চোখ বুলাই।
তবে আমার এই লেখার বিষয় শুধু কিশোরকুমার ই নন...  সেটা হ'লে এই লেখা যে কোথায় গিয়ে থামবে সেটা বলা মুশকিল!  জিভে প্রায় রিভেট করেই লোভ সামলাতে হচ্ছে!
আশির দশকে সম্ভবত উত্থান হয় কিশোর কন্ঠীদের!  সেসময় কিশোরকুমারের সেরকম কাজ ও ছিল না!  রাহুল দেববর্মন এর সুর দেওয়া ছবি একের পর এক ফ্লপ হচ্ছিল!  ঝড়ের মতো উঠে এলেন বাপ্পী লাহিড়ী!  কিশোর কে দিয়ে অনেকগুলো সুপারহিট গান গাওয়ালেন তিনি!  কয়েকটা অমরত্ব ও পেয়ে গেছে!  বাংলায় অজয় দাস প্রমুখও তাঁকে দিয়ে কয়েকটা অসাধারণ গান গাইয়ে নেন!
এরকম সময়েই কন্ঠীরা বাজারে আসতে শুরু করেন!
গৌতম ঘোষ প্রমুখ এভাবেই কিংবদন্তি হয়ে যান। গৌতমবাবুর প্রোগ্রাম আমি একবার দেখেছিলাম... রবীন্দ্রসংগীত গাইছিলেন! 'আকাশ ভরা সূর্য তারা'... চোখ বন্ধ করে মনে হচ্ছিল অবিকল কিশোর গাইছেন!  অবিকল!
আমার মা প্রচুর কন্ঠীদের অনুষ্ঠান দেখেছেন!  হোল নাইট প্রোগ্রাম! কাতারে কাতারে মানুষ ছুটে আসতেন সেসব প্রোগ্রাম দেখতে!  এঁরা একের পর এক তাঁদের গুরুদের সে কিশোর হোন বা রফিদের নকল করে ( অনেকের আবার নিজস্ব স্টাইল ও ছিল) গান গেয়ে যেতেন!কিংবদন্তি শিল্পীদের গান এঁরাই পৌঁছেছেন প্রত্যন্ত সব অঞ্চলে। 'গুরু'রাই কন্ঠীর মতো গলায় ঝুলে থেকেছেন সারাটা জীবন!  স্টেজ মাতিয়ে রাখতেন রীতিমতো! অনেকেই আবার প্রপস ইত্যাদি ব্যবহার করে চমক দিতেন!
'ধুপ মেঁ নিকলা না করো রূপ কি রানী' গাওয়ার সময়ে মহিলা শিল্পীর মাথায় রীতিমতো অভিনয় করে ছাতা ধরতেন কেউ কেউ!  সেই একই ছাতাতেই পরে অনেকসময় দু'জনেই আশ্রয় নিয়েছেন পাকাপাকি!

কিন্তু এই 'কপি সিঙ্গার'দের সবসময় মানুষ গ্রহণ করেন না!  তাই এদের জীবনে প্রচুর স্ট্রাগল থাকে! 'গুরু'দের গান গাইতে গাইতে নিজস্ব পরিচয় এঁদের লোপ পায়! কেউ কেউ সারাবছর ই কন্ঠী হিসেবে গান গেয়েই রোজগার করেন! আবার অনেকেরই অন্য রোজগার ও থাকে!  গান গাওয়ার বরাত পেলে সেই কাজ শেষ করে গানটা গাইতে আসেন। কাজের জায়গার পোশাকটা ছেড়ে যখন গান গাওয়ার পোশাকটা গায়ে চাপান, তখন  নিজের কাছেই নিজে আরও একটু জেল্লাদার, আরও একটু প্রাণবন্ত হয়ে পড়েন!  অনেকটা নায়কও।
।একদম ঠিকই বলেছ।  রাত একটা দেড়টার পর যখন স্টেজটা আরও ছড়ায়,  তখনই ডাক পড়ে এঁদের। কিন্তু , যখনই উঠুন, ওঁরা কিন্তু স্টেজটা মাতিয়ে দেন। একজন মূল গায়ক না হলেও, ভালো কণ্ঠী হতে গেলেও  ভালো করে গানটা জানতে হবে। শিখতে হবে। রেওয়াজে বসতে হবে। কিন্তু এতকিছুর পরেও, এঁদের যন্ত্রণা হ'ল, এঁরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই  স্টেজটা পান সবসময়ই নামীদামী শিল্পীদের পরে।
গৌতম ঘোষ প্রসঙ্গে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় একটা ইন্টারভিউ তে বলেছেন :
'' আমি গৌতমদার কাছ থেকে একটা ঘটনার কথা শুনলাম। সেটা বহু বছর আগের ঘটনা। গৌতমদার তখন অল্পবয়স। কিন্তু, তখনই উনি যথেষ্ট পরিচিত। দিনে তিনটে-চারটে করে ফাংশন করছেন। তা, উনি দমদমে একটা শো করতে গিয়েছেন। সেখানে সব বিখ্যাত শিল্পীরা গান গাইবেন। উনি বসেই আছেন। ওই শিল্পীরা গেয়েই যাচ্ছেন। রাত এগারোটা বাজল, বারোটা বাজল, আড়াইটে, তিনটে হয়ে ভোর হয়ে গেল। গৌতমদা তখনও বসে আছেন মঞ্চে উঠে গানটা গাইবেন বলে। সকাল ছ’টার সময় ওঁর কাছে এসে উদ্যোক্তারা বলেছিল, দাদা। আজ ছ’টা বেজে গেছে। সকাল হয়ে গেছে। আজ আর হবে না। তবে, আপনাকে কথা দিচ্ছি, পরের বছর আপনাকে ডাকবই। দারুণ বড় করে জায়গা দেব।
...এটার থেকেও বেশি প্যাথেটিক হল পরের বছরের ঘটনাটা। সেই বছরও ওঁকে ডাকল ওই উদ্যোক্তারা। উনি গেলেন। সেই বছরের ফাংশনেও প্রচুর বিখ্যাত গায়ক-গায়িকারা গাইছেন। গৌতমদা ঠায় অপেক্ষা করছেন গান গাইবেন বলে। আবার সেই রাত হল, রাত পেরিয়ে মধ্যরাত হল, মধ্যরাত পেরিয়ে ভোর হয়ে গেল। আবার সেই সকাল ছ’টার আশেপাশের একটা সময় উদ্যোক্তারা এসে বলছে, দাদা। খুব ভুল হয়ে গেছে। এখন সকাল হয়ে গেছে। আপনি দুটো গান কোনওভাবে গেয়ে দিয়ে নেমে যাবেন প্লিজ! গৌতমদা স্টেজে উঠল শান্তভাবে। তারপর কী হয়েছিল জানো?...
গৌতমদা টানা আড়াই ঘন্টা ধরে গান গেয়ে গিয়েছিলেন। এবং, একজন দর্শকও কিন্তু উঠে যায়নি। সকালের ওই আড়াই ঘন্টা তারা মন দিয়ে গানগুলো শুনেছিল। যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।"

 এঁদের প্রত্যেকের পারফরমেন্সের মধ্যে চমৎকার একেকটা নাটক পোরা। তাক লাগানো  অভিনয় আছে। স্টেজ পারফরমেন্সটাকে অন্য লেভেলে পৌঁছে  দেওয়ার জন্য এটা খুব জরুরি। কুমার  শানু  স্টেজের ওপর দাঁড়িয়ে শাহরুখ খানের মতো অ্যাক্টিং করতেন!  একেকজন ‘দূত’ এঁরা!  মূল গানটাকে  মানুষের কাছে বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে , বছরের পর বছর ধরে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পৌঁছে দিচ্ছেন। কিশোরকুমারের গান  মহম্মদ রফির গান , কতরকমের  কণ্ঠী  !  ঠিক কী মাপের গায়ক ছিলেন এঁরা... কোন পর্যায়েই বা পৌঁছেছিলেন তাঁরা যেখানে মৃত্যুর এত বছর পরেও হাজার হাজার কন্ঠী এঁদের গান গেয়ে এখনও সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন! অবিশ্বাস্য!
প্রতিভাবান অনেক কন্ঠী উঠেছিলেন সেই সময়ে!
তাঁদের বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা!

উদয়শঙ্কর রায়চৌধুরী ছিলেন এমনই একজন!
কিশোরকুমারের সঙ্গে তাঁর  দীর্ঘদিন ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল৷ অসংখ্য বাংলা সিনেমায় তিনি কিশোরের গানের ট্র্যাক গেয়েছেন৷ কিশোরের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে গেয়েছেন বহুবার৷ গাওয়ার মিলে চমকে গেছিলেন  কিশোরকুমার নিজেও!
যতীন দাস পার্ক থেকে কালীঘাট মন্দিরের দিকের রাস্তায় যে কোনও দোকানকে জিজ্ঞাসা করলেই দেখিয়ে দেবে উদয়বাবুর বাড়ি!  সেই ১৯৭৪ সাল থেকে দাপিয়ে গেয়ে আসছেন৷ কিশোরের গান অনুষ্ঠানে গাওয়ার সময় তিনি নাচতেন!!  ‘দেখা না হায় রে, সোচা না হায় রে’-র মতো একটু ফাস্ট গান হ'লেই স্ট্যান্ড থেকে মাইক খুলে হাতে নিয়ে নেন৷

সারা স্টেজে ঘোরেন৷ ‘বিপিনবাবুর কারণসুধা’ গাওয়ার সময় বোতল থেকে গ্লাসে জল ঢেলে  টলমল করে নেন৷  কিশোরকুমারের সঙ্গে তাঁর মোলাকাতের ঘটনাটা দারুণ!  একবার কিশোর এক অনুষ্ঠানে যাওয়ায় সেখানে চলে গিয়েছিলেন উদয়রাজও৷ শ্রোতারা রিকোয়েস্ট করলেন  রাজেশ খান্নার  ‘ছাইলাবাবু’ ছবির ‘ম্যায় বাবু ছাইলাবাবু’ গানটা৷ কিন্ত্ত গানটার কথা মনে করতে পারছিলেন না কিশোর৷ তখনই নিজের থেকে এগিয়ে যান উদয়৷  অনুষ্ঠানে গেয়ে গেয়ে  সে গান তাঁর মুখস্থই ছিল৷ কিশোরের গানের লিরিক কিশোরকেই গড়গড়িয়ে বলে দেন তিনি৷  খুব প্রশংসা করেন কিশোর৷ উদয়কে ডেকে নেন মঞ্চে৷ বলেন, ‘গাও আমার সাথে৷’ এরপর অজয় দাসের সুরে কিশোরের গাওয়া বহু বাংলা গানের ট্র্যাকে কন্ঠ দিয়েছেন উদয়৷ ‘মংলু আমি, জংলি আমি, পাহাড় দেশে থাকি’ গানটায় তাঁর ট্র্যাক ভয়েস শুনে একেবারে অবাক হয়ে যান স্বয়ং কিশোর৷ এতটাই মিল! মজা করে নাকি বলেন, ‘এটায় আর আমার গলা না দিলেও হবে!’ কিশোর নিজে পছন্দ করতেন বলে অজয়বাবুও উদয়কে দিয়েই প্রায় সব গানের ট্র্যাক রেকর্ডিং করাতেন৷ আর সেই সূত্রেই উদয়ের  আছে বহু স্মৃতি ৷  ‘ভালোবাসা ছাড়া আর আছে কী’ গানেরও ট্র্যাক-এ গলা দেন উদয়ই৷ কিন্ত্ত বম্বের ওয়েস্টার্ন স্টুডিওতে টেক করার পর কিশোর খেয়াল করেন লয়  ঝুলে আছে যান্ত্রিক গোলযোগে৷ উদয়কে বলেন, ‘চলো, রেডিও জেম স্টুডিওতে গিয়ে কারেকশন করে নিই৷’ একটা ১২ তলা বাড়ির নয় তলায় রেডিও জেম-এর অফিস৷ সেদিনই লিফট খারাপ৷ কী করা যায়? অগত্যা কিশোর বললেন  চলো আস্তে আস্তে উঠি৷' কারণ, দু’বার তাঁর  স্ট্রোক হয়ে গেছে আগে! কিশোরকুমার তাঁর কাঁধে হাত দিয়ে উঠছেন মনে পড়লে এখনও শিহরণ বোধ করেন উদয়৷ মনে পড়ে, কেমন করে একবার একটা গানে ক্ল্যাসিকাল পার্টটা অক্লেশে গেয়ে হাঁটুতে থাপ্পড় দিয়ে অজয় দাসকে বলেছিলেন, ‘কী অজয়বাবু, কেমন দিলাম! কিশোরকুমার পারবে না হয়!’
গৌতম ঘোষ হ'লেন আরেক কিংবদন্তি কিশোর কন্ঠী!
 কিশোর কুমারের গানই শুধু গেয়েছেন তিনি অনুষ্ঠানে ৷ এখনও গেয়ে চলেছেন৷ কিশোরকুমারকে চাক্ষুষ করতে   পেরেছিলেন৷
তখন ১৯৮৪-৮৫ সাল...  গান গেয়ে খানিক নাম করেছেন গৌতম ঘোষ৷ বম্বেতে থাকতেন৷ তাঁর  নেশা ছিল, কিশোর কুমারের গান রেকর্ডিং দেখা৷ বিভিন্ন স্টুডিওর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন ৷ কিশোর কুমার এলেন, বেরিয়ে গেলেন, সেটাই দেখতেন৷ তাতেই আনন্দ পেতেন৷ তখন মেহবুব স্টুডিয়োতে বড় দায়িত্বে ছিলেন এক বাঙালি৷ অভিনন্দন ঠাকুর৷ তাঁর কাছেই একদিন সুযোগ বুঝে পেড়ে ফেললেন কথাটা৷ বললেন, ‘দাদা ওঁর গানই তো গাই সব জায়গায়৷ দিন না একটু আলাপ করিয়ে৷’ তো অভিনন্দনই একদিন আলাপ করালেন৷ কিশোরকুমারকে বলে দিলেন, ‘এ ছেলেটি কলকাতার৷ আপনার গানই গায়৷ আপনার সঙ্গে আলাপ করতে চায়৷’ স্টুডিয়োর ভিতরে একটা ঘরে গৌতমকে ডেকে নিলেন কিশোর৷ সেদিন উনি খুব ভালো মুডে ছিলেন৷ বললেন, ‘বাঃ, বাঙালির ছেলে গান-বাজনা করছো খুব ভালো কথা৷ তা একটা গান শোনাও৷’ বহু অনুষ্ঠানে বহু জায়গায় গান গেয়েছেন  গৌতম৷
কিন্ত্ত সামনে খোদ কিশোরকুমার বসে আছেন, তাঁকে গান শোনানো কি মুখের  কথা! তাও আবার তাঁরই গান! লজ্জা পেলেন  গৌতম!  সাহস যোগালেন কিশোরই৷ বললেন, ‘আরে গাও গাও৷ লজ্জা কী?’ শেষে  অনেক সাহস জড়ো করে গাইলেন ‘মেরে নয়না শাওন ভাদো’৷ কিশোর মন দিয়ে শুনে বললেন, ‘তুমি গানটা খারাপ গাও না৷ আবার খুব ভালোও গাও না৷ তবে আমার মতো করে গাওয়ার চেষ্টা কোরো না৷ আমার গান গাও তাতে সমস্যা নেই, কিন্ত্ত নিজের স্টাইলটা রাখার চেষ্টা করবে৷ না হ'লে, নাম করতে পারবে না৷’

তো এই আলাপের পর মাঝে মাঝেই বিভিন্ন স্টুডিয়োতে কিশোর কুমারের সঙ্গে দেখা হত গৌতমের৷ কিশোর ভীষণ মুডি মানুষ ছিলেন৷ কোনও দিন ডেকে নিয়ে হেসে কথা বলতেন৷চা খাওয়াতেন!  আবার কোনও দিন যেন দেখতেই পেলেন না এমন ভাব করে গটগট করে হেঁটে চলে যেতেন৷ স্টুডিয়োতে গৌতম দেখেছেন একটা গান তুলতে ভীষণ কম সময় লাগতো ওঁর৷ চট করে গেয়ে ফেলতেন৷ প্রায় ভাবাই যায় না৷ রেকর্ডিং মাইক্রোফোনের সামনে গলা দিয়ে যে ভয়েস থ্রো করতেন, আট ইঞ্চি দূর থেকে থ্রো করলেও সেই একই আওয়াজ আসতো৷ এই কন্ট্রোল ভাবাই যায় না৷ কিশোরকুমার মারা যাওয়ার পর প্রথমবার ওঁর বাডিতে ঢোকেন গৌতম৷ অমিত কুমার আর বাপ্পী লাহিড়ীর সঙ্গে৷ ঘুরে ঘুরে দেখেন বাড়িটা৷ বসার ঘরে প্রচুর বই, ইংরেজি নভেল, হিন্দি আর ইংরেজি সিনেমার ভিডিও ক্যাসেট ভর্তি৷ দেওয়ালে টাঙানো বাবা-মা’র অয়েল পেইন্টিং৷ আর ছিল একটা দারুন ছবি৷ গলা জড়াজড়ি করে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছেন কিশোরকুমার আর মহম্মদ রফি৷ সেদিনই অমিতকুমারকে গৌতম বলেন, কিশোরকুমারের ব্যবহার করা কিছু একটা স্মৃতি হিসেবে দিতে৷ অমিতকুমার একটা পেন দেন৷ সেটা দিয়ে প্রায়ই লিখতেন কিশোরকুমার৷ কিন্ত্ত সেটা নিতে চাননি গৌতম কারণ কিশোরকুমার তাঁর কাছে ভগবানের অন্য নাম৷ তাই তিনি চেয়ে নেন  ওঁর জুতো জোড়া৷ অমিতকুমার তাঁকে ওঁর বাবার দু-আড়াইশো খানা জুতো বের করে দেন৷মারা যাওয়ার ঠিক আগের দিন উনি যে জুতোটা পরেছিলেন সেটাই গৌতম নিয়ে যান ৷’ সে জুতো জোড়া আজও গৌতমের ড্রইংরুমে আছে!

কিশোরকুমারের গান গেয়েই বম্বে পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন তরুণ!  কিন্ত্ত কোনও দিন চর্মচক্ষে দেখেননি ‘গুরুজি’কে৷ সেটাই জীবনের সবচেয়ে বড় আফশোস তাঁর!
ছোটবেলা  থেকেই গান করলে, কিশোরকুমারের গানই করেন৷ অন্য কারও গান গাননি কখনও৷  যখন, আত্মীয়স্বজনরা গান শুনতে চেয়েছেন, তিনি কিশোরের গান গেয়েছেন৷ তারপর বন্ধু-বান্ধবরা যখন গান শুনতে চেয়েছেন তখনও সেই কিশোর৷ এভাবেই ধীরে ধীরে নিজের পাড়ার, পাশের পাড়ার লোকের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছেন কিশোর কন্ঠী হিসেবে ৷ রবীন্দ্রজয়ন্তীতে গিয়েও গেয়েছেন কিশোরের গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত ই৷ কিশোরকুমারের গান গাইতে গিয়েই পেয়ে গিয়েছেন স্ত্রীকেও! এক বার পাড়ার অনুষ্ঠানে তরুণের সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজিয়ে দেন এক যুবতী৷ পুষ্প৷ তিনি তরুণের গাওয়া শুনে সকলকে বলেন, ‘ওঁর গলা তো তৈরি৷ দারুন গান করেন৷’ পরে পুষ্পর সঙ্গেই তাঁর বিয়ে হয়৷ তরুণের জীবনটাই যেন কিশোরকুমার দিয়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে৷ ১৯৮৮ সাল নাগাদ বম্বে যান তরুণ৷ অল্পস্বল্প কিছু জায়গায় গেয়েছেন৷ তারপর কিশোরকুমারের গানই তিনি ক্যাসেটে ঘরোয়া রেকর্ডিং করেন৷ সেই ক্যাসেট শোনান অন্নু মালিক, আনন্দ-মিলিন্দের মতো সুরকারদের৷  অন্নু মালিক তাঁকে কাজের অফারও দেন৷ কিন্ত্ত তরুণ বম্বের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেননি৷ বলেন, ‘বোম্বেতে থাকতে না পারাটা আমার নিজস্ব সমস্যা৷ কিন্ত্ত ওই পর্যন্ত যে পৌঁছতে পেরেছি সেটা তো কিশোরকুমারের গান গেয়েই৷’

অমিত সরকার ডেকার্স লেনের এক বার-এ দু’দশক হতে চলল কিশোরকুমারের গানই করেন৷ কিশোর তাঁর কাছে বহু দূরে থাকা এক ভগবান, যিনি তাঁকে রোজগারের পথ গড়ে দিয়েছেন!
ডেকার্স লেন এর চা-চাউ-চপ-ধোসার দোকান থেকে মাঝেমাঝেই গান ভেসে আসে!  বেশিরভাগ গানই কিশোরকুমারের৷ তেমনই এক গায়ক অমিত সরকার!...   অমিত বলেন তিনি  পড়াশোনা তেমন করতে পারেননি৷ ক্লাশ এইট পাশ! একটু আধটু গানই শুধু পারেন!  কিশোর কুমারের গান তাঁর ছোটবেলা থেকেই ভালো লাগত!  তাঁর গানের স্যার সমীর অধিকারীর কাছে কিশোরের গানই তুলতেন হারমোনিয়াম বাজিয়ে৷ তারপরে এই লাইনেই চলে আসা! ১৭ বছর বয়স থেকেই গান করেন!  বোনেদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে৷ ভাই কাজের সূত্রে শহরের বাইরে থাকেন!  তিনি থাকেন বাবা-মাকে নিয়ে!  বাবা অনেক দিন আগেই রিটায়ার করেছেন৷ আর বাড়িতে আছে কিশোরকুমারের একটা ছবি৷ রোজ প্রণাম করে কাজে বেরোন৷ উত্‍সবে-অনুষ্ঠানে সে ছবিতে মালা দেন৷  রোজগার প্রসঙ্গে  বলেন, ‘ওই , চলে যায় আর কী! কিশোর কুমারের যেমন ফাস্ট গান আছে, তেমনই স্যাড সংও তো আছে৷ লাইফ তো সে রকমই!’ বারে বহুজন অপেক্ষা করেন তাঁর গলায় কিশোরের গান শুনবেন বলে!
আরও এক কন্ঠী টোটনকুমার রামকুমার চট্টোপাধ্যায় এর কাছে টপ্পা শিখেছিলেন!

এবার সিনেমার প্রসঙ্গে আসা যাক!  বেশি কিছু বলার নেই ও!
কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি ৬/৭ বছর ধরে আমার সেরকম ভালো লাগছে না। অথচ তাঁর ছবি নিয়ে সেরকম লেভেলের নেগেটিভ কথা শুনি না! কৌশিক এমন এমন বিষয় বাছেন, যেগুলো নিয়ে বাংলায় ছবি হয়নি!  কিন্তু তাঁর ছবিগুলো শেষপর্যন্ত জমে না!  অতৃপ্তি নিয়ে বেরোতে হয়!  এর একটা কারণ কৌশিক পরপর ঘাড়ে ঘাড়ে ছবি করে যান!  এটা নিয়ে অঞ্জন দত্ত একবার বলায় তিনি পাল্টা উত্তর দিয়েছিলেন ' আমি গীটার বাজাতে জানি না, গাইতেও পারিনা...  রোজগার টা হবে কীভাবে? '
প্রসেনজিৎ এর সঙ্গে অনেকদিন ধরে কাজ করার ইচ্ছে ছিল তাঁর!  তাঁর ' c/o স্যর ' সিনেমায় শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় রাক্ষুসে অভিনয় করলেও কৌশিক ঐ চরিত্রে প্রসেনজিৎ কেই ভেবেছিলেন প্রথমে!  'দৃষ্টিকোণ' খুঁটিয়ে দেখলে তাই ' c/o স্যর' এর প্রচুর ছায়া পাবেন!  অন্তত কৌশিকের স্বাদ পূরণের ইচ্ছেটা ভালোমতোই টের পাবেন!
কৌশিকের ভয়ংকর ভালো গুণ হ'ল খারাপ হোক, ভালো হোক তিনি গল্পটা বলতে জানেন দারুণ গুছিয়ে! শুরু আর শেষ একেবারে ছিপি মারা দারুণ! তাঁর স্টাইল টা হ'ল ক্যামেরা - স্ক্রিনপ্লে- এডিটিং সব চুলোয় যাক,তবু দর্শককে একটা সম্পূর্ণ  গল্প বলেই ছাড়ব!  গল্প!

যাদবপুরের বাংলা ডিপার্টমেন্ট এর ছাত্র কৌশিক তাই গল্পটা চমৎকার বলতে জানেন। হাস্যকর শোনালেও  এই ক্ষমতাটা আছে কিশোরকুমার এর সম্পর্কিত ভাই সন্দীপ রায়ের মধ্যেও!

আর 'কিশোরকুমার জুনিয়র ' নাগেশ কুকনুরের ' মোড়' ছবির মতো একজন কন্ঠীর রোজকার জীবনের  স্ট্রাগল নিয়ে নয়!  আমার মতে ' কিশোরকুমার জুনিয়র ' একটা লার্জার দ্যান লাইফ গল্প, যা এগোতে থাকে কন্ঠী রজতের সঙ্গে। এই রজত এর জীবনে কিশোরকুমার ছাড়া আর কিছুই নেই!  কথা থেকে ব্যথা সবেতেই তাঁর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হন কিশোর!  পিতৃদত্ত নাম হারিয়ে তিনি শুধুই ' কিশোরকুমার জুনিয়র '! রাতভর মাচা করে রোজগার করেন তিনি।রাজেশ খান্না -জিতেন্দ্র যাঁদের কেরিয়ার উঁচুতে উঠেছিল কিশোরের কন্ঠে ভর দিয়েই ( গায়ক অভিজিৎ মনে করেন রাজেশ খান্নাকে আজও মানুষ মনে রেখেছেন তাঁর লিপে কিশোরকুমারের অনবদ্য সব গানের জন্য) তাঁদের মতোই পোশাক পরেন! একটা সময়ে তাঁর স্ত্রী ও এভাবেই গাইতেন!
আকন্ঠ মদ এবং কিশোরকুমার গিলে মাঝরাতে বাড়ি ফিরে ছেলে- বৌ এর উপর চড়াও হন তিনি!  ছেলে খোঁটা দেয় সামান্য  'মাচা' করে অত গর্ব করার কিছু নেই!  অনুতপ্ত বাবা 'গুরু'র দাওয়াইতে সমঝোতা করতে যান!  গীটারিস্ট আধুনিক ছেলে তাঁর বাবাকে কার্যত ঘেন্না করে!  যার নিজের সত্তা ই হারিয়ে গেছে, তার ছেলের পরিচয়ে থাকতে ভালো লাগে না!
সকালেই নেশা কাটিয়ে রজত বাজারে যান। লোকাল নেতা 'রিকোয়েস্ট' করেন ফ্রি তে প্যান্ডেলে গেয়ে দেওয়ার জন্য!  তারপরেই পড়শীদের অনুরোধে খালি গলায় রজতের গলায় কিশোরের গান শুনে ভিড় জমে যায়!  এটাই তাঁর জীবন!
সরকার থেকে ভারত-পাক সীমান্তে মৈত্রীর জন্য অনুষ্ঠানে তাঁকে পাঠানো হয়!  কিন্তু রাজস্থানে স্ত্রী আর বাজনদারসুদ্ধ পুরো টিমকে মাঝপথে কিডন্যাপ করে ডাকাতেরা! তাদের পণবন্দী করা হয়!  কিন্তু রজত কিশোরের গান গেয়ে আর তাঁর স্ত্রী বাঙালি খানা খাইয়ে ডাকাতদলকে বুঁদ করে ফেলেন!
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, অনেক রুদ্ধশ্বাস কান্ডের পর কিশোরকুমারকে অস্ত্র করেই
 তাঁরা উদ্ধার পান!
ওদিকে কলকাতায় তাঁর ছেলেকে অনেক অমানবিকতা, অনেক বাধা সহ্য করে প্রায় শুণ্যের সঙ্গে লড়ে যেতে হয়!  বন্ধুদের প্রবল সাহায্য সে পায়!

শেষ দৃশ্যে প্যারালাইজড রজতকে কিশোরের ই গান শুনিয়ে শান্তি দেয় তাঁর ছেলে। রজতের ব্যাটন সে তুলে নেয়!

ছবিটা পুরোটা দেখতে খারাপ লাগেনা কারণ শুরু আর শেষটা একদম মাপে মাপ!  আর তার উপরে আমি কিশোর ভক্ত!
কিন্তু সংলাপ অতিনাটকীয়... প্রায় সিরিয়ালেরই মতো!  অনেক জায়গাই ছেলে ভোলানো! 
 আর টেররিস্টরা এতোটাই কি বোকা হয়?  আর যারা হার্টলেস, তাদের সবার ক্ষেত্রে কি ' বাবা' নামক ইমোশন দিয়ে কাজ হয়?
গল্পের গরু গাছে উঠলেও এই ছবি অনেকদিন মনে থাকবে কারণ বিষয় নির্বাচন!ধরে ধরে একটা 'কমপ্লিট' গল্প বলা  আর গান নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট! 
মারা যাওয়ার আগে কিশোর বলেছিলেন যেদিন তিনি চলে যাবেন, তাঁর কন্ঠ সবাই পাগলের মতো  খুঁজে বেড়াবে কিন্তু তাঁকে কেউ পাবে না! তাঁর কন্ঠের জাদু সামান্যও অন্যের গলায় পেলে তাকেই আপন করে নেবে সবাই!
কিশোর মারা যাওয়ার পর সেই জায়গাটা নেন কুমার শানু!  কিশোর পন্থী হলেও সম্পূর্ণ নিজস্ব এক স্টাইল ছিল তাঁর ।  তবু কিশোর উত্তর যুগে এই বাঙালি লোকটিই কিন্তু কিশোরের অভাব পূরণ করেছিলেন! ভুলিয়েও দিয়েছিলেন অনেকটা!
এই ছবির ৯০% গানই গেয়েছেন শানু। ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের হাতে কিশোরের গানের রিক্রিয়েশন দুর্দান্ত হয়েছে!  কিন্তু সব গান না! এই বয়সেও শানু গেয়েছেন দারুণ কিন্তু প্রাণ বেশ কম। কিশোরের গানের রিমেক তিনি আগে প্রচুর গাইলেও এখানে কিশোরের গান একদম নিজের কায়দায় গেয়েছেন। বিশেষ করে ' কী আশায় বাঁধি খেলাঘর ', ' এ কী হ'ল কেন হ'ল ', 'একদিন পাখি উড়ে' অসাধারণ গেয়েছেন!
আর গেয়েছেন বাবুল সুপ্রিয়!  তিনি আবার শানু-কন্ঠী!  কান খাড়া না রাখলে বোঝাই যাবে না তিনি গেয়েছেন না শানু!

কৌশিকের ছবিতে গালাগালির টাইমিং খুব খারাপ হয়!  বাড়তি আরোপিত লাগে... প্রাণ থাকে না!  মিমি( 'খাদ') আর দুলাল( 'ছোটদের ছবির) এর মুখে 'বাল ' কিংবা দৃষ্টিকোণ এর প্রসেনজিতের মুখে ' গান্ডু' একেবারেই খাপ খায়নি!  ' বিসর্জন ' এ আবীরের মুখেও খুব কৃত্রিম লেগেছে!
এখানে অসাধারণ অভিনয় করেছেন প্রসেনজিৎ!  মদ খেলে মুখের পেশী আলগা হয়ে যায়!  সেই এক্সপ্রেশন অনবদ্য করেছেন। তিনি নিজে মাচা করেন, গান ও গান!  তাই মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে বোঝাপড়া, মাইক ধরা হাত হাত ব্যথা হ'লে তা ছাড়ানো, লিপ দেওয়া ( এটা তিনি বরাবরই ভালো পারেন) এসমস্ত একেবারে নিখুঁত করেছেন!
কিশোরের গান ' চিরদিনই তুমি যে আমার ' তাঁকে স্টার বানিয়েছিল... আজ অবধি এরকম হিট আর কোনো বাংলা গান হয়েছে কিনা সন্দেহ! এছাড়াও ' পারি না সইতে', ' দু'চোখে রজনী ', ' চোখেতে শাঁওন গায় গুনগুন ' - কিশোরের অসাধারণ কিছু গান আছে প্রসেনজিতের লিপে! কিশোরের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত আলাপ ও ছিল!
প্রসেনজিৎ ই টেনেছেন পুরো  ছবি!  রাজেশ শর্মা বিচ্ছিরি রকমের ভালো অভিনয় করেছেন!
প্রসেনজিতের এই প্রথম ত্রুটি ছাড়া এত ভালো অভিনয় দেখলাম!  তাঁর দারুণ টাইমিং এ ' বিলিক ছিলিক' ইত্যাদি গালাগালি দিব্যি তাঁর চরিত্রের সঙ্গে স্যুট করে!

' কিশোরকুমার  জুনিয়র ' একটা বিনোদনে ঠাসা ব্যালেন্সড গতিওয়ালা সিনেমা ( গল্প?)

বোরিং লাগে  না!

(অন্বয়  গুপ্ত)

#pendrive


0 comments: