Monday, April 29, 2019

( পেনড্রাইভ : গল্প ) || কণ্যারূপেন সংস্থিতা



উমারানী দেবীর ভরা সংসার। দুই ছেলে, তাদের বউ বাচ্চা নিয়ে হই হই করে দিন কাটে। সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে উমারানী দেবী  সিথি ভর্তি করে সিঁদুর পরেন, কপালে সিঁদুরের বড়  একখানি টিপ আর পাড় ভাঙ্গা লাল পাড় শাড়ি। পঞ্চাশের কোঠায় এসেও উমারানী দেবীর এই রূপ যেন সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা। বাড়িতে সকলে ঘুম থেকে ওঠার আগেই পারিবারিক গোপালকে  ভোগ দিয়ে পুজো  সারা  হয়ে যায় ওনার। এত কিছুর মধ্যেও কোথায় যেন এক বিষন্নতা তাকে গ্রাস করে আছে। শশুরের  বিধানেই  কেটে গেছে তার জীবন। তার শশুর মশাই এখনো জীবিত। শ্বাশুড়ী গত হয়েছে বছর পাঁচেক আগে। শ্বশুরের বয়স নব্বই ছুঁই ছুঁই। চোখের সামনে ছোট ছোটো নাতি-নাতনি গুলোকে দেখে বারবার তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছু পুরনো স্মৃতি, সেই স্মৃতির সুর  সততই বহমান... কিন্তু ছন্দপতন ঘটে গ্লাস ভাঙ্গার  ঝনঝনানিতে, উমারানী দেবী  ছুটে যান আওয়াজ লক্ষ্য করে। তার শ্বশুরের ঘর থেকে  আওয়াজটা  এসেছে, উমরানী দেবী দেখেন শ্বশুর মশাই মাটিতে পড়ে আছেন,আর পাশে গ্লাসটা। গ্লাসের জল মাটিতে গড়িয়ে গেছে। সবাই মিলে ধরাধরি করে ওনাকে বিছানায় তুলে শোয়ালেন। উমারানী দেবী বরাবরই ঠান্ডা  মস্তিষ্কের মানুষ। তিনি স্বামী অরুণ বাবু কে   ডেকে তিন্নিকে ফোন করতে বললেন। অরুণ বাবু সাথে সাথে তিন্নিকে কোন করেন। ফোন করার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিন্নি এসে উপস্থিত হয়।
তিন্নি স্টেথোস্কোপটা নিয়ে মিনিট খানিক  ওনাকে পরীক্ষা করে নিজের ব্যাগ থেকে একটা ওষুধ বের করে ওনাকে দেয় এবং বলে,"বড় কর্তা কে ইমিডিয়েটলি হসপিটালাইজ করতে হবে,তোমরা অ্যাম্বুলেন্স  ডাকো।"
 এ বাড়িতে ডাক্তার হিসেবে তিন্নির কথা অমান্য করার সাহস কেউ পায় না, কারণ সে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটা জটিল অস্ত্রোপচার দক্ষতার সাথে সফল করে বেশ নাম কামিয়েছে। তাই তিন্নির কথা মত সঙ্গে সঙ্গে ওনাকে হসপিটালে ভর্তি করা হয় এবং তিন্নির ট্রিটমেন্টেই কয়েকটা টেস্ট করানো হয়।

 টেস্ট এর  রিপোর্ট  আজ এসছে। উমারানী দেবী গোপাল মূর্তির সামনে বসে আছেন। অশ্রুসজল চোখ, তার শ্বশুরের হার্টে ব্লক পাওয়া গেছে, কিন্তু আজ তার চোখের জলটা সাতাশ বছর আগের সেই অভিশপ্ত দিনটার জন্য। এতদিন বারবার তিনি ওই দিনটার কথা ভেবে উদাসীন থেকেছেন  কিন্তু ….
উমা রানী দেবী এতদিন তার বাড়ির কাজের লোক বাঞ্ছার  নাতননিকেই  অনেকটা আঁকড়ে  ধরেছিলেন। তিন্নিকে তিনি নিজের  হাতে খাইয়েছেন, পড়িয়েছেন, লুকিয়ে টাকা জমিয়ে তিন্নির পড়ার  খরচাও দিয়েছেন তিনি।
      আজ সেই তিন্নির হাতেই  উমারানী দেবীর  শশুর বিমল বাবুর  অপারেশন। এই বয়সে অপারেশনের ঝুঁকি অনেক বেশি, কিন্তু তাও চোখের সামনে বিনা চেষ্টায়  স্বজনের  মৃত্যু কেউই চায় না। তাই সবার মতে নিদেনপক্ষে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা হোক। অপারেশন থিয়েটারে বিমল বাবু কে আনা হয়েছে। তিন্নি রেডি, তিন্নির মুখে  মাস্ক,গোটা মুখে শুধু চোখ দুটো ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বিমল বাবু অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে  আছেন তিন্নির দিকে। তিন্নি হাতে গ্লাভসটা পরতে পরতে   বিমল বাবুর দিকে তাকিয়ে বলল,“ কি বড় কর্তা কি হলো? ভয় পেয়ো না। তোমার তিন্নির ওপর তোমার ভরসা নেই ?”
 বিমল বাবু তাকিয়ে আছেন তাও ।
 চোখ দুটো অবিকল উমারানীর চোখ যেন, সেই একই রকম মায়াময়, স্নেহসমৃদ্ধ। তবে কি...? না না, কি সব উল্টোপাল্টা ভাবছেন বিমল বাবু। এ আবার কখনো হয় নাকি ? তিন্নি তো বাঞ্ছার  নাতনি, আর  তাছাড়া  অরুণ- উমারানীর  দ্বিতীয় সন্তান তো মৃত ছিল, আর দুই  পুত্রই  তো ঘরে …
―“কি বড় কর্তা, কি এত ভাবছো বলতো ! ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই, কিচ্ছু হবে না তোমার।” গ্লাভস  পরতে পরতে   তিন্নি  বলে।
 তিন্নির  কথায়  ছেদ পড়ে  বিমল বাবুর  ভাবনায় ।
এবার বিমল বাবুর চোখ যায়  তিন্নির হাতের দিকে , একি ! তিন্নির হাত এর জন্মদাগটা তো অবিকল বৌমার হাত এর মতো ! জ্যোতিষীর কথা অনুযায়ী ডান হাতে জন্মদাগ যুক্ত মেয়েরা গৃহলক্ষী হয়। আর বিমল বাবুও তো গৃহলক্ষ্মীই  খুঁজছিলেন  পুত্র অরুন এর জন্য। উমারানী অবশ্য  লক্ষ্মীই ...
 এতক্ষণে পুরো ব্যাপারটা বিমল বাবুর কাছে জলের মত পরিষ্কার, তিনি হাতছানি দিয়ে  তিন্নিকে কাছে ডাকলেন। তিনিই  তো  বাড়িতে  কোনদিনও কোনো কন্যা সন্তান  চান নি। তার কন্যা সন্তান জন্মের সময় তার স্ত্রী মারা যান। তখন তার ধারণা হয়,বাড়িতে কন্যা সন্তান  অপয়া। কিন্তু আজ তিনি  উপলব্ধি  করতে পারছেন যে তার ব্যক্তিগত ধারণা ও অভিমত যে তিন তিনটে জীবনকে  ওলট পালট করে দিয়েছে। তিন্নি কাছে আসতেই তিনি তার হাত দুটো শক্ত করে ধরে  তিন্নিকে তার পাশে বসতে  বললেন এবং তার দিকে চেয়ে অশ্রুসজল নয়নে বললেন, “ এই বুড়োটাকে পারলে ক্ষমা করে দিস দিদিভাই। তোর কোন ক্ষতির কারণ আমি হলে আমার ক্ষমা করিস, নইলে যে আমি মরেও শান্তি পাব না ।”
 তিন্নি হতবাক হয়ে যায়, তার শৈশবে দেখা রাশভারী  বড়কর্তার এই শৈশব রূপের দিকে তাকিয়ে ....

0 comments: