Monday, May 4, 2020

BOOK REVIEW : ঢোঁড়াই চরিত মানস



'ঢোঁড়াই চরিত মানুষ' বাংলা সাহিত্যে দলিত মানুষদের এক অনন্য দলিল - একটি আলোচনা।
সতীনাথ ভাদুড়ীর জন্ম ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯০৬ সালে। জন্মেছেন তৎকালীন বিহারের পূর্ণিয়ায়। পিতা ইন্দুভূষণ জীবিকা সূত্রে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ার কৃষ্ণনগর থেকে সেখানে গিয়েছিলেন।
সতীনাথের স্কুলজীবন শুরু হয় সেখানেই। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অর্থনীতিতে এম এ এবং বি এল পাস করেন। পিতার সহকারীরূপে আইন ব্যবসা শুরু করলেও তিনি জড়িয়ে পড়েন সমাজসেবা এবং জাতীয়তাবাদী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। সেই সময়ের স্বনামধন্য সাহিত্যিক কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহ তাঁকে সাহিত্যের দিকে ঠেলে দেয়। পাশাপাশি গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ফলে জেল জীবনের স্বাদ পান। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ফলে দ্বিতীয় জেল জীবনে লেখেন 'জাগরী'। এসময় তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় ফণীশ্বরনাথ রেণু সহ বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক বিখ্যাত ব্যক্তির সঙ্গে। জাগরী উপন্যাস তাঁকে সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং এরজন্য রবীন্দ্র পুরস্কার পান। 'জাগরী' এবং 'ঢোঁড়াই চরিত মানস' তাঁর এই দুটি ব‌ইয়ের কথাই বেশি চর্চিত হয়। সেই হিসেবে তিনি খুব জনপ্রিয় লেখক নন। তবু বাঙালি মানসে তিনি জেগে আছেন তাঁর এই দুই উপন্যাসের শিল্পিত বৈশিষ্ট্যের জন্য।

ঢোঁড়াই চরিত মানস দুটি পর্বে লেখা। প্রথম পর্ব ১৯৪৯-এ প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় পর্ব ১৯৫১ সালে।

পূর্ণিয়া সংলগ্ন উত্তর বিহারের ধাঙড় সম্প্রদায় দলিত বর্গের মানুষের একটি গোষ্ঠী। এরা একেবারেই অচ্ছুৎ। বিহারের জাতপাতের সমস্যা ভারত বিখ্যাত। কিন্তু ১৯৪৮-৫০ সময়ে সেখানে জাতপাতের ব্যাপারটা কেমন ছিল ২০২০ সালে তা আমাদের কল্পনায় আসবে না। খানিকটা আন্দাজ করা যায়, যদি মৃণাল সেনের 'মৃগয়া' ছবিটি দেখা থাকে! কারণ ওই ছবি তৈরি হয়েছে হিন্দি সাহিত্যের বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ফণীশ্বরনাথ রেণুর কাহিনি নিয়ে। ফণীশ্বরনাথ ছিলেন সতীনাথের কারাবাসের বন্ধু। সতীনাথ ভাদুড়ীকে নিয়ে তাঁর 'ভাদুড়ীজি' নামে একটি স্মৃতিকথা আছে।

তাৎমাটুলীর কাহিনি ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’ বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কয়েকটি উপন্যাসের অন্যতম। দেড় বছর বয়সে ঢোঁড়াইয়ের বাপ মারা গেছে। তার মা আবার বিয়ে করেছে বাবুলালকে। ঢোঁড়াই মানুষ হয়েছে পূজারি বামুন বৌকাবাওয়ার কাছে।

তাৎমাটুলীর মেয়েরা পশ্চিমে ধান কাটতে যায়। রামিয়া-কাণ্ডের শুরু সেখানে। পশ্চিম মানে গঙ্গা কিনারে মুঙ্গের। সেখানে রামিয়াকে দেখতে পায় রবিয়ার বউ। রামিয়ার মা মারা গেছে রবিয়ার বউয়ের সঙ্গে রামিয়া গ্রামে ফেরে। রামিয়ার যৌবনে মুগ্ধ ঢোঁড়াই বিয়ে করে তাকে। ঢোঁড়াইয়ের আশ্রয়দাতা বৌকাবাওয়া নিরুদ্দেশ হয়।

রামিয়ার সাথে সামুয়র ঢলাঢলি ঢোঁড়াই মানতে পারে না। তার মাথা গরম হয়। রামিয়ারকে শাসন করে। সামুয়রকে রামিয়ার ভালো লাগে। ঢোঁড়াইয়ের প্রতি বিরক্ত রামিয়া ঘরে ফেরে না। অথচ ঢোঁড়াই ভাবে রাত কাটিয়ে সে নিশ্চয় ফিরবে। তারপর সে মাফ চাইবে তার কাছে। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে সে উনুনে বসবে ঢোঁড়াইয়ের জন্য ভাত রাঁধতে। না না, আজ সে ছটপরবের ‘ঠেকুয়া’ তৈরি করবে। এই সব
আকাশপাতাল ভাবে ঢোঁড়াই।

রামিয়াকে পছন্দ করে বিয়ে করেছে। অথচ এক বছর পার না হতেই পরপুরুষের সঙ্গে প্রেমে মশগুল সে! রামিয়ার পেটে ঢোঁড়াইয়েরই সন্তান। সে আর ভাবতে পারে না। সামুয়র যত নষ্টের গোড়া। ঢোঁড়াই সারা রাত জেগে কাটায়।
রামিয়া ফেরে না, গাঁয়ের পঞ্চকে টাকা খাইয়ে হাত করে সামুয়র রামিয়ার সঙ্গে ঢোঁড়াইয়ের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটায়। রামিয়াও রাজি। ঢোঁড়াই গ্রাম ছাড়ে। রামিয়ার বিচ্ছেদ তাকে ঠেলে দেয় উদ্বাস্তু জীবনে।

রামিয়া সামুয়রকে বিয়ে করে। মরা ছেলে জন্ম দিয়ে মারা যায়। ঢোঁড়াই জানে না রামিয়া মারা গেছে। সে আবার স্বপ্ন দেখে অ্যান্টনিকে নিজের ছেলে ভেবে। ১৫ বছর পর অ্যান্টনির হাত ধরে রামিয়ার আশায় তাৎমাটুলীতে এসে দাঁড়ায় ঢোঁড়াই। জানতে পারে অ্যান্টনির মা রামিয়া নয়। বুঝতে পারে অ্যান্টনি তার ছেলে নয়।

ভারতীয় গ্রামীণ জীবনের আঁধি সতীনাথের উপন্যাসের আদি অকৃত্রিম স্পন্দন। ঢোঁড়া সাপ কখনো গোখরোর সঙ্গে পারে! রামিয়া হল গোখরো সাপ। তার দংশনের বিষে নীল হয়ে গেছে ঢোঁড়াইয়ের জীবন।

অনেকে বলেছেন রামায়ণের আদর্শ এই গঙ্গা পাড়ের মানুষের মধ্যে দারুণভাবে প্রভাবশালী। ঢোঁড়াই ‘এ যুগের’ রামচন্দ্র। রামায়ণের আদলে এই কাহিনি লিখেছেন সতীনাথ। কিন্তু ঢোঁড়াই সারা জীবন একটু ভালোবাসার খোঁজে ঘুরে বেড়িয়েছে। সে ভালো বাসা পায়নি।

ভারতীয় সাহিত্যে নিম্নবর্গের অর্থাৎ দলিত মানুষ বোধহয় এমন ভাবে আগে কোনোদিন আসেনি। যদিও বাংলা সাহিত্যে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে এর সূচনা হয়েছিল। ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’-এ সতীনাথ সেই দলিত মানুষের জীবনকে দিয়েছেন মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি। এই অর্থে তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস 'ঢৌঁড়াই চরিত মানস'।

দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৪৮ সালে সতীনাথ রাজনীতির সংশ্রব সম্পূর্ণ ছেড়ে পুরোপুরি সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। একটানা ১৭ বছর লিখে গিয়েছেন। ৩০ মার্চ, ১৯৬৫ তিনি প্রয়াত হন।

কলমে : শুভম নন্দ 

0 comments: