Wednesday, March 20, 2019

পুরনো কলকাতার দোল






ন্যাড়াপোড়া, আবির, নগর সংকীর্তন...। দোল উৎসব ছিল পুরনো কলকাতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আভিজাত্য বুঝতে প্রশ্ন করা হতো, ও বাড়িতে বড় করে দোলের আয়োজন হয় কি...?


দেল (দেউল), দোল, দুর্গোৎসব... এই তিন নিয়েই ছিল প্রাচীন কলকাতার ধর্মার্চনা, আনন্দ-উৎসব। বাংলাদেশে সেদিন দেউল বা মন্দিরের অভাব ছিল না। সেই সব মন্দিরে প্রধানত রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তির আরাধনা চলত নিরবচ্ছিন্নভাবে। বৈষ্ণবদের তখন ছিল রমরমা। সময়টা ষোড়শ-সপ্তদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ। কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই বৈষ্ণবীয় পরিমণ্ডলে লালিত-পালিত হয়েও বাংলায় শক্তিদেবীর আরাধনা—বৈষ্ণব বিরোধী শাক্ত সাধনাকে প্রসারিত করার জন্য রাষ্ট্রশক্তি কাজে লাগিয়েছিলেন।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌল্লার পরাজয়ের পর (১৭৫৭) বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ড রূপে দেখা দেওয়ায় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা চরমে পৌঁছয়। সেই দিনগুলিতে অভিজাত-অভাজনেরা বিপর্যয় থেকে মুক্তি পেতে কৃষ্ণের বাঁশির পরিবর্তে শক্তিদেবীর অসিকেই প্রাধান্য দিয়েছিল। কিন্তু কালে-কালান্তরে দেখা গেল, জমিদার-ইজারাদার-ইমানদার তথা ভূস্বামীরা কৃষ্ণ আরাধনার পাশাপাশি শক্তি আরাধনাকেও গুরুত্ব দিলেন। বাংলাদেশে দুর্গা ও কালীপুজোর সূচনা এই প্রেক্ষিতেই। কৃষ্ণের বংশীধ্বনির মাধুর্য কিন্তু হারিয়ে গেল না। অভিজাত ব্যবসায়ী এবং সাধারণ কুলীন মানুষেরা... যাঁদের মধ্যে ছিলেন বেনিয়ান, মুৎসুদ্দি, রাইটার, কেরানি, মুন্সি প্রমুখ। তাঁরা রাধাকৃষ্ণের মধুর লীলার আস্বাদন ও আরাধনাকে নতুন রূপ দিয়েছিলেন। জোব চার্নকের উদ্যোগে নগর কলকাতা গড়ে ওঠার পর দেখা গেল, অভিজাত ধনবান মানুষদের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত দেউল অর্থাৎ মন্দিরে সাড়ম্বরে রাধা-কৃষ্ণের আরাধনা নানাভাবে চলছে।
সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা—এই তিনটি গ্রাম নিয়েই তৈরি হয়েছিল নগর কলকাতা। যা বর্তমানে কলকাতা মহানগরীতে রূপান্তরিত। প্রাচীনকাল থেকেই এই তিন জনপদের অস্তিত্ব ছিল লক্ষণীয়। চার্নক গঙ্গা পূর্বতীরবর্তী এই তিন গ্রামকে কেন্দ্র করে কলকাতা মহানগরীর রূপরেখাটি চিত্রায়িত করলেন। সুতানুটি অর্থাৎ উত্তর কলকাতা... যেখানে সুতো তথা বস্ত্র নিয়ে কাজ কারবার ও তার ব্যবসাই ছিল প্রধান। গোবিন্দপুর ছিল বর্তমানে ফোর্ট উইলিয়াম ও সন্নিহিত গড়ের মাঠ অঞ্চলটি। আর কলকাতা ছিল দক্ষিণ অংশের কালীঘাট-ভবানীপুর থেকে বড়িশা-বেহালা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল। এই অংশটির মালিক ছিলেন সাবর্ণ রায়চৌধুরীরা। কালীঘাটের মন্দির তাঁদের হাতেই গড়ে উঠেছিল।
কলকাতা ফোর্ট যখন গড়ে উঠল, তখন গোবিন্দপুরে বসবাসকারী তাঁতি-বস্ত্র ব্যবসায়ীরা উঠে গেলেন বর্তমান বড়বাজারে... পাথুরিয়াঘাটা অঞ্চলে। প্রসঙ্গত, পিরালি ঠাকুর পরিবার এই গোবিন্দপুরেই প্রথমে বসবাস করত। পরে পাথুরিয়াঘাটা-জোড়াসাঁকোতে চলে যায়। সুতানুটি রয়ে গেল সুতানুটিতেই।

* * *


পুরনো কলকাতার দোল উৎসব বিশেষভাবে পালিত হতো সুতানুটি, গোবিন্দপুর এবং মধ্যবর্তী বড়বাজার সন্নিহিত অঞ্চলে। আর অভিজাত ব্যবসায়ী, কোম্পানির শাসকদের কৃপায় রাজা-জমিদার-ইজারাদার প্রমুখের প্রধানত সুতানুটি অঞ্চলে নির্মিত অট্টালিকা সংলগ্ন মন্দিরে নিত্য রাধা-কৃষ্ণের আরাধনার ব্যবস্থা ছিল। সংলগ্নবাগান বাড়িতে হতো দোল উৎসব। দোলের আগের দিনে সংশ্লিষ্ট বাগানবাড়িতে ‘চাঁচর’ অর্থাৎ হেমন্ত-শীতে ঝরে পড়া শুকনো স্তূপীকৃত পাতা, ভেঙে পড়া গাছের ডালপালা, আবর্জনায় অগ্নি সংযোগ করা হতো। এটিই চাঁচর উৎসব। এটি একটি রূপক অনুষ্ঠান। এই প্রসঙ্গে পৌরাণিক তিনটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কৃষ্ণগত প্রাণ প্রহ্লাদকে আগুনে পুড়িয়ে মারার জন্য তারই পিতা দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু নিজের সহোদরা হোলিকাকে নিযুক্ত করে। কিন্তু কৃষ্ণের সক্রিয়তায় প্রহ্লাদ রক্ষা পায়। হোলিকারই মৃত্যু ঘটে ষড়যন্ত্রের আগুনে পুড়ে, যেখানে প্রহ্লাদের পুড়ে মরার কথা ছিল। চাঁচরের পরের দিন কৃষ্ণ আরাধনার আনন্দোৎসব। এই অনুষ্ঠানের নাম হোলি (হোলিকা থেকে)। যা প্রবাসী অবাঙালিদের উৎসব অনুষ্ঠিত হয় পূর্ণিমা তিথিতে নয়, দ্বিতীয়ার প্রতিপদে।
আর একটি মত হল, ঢুন্ডা নামে এক রাক্ষসী শিবের বরে বলশালী হয়ে সুরলোকে প্রায় একাধিপত্য বিস্তার করে... কম বয়সের ছেলেরা ঋতু পরিবর্তনের সময় তার উপর অত্যাচার করতে পারে জেনে রাক্ষসী কম বয়সি বালকদের মেরে ফেলতে থাকে। এই ভয়ানক রাক্ষসীর হাত থেকে নিস্তার পেতে শুকনো কাঠপাতায় আগুন লাগিয়ে তাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দোলের আগেরদিন যে চাঁচর... যেখানে কাঠপাতায় অগ্নি সংযোগ করে পোড়ানো ও ছোট ছেলেদের আনন্দে বিহ্বল হওয়ার ঘটনা। সেটি ঢুন্ডা বধেরই স্মৃতি।
তৃতীয়টি হল মেড়াসুরের হত্যা। এখানেও অত্যাচারী অসুরের মেড়ার বা ভেড়ার রূপ ধারণে এবং সাধারণ মানুষের ক্ষতি করে। তাকে দোলের আগের দিন অগ্নি সংযোগ করে হত্যা করা হয়। ‘মেড়াপোড়া’ থেকেই আজকের ‘ন্যাড়াপোড়া’ শব্দটির উদ্ভব বলে অনুমান করা হয়।
এ তো গেল দোলের আগের দিনের উৎসব—যা মূল দোলযাত্রার সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত। মূল উৎসবটিকে আরও একটু উদ্দীপিত করার আয়োজন এখানে। এবার আসা যাক মূল উৎসবের ক্ষেত্রে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দোলে পাঁচ-পাঁচটি দিন ছুটি দিত। পুরনো কলকাতার এই পাঁচটি দিন রঙের অনুষঙ্গে কাটতো। জার্মান থেকে আসত নানা রং। দাম অনেকটা সস্তা হওয়ায় সহজেই কিনতে পারতেন সব মানুষ। গোলাপি-সবুজ-গাঢ় নীল ইত্যাদি রং এলেও সাধারণ মানুষ কিন্তু লাল রংটিই পছন্দ করত বেশি। রঙের উৎসব... দোল খেলার পর পথঘাট লাল হয়ে থাকত বেশ কয়েকদিন পর্যন্ত। দিনের বেলা রং-পিচকিরি নিয়ে মাতামাতি চললেও বিকেলে, রাতে কখনও বা পরের দিন শুধুই আবির দেওয়া হতো। টিন-বাঁশ-পিতল ইত্যাদি দিয়ে তৈরি হতো পিচকারি। ধনী-অভিজাত বাড়ির দোলখেলায় পিতলের পিচকিরি, পিতলের বালতিতে রং, কিংবা সুগন্ধী আবির, পিতল বা কাঁসার রেকাবিতে অভ্র ও ফুলের পাপড়ি ছড়ানো আবির ইত্যাদি ব্যবহার করা হতো। তুলনায় সাধারণ মধ্যবৃত্তের সম্বল বলতে ছিল বাঁশ-টিনের পিচকিরি... যার দামও কম। সাইজ অনুযায়ী দু’পয়সা থেকে দু’আনার মধ্যে। অন্যদিকে পিতলের পিচকিরির দাম ঘোরাফেরা করত ছ’আনা থেকে দশ আনার মধ্যে। অবস্থাপন্ন মানুষজন বাড়িতে বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করত দোলখেলার জন্য। সকালে রঙের উৎসবে উল্লাস, দুপুরে থাকত এলাহি ভোজের আয়োজন। বিকেলে আবার আবির খেলা। ছোটরা বড়দের পায়ে আবির ছুঁইয়ে প্রণাম করত। বিকেল-সন্ধ্যায় ঘরোয়া গানের আসর যেমন থাকত, তেমন কেউ কেউ ওস্তাদ গাইয়ে-বাজিয়েদেরও আমন্ত্রণ জানাতেন বাড়িতে। নিধুবাবুর টপ্পা, যদু ভট্টের গান এর মধ্যে উল্লেখ্য। বাঈজি নাচও হতো। বৈষ্ণবরা আয়োজন করতেন কীর্তন গানের। এছাড়া কবিগান, তরজা, আখড়াই-হাফ আখড়াই গানেরও ব্যবস্থা হতো। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নাট্যাভিনয়ের কালে দোললীলা, বসন্তলীলা প্রহ্লাদচরিত, কংসবধ বিষয়ক নাটকও অভিনীত হয়েছে। সব মিলিয়ে দোলের উৎসবের প্রেক্ষাপট ছিল রঙিন এবং বর্ণাঢ্য।
সেকালে নগর কলকাতায় কোনও পরিবার বর্ধিষ্ণু কি না জানতে মানুষ জিজ্ঞেস করত, সেই পরিবারে দোল ও দুর্গোৎসবের আয়োজন হয়? দুর্গাপুজোর মতোই দোল উৎসব ছিল জাঁকজমকপূর্ণ এবং সম্মানসূচক। যাকে বলে স্ট্যাটাস সিম্বল। মন্দিরে রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহের নতুন সাজ, ফুলের অঙ্গসজ্জা, বিশেষ ভোগরাগের ব্যবস্থা। বিগ্রহের পায়ে-গায়ে ছোঁয়ানো হতো আবির। সাদা, গোলাপি বাতাসা, সাদা ও রঙিন মঠ (চিনি দিয়ে তৈরি ত্রিভূজাকৃতির মিষ্টি)—নানা পাখি, ফুল ইত্যাদির ছাঁচ তৈরি করে এই ‘মঠ’কে বিভিন্ন আকৃতি দেওয়া হতো। এছাড়াও মুড়কি-কদমা-ছোলা ও চিনি সহযোগে তৈরি একরকমের মিষ্টি... যা ‘ফুটকড়াই’ নামে জনপ্রিয়। তাও দেওয়া হতো পুজোয়। আর সেই প্রসাদ বাচ্চা-বুড়ো সবার কাছেই ‘দোল স্পেশাল’ হিসেবে খুবই জনপ্রিয় ছিল।
প্রাচীন কলকাতার ব্রিটিশ পুলিস বিভাগ থেকে দোলের বেশ কয়েকদিন আগেই প্রচার করা হতো শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অনিচ্ছুক ব্যক্তিদের গায়ে রং না দেওয়ার জন্য। এখনকার মাইক-মাইক্রফোন বা প্রিন্ট ইলেক্ট্রনিকস মিডিয়ার মাধ্যমে যে প্রচার জনস্বার্থে করা হয়, ঠিক সেই জাতীয় প্রচারই করত সেই সময় ঢুলি সম্প্রদায়। বিভিন্ন জরুরি খবর সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি এই ঢুলিরাই করত। কলকাতার জনবহুল অঞ্চলগুলি—বারোয়ারিতলা, বাজার-হাট, কখনও বা যাত্রাপালা, কীর্তনের আসরের আগে পরে ঢুলিরা ঢোল বাজিয়ে পুলিস, আদালত ইত্যাদির সরকারি আদেশ-নির্দেশ প্রচার করত। এবিষয়ে যদি কোনও রকম অভিযোগ থানায় যায়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে আটক করা হবে বলেও জোর প্রচার চালানো হতো। অনেক ধনী বা জমিদার ব্যক্তি, ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের বাড়ি কিংবা বাগানবাড়িতে যে দোল খেলার এলাহি আয়োজন করতেন, তার প্রচারও করা হতো এই ঢুলিদের দিয়েই। তারা ‘ঢ্যাঁড়া’ পিটিয়ে সেইসব বাবু সম্প্রদায়ের মানুষজনের মহিমা প্রচার করত। অনেক বিত্তশালী-জমিদার আবার কলকাতার বিভিন্ন বস্তি অঞ্চলে ঘর দিয়ে ঢুলিদের থাকতে দিতেন বিভিন্ন প্রচারের স্বার্থে। এই ঢুলিরা ছিল ডোম সম্প্রদায়ভুক্ত।
কলকাতার যে সব ধনীর বাড়িতে বেশ জাঁক করে দোল উৎসবের আয়োজন হতো তাঁরা হলেন, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, দিগম্বর মিত্র, বলরাম বসু, পশুপতি বসু, বাবু পীতরাম দাস, বাবু বৈষ্ণবচরণ শেঠ, রাধাকান্ত দেব বাহাদুর, বাবু আশুতোষ দেব, বাবু নবীনচন্দ্র বসু, বাগবাজারের ভুবন নিয়োগী, অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদক শিশিরকুমার ঘোষ প্রমুখ। ইংরেজরা অতিথি হয়ে আসতেন এই আয়োজনে। খানাপিনার সঙ্গে নাচ-গান ছিল উৎসবের অপরিহার্য অঙ্গ। ইংরেজ প্রশাসকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে নিজের খ্যাতি প্রতিপত্তিতে আরও খানিকটা জৌলুস আনার চেষ্টাও থাকত অনেক সময়েই। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করলেও জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে দোল উৎসব আবির-কুঙ্কমে বেশ জাঁকজমক করেই হতো। ঠাকুরবাড়ির নারী পুরুষদের অংশগ্রহণে গান ও অভিনয়ের আয়োজন হতো সন্ধ্যায়। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে যেভাবে হতো রঙের উৎসবের উদযাপন। যা প্রবল জনপ্রিয় বসন্ত উৎসব নামে। এর সূত্রপাত ঠাকুরবাড়ির দোল উৎসবের প্রভাবেই।
অর্থবান মানুষেরা এই রঙের উৎসবে প্রিয়জনদের বাড়িতে তত্ত্ব পাঠাতেন। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বয়স্যদের বাড়িতে বিলিতি রঙের বাক্স নানা আকৃতির পিতলের পিচকিরি, পিতলের বালতি, আবির, গন্ধদ্রব্য, রঙিন মিষ্টি, কখনও বা বিলিতি প্রসাধন সামগ্রীও উপহার হিসেবে যেত বড় পিতল-কাঁসার পরাতে, বা কাঠের সুদৃশ্য বারকোশে। বিদেশ থেকে আমদানি করা লেসের ঢাকনা দেওয়া এইসব উপহার সামগ্রী তাঁদের আভিজাত্যেরই স্মারক।
বর্তমানে বিবাদি বাগ... অতীতের ডালহৌসি অঞ্চলে মহাকরণের (অতীতের ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ) সামনে যে বড় দিঘি আছে, তার নাম লালদিঘি। তা কিন্তু এই দোলেরই অনুষঙ্গে। বাড়িতে এবং রাজপথে রং খেলা শেষ করে বিভিন্ন মানুষ এই দিঘিতেই স্নান করতেন। রঙে ভালো জামা-কাপড় নষ্ট হওয়ার ভয়ে পুরনো ছেঁড়া জামাকাপড় পরেই অনেকে সেদিন পথেঘাটে রং খেলায় অংশ নিতেন। সেই জামাকাপড় ও গায়ের রঙে দিঘির জল লাল হয়ে উঠত। অনেকদিন পর্যন্ত জল রঙিন থাকত উৎসবের রেশ বহন করে। লালদিঘির পাশে বাজারের নামও হয়েছে তা‌ই লালবাজার।
পুরনো কলকাতায় দোল উপল঩ক্ষে সঙের দল বেরত। কৃষ্ণ আরাধনা কেন্দ্রিক দোল উৎসবের সঙ্গে অবশ্য কলকাতার সেকালের নিম্নবর্গের মানুষজনের বিশেষ সংযোগ ছিল না। তাঁদের সাধনা-আরাধনা ছিলেন লৌকিক দেবদেবীরা; শীতলা, ষষ্ঠী, ধর্মঠাকুর, বাশুলী, শিব প্রমুখ। কিন্তু দোলের দিন কলকাতার এই জেলে ও কৈবর্তপাড়া থেকে সং বের হতো। গাজন উৎসবে সঙের রমরমা থাকলেও দোলেও তা নেহাত কম হতো না। অভিজাতজনেরা অনেকাংশে এঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। শীতলা, ষষ্ঠী, ধর্মঠাকুর, বাশুলী, শিব, মনসার পুজো করলেও দোলের দিন এঁরা নিজেদের মতো করে কৃষ্ণ কথা নিয়ে মুখে মুখে গান বাধতেন রসরসিকতায়। বলাবাহুল্য, সেই সব গান, সব সময় জনরুচির উপযুক্ত হতো না। সমসাময়িক সমাজব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয় নিয়েও দোলের দিন মুখে মুখে গান বাঁধতেন এই সঙেরা। বউবাজার থেকে ক্রিক রো ও সন্নিহিত অঞ্চলে এই সঙের দল ঘুরে বেরাত। এঁদের সঙ্গেও থাকত রং ও আবির। রাস্তায় ছেলে-বুড়ো যাকে পাওয়া যেত, তাকেই চলত রং মাখানো। নিজেদের মধ্যেও রং খেলতেন তাঁরা। কৃষ্ণ কথা ছাড়াও দোলের দিন সমসাময়িক বিষয় নিয়ে ছড়া বেঁধে চলত গান গাওয়া... সেসব উন্নত রুচির না হলেও সাধারণ মানুষ খুব আমোদ পেত। শুধু সংই নয়, সেকালে বউবাজার থেকে বাগবাজার পর্যন্ত বহু পল্লিতে দোলযাত্রার দিন নগর সংকীর্তনের দল বের হতো। বহু দল রূপচাঁদ পক্ষীর গান গাইত। একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে—‘হোরি খেলিছে শ্রীহরি, সহ রাধাপ্যারী,/ কুঙ্কুম ধূম, শ্যাম অঙ্গভরি।।/পুস্পমালা, হিন্দোল সাজায়ে ব্রজনারী,/ রাই শ্যাম, অনুপম, দোলে তদুপরি।’ এছাড়া রাম বসু ও হরু ঠাকুরের কথকথাও জনপ্রিয় হয়েছিল দোল-হোলিকে কেন্দ্র করে।
* * *
পুরনো কলকাতার দিনকাল গত হয়েছে। পরিবর্তনের শত-সহস্র স্রোত মানুষের জীবন ও সমাজের উপর দিয়ে প্রবাহিত। পরিপ্রেক্ষিত কিন্তু পাল্টায়নি। আজও ফাল্গুনী পূর্ণিমায় রঙের উৎসব দোল শুধু পালিত হয় না, সাড়ম্বরেই পালিত হয়। এই দিনটিতেই ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দে চৈতন্যদেব আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁর ৫০০ বছর পূর্তি থেকে জন্মোৎসব উদযাপনের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। দুয়ে মিলে বৃন্দাবনের বর্ষানা (রাধার জন্মস্থান), নন্দ্‌গাঁও (কিশোর কৃষ্ণের অবস্থান) নদীয়ার নবদ্বীপের সঙ্গে মিলেমিশে বর্তমানের কলকাতা মহানগরী নব বৃন্দাবন সদৃশ হয়ে ওঠে বাঙালি-অবাঙালিদের দোল-হোলির উৎসবে।
আসলে দীপাবলি বা দেওয়ালির পর হোলি দ্বিতীয় বৃহত্তম সর্বভারতীয় উৎসব। দল-হোলিকে কেন্দ্র করে আজ কলকাতা মহানগরী সামন্ততন্ত্র অতিক্রম করে একাধারে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক, সম্প্রীতিবাহী, সংহতি সূচকও। প্রশাসনের তৎপরতা, সাধারণ মানুষের সচেতনতায় এখন ক্ষতিকর রঙের ব্যবহার তেমন হয় না। পাড়ায় পাড়ায় সংঘর্ষ হয় না, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ থাকে পুরোপুরি। নাচে-গানে-কীর্তনে-অঞ্চল পরিক্রমায় নান্দনিকতার বার্তা প্রসারিত হলেও ঘরে-বাইরে মদ্যপানের তীব্রতা বর্ধমান। রঙের পরিবর্তে কাঁচা ডিম, নর্দমার জল, পুকুরের পচা পাঁক ব্যবহার এবং মদ্যপানের মত্ততা বন্ধ হোক। আগের মতো আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়াক নানা বসন্ত ফুলের নির্যাস; সংকীর্তন, রবীন্দ্রগানের সুর আর বিহারের ভাইদের ভোজপুরি ভাষায় গাওয়া ‘রামাহো রামাহো’র আবহ। দু’দিনের ছুটি আমরা মনেপ্রাণে উপভোগ করি, আর স্মরণ করি পুরনো কলকাতার দোলচিত্রকে।

0 comments: