Friday, April 26, 2019

( পেনড্রাইভ : গল্প ) || ঐশী

ঘড়ি ধরে ঠিক ভোর চার টে চুয়াল্লিস মিন. ফোন রিং হতে শুরু করলো অংশুর। যতক্ষণ না ধরবে থামবে না। silent করে রাখবে সে উপায় ও নেই। এরপর ই ফোন করবে মা বা বাপির ফোন এ নাহলে বাড়ির ল্যান্ড লাইন কাঁপিয়ে। গত 10 দিন ধরে এই নতুন উৎপাত শুরু করেছে ঐশী ।
ঐশী ওরফে ঐশী সেনগুপ্ত। অংশু দের বাড়ি থেকে ঠিক 6 টা বাড়ি পর 7 নং বাড়ী টায় বিরাজ করছেন যিনি। এগার বছর আগে সেনগুপ্ত কাকু এ পাড়া তে বাড়ি করে এসেছেন। অংশু রা যে মাঠ টায় খেলতো সেই মাঠ টাই কিনে বাড়ি তুলে দিলো। খেলা বন্ধ হলো অংশু দের। আর সেই নিয়েই বেজায় চোটে অংশু রা। ওরা ওদের মাঠ ছাড়বে না।তাই ঐশী দের বাড়ির সামনেই খেলবে।

পাড়ার ক্রিকেটে মাতোয়ারা অংশু মারলো জোরে ছক্কা। বল গিয়ে লাগলো সোজা ঐশীর হারমোনিয়াম এ। প আর ধ গেল একসাথে বসে। তারপর ওই বল গিয়ে লাগলো টেবিলে সাজানো বড় মামার দেওয়া ডিজিটাল ফ্রেম এ।।সঙ্গে সঙ্গে টুকরো হলো।
বল কুড়িয়ে দাঁত কির মির করে ঐশী গেল বারান্দায়। যার হাতে ব্যাট ওই লম্বা ছেলেটাই তারমানে ভিলেন। এক চোখ বুজে সোজা টিপ ।বল লাগলো অংশুর মাথায়।disbalanc হয়ে অংশু পড়লো ইট এর ওপর আর মাথাটি গেল ফেটে।  মোটা মুটি বাহুবলীর রণ ক্ষেত্র।
রক্ত দেখে গাঁ গাঁ করে উঠলো অংশু। ঐশী ও কম যায় না। বসে যাওয়া রিড গুলোর স্বর এ চেঁচিয়ে উঠলো
-এত সব শচীন সৌরভ এ পাড়ায় কি করছো? যাওয়া না ইডেন এ যাও। আমার হারমোনিয়াম ভেঙেছো, ফ্রেম তাও ভেঙেছো আজ ই বাপি কে বলে তোমাদের খেলা বন্ধ করবো।

- এত লতা মঙ্গেশকর যখন আমাদের পাড়ায় কেন? বম্বে যাও না। এটা আমাদের খেলার জায়গা।আমরা খেলবোই।
এই ছিল সূত্রপাত।এরপর মিঃ সেনগুপ্ত ঐশী কে নিয়ে অংশুদের বাড়ি গিয়ে মেয়ের হয়ে ক্ষমা চেয়ে নেন। অংশুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন -খেলা টা বন্ধ হয়ে গেল তাই না? তোমরা খেলো।শুধু ছক্কার অভিমুখ তা একটু ঘুড়িয়ে দিলে হয় না?

ওদিকে মিষ্টি চেহারায় ডাকা বুকো ঐশী কে ভারী পছন্দ হয় ব্যানার্জি গিন্নী র।অর্থাৎ অংশুর মা এর। উনি গাল টিপে ঐশী কে বলেন -তোর হারমোনিয়াম আমি ঠিক করিয়ে দেব।তুই যাবি আমার সাথে বড়ো বাজার?
ঠোঁট ফুলিয়ে ঐশী বললো -জানো বড়ো মামার দেওয়া ফ্রেম টাও ভেঙে দিয়েছে।ওটা বাপি এনে দেবে বলেছে।

এরপর অংশুর বাড়িতে ঐশীর আসা যাওয়া বাড়ে, বাড়তে থাকে আধিপত্য। গোটা বাড়িটায় স্বেচ্ছায় ঘুরে বেড়ায় ও,শুধু অংশুর ঘরে যায়না।ও মুখো হয়ই না।
অংশুদের বাড়ি রঙ হলো যখন ঐশীই সব রং নিজে পছন্দ করেছিলো। অংশুর ঘরে রং কি হবে জিজ্ঞেস করায় বলেছিল "পুরো কালো করে দাও"। ভীষণ হেসেছিল কাকু আর মণি মা। ব্যানার্জি গিন্নী নিজেই চেয়ে নিয়েছিলেন আদরের ডাক টা।

গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন অংশু কোনোমতে ধরলো ফোন টা।
-জলদি ওঠ।মাঠে যা।
এই সেই উৎপাত।যেদিন থেকে অংশু SI পাস করেছে ঐশী নতুন উৎপাত শুরু করেছে।
-আমি যাব না। তুই ফোন করবি না আমায়।আমি কিন্তু এবার ব্লক করে দেব তোকে।
-তুই যাবি না তোর বাবা যাবে।
- হ্যাঁ বাবা কে তোল, তুলে পাঠা মাঠে।
-দাঁড়া তবে।
- না না ঠিক আছে উঠছি।
বলা যায় না সত্যি হয়তো বাবা কে ফোন করে তুলবে,তারপর পাড়া তোলপাড় করে ছাড়বে।ভদ্র ভাবে উঠে যাওয়াই ভালো।
রেডি হয়ে বেরোলো অংশু। হুকুম ওর বাড়ির সামনে দিয়েই ছুটতে হবে।তাই করছে গত ১০দিন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙার অঙ্গ ভঙ্গি করে ঐশী বোঝায় "যা তুই ছোট আমি আর এক রাউন্ড ঘুমোই গা। ভীষণ রাগ হয় অংশুর। তবে এরপর যতবার ওর বাড়ির সামনে দিয়ে যায় দেখে light জ্বলছে।ঘুমোয়না নাকি কে জানে? কি যে করে। আগ্রহ থাকলেও জিগ্যেস করেনি কখন ও। সোজা সুজি উত্তর তো পাবেই না বরং এমন কিছু বলবে যে অংশুর মাথা গরম হবে। ১১ বছরের বন্ধুত্বে ভাবের দিন ওদের খুব কম। বেশিরভাগ টাই আড়ি।
এই তো সেদিন ঐশী ওর ফোন থেকে সব game উড়িয়ে দিয়ে বিজয়ীর হাসি হেসেছিল। বিকেলে ঐশীর মাথায় ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে শুনে অংশুর সকাল এর রাগ টা ঝেড়ে বললো "আমার চাকরী নিয়ে ওকে বেশি মাথা ঘামাতে বারণ করো মা।আমার ইচ্ছে হলে চাকরি করবো নাহলে করবো না।ওকে ওর মাথা টা কে রেস্ট দিতে বলো নাহলে যন্ত্রণা হবেই"

মা ঠাকুমা র কি যে পছন্দের ওই বাঘিনী।একবার তো মা জিজ্ঞেস করে বসলো "বউ হলে কেমন হবে'
পাগল নাকি মা!! ওরকম বউ হলে আমি ঘর ছেড়ে সন্ন্যাসী হবো।
ওদিকে অংশু ice cream কিনলে ৫ টা কেনে।ওর মায়ের বাপির ঠাম্মি র আর একটা কার?
পালক পনির শেখার পর ঐশী প্রথম টিফিন বক্সে করে এবাড়িতে দিয়ে গেছিলো।সঙ্গে একটা চিরকুটে লিখে অংশুর দরজায় চিটিয়ে গেছিলো "হজম না হলে জানাবেন antacid পাঠিয়ে দেব দুটো".
অংশুও কম যায়না টিফিন বক্সে চিরকুট ভরে দিয়েছিল "হারমোনিয়াম এর ওপর অত্যাচার বন্ধ করে রান্না টাই শেখ। ঝগড়ার পর ওটাই একমাত্র পারিস দেখছি" ।

মণি মা মনে মনে স্থির করে ফেলেছে এই ক্ষেপি কে নিয়েই কাটাবে বাকি জীবনটা। ঐশী কোনো অনুষ্ঠান থাকলেই এসে মনি মা র আলমারি খুলে শাড়ী পছন্দ করে। মণি মা না তো করেই না উল্টে খুব খুশি হয়ে ম্যাচিং গয়না খুঁজতে বসে। না পেলে কিনেও এনে দেয়।
আজ অংশু শিলিগুড়ি যাবে। ওখানেই মাঠ পাস করতে হবে। রাতে ৮:৫২ তে ট্রেন। বাপি মা এর সাথে ওই সেন বাঘিনী ও যাবেন। গাড়ি হর্ন দিতেই রান্না ঘর থেকে খুন্তি উঁচিয়ে বললো "তোমরা চলো।আমি আসছি একটু পড়ে"

ট্রেন প্রায় ছাড়বে ছাড়বে। লোক জন কে গুঁতিয়ে পৌঁছলো ঐশী।হাত এ টিফিন বক্স।
-এটা রাখ।পরে খাস।শরীর বুঝে।
-কি আছে এতে?
-অত কৈফিয়ত দিতে পারব না তোকে।রাখতে বললাম রাখ।
-দেখেছো তো মা ও কেমন....
"আচ্ছা বাবা থাক থাক। বলছে যখন রাখ না। যাওয়ার সময় ঝগড়া করতে হবে না"

বাপি মা নামলো ট্রেন থেকে। ঐশী নামার আগে সামনের বার্থ এর মেয়েটা কে বলে গেল "ভীষণ বাজে ছেলে।মুখ টাই দেখো কেমন ত্যাঁদড় পারা ৷শয়তান এর কারখানা একেবারে।বেশি তাকালে এক চড় দিও কষিয়ে"
কষিয়ে চড় এর ভয়ে অংশু তাকায়নি মেয়েটার দিকে।কে বলতে পারে হয়তো ঐশী কথা গুলো খুব সিরিয়াসলি নিয়েছে। রাতে ঘুম আসছিল না অংশুর ওই টিফিন বক্স এ কি আছে না দেখে।খুলে দেখে সেই পালং পনীর।লোভ সামলাতে পারেনি।রাতেই শেষ করেছিল সব টা।

সামনে ভোট তাই দুদিনের মাথায় মাঠ পাস করার খবর নিয়ে ফিরেছে অংশু। দেখা করেনি ঐশীর সাথে।কাল ভোর হলেই হানা দেবে সে এ কথা সবাই জানে। তখন ই বলবে নাহয়। সামনে থেকে দেখা যাবে reaction টা।
ভোর রাতে ল্যান্ড ফোন এ রিং হচ্ছে। এ ওই মেয়ে ছাড়া আর কে। এই মেয়ে  কি কাও কে ঘুমোতে দেবে না নাকি!
বাপি ছুটতে ছুটতে ওপরে এলো।। বাবু তাড়াতাড়ি ওঠ।হাসপাতালে যেতে হবে। মেয়েটাকে ভর্তি করতে হয়েছে। সেন দা রাতে খবর দিতে পারেনি।তোর মা ভীষণ কান্না কাটি করছে।
-কি হয়েছে? অবাক অংশু।
ওরা যখন পৌঁছলো সেনগুপ্ত কাকু কাকিমা নিথর হয়ে বসে। কেবিনে ঢুকতেই দেখলো মেশিনের তারে তারে জর্জরিত মেয়েটা,চোখ দুটো ঘোলাটে। অংশু কে দেখে জ্বল জ্বল করে উঠলো। খুব কষ্টে জিগ্যেস করলো 'রেজাল্ট?'
বুড়ো আঙুল তুলে অংশু জানালো পাশ করেছে।
তারপর সবাই ক একবার দেখে অংশুর দিকে ঘুরে ভেংচি কেটে চোখ বন্ধ করলো।
মণি মা জ্ঞান হারালো সঙ্গে সঙ্গে।
Appointment letter এসেছে আজ। কিন্তু কারোর উচ্ছাস নেই।সব টা সে নিয়ে গেছে।খাম টা অংশু রাখলো ঐশীর ছবির সামনে।
Brain tumour ছিল আগে বোঝা যায়নি।মাঝে মাঝে মাথায় যন্ত্রণা হতো শুধু। burst করেছিল সেই রাতে।তারপর কাও কে কোন সময় না দিয়েই চলে গেল।
মণি মা আলমারি খুলে শাড়ী গুলো বের করে গন্ধ শুঁকে রেখে দেয়।
অংশু আর ওই বাড়ির দিকে যায়না। আজও ঘড়ি ধরে ঠিক ৪:৪৪ এ ঘুম ভেঙে যায় অংশুর- অভ্যেস।

#নম্রতা ঘোষ (ঐশী)

3 comments: