Tuesday, July 30, 2019

( পেনড্রাইভ : গল্প ) || অন্নপূর্ণা ও উল্কি



সালোয়ার কামিজের ওড়নাটা ভালো করে গলায় জড়িয়ে নিল অন্নপূর্ণা।নভেম্বরের মাঝামাঝি,বেশ হিম বাতাসে।চিরটাকাল ঠান্ডার ধাত অন্নপূর্ণার।ঘড়িতে চোখ গেল,ছটা বাজতে চলল।দেরিই হল একটু আজ।
মালতিকে ডেকে দরজাটা দিতে বলে বাইরে বেরোল অন্নপূর্ণা।একটু তাড়াতাড়ি পা চালাল আজ।পার্কের কাছাকাছি আসতেই পরিচিত মুখ,মাপা হাসি।প্রাতঃভ্রমনের সময় কেউই খেঁজুরে করে সময় নষ্ট করতে চায়না।নির্ধারিত বেঞ্চের দিকে এগোতেই চোখে পড়ল,বাবু বসে আছেন।
..কতক্ষণ?
..এই তো সবে।তোমার দেরি হল যে বড়?
..বুড়ো হয়েছি।অত ঝটপট শরীর চলেনা আর।তা তোমার সোয়েটার কই?
..ঠাণ্ডা কই?তোমার চিরকাল ঠান্ডার ধাত।
..বুঝবে যখন কুপোকাত হবে।
..সেই একরকম কথা তোমার অনু।একরকম শাসন।
..ধ্যাৎ।
..হ‍্যাঁ গো।সেই কলেজ বেলার অনু।দুটো বিনুনি,হাতে বই খাতা।কম মশার কামড় খেয়েছি তোমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে?
..পারও কিছু তুমি।চিরটাকাল আওপাতালি।
..কি?আমি আওপাতালি?
..তাছাড়া কি?ওই উল্কি করার পর সাতদিন বিছানা নিয়েছিলে।
..বাড়িয়ে বলছ কিন্তু।অল্প বয়স ছিল,ব্যাথাটা লেগেছিল একটু.......
..ভাগ্যিস করেছিলে,ব্যাথা পেয়েও।
তাকালেন দুজন দুজনের দিকে।ইতিহাস পড়ছেন দুজন,দুজনের চোখে।

..ও খোকা,কখন আমার নাম লেখা রে?
..পাঁচ নম্বর।
..ওরে বাবা,সে তো অনেক দেরি।ডাক্তার আসতেই আধঘণ্টা।
..অধৈর্য হোয়োনা মা।
ছেলে চেম্বারের বাইরে গেল।ওয়েটং রুমে বসে এদিক ওদিক দেখছেন অন্নপূর্ণা।সময় আর কাটেনা।কি যে পেটের সমস্যা ছাই।কিছু খেলেই অম্বল।
..আমি কাল নাম লিখিয়েছি,এগারো নম্বরে নাম হয় কি করে?
গাঁকগাঁক করে চিৎকার করল কেউ।চোখ তুলে দেখলেন অন্নপূর্ণা।পিঠ দেখতে পাচ্ছেন শুধু।
..না আমাকে বোঝান কি করে হয় এটা?মামদোবাজি নাকি?
উফ্ কি গলা বাবা লোকটার!এখানে এরকম করে কেউ?বিরক্ত লাগল অন্নপূর্ণার।
..আমাকে অন্য কথা বলা হল কাল,আজ অন্য বলছেন আপনি।ব্যাপারটা কি?আমি কথা বলব ডাক্তারবাবুর সাথে......
ততক্ষণে লোকটার ডানহাতে চোখ আটকেছে অন্নপূর্ণার।হাতটা উঠেছে নামছে।আঙুল তুলে কথা বলছে লোকটা।তাতেই নীলবর্ণ শব্দটায় চোখ যাচ্ছে।কি লেখা ওটা?সেই শব্দটা?
..শুনছেন?
লোকটার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে অন্নপূর্ণা।লোকটার ভ্রূক্ষেপ নেই।
..এই যে শুনছেন?আপনাকেই বলছি।

কি আশ্চর্য!আজ এতগুলো বছর পর জানতে পারলেন একজন,আরেকজন কত কাছাকাছি ছিল।একবারও তো দেখা হয়নি!অন্নপূর্ণার বিয়ে,সংসার, সন্তান,অনেকগুলো বছর,স্বামীর চলে যাওয়া।তাও তো হল আজ উনিশ বছর।ছিল কোথায় অনিমেষ?
..তুমি সংসার করনি কেন?ভালো চাকরি করতে।
..এই বেশ আছি।ভাইপোর সংসারে।
..এটা উত্তর হল?
..পাগল!এই উল্কি দেখে বউ পেটাতো ধরে।
জীবনটা বদলেছে অন্নপূর্ণার।প্রাতঃভ্রমন আগেও করতেন,ডাক্তারের নির্দেশে।এখন ছোটেন মানুষটাকে দেখবেন,দুটো কথা বলবেন।ফোনটা আগে বাজত কই?ওই কালেভদ্রে বোন হয়তো করল।এখন অহরহ টুংটাং।কি খেল,কখন খেল,ওষুধ পেটে গেল কি না,সব জানা চাই।কখনও আবার এদিক ওদিক।বেলুড়, দক্ষিণেশ্বর, কালীঘাট।সাথে মোগলাই পরোটা,ভাঁড়ের চা।তেষট্টির অন্নপূর্ণা, আটষট্টির অনিমেষ।পলকেই যেন পাতা উল্টে সতেরোর অন্নপূর্ণা, একুশের অনিমেষ।

..কি শুরু করেছ মা?লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে।
..কি করলাম?
..ওই লোকটার সাথে ঘুরে বেড়াও,পার্কে বস।ছি ছি।
..তাতে কি হয়েছে খোকা?দুটো কথা বললে ক্ষতি কি?গেলামই বা কোথাও।
..ভীমরতি ধরেছে তোমার।আর যোগাযোগ করবেনা মা ওই লোকটার সাথে।
..কেন?যুক্তি দিয়ে কথা বল।
..তোমার বোধবুদ্ধি লোপ পেয়েছে।নইলে এই বয়সে.....এজন্যই এত পার্কে যাওয়ার ধুম।
..কি বলছিস তুই?মানুষের সঙ্গী দরকার হয়না?দুটো কথা বলতে?কাঁধে মাথা রাখতে?
..তাহলে বাবা যাওয়ার পর বিয়ে করলেই পারতে।
..খোকা!
..ঘেন্না হয় তোমাকে।আমার ছেলেটা কি শিখবে?এই ঠাকুমার ছিরি।

..তুমি আর যোগাযোগ রেখোনা অনু।আমি চাইনা তুমি কষ্ট পাও।ছেলের কথা শোনো।
সামনে প্রবাহমান গঙ্গা।অনিমেষের চোখ সেদিকেই।অন্নপূর্ণার দৃষ্টি অনিমেষে,আর সেই উল্কিতে।পিছিয়ে গেলেন কটা বছর।
সাইকেল হাতে অনিমেষ।শাড়িতে অন্নপূর্ণা।
..এই দেখ কেমন লিখেছে?
..একি!
অনিমেষের ফর্সা হাতে গাঢ় নীলচে কালিতে খোদাই করা,'অনু'।
..এসব কি করেছ?
..তোমাকে খোদাই করলাম অনু,সারাজীবনের মতো।তুমি আমার না থাকলেও,আমি রইলাম।
কথাটা ফলে গেছিল অনিমেষের।বাবাকে রাজি করাতে পারেননি অন্নপূর্ণা।স্বামী সংসার,অনিমেষ থেকেও যেন ছিলেননা।শেষ যেদিন দেখা হয়েছিল ওঁদের, ঠিক এভাবেই বলেছিলেন অনিমেষ,
"তুমি আর যোগাযোগ রেখোনা অনু।বাবার কথামত বিয়ে কর।আমি চাইনা তুমি কষ্ট পাও।"
সেদিন শুনেছিলেন অন্নপূর্ণা।

দেড়মাস পর
সামনে খরস্রোতা গঙ্গা,বক্ষে অজস্র ভাসমান প্রদীপ।ঘাটের সিঁড়িতে বসে অন্নপূর্ণা।সোয়েটার, চাদরে মোড়ানো।
..উঠবে?
..আর একটু বসি।
..চা করবে একটু কেমন?আদা দিয়ে।
..পার বটে কিছু চা খেতে।
স্নেহের কটাক্ষ হানলেন অনিমেষের দিকে।অনিমেষের হাতটা ধরলেন আলতো করে।রোজ সন্ধেবেলা আসেন ওঁরা,আরতি দেখতে।হরিদ্বারের এক কামরার ফ্ল্যাটের বাসিন্দা ওঁরা।এরপর বাড়ি গিয়ে রাতের রান্না।তারপর কাঁপতে কাঁপতে লেপের নীচে।এক আধটা চুমু?হলই বা।একটুখানি উষ্ণতা?অসুবিধা কি?
"আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে".........মঙ্গলকামনা গুলো একতরফা নাই হল।সব অন্নপূর্ণাকে,ঈশ্বরী পাটনী হতেই হবে?                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                    #শ্রীতমা সেনগুপ্ত

0 comments: