Wednesday, April 1, 2020

( পেনড্রাইভ : গল্প ) || কাঠি (Bangla Golpo)

ghost



রোজকার মতো আজও আমার শাশুড়ি ভোর থেকেই ঝামেলা শুরু করেছে।প্রথমে দরজায় ধাক্কা,তারপর চিৎকার।সবে তো সাড়ে পাঁচটা।এরমধ্যেই এত ডাকাডাকি।চোখ কচলে উঠেই পড়লাম।
বাহ্!কি সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে।কি সুন্দর নরম রোদ্দুর।শরীরটা যেন জুড়িয়ে গেলো।সারারাত ওই ঘুপচি ঘরটায় শোওয়ার যে কি কষ্ট!একফোঁটা হাওয়া বাতাস নেই ওই পূবের ঘরটায়।আর থাকবেই বা কোথা থেকে?একটাও জানলা আছে ঘরটায়?নেই।মাথার ওপর নীচু সিলিং।সারা ঘরময় কালচে ছোপ।ঝুলের পাহাড়।ওখানে ঘুম হয় কারও?হয়না।ওরও তো হয়না।তবুও কাকভোরে ওঠা চাই।কে বোঝাবে?এতটুকু পরিবর্তন হলনা মহিলার।সেই একরকম।

আমরা তিন বোন।গ্ৰামের স্কুলের পাতি কেরাণী বাবা হিসেব করেনি হয়তো।করলে তিন তিনটে সন্তান হয়না ওই রোজগারে।জ্ঞান ইস্তক দেখেছি মা কে উদয়াস্ত খাটতে।ন্যাতাপানা শাড়ি জড়িয়ে কেবলই সংসারের কাজ সারতে।তবে বলতে নেই,বাবা আমাদের সুপুরুষ।ভগবানের দয়ায় বাবার আদলই পেয়েছি আমরা তিনবোন।ধবধবে ফর্সা,সুন্দর স্বাস্থ‍্য,টিকালো নাক।একরকমের ধাঁচ আমাদের তিনবোনেরই।দুই দিদিকেই স্কুল পাশের পরেই বিয়ে দিয়েছে বাবা।তবে দিদিরা আমার ভালোই আছে।জামাইবাবুরা ভালো মানুষ।রুপের জোরেই উতরে গেছে আর কি।

ছোট থেকেই শুনতাম দিদিদের থেকে আমি নাকি একটু বেশি ফর্সা,বেশি সুন্দর।আমার চোখদুটোও নাকি হাসে,আমি যখন হাসি।বলতে নেই লেখাপড়াতেও বেশ ভালোই ছিলাম আমি।কি সুন্দর অঙ্ক ধরে ফেলতাম।হাতের লেখাও ছিলো মুক্তোর মতো।স্কুলের পারুল দিদিমণি খুব আশাবাদী ছিলেন আমাকে নিয়ে।আমি নাকি উচ্চমাধ্যমিকে দারুণ রেজাল্ট করবো।যথেষ্ট সাহায্যও করতেন উনি।আমিও মনপ্রাণ ঢেলে পড়াশোনা করতাম।বাবা সাধ্যমতো করতো।মাষ্টারমশাই রাখতে চেয়েছিলো।আমিই না করে দিয়েছিলাম।কি দরকার?সংসার চালাতে কত কষ্ট বাবার আমি তো জানি।তারপর দিদিদের বিয়ের জন্যও কিছু ধারদেনা হয়েছিলো।মাও এটা ওটা খাবারদাবার এনে মুখের কাছে ধরতো পড়তে বসলেই।আসলে বাবা,মায়ের আলাদা একটু টান ছিলোই আমার ওপর,সেই ছোট থেকেই।আর হবেনা কেন?সবচেয়ে ছোট মেয়ে যে আমি।ছোট আর খোঁড়া।হ্যাঁ,ঠিক শুনলেন।আমি খোঁড়া।ডান পা বেশ খানিকটা ছোট।হাঁটতে পারিনা স্বাভাবিক ভাবে।ওই জন্মগত ত্রুটি যাকে বলে আর কি।

কেউ কখনও ভাবেইনি আমার বিয়ে থা হবে।আমিও ভাবিনি।আর কেই বা খোঁড়া মেয়েকে বিয়ে করবে বলুন?সে যতই রুপ,গুন থাকুক।কিন্তু ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য ভাবেই ঘটে গেলো।একেবারে যেচেপড়ে সম্বন্ধ হাজির।সেদিন কোনও ছুটির দিন ছিলো।মধু ঘটক আমাদের গ্ৰামের নামকরা ঘটক।গ্ৰামের প্রায় সব ছেলেমেয়েদের বিয়ে মধুর হাত দিয়েই হয়।আমার দুই দিদিরও তাই।তা সেই মধুকে হঠাৎ দেখে অবাকই হয়েছিলাম।কিন্তু অবাক হবার তখনও অনেক বাকি।বাবা,মা তো প্রথমটায় বিশ্বাসই করতে পারেনি।আমার মতো খোঁড়া মেয়ের নাকি আবার বাড়ি বয়ে সম্বন্ধ আসে?ছেলে আবার কানা,খোঁড়া কোনটাই নয়?সম্পূর্ণ সুস্থ,স্বাভাবিক ছেলে?এও সম্ভব!

হ্যাঁ সম্ভব বৈকি!ঠিক তেত্রিশ দিনের মাথায় বিয়েও হয়ে গেলো।রজতের একটা মনোহারি দোকান আছে।সংসারে আছে কেবল ওর বিধবা মা।ও তার আগে বলে দিই,রজত হল আমার বর।মোটাসোটা,কালো,গা ভর্তি লোম।আমার ঘাড়ের কাছে পড়ে রজত চাকলাদার।বয়স ধরুন আন্দাজ ওই চল্লিশের কোটায়।তা যাই হোক,বউ হিসেবে সব ধর্মই পালন করতাম।মা পইপই করে শিখিয়ে দিয়েছিলো কিভাবে বরের আর শাশুড়ির মন জোগাতে হবে।ঠিক তাইই করতাম।সংসারের সব কাজ একাই সারতাম।শাশুড়িকে কুটো ভেঙে দুটো করতে দিইনি।রজত মুখ থেকে কথা খসানোর আগে সে জিনিস হাজির করতাম।আরে বাবা খোঁড়া হতে পারি,পঙ্গু তো নই।সবই পারি ঠিকঠাক।আসলে অভ্যেস হয়ে গেছে সবই।হ্যাঁ সবই পারি।ওই সোহাগটোহাগও।তা মিথ্যে বলবোনা রজত হামলে পড়ে খুব আদর সোহাগ করতো।কচি বউ বলে কথা,তায় সুন্দরী।সব সুন্দর চলছিলো।তাল কেটে গেলো বছর খানেকের মাথায়।

প্রায়ই দেখতাম রজত বাড়ি ফিরছেনা রাতে।জিজ্ঞেস করলে বলতো দোকানের মাল আনতে কলকাতা যেতে হয়,ফেরা হয়না।ওখানেই থাকতে হয়।একটু খটকা লেগেছিলো।প্রতি সপ্তাহে চার পাঁচদিন কি এমন মাল আনতে যেতে হয়?এতদিন তো তেমন ছিলোনা।তবুও মুখে কিছু বলিনি।আরও প্রাণ ঢেলে ভালোবাসতে,সেবা করতে লাগলাম।কিন্তু রজতের ব্যবহার বদলাতে শুরু করলো।বদলালো শাশুড়িও।সহ্যই করতে পারতোনা আমাকে ওরা।শাশুড়ি কথায় কথায় গালিগালাজ করতো।একদিন তো রুটি একটু শক্ত হয়েছিল বলে চুলের মুঠি ধরে দু ঘা দিয়েই দিলো ওই বুড়ি।তবুও দাঁতে দাঁত চেপে ছিলাম।বাবা,মাকে কিচ্ছু জানাইনি।কি বলব?কি সুরাহা হবে তাতে?অশান্তি ছাড়া কিছু দিতে পারবো ওদের?

তখনও বুঝিনি ওদের এহেন ব্যবহারের কারণ।সেদিনও বুঝিনি যেদিন রজত প্রায় বিনা কারণে মেরে কালশিটে ফেলে দিলো,একটা দাঁতও নড়িয়ে দিল এক চড়ে।কিন্তু ওরাও বোধহয় আর ধৈর্য্য রাখতে পারেনি সেদিন।গালাগালি দিয়ে,মারধোর করে ওরাও বোধহয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।রজত সরাসরি বললো সেদিন।পরিষ্কার গলায়,চোখে চোখ রেখে বললো কলকাতার এক মেয়েছেলের সাথে লটঘট হয়েছে।সে এখন বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে।আসলে সে মেয়েছেলের পেট হয়ে গেছিলো।অতএব আমাকে ফুটে যেতে হবে এবার।ওই মেয়ে সতীনঘর করবেনা মোটেও।আমিও হিসহিসিয়ে বলেছিলাম,

-যাবোনা।ইয়ার্কি নাকি?বললেই হল?
-যাবিনা মানে?তোর বাপ যাবে।খোঁড়া মাগি।
-বিয়ে করে এনেছিলে কেন?আমি তো পায়ে ধরে আসিনি।
-ওই এনেছিলাম বলে বর্তে গেছিস।আইবুড়ো নাম ঘুচেছে।খোঁড়া মেয়েমানুষ আবার কি চাস?চল ফোট।
-কোথাও যাবোনা।আমি কোথাও যাবোনা।

এই দেখুন এত কথা আপনাদের বলতে বলতে কখন বেলা বেড়ে গেছে।রোদ এসে পড়েছে উঠোনে।ম্যালা কাজ আছে।শাশুড়ি এক্ষুনি চিল্লিয়ে বাড়ি মাথায় করবে।বুড়ি নিশ্চয়ই ওই পেছনের বাগানটায় গেছে।এসে যেই দেখবে এখনও এখানে দাঁড়িয়ে আর রক্ষে থাকবেনা।তবে আজকাল শাশুড়ি যেন একটু নরম হয়েছে।কথায় কথায় গায়ে হাত তোলা,গালাগালি এসব আর করেনা বললেই চলে।যেটুকু যা আছে,সেও আস্তে আস্তে চলে যাবে।যতই হোক,মানুষটার তো বয়স হয়েছে।এতদিনে বুঝেছে,আমি ছাড়া গতি নেই।যাই,দেখি বুড়ি কি করছে।ও আর একটা কথা,আসল ঘটনাই তো বলা হয়নি।দেখেছেন কেমন ভুলোমন হয়েছে আজকাল!

হয়েছিলো কি,সেদিন কথায় কথা বেড়েছিলো খুব।খুব একপ্রস্থ মারধোর করে ওই পূবের ভাঁড়ার ঘরে আমাকে আটকে রেখেছিলো ওরা।ওই গরম আর মশার মধ্যেই কখন যেন চোখটা লেগে এসেছিল।হঠাৎ খুব গরম হলকায় ঘুমটা ভেঙে যায়।অন্ধকারে ঠাওর করলাম চোখের সামনেই তিন চারটে জ্বলন্ত দেশলাই কাঠি।কিছু বোঝার আগেই  দাউদাউ আগুন জ্বলে উঠলো ঘরে।লাফিয়ে যেই উঠতে গেছি অমনি দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিলো ওরা।জোর ধাক্কা দিলাম দরজায়।ততক্ষণে আগুন ছড়িয়েছে আমার শরীরে।মরিয়া হয়ে ধাক্কাটা জোরেই হয়েছিল।পুরোনো ঘুণ খাওয়া দরজা ভেঙেও গেলো।সামনেই ছিলো শাশুড়ি।জড়িয়ে ধরলাম গিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে।বুড়ি খুব ছটফট করছিলো পালাবে বলে।আমার সাথে পারবে কেন?পা টাই যা কমজোরি।আর তো সব ঠিক আছে।দাউদাউ করে জ্বলে গেলাম দুজনেই।রজত তখন পরিত্রাহী চিৎকার করছে।কারা যেন সব ছুটে এসেছে।

সেই থেকেই আমরা এখানে।সেই রাতেই মরে গেছিলাম দুজনেই,আমি আর আমার শাশুড়ি।পনেরো মিনিটের হেরফের কেবল।রজত বিয়ের জন্য এত মরিয়া হয়েছিল বটে,তবে আজকাল বোধহয় উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে।এই সেদিনও তো শুনলাম ফোনে খুব ঝগড়া করছে ওই মেয়েছেলের সাথে।সে বোধহয় বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে খুব।আর দেবে নাই বা কেন?তার তো বিয়োবার আগে বিয়ে দরকার রে বাবা।এই মাথামোটা রজতটাকে কে বোঝায়?আসলে ভীতু ভীতু।রজতটা বড্ড ভীতু।বাড়িতে থাকেইনা আজকাল।রাত্তিরটুকু কোনমতে কাটায়।তা আমরাই বা কি করি?এক বাড়িতে থাকতে গেলে আওয়াজ টাওয়াজ হবেনা?পোড়া ক্ষতগুলো এখনও বড্ড দগদগে যে।যন্ত্রণা হলেই চিৎকার করে কাঁদি আমরা দুজনেই,আমি আর আমার শাশুড়ি।রাতের দিকেই বেশি হয় যে যন্ত্রণাটা।আর শাশুড়ি পরে আমাকে বলেছে,দেশলাই কাঠি সেদিন রজত জ্বালেনি।ও কেরোসিন ঢেলেছিলো।কাঠি জ্বালিয়েছিলো শাশুড়িই।সে যাক গে।আমার আর রাগটাগ নেই ওদের ওপর।তবে এই বুড়ির কি যে অভ্যাস হয়েছে কে জানে?সারারাত যন্ত্রণায় ছটকাবে আর একের পর এক দেশলাই কাঠি জ্বালতেই থাকবে।                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                          
#Bangla Golpo
#শ্রীতমা সেনগুপ্ত

0 comments: